কর্ণাটকে মীর জুমলার প্রশাসন
৫। কর্ণাটক দখলের পরে ইওরোপিয়দের সঙ্গে মীর জুমলার সম্পর্ক
কর্ণাটক দখল কাণ্ডের পরেই পূর্ব উপকূলের ইওরোপিয় বণিকদের সঙ্গে মীর জুমলার সম্পর্কের গুণগত পরিবর্তন ঘটে যায়। ব্রিটিশেরা এক সুপ্রভাতে ঘুম থেকে উঠে আবিষ্কার করল, এতদিন যে ব্যক্তি নিয়ন্ত্রণযোগ্য স্থানীয় প্রশাসক আর তাদের বাণিজ্য প্রতিযোগী ছিল, সে হঠাতই তাদের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে বসেছে। মীর জুমলার ভয়ে এবং তাদের কুঠির ওপর মীর জুমলার মন্ত্রীদের ঘন ঘন নজরদারির ফলে তারা ঠিক করল সেন্ট জর্জের প্রতিরক্ষা বলয় জোরদার করার। কিন্তু মীর জুমলা তক্ষুনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক পদক্ষেপের ইঙ্গিত না দেখিয়ে তাদের প্রতি বন্ধু নরম মনোভাব দেখালেন। ব্রিটিশদের ব্যবসা বাড়াবার জন্যে মীর জুমলার নিরাপদ পক্ষ্মপুটে আশ্রয় নেওয়া জরুরি ছিল। অতীতের হিন্দু শক্তি তাদের যে সব ব্যবসায়িক সুযোগ সুবিধে দিত, সেগুলি নতুন সরকার তাদের দেবে কিনা এই প্রশ্নে তারা চিন্তিত হয়ে ওঠে। কর্ণাটকে যুদ্ধের মধ্যেই বোঝা যাচ্ছিল যে সে অঞ্চলে ক্ষমতার ভারকেন্দ্র বিজয়নগর থেকে গোলকুণ্ডায় স্থানান্তরিত হতে যাচ্ছে এবং সেই তত্ত্ব বুঝেই মাদ্রাজে ব্রিটিশ দূত আইভি (আগস্ট ১৬৪৪-সেপ্টেম্বর ১৬৪৮), তড়িঘড়ি ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে চাইলেন। ১৬৪৬-এ মীর জুমলা যখন মাদ্রাজের কাছে স্যান থোম অবরোধ করেছেন তখন ব্রিটিশেরা তাকে গোলান্দাজ এবং পদাতিক সেনা দিয়ে সাহায্য করছে। প্রতিসৌজন্যে মীর জুমলা গোলকুণ্ডার সুলতানের পক্ষ থেকে বর্তমান কাউল (মাদ্রাজ দখল রাখার ফরমান) এবং অন্যান্য সাহায্য দেওয়ার ঘোষণা করেন (জুন ১৬৪৭)।
মীর জুমলার সঙ্গে সম্পর্ক ভাল রেখে পুলিকটের ডাচেরা তাদের পুরোনো বাণিজ্য সুবিধে বজায় রাখল এবং অতিরিক্ত হিসেবে পেল আরও বেশি কিছু আর্থিক সুযোগ সুবিধে। আর হিন্দু রাজত্বের তুলনায় তাঁর সময়ে পর্তুগিজেরা অতিরিক্ত কিছু সুযোগ পেয়েছে। ১৬৪৮-এ মছলিপত্তনমে মীর জুমলার একটি জাহাজ ঝড়ে ভেঙ্গে পড়ায় তিনি ব্রিটিশ বা ডাচ জাহাজকে তাঁর ব্যবসায় কাজে লাগাতে উদ্গ্রীব ছিলেন।
৬। মীর জুমলার দরবারে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির দৌত্য
১৬৫০-৫১-র কাছাকাছির সময়ে মীর জুমলা এশিয়াজোড়া কাপড়ের একচেটিয়া বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ সফল করার উদ্যম নিতে গিয়ে ডাচেদের নাছোড় বাণিজ্য প্রতিযোগিতায় বিরক্ত হয়ে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে উপনীত হলেন। ঠিক হল এবার থেকে ব্রিটিশ কোম্পানি তাঁর দালাল মার্ফত বস্ত্র কিনে পারস্য এবং অন্যান্য এলাকায় বাণিজ্য করে তাঁর সঙ্গে লভ্যাংশ ভাগ করে নেবে।
গাণ্ডিকোটায় মীর জুমলা ১৬৫০ সালে ডাচ দূতের সঙ্গে দেখা করতে অস্বীকার করলেন; কিন্তু ভেঙ্কট ব্রাহ্মণের ব্রিটিশ দৌত্য তিনি স্বীকার করলেন। ব্রিটিশদের বললেন তাঁর সঙ্গে বাণিজ্যের সম্পর্ক তৈরি করতে পারলে তারা ব্যাপক লাভ করতে পারবে এবং সামগ্রিক বাণিজ্য বিষয়েও খবরদারি করতে পারবে — অর্থাৎ সেভাবে দাম এবং উতপাদন নিয়ন্ত্রণ করে তিনি এলাকার সমগ্র বস্ত্র উতপাদন নিজের নিয়ন্ত্রণে এনেছেন, ব্রিটিশেরা ঠিক সেই রাস্তাতেই তাঁর গুদাম থেকে কাপড় নিয়ে একচেটিয়াভাবে উপকূল জুড়ে ব্যবসা করুক। এ ছাড়াও তিনি সূক্ষ্মভাবে ব্রিটিশদের সঙ্গে ডাচেদের লড়িয়ে দিলেন। তিনি ব্রিটিশদের বললেন ডাচেরা করমণ্ডলের বস্ত্র উতপাদনের পুরোটা কিনে কম বিক্রি করে ব্রিটিশদের ভাতে মারতে চাইছে। কুঠিয়াল গ্রেনহিল মীর জুমলার উত্তরে দূত ভেঙ্কট ব্রাহ্মণকে এবং আরও একটা দৌত্যে ওয়াল্টার লিটলটনকে ১৬৫০-এর ডিসেম্বরে পাঠালেন। তারা যৌথ সমীক্ষায় (১৭ জানু, ১৬৫১) জানালেন যে মীর জুমলার ব্রিটিশদের প্রতি আগ্রহ, ভালবাসা আন্তরিক, এবং ব্রিটিশদের সঙ্গে তিনি দীর্ঘকালীন চুক্তিতে যেতে চান। এবং কোম্পানির ব্যবসাকে সুদ-মুক্ত অর্থ ধার (৫০ থেকে ৬০ হাজার প্যাগোডা) দিয়ে সাহায্য করতে চান। তাদের ধারণা হল মীর জুমলার সঙ্গে এই চুক্তিতে যাওয়া ব্রিটিশ কোম্পানির পক্ষে শুভকর হবে এবং ডাচেদের বাণিজ্য উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উদ্দেশ্যে লেখা একটি চিঠি এবং উপহারস্বরূপ ৩০০টি লং ক্লথ এবং সালামপুর কাপড় দূতেদের মাধ্যমে পাঠালেন।
বহু বছর ডাচেদের ব্যবসা সঙ্গ করার পর একদিন তিনি সিদ্ধন্ত নিলেন, দূর সমুদ্র ব্যবসায় তাদের হাত ছেড়ে ব্রিটিশদের হাত ধরার। কর্ণাটক লুঠের সম্পদে তিনি এখন ব্রিটিশদের সহজ শর্তে ঋণ দিতে পারার অবস্থায় এসেছেন। ইওরোপিয় কোম্পানির সঙ্গে ধারের ব্যবসা তাকে আরও বেশি লাভের মুখ দেখতে সাহায্য করবে। তাছাড়া এইভাবে তিনি কোম্পানিকে বোঝাতে পারবেন তিনি তাদের শুভ চিন্তক। তারা যদি ঝামেলায় পড়ে তাহলে তিনি তাদের আনুগত্যকেও নিজের সুবিধে মত ব্যবহারও করতে পারবেন।
১৯ ফেব্রুয়ারি ১৬৫১ ব্রিটিশ দূত এবং কাউন্সিল উভয়েই মীর জুমলার উদ্দেশ্য, চুক্তির বয়ান বিষয়ে খুব বেশি উচ্ছ্বাস দেখাল না। তাঁরা সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নিয়ে বলল শুধু একটি বিষয়েই মীর জুমলার সঙ্গে একমত হচ্ছে, ইওরোপ থেকে আনা যত পণ্য মীর জুমলা তাদের গুদাম থেকে নেবেন, ঠিক সেই মূল্যের কাপড় তারা মীর জুমলার গুদাম থেকে তুলবে। তবে যত দিন না প্রেসিডেন্ট বেকার সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন, ততদিন তাঁরা কোন চরম সিদ্ধান্তে উপনীত হবে না। যদি কোম্পানি মীর জুমলার প্রস্তাবে সম্মত হয়, তাহলে তারা চাইবে কোম্পানি, দূত এবং প্রেসিডেন্টকে নবাবের সঙ্গে চুক্তি করার ক্ষমতা অর্পন করুক। ১৬৫১-র জানুয়ারিতে গোলকুণ্ডায় নবাবের দরবারে ভেঙ্কট ব্রাহ্মণকে দুটি তথ্য জানতে আরও একটা দৌত্যে পাঠানো হল — জাহাজে নবাব কী ধরণের ইওরোপিয় পণ্য চাইছেন এবং মীর জুমলা যে কাপড় কোম্পানিকে দিয়েছেন, তাঁর দাম কী হতে পারে।
যথারীতি স্থানীয় কুঠিয়ালের কাছে কোম্পানির কর্তাদের জবাব এল এক বছর পর। তাদের জানানো হল মীর জুমলার দালালদের থেকে তাদের সব ব্যবসা দ্রব্য কেনার প্রশ্নে তারা এখুনি কোন নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে অপারগ। তবুও তারা মীর জুমলার দাদলদের থেকে গুরুত্ব দিয়ে বস্ত্র কেনার সুযোগ খুলে রাখছে, কিন্তু এর জন্য তারা কোন ছাড় দিতে রাজি নয়। ১৬৫২-র গ্রীষ্মে, লিটলটন এবং ভেঙ্কট আবার দৌত্যে গেলেন মীর জুমলার সভায় যতদূর সম্ভব কোম্পানির উত্তর নিয়ে, এবং সেখানে তারা বন্ধুত্বপূর্ণ সদ্ভাব পেল। তারা জানাল কুঠিয়ালেরা মীর জুমলার দালালদের যে ছাড় দিয়েছিল, কোম্পানি সেসব বাতিল করেছে। কিন্তু মীর জুমলার অনুরোধ যেহেতু তাদের কাছে আদেশের সমান, আগামী দিনে তাদের সমস্ত ভুল সংশোধন করে পুরোনো দামে সর্বসম্মিতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় কি না সেটা তারা দেখবে।
১৬৫১-৫২ ডাচেরা নতুন একটা পরিকল্পনা সাজাল। তারা ড্রিক স্টিউয়ারের দৌত্যে একলপ্তে বিপুল পরিমান অর্থ দেওয়ার শর্তে নতুন কিছু শহর ভাড়ায় নেওয়ার এবং বাণিজ্যকর্মে ডাচেদের আরও ছাড় দেওয়ার এবং আগামী দিনে তাদের বাণিজ্যে কাস্টম শুল্ক ছাড় দেওয়ার বিষয়ে মীর জুমলার দপ্তরে আলোচনা চালাতে আসে। মীর জুমলা এবিষয়ে সিদ্ধন্ত নিলেন না। সে সময়ে সুলতান গাণ্ডিকোটায় ছিলেন। তিনি সুলতানের দরবারে ডাচেদের সমস্ত আবেদন বিবেচনার জন্য পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু একই সঙ্গে পুলিকটে ডাচেদের আরও বেশি সুরক্ষা বাড়ানোর প্রশ্নে সটান না করে দিলেন।
অথচ তিনিই কিন্তু ব্রিটিশ কুঠিয়ালদের সেন্ট জর্জকে আরও সুরক্ষিত করার সম্মতি দিয়েছিলেন। ব্রিটিশদের এই সুযোগ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর প্রখর দৃষ্টি থাকল ব্রিটিশরা যাতে তার ক্ষমতাকে প্রতিস্পর্ধা দেখানোর মত করে বেড়ে উঠতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করা। এই ধারণার প্রতিফলন ঘটল তাদের ব্যাঙ্কশাল [সমুদ্রের/নদীর পাশে গুদাম, সংস্কৃততে বন্ধশালা উর্দুতে তিজারতি মাল গুদাম; মাদ্রাজে সমুদ্রের তীরে আর কলকাতায় গঙ্গার তীরেও ব্রিটিশেরা বিশাল বিশাল ব্যাঙ্কশাল তৈরি করে; ব্যাঙ্কশাল নামে ঘাট আছে, আদালত আছে, রাস্তা আছে; মাদ্রাজ বা কলকাতায় ব্যাঙ্কশাল মানে আর প্রয়োগ একই।] তৈরির জরিমানায়। যদিও ব্রিটিশদের মীর জুমলা খড় মাটির তৈরি ব্যাঙ্কশাল তৈরি করতে অনুমতি দিলেও ব্রিটিশেরা সেই অনুমতি লঙ্ঘন করে চুন আর পাথরের ব্যাঙ্কশাল তৈরি করে। এই বেয়াদপির জন্যে তিনি তাদের বড় অঙ্কের ২০০ প্যাগোডা জরিমানা করেন।
প্রথম এংলো-ডাচ যুদ্ধের প্রভাবে পারস্যে, বাংলায়, জাপানে পড়ে। এর ফলে ডাচেদের আর্থিক, ব্যবসায়িক অবস্থা খারাপ হতে শুরু করে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অবস্থায় ডাচেরা কোণোঠাসা বুঝে ১৬৫৪-তে তিনি ডাচেদের ছাড়পত্র উপেক্ষা করে নিজের এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক জাহাজ শ্রীলংকা, আচে এবং অন্যান্য এলাকায়, যে সব অঞ্চলে ডাচেরা প্রায় একচেটিয়া ব্যবসার পরিবেশ সৃষ্টি করার চেষ্টা করে যাচ্ছিল, পাঠানোর উদ্যম নিলেন। ডাচেরা পর্তুগিজ নিরাপত্তায় যাওয়া মীর জুমলার একটি জাহাজ দখল করে। ডাচেদের সঙ্গে মীর জুমলার এবং মাকাসসারের রাজার সম্পর্ক তলানিতে এসে ঠেকে (এপ্রিল ১৬৫৪)। তাঁর জাহাজ ছাড়া না হলে তিনি পুলিকটে ডাচ কুঠি আক্রমণ করার হুঁশিয়ারি দিলেন। ডাচেরা ভয়ে তাঁর জাহাজ ছেড়ে দিলে এবং অন্যান্য এলাকায় ভারতীয় জাহাজ অবাধে যাওয়ার ছাড়পত্র দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিল। কিন্তু কোনও একটা কারণে ডাচেদের ওপর তাঁর রাগ বিন্দুমাত্র কমে নি। পারস্যের ব্রিটিশ কুঠিয়ালেরা কোম্পানির করদাতাদের পারস্যে আরও বড় এবং বেশি জাহাজ পাঠিয়ে ডাচেদের তৈরি করা বাজার দখলের অনুরোধ করল।
অন্যান্য ইওরোপিয় কোম্পানির সঙ্গে মীর জুমলার সম্পর্ক এতটা খারাপ ছিল না। তাভার্নিয়ে আর তাঁর দলবল, সুলতানকে কিছু রত্ন বেচার উদ্দেশ্য নিয়ে গাণ্ডিকোটায় মীর জুমলার সঙ্গে দেখা করেন ১৬৫২-র সেপ্টেম্বরে। তাদের রতন কেনা তো দূরস্থান, মীর জুমলা উল্টে তাঁদের প্রস্তাব দেন, তাঁর পাঁচটি রত্নভরা পুঁটলি কী ইওরোপে তাভার্নিয়ে বেচে দিতে পারবেন? গোলকুণ্ডায় তাঁর পুত্র যাতে তাভার্নিয়ে আর তাঁর দলবলের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করেন, তার জন্যে তিনি তাদের হয়ে প্রশংসাপত্র লিখে দেন।
১৬৫৩-৫৫-তে সুলতানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করার সময় তিনি ব্রিটিশদের চটান নি। বরং তাদের সঙ্গে ব্যবসা করে তাঁর নিজস্ব ব্যবসাজাত সম্পদ বাড়ানোর কাজ করেছেন। একই সঙ্গে জাতপাত নিয়ে কোম্পানির আভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব তৈরি হলে (এপ্রিল ১৬৫৫) সেই গোলযোগে প্রথমে প্রবেশ করতে চাননি, এমন কি তারা তাঁর সাহায্য চাইলেও তিনি সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে অস্বীকার করেন; আবার মাদ্রাজ কাউন্সিলে কোম্পানির মধ্যে এই বিষয় নিয়ে মতদ্বৈধ তৈরি হলে, তাকে তিনি কাজে লাগিয়ে ব্রিটিশেরা যাতে চন্দ্রাগিরির রাজাকে সাহায্য না করতে পারে, সে বিষয়ে পর্দার পিছনে কূটনৈতিক চাল চাললেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল নিজের এবং গোলকুণ্ডার সুলতানের রাজনৈতিক, আর্থিক অবস্থানকে আরও দৃঢ করা। ব্রিটিশ আর মীর জুমলার মধ্যে এই যে ছোট ফাটল তৈরি হল তা আগামী দিনে চওড়া ফাটলের রূপ নেবে।
৭। পর্তুগিজদের সঙ্গে সম্পর্ক
কর্ণাটকে মীর জুমলার সঙ্গে গোয়ার পর্তুগিজ শাসক দোম ফিলিপ ম্যাসকারহানসের (১৬৪৫-৫১) সম্পর্ক ‘অসাধারণ বন্ধুত্বপূর্ণ’ ছিল। তাদের মধ্যে চিঠি চালাচালিও হত এবং নিয়মিত সৌর্হার্দ্যপূর্ণ উপহার আদান প্রদান হত। তাকে দেওয়া পর্তুগিজ হস্তাবরণ [দস্তানা], বক্ষাবরণী [শিল্ড] বা শিরস্ত্রাণের উচ্ছসিত প্রশংসা করতেন মীর জুমলা। যুদ্ধে পর্তুগিজদের দেওয়া নিরাপত্তার পরিধেয়গুলো ব্যবহার করতেন। বিনিময়ে তিনি কর্ণাটকের হিরের খনি থেকে তোলা ভাল ভাল হিরে পর্তুগিজ প্রশাসককে উপহার হিসেবে পাঠাতেন। এমন কী তাঁর জিম্মায় থাকা বেশ কিছু শ্রেষ্ঠ রত্ন ফিলিপ ম্যাসকারহানসকে বিক্রিও করেছেন। তাঁর শাসন কালে মীর জুমলা পর্তুগিজদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চেয়েছেন, যাতে প্রয়োজনে ভবিষ্যতে তাদের শক্তি তিনি ব্যবহার করতে পারেন। মাথায় রাখতে হবে অন্যান্য ইওরোপিয় শক্তর ১০০ বছর আগে যেহেতু পর্তুগিজেরা দক্ষিণ এশিয়ায় এসেছিল এবং তাদের ক্ষমতা দেখিয়েছিল, তাই অন্যান্য ইয়োরোপীয়দের তুলনায় দেশিয় রাজারা পর্তুগিজদের ক্ষমতা কমে গেলেও তাদের অনেক বেশি সম্মান দিতেন।
মাথায় রাখতে হবে ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য সাধনে মীর জুমলা একবগগা ছিলেন, কোনও বাধাই পাত্তা দিতেন না। কর্ণাটক বিজয় যাত্রায় পর্তুগিজ উপনিবেশ স্যান থোমকে কিন্তু মীর জুমলা ছেড়ে কথা বলেন নি। তিনি বহু দিন ধরে স্যান থোম শহর অবরোধ করেন এবং তাঁর কর্মচারীরা শহরের বাইরের বহু পর্তুগিজ বাগান এবং জমি দখল নিয়ে, সেগুলোর উৎপাদন বিক্রি করে তাদের প্রভুকে না দেওয়া বকেয়া খাজনা উসুল করে নেয়। ১৬৫১র জানুয়ারি মাসে মীর জুমলা ভেঙে দেওয়া পর্তুগিজ চার্চ বানিয়ে দিলেও তাঁর রাজস্ব বছরে ২০০০ রিয়াল জরিমানা আদায়ের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেন নি। ব্রিটিশদের ধারণা ছিল পর্তুগিজেরা চার্চের বাইরের রাস্তা দিয়ে হিন্দু মূর্তির বহু কালের পরম্পরার শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ করায় তিনি এই জরিমানা আদায় করেন। (চলবে)