অধ্যায় ১
কর্ণাটকে মীর জুমলার প্রশাসন
৩। সেনা বাহিনী ব্যবস্থাপনা
কর্ণাটকে সামরিক অভিযানে সুলতান আবদুল্লা কুতুব শাহের বিপুল সুলতানি সেনা বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করা ছাড়াও, মীর জুমলার নিজস্ব সেনা বাহিনীর বহরও কম ছিল না। আওরঙ্গজেব সূত্রে জানতে পারছি, মীর জুমলা তার বাহিনীর বড় অংশই কর্ণাটক অভিযানে পাঠিয়েছিলেন। বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ায় বিশাল এলাকা দখল করা, সেই সব অঞ্চল দেখাশোনার কাজ চালানো এবং সেনা বাহিনী রাখার কাজ তুলনামূলকভাবে সহজ হয়ে গিয়েছিল। ওয়াল্টার লিটন এবং ভেঙ্কট ব্রাহ্মণ (১৭ জানুয়ারি ১৬৫১) সূত্রে জানছি যে মীর জুমলার ছিল ৩০০ হাতি, ৪০০-৫০০ উট এবং ১০,০০০ যাঁড় (অক্সেন–ষাঁড় বা মহিষ বা উটের মত ভারবাহী পোশে সেনাবাহিনীতে দরকার হত যুদ্ধের আগে বা পরে এমনব কী যুদ্ধের সময়ে বিপুল ভার বওয়ার জন্যে — যেমন বিপুল সেনার জন্যে তাঁবু, বিশাল রসদ, অস্ত্রশস্ত্র যেমন ভারি কামান)। ১৬৫২র বিজাপুরের সেনা অভিযানের আগে তিনি উদ্যম নিয়ে মুঘল, আফগান, পাঠান এবং রাজপুত সেনা সংগ্রহ করে বিশাল বাহিনী তৈরি করেন। নিজের হাতে, অর্জিত সম্পদে তৈরি বড় বাহিনীর জন্য তিনি গর্বিতও হতেন। ক্রমে নিজেকে শক্তপোক্ত আর আত্মনির্ভর করে গড়ে তুলে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে কুতুবশাহী সেনাবাহিনীর বহু যুদ্ধপোক্ত সেনা নায়ককে (সেনাপতি) ‘অপূর্ব অমায়িক ব্যবহার এবং অনুগ্রহ’ প্রদর্শন করে নিজের দিকে টেনে এনে পুরোনো অভিজ্ঞ কুতুব শাহী সেনার কাঠামো অনুকরণে সেনা বাহিনী গঠন করেন। মীর জুমলার কাজকর্ম সম্বন্ধে [গোপনে] সংবাদ সংগ্রহ করতে আওরঙ্গজেব মহম্মদ মুনিমকে পাঠিয়েছিলেন (১৬৫৩-৫৪)। সমীক্ষাপত্রে নুবিন লিখলেন, মীর জুমলার বাহিনীতে রিসালা (ঘোড় সওয়ার) ছিল ৯,০০০ — যার মধ্যে ৫,০০০ নিজের আর ৪,০০০ কুতুব শাহীর, পদাতিক ছিল ২০,০০০ — এ ছাড়াও তার বাহিনীতে সম্পদ হিসেবে ছিল নগদ অর্থ, মনোমুগ্ধকর অলঙ্কার, প্রশিক্ষিত হাতি, ইরাকি আর আরবি ঘোড়া, এছাড়াও আত্মমর্যাদা, গৌরব আর সম্মান বৃদ্ধির জন্য যা যা কিছু লাগে সবকিছুই। বিশাল এই বাহিনী তাঁর যোগ্য নেতৃত্বে সামরিক দক্ষতার চূড়ান্ত শীর্ষে পৌঁছেছিল।
দক্ষ সেনানায়ক মীর জুমলা সেনা বাহিনীর নানান খুঁটিনাটির দিকে প্রভূত নজর দিয়েছিলেন। ১৬৪২-তে তিনি সেনাবাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহের বিষয়টি নিষ্পত্তি করেন। তিনি শুধু যে সেনার বা পশুর খাবার মছলিপত্তনম, কোণ্ডাপল্লী এবং কোণ্ডাভিডু থেকে বাজার দরে কেনার উদ্যোগ নেন তাই নয়, তিনি শস্য দালালদের সেনা বাহিনীর সঙ্গে জুড়ে নিয়েছিলেন, যাতে বাহিনীর পণ্য সরবরাহে বিন্দুমাত্র ছেদ না পড়ে। আগেই দেখেছি, জরুরি চিঠিপত্র দ্রুত আদানপ্রদান করতে প্রভূত ডাকচৌকি স্থাপন করেছিলেন, যাতে সেনাবাহিনীর সঙ্গে দরবারের মধ্যে নিয়মিত খবর আদান প্রদান হয়। তাঁর জন্য প্রশিক্ষিত কবুতর এবং ডাকহরকরা নিয়োগ করেছিলেন।
যুদ্ধের আক্রমণাত্মক অস্ত্রশস্ত্রের বিষয়ে তাভার্নিয়ের সূত্রে জানতে পারছি, মাথায় ঝুঁটি বাঁধা হিন্দু পদাতিক সেনারা কোমরে সুইস সেনার মত চওড়া তরোয়াল বহন করত। ফরাসিদের তৈরি ভালতম কামানের থেকেও মীর জুমলার কামানের মুখ ছিল চওড়া, আরও শক্তপোক্ত। তিনি কামান তৈরিতে সব ভাল লোহা ব্যবহার করতেন যাতে গোলা ছোঁড়ার গরমে যুদ্ধ ক্ষেত্রে কামানগুলো ফেটে না যায়। ঘোড়সওয়ারদের পিঠে তীর ধনুক, যুদ্ধ কুঠার, আর ঢাল থাকত। এবং আত্মরক্ষার অস্ত্র হিসেবে বর্ম, শিরস্ত্রাণ, কাঁধে ঝোলানো লোহার বর্ম-জ্যাকেট, বাহুবন্ধ এবং বর্মের মত করে সারা দেহে আবরণ। কিন্তু সমস্যা হল সাধারণ পদাতিকের দেহে ৫ গজের মত কাপড় পরানো হত, যা দিয়ে তাদের সামনে বা পিছন কোনটাই ঢাকত না।
গোলান্দাজদের সঙ্গে ছিল কামান আর গুলতি — যা দিয়ে বিশাল বিশাল আগুণের গোলা বিপক্ষের দিকে ছোঁড়া যায়। আর ছিল কামানের জন্য গোলার ভাণ্ডার। মীর জুমলার এই বিভাগটা দেখত ফরাসি আর অন্যান্য খ্রিস্টান এবং বার্ণিয়ে বলছেন তাদের দক্ষতা চূড়ান্ত আকারের ছিল।
তাঁর বাহিনীতে বহু ইওরোপিয়, ফরাসী, ব্রিটিশ, পর্তুগিজ, ইটালিয় সেনা চাকরি করেছে। বিশেষ করে গোলান্দাজ বাহিনীর নানান পদে ইওরোপিয়রা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। ১৬৫০-৫২-য় ব্রিটিশরা তাঁকে ৬জন গোলান্দাজ — জেরিমি রুট, হিউ ডিক্সন, রিচার্ড এমার্সন, জন কাউহিল, রবার্ট ব্রিংবোর্ণ এবং রিচার্ড হল ধার দিয়েছিল। সেন্ট ফোর্ট জর্জের গোলান্দাজ সেনাপতি জেরিমি রুটের দক্ষতাকে মীর জুমলা বেশ গুরুত্ব দিতেন। ১৬৫৩য় আরও দুজন গোলান্দাজ সেনা সেন্ট জর্জ থেকে মীর জুমলার বাহিনীতে আসে। এছাড়াও বহু গোলান্দাজ সেন্ট জর্জ থেকে পালিয়ে তাঁর বাহিনীতে যোগ দিত এবং তিনি তাদের রাজনৈতিক সুরক্ষা দিতেন। এ মর্মে দুই পক্ষের মধ্যে চালাচালি করা বহু চিঠি-চাপাটি উদ্ধার করা গেছে। ১৬৫২-য় গাণ্ডিকোটায় মীর জুমলার বাহিনী দেখতে এসে তাভার্নিয়ে এবং তাঁর বন্ধুর (দু জার্ডিন) সঙ্গে একজন ব্রিটিশ গোলান্দাজ আর তাঁর ইতালিয় বন্ধু, নৈশভোজে যোগ দিয়েছিল। একজন ফরাসি কামান তৈরির জন্য খ্যাত গোলান্দাজ, শল্যচিকিতসক, ক্লদ মিলে, মীর জুমলার গোণ্ডিকোটার দুর্গের জন্য ১০টি ৪৮ পাউণ্ডের এবং ১০টি ২৪ পাউণ্ডের কামান তৈরির পরিকল্পনা করলেন। বিভিন্ন যায়গা থেকে তামা যোগাড় করে, গাণ্ডিকোটার ছটি বিখ্যাত মন্দিরের মূর্তি বাদ দিয়ে, অন্যান্য মূর্তি গলিয়ে মোট চাহিদামত তামা জোগাড় হল। কিন্তু তিনি একটাও কামান তৈরি করতে পারলেন না, নবাবের সেনাবাহিনী ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হলেন। শ্রীরঙ্গ বাহিনী থেকে দামরালা ভেঙ্কটাপ্পাকে পদচ্যুত করায়, সে মীর জুমলার বাহিনীতে যোগ দেয়। কর্ণাটকের হিন্দু বিদ্রোহের সময় জিঞ্জির টুপাক্কি কৃষ্ণাপ্পা নায়ক, মীরের সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর বাহিনীর আর এক হিন্দু সেনাপতির নাম ছিল ছিন্নাতাম্বি মুদালিয়ার।
বিভিন্ন জাতি সমন্বয়ে গঠিত বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে মীর জুমলা সতর্ক থাকতেন। ১৬৫২-র ১ সেপ্টেম্বর তাভার্নিয়ে দেখলেন পেন্নার নদীর তীরে মীর জুমলার সমগ্র বাহিনী পাহাড়ের তলায় সমবেত হয়েছে, এবং ঘোড়সওয়ার নজরদারি সবে শেষ হয়েছে এবং তাঁকে বেশ চৌখস (স্মার্ট) লাগছে। পরের নজরদারির তারিখ ঠিক হল ঐ মাসের ১৪ তারিখে।
বেতনের বিষয়ে কিছুটা সামন্ততান্ত্রিক পদ্ধতিতে এবং কিছুটা নগদে বিদায়ের প্রথা ছিল। প্রথমটির উদাহরণ পাওয়া যায় মুকাসদার বা জায়গির দেওয়ার প্রথায়, যারা সেই জায়গির থেকে রোজগারের টাকায় বেতন দিত। তারা সেনা সরবরাহ করত কি না জানা যায় না। পেশাদার সেনাদের সেনাপতি মার্ফত রাষ্ট্র নগদে বেতন দিত। তাভার্নিয়ে বলছেন, ১১ সেপ্টেম্বর ১৬৫২-তে ফরাসী গোলান্দাজেরা মীর জুমলার তাঁবুতে গিয়ে তাদের চার মাসের বকেয়া দাবির জন্য বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। অনাদায়ে তারা তাকে ছেড়ে চলে যাবে এমনও হুমকিও দিয়েছিল। নবাব তাদের পরের দিন আসতে বললেন, তিন মাসের বকেয়া মিটিয়ে দিলেন এবং এক মাসের বাকি বেতন মাসের শেষে দিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিলেন। বেতনটা হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার অর্ধেক তারা নাচনেওয়ালি এনে আমোদ ফুর্তি করে উড়য়ে দিল।
পাহাড়ি দুর্গ ছাড়াও, আমরা জনতে পারছি জিঞ্জি গাণ্ডিকোটা, উদয়গিরি পাহাড়ের শীর্ষের দুর্গ আর রায়পুর ছিল বন ঘেরা দুর্গ। এছাড়া নেল্লোর দুর্গ সমতলে অবস্থিত ছিল। (চলবে)