কর্ণাটকে মীর জুমলার প্রশাসন
৪। মীর জুমলার বৈদেশিক বাণিজ্য
দৈনন্দিন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ডুবে থেকেও মীর জুমলা তাঁর অমিত সম্পদ, তাঁর সমৃদ্ধি, তাঁর ক্ষমতার উৎস – বৈদেশিক বাণিজ্যের দিকে নজর দিতে ভুলে যান নি। প্রাথমিকভাবে খুব ছোট্ট করে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। ১৬৫০এর শেষের দিকে সেই দেশিয় এবং বৈদেশিক ব্যবসা বিপুল কলেবর লাভ করে। ১৬৫১র জানুয়ারির হিসেবে তাঁর ব্যবসায় নিয়োজিত ছিল ৪০০-৫০০ উট, ৪০০০ ঘোড়া, ৩০০টি হাতি আর ১০,০০০ ষাঁড় [ব্রিটিশদের ভাষায় বুলক ট্রেন]। এই ব্যবসা-বাহিনী তাঁর পণ্য গোলকুণ্ডা এবং বিজাপুরে এমনকি মুঘল সাম্রাজ্যে নিরাপদে, শস্তায় পৌঁছে দিত। প্রায় প্রত্যেক (ব্যবসায়িক) যায়গায় তাঁর নিজস্ব দালাল এবং নিজস্ব ব্যবসায়ী বসানো ছিল। তিনি বাণিজ্য করতেন ১) বর্মা – আরাকান, পেগু, টেনাসেরিম (মারগুই দ্বীপপুঞ্জ), ২) আচে, পেরুক, মাকাসসার এবং মালদ্বীপ, ৩) পারস্য এবং আরব, ৪) বাঙলার সঙ্গে। তাঁর সামুদ্রিক বাণিজ্যের জাহাজ ছিল ১০টি, এবং ক্রমশঃ সংখ্যা বাড়াতে থাকেন, পূর্ব উপকূলের নর্সাপুরে তাঁর বিপুলাকায় বাণিজ্য জাহাজ তৈরি হত। ১৬৩৮-এর জুলাইতে ৮০০ টনের একটি বিশাল জাহাজ (জাঙ্ক) তৈরি করেন পারস্য বা মোকায় পণ্য রপ্তানি করার জন্য। তাঁর কারখানার চিঠিচাপাটিতে জাহাজটির নাম উল্লিখিত ছিল সরইখাহিলের ‘বিশালকায়’ জাহাজ হিসেবে।
তাঁর মনে হয়ে ছিল বিজয়নগরের নাবিকেরা বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে। সে জন্য তিনি বাণিজ্য জাহাজে ব্রিটিশ আর ডাচ নাবিক নিযুক্ত করেছিলেন। এদের মধ্যে অন্যতম ছিল রজার এডামস (১৬৪২), রিচার্ড ওয়ালউইন (১৬৪৭), জন গাইটন (১৬৪৬), টমাস বোস্টক (১৬৫০)। কিছু মুসলমান নাবিকও ছিল — মুবারক টুকিল জাহাজের নেতৃত্ব দিতেন মুহম্মদ বেগ – তিনি মূলত পেগুতে ব্যবসায় যেতেন, নাখুদা নুরা যেতেন আচে, নাখুদা মুল্লা হাসান যেতেন গম্ব্রুন ইত্যাদি (অশীন দাশগুপ্তের ‘বঙ্গোপসাগর ১৫০০-১৮০০’ পড়তে গিয়ে একটা ভুল ভাঙ্গল। নাখুদা বা নাখোদা কিন্তু শুধুই বাণিজ্য জাহাজের প্রধান নাবিক নন, সম্পন্ন ব্যবসায়ীও বটে। কতকিছু যে জানা বাকী! তিনি লিখছেন, একটি সামান্য উদাহরণ দিই। গুজরাটের বন্দরগুলি থেকে যে ভারতীয় জাহাজ ভারত সমুদ্র পাড়ি দিত সেগুলিতে ১৭ শতক কি ১৮ শতকে মাঝি, মাল্লা, সারেং হিশাবে যেত সমুদ্রতটের গ্রামগুলির মানুষেরা। জাহাজের নাখুদা, হিশাবে সর্বময় কর্তৃত্বে যে লোকটি থাকত প্রায়শই সে হত সম্পন্ন কোনো বপণিক। মোগল আমির কেউ জাহাজে থাকলে তার প্রভুত্ব সবাই মানিত। এইভাবে দেশের সমাজ ও রাজনীতি সমুদ্রের জলে ঝাঁপিয়ে পড়ত’ — অনুবাদক)।
সামুদ্রিক সওদাগরি ক্রমশ বাড়তে থাকা সত্ত্বেও সব থেকে বড় দুর্বলতা ছিল, সমুদ্রে পণ্য সুরক্ষায় সেনাবাহিনীর অভাব। তাই সওদাগরদের নির্ভর করতে হত ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির ছাড়পত্রের ওপর। ১৬৫১-তে মীর জুমলা এবং গোলকুণ্ডার সুলতান পর্তুগিজদের থেকে সামুদ্রিক ছাড়পত্র নেওয়া বন্ধ করে দিলেও মাদ্রাজ ঘেরাওয়ের সময়ে (১৬৫৭, সেপ্টেম্বর — ১৬৫৯ এপ্রিল) মীর জুমলা নিজের সমুদ্রগামী জাহাজের জন্য ছাড়পত্র চাইলে ব্রিটিশেরা সেই কার্তেজ [সমুদ্রে দেশিয় বাণিজ্য জাহাজ যাওয়ার নিরাপত্তার ছাড়পত্র] দিতে অস্বীকার করে।
মীর জুমলা বার্মার সঙ্গে বড় ব্যবসা করতেন। বার্মাতে ছিল সারা বিশ্বের চাহিদাবন্ত সব থেকে ভাল চুণি আর নীলকান্তমণি। বার্মার গালার (গামল্যাক) গুণমান ভারতের তুলনায় উচ্চশ্রেণীর ছিল। মারটাবান জার, সোনা, তামা, টিন, কুইকসিলভার, গানজা (কাঁসা) এবং বেনজয়েন (লাবান?) বার্মায় মিলত। গোলকুণ্ডার মন্ত্রী থাকার সময় তিনি হাসান খানকে পেগু পাঠিয়েছিলেন শ্বেত হাতির দেশের রাজার সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য। পরের দিকে তিনি বার্মার রাজাকে অনুরোধ করেন, গোলকুণ্ডার নাবিক, মুহম্মদ বেগ এবং তাঁর নিজের জাহাজকে পেগুতে বাৎসরিক ব্যবসার সুযোগ দিতে। মীর জুমলা অনেক সময় ব্রিটিশ ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীদের (১৬৪৭ সালে রিচার্ড কোগান) পেগুতে তাঁর পণ্য নিয়ে ব্যবসা করার জন্য নিযুক্ত করতেন। তিনি পেগুতে ব্রিটিশদের ব্যবসার থেকে অনেক বেশি লাভে ব্যবসা করতেন। মীর জুমলার নিজস্ব অতিকায় জাহাজ মছলিপত্তনম থেকে নিয়মিত পেগুতে যেত এবং তাঁর কর্মচারী এবং দালালেরা অনেকসময় ডাচেদের জাহাজে (১৬৫৩) যাতায়াত করে পেগুর সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্বন্ধ বজায় রাখত। ১৬৫১য় চিনা আক্রমণে পেগু বিপর্যস্ত হলে মীর জুমলা আর ডাচেদের ব্যবসা বিপুল মার খায়। ১৬৫৩-তে পেগুর রাজা অচেনাদের (বিদেশি?) টিন আর হাতির দাঁত বিক্রি বন্ধ করেন। তাছাড়া কাঁসা রপ্তানি ব্যবসা কতিপয় ব্যবসায়িদের দখলে চলে যায়।
আরাকান হাতির জন্য বিখ্যাত ছিল। মীর জুমলা আরাকান রাজ, ধর্মরাজকে অনুরোধ করেন তাঁর কর্মচারীদের আবাধে ব্যবসার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। তাঁর বিশেষ অনুরোধে রাজা, শাহজাহানের চর সন্দেহে কারাগারে বন্দী সাত ইরাকিকে ছেড়ে দেন। এছাড়াও দীর্ঘদিন আরাকানের কারাগারে কিছু মুঘল বন্দীকে ছেড়ে দেওয়ার এবং আরাকানকে মুক্ত বাণিজ্যের নীতি লাগু করতে অনুরোধ করেন। তাঁর যুক্তি ছিল একমাত্র এইভাবেই আরাকান বিশ্ব বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠতে পারে। মীর জুমলা পূর্ব উপকূলে পাঠানো সে দেশের চারটি হাতি কেনেন এবং রাজার পাঠানো একটি অতরিক্ত হাতি উপহার পান।
পূর্ব উপকূলের ক্যালিকোর বদলে মীর জুমলা ইস্ট ইন্ডিজের মশলা, দাস, মাকাসসারের চাল, পেরুকের টিন এবং মালদ্বীপের কড়ি সংগ্রহ করতেন।
তাঁর বাণিজ্যের শৃংখলে পারস্য খুব বড় অংশিদার ছিল। প্রত্যেক বছর বিভিন্ন আকারের জাহাজে তিনি বিপুল পরিমানে পণ্য ভারতের পূর্ব উপকূল থেকে পারস্যে পাঠাতেন। যতক্ষণনা সরইখাহিল বা উজিরের সব ক’টি জাহাজ পণ্যে ভর্তি না হচ্ছে, ততক্ষণ কোন জাহাজেরই বন্দরে ভেড়া বা বন্দর ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হত না। গোলকুণ্ডার মন্ত্রীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের জেরে তিনি বহু সময়ে ব্রিটিশ কোম্পানির বহু জাহাজ, কোন রকম কর আর শুল্ক না দিয়েই পারসিক ব্যবসার কাজে (যেমন ১৬৩৭, এবং ১৬৪০-এ শুল্ক ছাড়া চিনি পাঠানো) ব্যবহার করতেন। ১৬৫১-৫২-তে একটি জাহাজ মছলিপত্তনম থেকে মারাকান উপকূলের গদর বন্দর হয়ে গম্ব্রুন পৌঁছয়। সেই জাহাজে কোম্পানির পণ্যের সঙ্গে তাঁরও শুল্ক মুক্ত ২০০ টুনাম পরিমান পণ্য ছিল। ১৬৫৩-য় গাম্ব্রুনে ব্রিটিশ ফ্যাক্টরেরা আশংকা করছিলেন, তাঁর শুল্ক মুক্ত দুই বেল গাঁটরির খবর যদি শাহবান্দার পায় তাহলে ঝামেলা হতে পারে – কেন না শাহবান্দারের দায়িত্ব ছিল, তাদের দেশে মুসলমানেদের পাঠানো গাঁঠরি খুলে তল্লাসি করা। মাদ্রাজের ফ্যাক্টরেরা ব্রিটিশ বণিকদের জানালেন, যদি এই দেশে তাদের কাজ করতে হয়, বাণিজ্য সুবিধে পেতে হয়, তাহলে তাদের মীর জুমলার নির্দেশানুযায়ী কাজ করতে হবে। মীর জুমলা বাঙলার সুবাদারির সময় এই ভাবেই বিদেশে শুল্কমুক্ত পণ্য পাঠাতেন।
১৬৪২, ৪৬ এবং ৪৮-এ ব্রিটিশ নাবিকের নেতৃত্বে তাঁর জাহাজ মোকায় ব্যবসা করতে গিয়েছিল।
বিজয়নগর সাম্রাজ্য আর ব্যবসার পতনের ফলে মীর জুমলা তাঁর বিদেশি ব্যবসার বহর বাড়িয়ে তাদের ছেড়ে যাওয়া বৈদেশিক ব্যবসার দেশগুলি যেমন আরাকান, পেগু, টেনাসরিম, মালয় উপদ্বীপ, পারস্য এবং আরবে দক্ষিণী ব্যবসায়ীদের ব্যবসার অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। ষোড়শ শতে পর্তুগিজেরা আরবি বণিকদের সমুদ্র বাণিজ্য কর্ম থেকে হঠিয়ে দিতে থাকে। সপ্তদশ শতের প্রথমার্ধে পর্তুগিজ এবং বিজয়নগরের বাণিজ্যকর্মের পতন ঘটতে থাকায়, এই শূন্যস্থান পূরণ করতে উদ্যমী হয়ে ওঠেন মীর জুমলা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ব্রিটিশ এবং ডাচেদের মধ্যে পারস্পরিক সাম্রাজ্যবাদী লড়াই। প্রত্যেক ইঅরোপিয় বাণিজ্য তাঁর আনুকূল্য চাইতে থাকায়, তাঁর ব্যবসা ফুলে ফেঁপে ওঠতে থাকে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পারসিক এবং বার্মা বাণিজ্যের প্রতিযোগীরূপে নিজেকে উপস্থিত করলেন মীর জুমলা। মছলিপত্তনম থেকে মীর জুমলার পারস্য বাণিজ্যে পাঠানো শুল্কমুক্ত পণ্য থেকে ব্রিটিশেরা কিছুতেই শুল্ক নিতে পারছিল না, ফলে তারা বঙ্গোপসাগরীয় অন্যান্য বাণিজ্য কেন্দ্র থেকে যতটা পারা যায় শুল্ক আদায় করত। এছাড়াও পেগু এবং বার্মা সমুদ্রেও যতটা পারা যায় ব্যবসা মুনাফা নিংড়ে নেওয়ার চেষ্টা করত।
ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির সঙ্গে সম্পর্ক (১৬৫৫ পর্যন্ত)
১। নিজের পদভারকে কূটনীতির কাজে ব্যবহার
১৬৩৫-৩৬ পর্যন্ত সময়ে মছলিপত্তনমের প্রশাসক হিসেবে মীর জুমলার উদ্যমী সত্ত্বা দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করতেন ব্রিটিশেরা কীভাবে মুঘল এবং অন্যান্য শক্তির থেকে ব্যবসা সংক্রান্ত নানান সুযোগ আদায় করেছে। ১৬৩৪-র স্বর্ণ ফরমান অনুযায়ী, কয়েকটি শর্তে গোলকুণ্ডা রাজ্যের সমস্ত শুল্ক ছাড়ের অনুমতি পেয়েছিল। ঘাটতি উসুল করতে মছলিপত্তনমের কৃষকদের পণ্য রপ্তানি করতে বছরে ৮০০ প্যাগোডা (৪০০ ডলার) রাজস্ব দিতে হত। তিনি জানতেন এই ফরমান অকার্যকর হতে পারে যদি ব্রিটিশদের রপ্তানি শুল্ক ৮০০ প্যাগোডার বেশি হয়। স্বর্ণ ফরমান হাতে নিয়ে বিনা শুল্কে ব্যবসা চালানো কোম্পানি আর কোম্পানির ব্যক্তিগত ব্যবসায়ী-আমলাদের বিরুদ্ধে মীর জুমলা ব্যবস্থা নিতে শুরু করলেন। তিনি ডাচেদের সঙ্গে নিয়ে ফরমান অপব্যবহারের দায়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করলেন গোলকুণ্ডা রাজদরবারের সরইখাহিল আবদুল্লা খান মুজানদারানি এবং দবীর, মুল্লা ওয়ায়িসের আদালতে। তাঁর অভিযোগ ব্রিটিশদের ব্যবসাজাত শুল্ক বছরে ৮০০ প্যাগোডার বেশি। অথচ তারা ফার্মানের সুযোগ নিয়ে সেটা দিচ্ছে না।
১৬৩৭-এ গোলকুণ্ডার সরইখাহিল হিসেবে রাজ্যের এই রাজস্ব ক্ষতি পূরণের উদ্যোগ নিয়ে কঠোরভাবে স্বর্ণ ফরমানে নজরদারি চালানোর ব্যবস্থা করলেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গী বাস্তব এবং যুক্তি সম্মত। কিন্তু তাঁর উদ্যোগে মিশেছিল নিজের স্বার্থ সাধন। সে উদ্যম রাষ্ট্রের ক্ষতি হলেও তিনি এগিয়ে যেতে পিছপা হতেন না। গোলকুণ্ডার আধিকারিকদের প্রতিবাদ সত্ত্বেও ফরমান নিয়ে দুর্নীতি চালিয়ে গেল ব্রিটিশেরা। এই অবস্থায় দুপক্ষই অনৈতিক এবং অসাধুভাবে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধি করতে উদ্যোগী হল। কিন্তু এই দ্বন্দ্বাবস্থায় লাভ করলেন সব থেকে বেশি মীর জুমলা। তাঁর সর্বময় রাজনৈতিক ক্ষমতা বেআইনিভাবে প্রয়োগ করে, ব্রিটিশদের হুঁশিয়ারি দিতে শুরু করলেন, এবং ব্রিটিশেরাও বুঝতে পারল (১৬৩৮, ১৮ মে) তাঁর হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন শুধুই ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে।
ডেনেরা সরইখাহিল মীর জুমলার বাণিজ্য জাহাজ দখল করল। এই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে ১৬৪১-এর সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর মাস ধরে, মছলিপত্তনমের প্রশাসক সমস্ত ব্রিটিশ জাহাজ বন্দরে ভেড়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করলেন। ১৬৪২-র জানুয়ারি মাসে তাদের সমস্যা সমাধান হয়ে যাওয়ায় ডেনেরা তাঁর জাহাজ ছেড়ে দিলে মছলিপত্তনমে জাহাজ প্রবেশ করার ক্ষেত্রে মীর জুমলার জারি করা নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। ডাচেরা এ ধরণের অবস্থা ঘটতে পারে ধারনা করেই, সবসময় নিজেদের পণ্য জাহাজঘাটায় তৈরি রাখত এবং ছোট ছোট ছিপে করে সেগুলি নিয়ে গিয়ে জাহাজ ভরত বা পাড়ে তুলত। সেন্ট ফোর্ট জর্জের কুঠিয়ালরা (সেপ্টেম্বর ১৬৪২) পরবর্তীকালে এই পদ্ধতিতে পণ্য পরিবফনের ব্যবস্থা নিতে শুরু করে।
ক্রমে ক্রমে মীর জুমলা সাধারণ মাঝারিগোছের একটি অঞ্চলের প্রাধান্যওয়ালা সুলতানি আমলা থেকে রাজ্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী হিসেবে পরিগণিত হতে শুরু করলেন। তাঁর বন্ধুত্ব আর সাহায্য যেমন ব্যবসার ক্ষেত্রে সমৃদ্ধির সূচক আবার তাঁর অপরিমিত ক্রোধ ঠিক বিপরীত ক্রিয়ারও জন্ম দিত। ইওরোপিয় কুঠিয়ালরা বুঝতে পারল তাকে খুশি রাখলে রাজনৈতিকভাবে এবং ব্যবসায়িক ফায়দা হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। ১৬৪২-এ মীর জুমলা ডাচ কুঠির কাজকর্ম বন্ধ করে দেন। ফলে তাদের বিপুল লাভের মশলা ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। তা সত্ত্বেও তারা তাকে ৯জন নাবিক এবং দুটি কামান, এবং গোলকুণ্ডা দরবারে ১০,০০০ রিয়াল দিল তাঁর জাহাজকে পারস্য ব্যবসার সাফল্যের জন্য। ডাচেদের সাহায্যের উত্তরে ব্রিটিশেরা মীর জুমলার জাহাজের জন্য বিভিন্ন ধরণের পেশাদার ধার এবং রপ্তানি পণ্য বিনা শুল্কে বয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিল। মীর জুমলার পক্ষ থেকে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলোকে বহু সময়ে নানান ধরণের সাহায্য করা হয়েছে, কখনো অর্থ ধার দেওয়া হয়েছে, কখনো তাদের সুযোগ সুবিধে প্রত্যয়িত করা হয়েছে, এবং কখনো কখনো বিদেশি কোম্পানিদের তাঁর নিজের জাহাজ ব্যবহার করতে দিয়ে তাদের প্রতি সদয় বার্তাও দিতে চেয়েছে। এইভাবে তিনি বিদেশিদের থেকে অনেক বেশি সুবিধে নেওয়ার জন্য তাঁর পদকে নিজের ব্যবসা বাড়াবার কাজে লাগিয়েছেন।
২। ব্রিটিশদের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক
মীর জুমলা মাঝেমধ্যে হয়ত নিজের ব্যবসার ঘাটতি পূরণ করতে, বা কখনও ব্যবসার কাজে (যেমন হিরের খনির কাজে, ব্যবসার জন্য, জাহাজ তৈরির জন্য ইত্যাদি), আর বিপুল সম্পদ তৈরি করে নিজের বিশাল সেনাবাহিনী তৈরির স্বপ্ন সার্থক করতে আরও আরও বড় ব্যবসা সাম্রাজ্য তৈরি করতে ব্রিটিশ কুঠিয়ালদের থেকে অর্থ ধার করতেন। সেই ধার দেওয়া সুদ সহ অর্থ উদ্ধার করা ব্রিটিশদের পক্ষে খুব একটা সহজ হয় নি। ১৬৩৮-এর শুরুর সময় থেকে ব্রিটিশেরা মীর জুমলাকে ৩,০০০ প্যাগোডা বা ১০,৫০০ টাকা ধার দেয়। ১৬৩৯-এর আগস্ট মাসে মছলিপত্তনমের কুঠিয়ালকে, গোলকুণ্ডার কুঠিয়াল এন্ড্রু কোগান বকেয়া উদ্ধারে চাপ দিতে শুরু করে। কোগানের বিশ্বাস ছিল নবাবকে আইন মোতাবেক ধার দেওয়া হয়েছে, যথা সময়ে চাইবা মাত্রই মীর জুমলা সেই অর্থ নিশ্চয়ই শোধ করবেন। ১৬৪০-এর নভেম্বরে ২০৯৯ প্যাগোডা ধারের মধ্যে ১৯১৯ প্যাগোডা ধার শুধতে আস্বীকার করলেও ধারের বন্ধক স্বরূপ তিনটি দামি গয়না ব্রিটিশদের থেকে উদ্ধার করলেন।
অন্য দিকে তাঁর সম্পদের ভাণ্ডার উপযুক্তভাবে ভর্তি থাকলে মীর জুমলা ব্রিটিশদের অর্থ ধার দিতে কসুর করতেন না। ১৬৪২-৪৩-ও মীর জুমলার একচেটিয়া কারবারের দরুণ মছলিপত্তনমের ধারের বাজার বন্ধই হয়ে যায়। ব্রিটিশেরা সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা গোলকুণ্ডায় মীর জুমলার দপ্তর থেকে ১ থেকে ২ শতাংশ সুদে ৪ থেকে ৫ হাজার প্যাগোডা ধার নেবে এবং এই ধার তারা নভেম্বর নাগাদ ফিরিয়ে দেবে। তিনি মাদ্রাজে ব্রিটিশদের ৯ মার্চ ১৬৪৬ থেকে ১০,০০০ নতুন প্যাগোডা ধার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, সম্ভবত এটি মীর জুমলার কর্ণাটক লুঠের সম্পদ। ১৬৪৭-র ২৯ জুনের আগে ব্রিটিশরা সে ধারের অঙ্ক শোধ করতে পারে নি। কয়েক বছর পরে শোধ দিলে তিনি কিছু সুদ মাফ করে দেন এবং তাদের থেকে ৬৪১ প্যাগোডা দামের পিতলের তৈরি বন্দুকের মত কিছু ছোটমোট উপহারও পান।
৩। মীর জুমলার সঙ্গে ব্রিটিশদের দ্বন্দ্ব
মীর জুমলার সঙ্গে ব্রিটিশদের সম্পর্ক শুধু উত্তমর্ণ-অধমর্ণের সম্পর্কে আবদ্ধ ছিল না। মীর জুমলা যেহেতু কর্ণাটক রাজ্যের সর্বোচ্চ প্রশাসক ছিলেন, সেহেতু ব্রিটিশেরা মনে করত স্থানীয়দের থেকে ধার উসুল করতে ঝামেলা পোয়াতে হবে। তারা ধার উসুল করতে প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৬৪০-এ গোলকুণ্ডা এবং ভিরাভাসরম থেকে দেয় ১০,০০০ প্যাগোডা উদ্ধার না হওয়ার দায় চাপায় মীর জুমলার ওপর। মছলিপত্তনমের কুঠিয়ালেরা তাঁর ওপর পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করতে তাঁর জাহাজ দখল করারও পরিকল্পনা নিয়ে ফেলেছিল।
মীর জুমলার পদকে সমীহ করে তাঁর সঙ্গে ওপর ওপর দেখনদারি বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার করলেও ব্রিটিশেরা মনে মনে মীর জুমলাকে ঘৃণা করত এবং তিনি যে তাদের ওপর সরাসরি চাপ দিয়ে তার কাজ উসুল করে নিতে পারেন, সেটাও তারা বুঝত। গোলকুণ্ডার কর্মচারীরা ব্রিটিশদের স্থানীয় উতপাদকের কাছ থেকে চুক্তি মত দাদন দেওয়া পণ্য কিনতে বাধা দিত এবং এই দীর্ঘকালীন বিবাদ তিক্ততায় প্রায় হাতাহাতিতে পর্যবসিত হয়। মীর জুমলার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল, তিনি গোলকুণ্ডার ব্রিটিশ কুঠিয়ালের সঙ্গে মাল্লুভুল শহরের কিছু বিষয় নিয়ে যে ধরণের ব্যবহার করছেন, সেটা মছলিপত্তনমের ব্রিটিশ কুঠিয়ালের সঙ্গে করছেন না (ফেব্রুয়ারি ১৬৩৮) — তিনি একজনকে বেশি সুযোগ দিচ্ছেন, অন্যজনকে সেটা দিচ্ছেন না, যা অনৈতিক।
তবে ব্রিটিশ কোম্পানি আমলাদের সব অভিয়োগ যে খুব একটা যুক্তিযুক্ত ছিল এমন নয়। মছলিপত্তনমের কুঠিয়ালের অভিযোগ ছিল মীর জুমলা শহরের প্রশাসককে (জুলাই ১৬৩৮) কোর্টিন এসোসিয়েশনের ক্যাপ্টেন ওয়েডেল এবং মন্টিনির বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। আদতে ব্রিটিশদের দাবি ছিল স্থানীয় প্রশাসন তাদের উপকূল ভূমি দখলে বাধা দেওয়ায়, তারা কামান দিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সদরে দপ্তরে হানা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাদের দাবি সেই কামানের গোলা মছলিপত্তনমে আমদানির ওপরে স্থানীয় প্রশাসন তাদের শুল্ক ছাড় দিক।
৪। অবস্থা সামাল দিতে কোম্পানির চেষ্টা
মছলিপত্তনমের হতবুদ্ধিকর অবস্থা সামাল দিতে বিজয়নগর রাজ্যের তটের আরও দক্ষিণের নিরাপদ এলাকায় দিকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ব্রিটিশ কুঠিয়ালেরা এবং তার জন্য সুলতানের থেকে নতুন করে ফরমান সংগ্রহ করার সিদ্ধান্ত হল, যাতে তারা নতুন এলাকায় অবাধে ব্যবসার সুযোগ কাজে লাগাতে পারে। এর প্রথম পদক্ষেপ হল বিপুলাকার ফোর্ট জর্জের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং দ্বিতীয়টি সুরাট থেকে গোলকুণ্ডায় এন্ড্রু কোগানের আগমন।
এন্ড্রু কোগানকে যথেষ্ট সম্মান দেখিয়ে নানানভাবে সাহায্য করার চেষ্টা করলেন মীর জুমলা, সরইখাহিল। মীর জুমলার এই চরিত্র কোগানের কাছে নতুনভাবে প্রতিভাত হল; বিশেষ করে মছলিপত্তনমের কুঠিয়ালেরা তাঁর চরিত্র সম্বন্ধে এত দিন তাঁকে যা জানিয়েছিল, তিনি দেখলেন মীর জুমলা তার বিপরীত চরিত্রের শাসক। কোগান, মীর জুমলাকে একটা দামি রত্ন দিলেন (আম্বারগিজ) এবং বিরক্ত হয়ে কোম্পানির মাথাদের লিখলেন (বান্টামকে ৩ সেপ্টেম্বর ১৬৩৯) কোনও দিন যদি কোম্পানির কাজে সরইখাহিলের সহযোগিতা দরকার পড়ে তাহলে তিনি কোম্পানির হয়ে মীর জুমলার সঙ্গে কথা কইবেন। মীর জুমলা মছলিপত্তনমের প্রশাসককে বিশেষ চিঠি লিখে কোগানকে সম্মান দেখিয়ে আপ্যায়নের আদেশ দিলেন। (চলবে)