তৃতীয় অধ্যায়
বিদ্রোহী মীর জুমলা
১। মীর জুমলা এবং কুতুব শাহের বিরোধের কারণ
কর্ণাটক বিজয়ে মীর জুমলার চরিত্র আমূল বদল ঘটেগেল। এর আগে তিনি ছিলেন এক প্রায়-ক্ষমতাহীন সুলতানের গুরুত্বপূর্ণ সভাসদ এবং উচ্চপদস্থ কর্মচারীমাত্র। কিন্তু কর্ণাটক বিজয়ের পরে প্রভুর থেকে যথেষ্ট দূরত্বে অবস্থান করায় উচ্চপদস্থ এই সম্মানিত কর্মচারীই হয়ে উঠতে চাইলেন বিজিত ভূখণ্ডের স্বাধীন এবং ক্ষমতাবান শাসক। বার্নিয়ে সূত্র ধরে বলা যায় তাঁর অধস্তন কর্মচারী মীর জুমলার দক্ষতা, যোগ্যতার প্রতি অযোগ্য সুলতানের মনে অস্বাভাবিক ঈর্ষা বরাবরই ধিকিধিকি করে জ্বলছিল। ইওরোপিয় ঐতিহাসিকদের বক্তব্য নতুন উদ্ভুত রাজনৈতিক অবস্থায় কুতুব শাহ তাঁর উজিরের বাড়তে থাকা ক্ষমতায় চিন্তিত ছিলেন। কিন্তু এটাও বলা বোধহয় ঠিক হবে না যে সুলতান, তাঁর সেনাপতি মীর জুমলার কর্ণাটক জয়ের পরই, উজিরের ক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে কর্নাট রাজ্যে তাঁর [সুলতানের] ক্ষমতা হ্রাস বিষয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। আমরা আগেই দেখেছি, মীর জুমলার সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে সুলতান তাঁর সমস্ত রকমের সুযোগ সুবিধে বাড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তিনি যে সতর্ক এবং নিজের স্বার্থে কর্ণাটকে মীর জুমলার অভিযানকে দূর থেকে বিশ্লেষণ করছিলেন এই তথ্যটা আজ স্পষ্ট। বহু পরে পারস্যের সুলতানকে গোলকুণ্ডার সুলতান আক্ষেপ করে লিখছেন, ‘তিনি যে চারাগাছটি দুঃসাহসিক অভিযাত্রী মীর মহম্মদ সঈদ রূপে তাঁর রাজত্বে রোপণ করেছেন, সেটি এখন বিপুল বিশাল মহীরুহ হিসেবে গোলকুণ্ডার উজির মীর জুমলায় পরিণত হয়েছে — এবং তিনি অবাক হয়ে যাচ্ছেন যে তাঁর বিরুদ্ধে মীর জুমলা বিশ্বাসঘাতকতার জাল ছড়ানো শুরু করছেন’। উজিরের কাজকর্মের নমুনায় সুলতানের অবিশ্বাসের ধারণা তৈরি হওয়াই খুব স্বাভাবিক। কিন্তু শুধুই মীর জুমলার স্বাধীন শাসক হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষাই তাকে এই ঈর্ষার পরিবেশ তৈরি করার দিকে ঠেলে দিয়েছিল এ কথা হয়ত বলা যাবে না। বরং মীর জুমলার অমেয় সম্পদ, নতুন ক্ষমতাবৃদ্ধিতে সুলতান ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠেন। মীর জুমলা দরবারি অভিজাতদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন এমন একটা ফিসফিসানি অভিযোগ গোলকুণ্ডার ক্ষমতার অলিন্দে শোনা যাচ্ছিল। অসন্তুষ্ট দরবারিরা মীর জুমলার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে সুলতানের কান ভারি করলেন। ঠারেঠোরে সুলতানকে বোঝালেন, ভৌগোলিক দূরত্বে থেকে তাঁর উজির গোলকুণ্ডার সুলতানের ক্ষমতার প্রতিস্পর্ধী হয়ে উঠতে চাইছেন, সুলতানের মীর জুমলা বিষয়ে সাবধানে থাকা দরকার। যদিও মীর জুমলা স্বাভাবত দুর্বিনীত চরিত্রের মানুষ ছিলেন না, কিন্তু তাঁর যত ক্ষমতা বাড়তে থাকে, তিনি কিছুটা নিজের খোলসে ঢুকে পড়তে থাকেন। স্বাভাবিকভাবে বহু মানুষের সঙ্গে এত দিনের স্বাভাবিক কথাবার্তার দ্বার রুদ্ধ করে দিলে একদা তাঁর স্তরের মানুষেরা মনে করলেন তিনি তাদের এড়িয়ে চলছেন। তারা ক্ষুব্ধ হয়ে এইভাবে প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ খুঁজে নিল।
মীর জুমলার ক্ষমতা বৃদ্ধিতে হিংসায় জ্বলেপুড়ে ওঠা তাঁর বিরোধীরা, তাঁর অনুপস্থিতিতে সুলতানের কানে তাঁর উজিরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরণের কল্প-কাহিনী রচনা করে তাঁর মন বিষিয়ে দিলেন। সেই সময়ে ভারত ভ্রমণে আসা ইওরোপিয় লেখকদের সূত্রে জানা যায় মীর জুমলা এবং সুলতানের মা হায়াত বক্সী বেগমের অস্বাভাবিক সম্পর্ক-নৈকট্য নিয়েও প্রশ্নব উঠেছিল। সুলতান সেই গুজবকে খুব স্বাভাবিকভাবে নেন নি। একে তিনি শাসক সুলতানি পরিবারের সম্মানহানিরূপে গণ্য করলেন। তাঁর উজিরের থেকে দূরে সরে যাওয়ার অন্যতম কারণ এই গুজবটাও হতে পারে। হাদিকত-উস-সুলতান-এর লেখক নিজামুদ্দিন আহমদ সিরাজি লক্ষ্য করছেন যে সুলতানের মায়ের বেশ কিছু ব্যক্তিগত এবং প্রয়োজনীয় কাজকর্ম সরইখাহিল সম্পাদন করে দেওয়ায় প্রায়ই তাঁকে তিনি বহুমূল্য উপহারে সম্মানিত করতেন। তাঁর উত্তরে মীর জুমলাও কিছু প্রতিউপহার পাঠাতেন সুলতানের মায়ের উদ্দেশ্যে। এই উপহার দেওয়া নেওয়া গোপনে সম্পাদিত না হওয়ায় উপহার-প্রতিউপহার দেওয়া নেওয়ার ওপরে জনগণের দৃষ্টি নিবদ্ধ হতে থাকে। মীর জুমলার বিরোধী পক্ষ এই সম্পর্কটিকে ‘অস্বাভাবিক’ সমাজ অননুমোদিত দেগে দেয়। আমাদের কথা হল প্রথমত দুজনেই তখন মধ্য বয়স পেরিয়েছে, দুজনেই উচ্চ রাজ ক্ষমতা ভোগ করছেন, যদিও সামাজিক সম্মান আর থাকবন্দীতে সৈয়দ মীর জুমলা সুলতানের মায়ের থেকে অনেক নিচে অবস্থান করেন। দ্বিতীয়ত মীর জুমলা সুলতানি সভার জমায়েত থেকে নিজেকে দূরে রাখতেন। তৃতীয়ত মীর জুমলার ব্যক্তিগত চরিত্র এই ধরণের মহিলা সংক্রান্ত ঘটনার সঙ্গে খাপ খায় না। এই রটনা সপক্ষে উপযুক্ত প্রমানও পাওয়া যায় নি। অতএব, এই ব্যক্তিগত কাদা ছোঁড়াকে আমরা স্বকপোলকল্পিত গুজব রটনা হিসেবেই দেখতে পারি, এর বেশি কিছু নয়। বাস্তবে মীর জুমলা এবং সুলতানের দুজনের সম্পর্ক জড়িয়ে যে অবিশ্বাসের বাতাবরণ গড়ে উঠেছিল সেটা বহু দরবারি অভিজাত প্রত্যেকেই নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করতে চাইছিলেন। এই চরিত্র হননের চেষ্টা সময়কার ঈর্ষান্বিত সভাসদেদের উতসাহী রটনা ছাড়া আর কিছুই নয়। তাভার্নিয়ে সূত্রে জানছি, ঈর্ষান্বিত দরবারিদের অভিযোগকে সুলতান মান্যতা দিচ্ছেন এই বিষয়টা বাজারি গুজব সূত্রে ইওরোপিয় মুসাফিরদের মনে হয়েছে। সুলতান দক্ষিণী সভাসদদের বললেন, ‘মীর জুমলা যে ধরণের ক্ষমতা কেন্দ্রিভূত করছেন, তাতে যে কোন সময়ে সুলতানের সিংহাসন কেড়ে নিতে পারেন। তাঁর কাছে খবর আছে গোলকুণ্ডা রাজত্বে সুলতানকে হঠিয়ে মীর জুমলা তাঁর পুত্রকে বসিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছেন। সুলতানের পক্ষে শেষ দিনের জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকা দুর্ভাগ্যকে সসম্মানে ডেকে আনার মত হবে। সেই দুর্দিনের দিকে তাকিয়ে আমি অপেক্ষা করে বসে থাকব না। আমি মনে করি মীর জুমলার সর্বোচ্চ ক্ষমতায় ওঠার সব থেকে সহজ আর ছোট রাস্তা হল সুলতানকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে দেওয়া।’
মুঘল সম্রাটের উজির পদে বৃত হওয়ার পর পাদশাহ শাহজাহান কুতুব শাহকে যে চিঠিটি লেখেন তাতে মীর জুমলার বিদ্রোহের কারণের সমস্ত ইঙ্গিত ধরা রয়েছে এবং এই চিঠিতে সম্রাট, এ ধরণের যোগ্য শাসককে দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য কুতুব শাহের মুর্খতা এবং তাঁর প্রজ্ঞাকে পরোক্ষাভাবে দোষী ঠাউরেছেন। সম্রাট লিখছেন, ‘আজকের দিনে অভিজ্ঞ এবং কর্মক্ষম কর্মচারী পাওয়া খুব কঠিন, বিশেষ করে মুয়াজ্জম খানের মত, যিনি তাঁর সময়ের দক্ষতম উজিরের মতই আমার সভা উজ্জ্বল করছেন। তাঁর দক্ষতা স্বীকার করা এবং মেনে নেওয়া অতীব প্রয়োজন।’ শাহজাহান আরও লিখছেন, ‘স্বউদ্যমী মানুষের পক্ষে শত্রুদের পরামর্শে কান দেওয়া অনুচিত বলে আমি মনে করি, কেননা ভুল পরামর্শদাতারা এই সব কান ভারি করা কথা বলে প্রভুর বিন্দুমাত্র উপকার করতে পারে না এবং তাকে ভালও রাখতে পারে না, শুধু স্বস্বার্থ সম্পাদনে লেগে থেকে বন্ধুদের শত্রুতে পরিণত করে, ফলে (এই মানুষদের থেকে দূরে থেকে) নিজের জীবন, পরিবার, সমাজের সম্মান রক্ষা সক্কলের সামূহিক কর্তব্য।’
মীর জুমলার গাণ্ডিকোটা দখলের (১৬৫০) পর প্রথমবার সুলতান আর উজিরের মধ্যে মতপার্থক্য সর্বসমক্ষে চলে এল। কর্ণাটক দখল এবং ভাগ করা নিয়ে দুই সুলতানের মধ্যেকার যুদ্ধে (১৬৫১-৫২) মীর জুমলার হার এবং গাণ্ডিকোটার নিয়ন্ত্রণকে কুতুব শাহের হাতে না দিয়ে আদিল শাহের হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্তেই গোলকুণ্ডার সুলতানের সঙ্গে তাঁর উজিরের প্রথম সম্পর্কের মধ্যে ফাটল হিসেবে ধরা হয়। স্যার যদুনাথ যথাযথভাবেই এই বিষয় সম্বন্ধে বলছেন, ‘স্বাভাবিকভাবেই উজিরের জয়ের ফসল তুলতে চেয়েছিলেন কুতুব শাহ। কর্ণাটক দখলের কাজে দুজন পরস্পরের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে কাজ করেছেন। আশ্চর্যের কথা হল, ভূখণ্ডটি জয়ের পরে লাভের অঙ্ক নিয়ে পরস্পরের সঙ্গে দুর্ভাগ্যজনক কাজিয়ায় জড়িয়ে পড়লেন। কুতুব শাহ, মীর জুমলাকে সাধারণ আম-কর্মচারীর মত ডিল করতে চাইলেন। জয় করা অঞ্চলকে মীর জুমলা নিজেই দখলে রাখতে চাইছেন সুলতানের মনে এমন একটা ধারণা তৈরি হল। অন্য দিকে মীর জুমলা জানেন, তিনি যে সুলতানের অধীনে কাজ করছেন তিনি মানসিকভাবে কত দুর্বল এবং রাজনৈতিকভাবে কতটা ক্ষমতাহীন। কর্ণাটকে তিনি যে যুদ্ধটি জিতেছেন সেটি সম্পূর্ণভাবে তাঁর নিজের কৃতিত্ব এবং সেই যুদ্ধার্জিত ফল তিনি নিজেই ভোগ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। কর্ণাটকে প্রায় স্বাধীন জীবনযাপন করার পরে সুলতানের সভাসদ হিসেবে ফিরে যাওয়া খুব সম্মানের কাজ ছিল না।’ তাঁর কর্মের প্রতিফল হিসেবে যে পদ তাকে দেওয়া হল, তাতে তিনি মনঃক্ষুণ্ণ হলেন এবং জয় করা এলাকা ফিরিয়ে দিতে চাইলেন। ইংরেজ কুঠিয়াল লিখছেন, তিনি চাইলেই প্রকৃতপক্ষে মহান রাজা হতে পারতেন। ক্ষিপ্ত সুলতান মীর জুমলার পাঠানো জয়ের চিঠিকে তার উজিরেরই কৃতিত্ব বুঝে, তাঁর কর্ণাটকীয় স্বাধীনতার ভিত্তি কেড়ে নিতে উদ্যোগী হলেন। লিখিত সূত্রে পাওয়া যাচ্ছে, ১৬৫৩-র সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত চিঠি চালাচালি সূত্রে কিন্তু সুলতান এবং মীর জুমলার মধ্যে কোন বিরোধের আভাস পাওয়া যাচ্ছে না বরং মীর জুমলাকে বলা হচ্ছে সুলতানের মধ্যসত্ত্বভোগী (এজেন্ট)। কিন্তু এক বছরের মধ্যেই সেন্ট জর্জের কুঠিয়ালদের লেখায় দেখা যাচ্ছে সুলতানের বিরুদ্ধে মীর জুমলা হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছেন।
সুলতান মীর জুমলাকে ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চিহ্নিত করলেন উজির মীর জুমলাকে গোলকুণ্ডা রাজ্যের বিশ্বস্ত উচ্চপদস্থ কর্মচারীরূপে নয়। ফলে সুলতানি ক্ষমতার প্রতিস্পর্ধী রূপে মীর জুমলার সম্মান এক ধাক্কায় বহুগুণ বেড়ে গেল। সুলতান প্রমাণ গণলেন। সুলতানের একমুখী চিন্তা হল নীরবে মীর জুমলাকে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং সমূলে ধ্বংস করা। এই সমস্যার আগুণে তৈরি গণগণে রাগে ঘৃতাহূতি পড়ল তাঁর দরবারিদের স্বার্থী মন্ত্রণা। তারা বারে বারে সুলতানের ‘শয়তান’ প্রতিস্পর্ধীকে, দেরি না করে সমূলে ক্ষমতাচ্যুত করার উত্যক্ত মন্ত্রণা দিতে থাকলেন। তাঁর পাশে শুধু উজিরের বিরোধীরাই নয়, উজিরের শুভচিন্তকরাও সর্বক্ষণ ঘিরে থাকে, তাই সুলতান মীর জুমলা বিরোধী মনোভাব রাজকীয় আভিজাত্যের মোড়কে লুকিয়ে চলতে চেষ্টা করলেও মাঝে মাঝে হঠাত হঠাতই মীর জুমলার বিরুদ্ধে সুলতানের রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে শুরু করল রাজকীয় আলাপ আলোচনায়। ক্ষোভ প্রকাশের মাত্রা আর প্রবণতা বাড়তে থাকায়, মীর জুমলার সুলতানি দপ্তরের দরবারি শুভার্থীরা কর্ণাটকে থাকা মীর জুমলাকে বারে বারেই ঘটোনাক্রম জানাতে থাকে। মীর জুমলা বুঝলেন সুলতান তাঁকে বিপদ হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন। তিনি জানেন সুলতানের রোষের জন্যে তার নিজের এবং পরিবার আর আত্মীয়স্বজনের জীবন সরু সুতোয় ঝুলছে। তাদের বার্তা সবার আগে নিজের আর পরিবারের নিরাপত্তা বলয় জরুরিভিত্তিতে তৈরি করা দরকার।
কুতুব শাহের কবল থেকে মীর জুমলার মুক্তিকে অনেকটা তুলনা করা যায় শিবাজীর বিজাপুর উদ্ধারের ভাবনাকে। তবে এটা কতটা তুলনীয় তা বলা কঠিন। শিবাজীরকে চেষ্টা ছিল জাতীয় স্তরের স্বাধীনতা আনয়ন করা এবং তাঁর উদ্যম ঐতিহাসিকতায় পরিপূর্ণ। উল্টো দিকে মীর জুমলার স্বাধীনতার উদ্যম কিন্তু নিজের, ব্যক্তিগত; এ বিষয়ে এইটুকু মন্তব্যই করা যায়।
২। মীর জুমলার কূটনৈতিক চাল
তার প্রতি যে সুলতান তীব্র অসন্তুষ্ট, সেটা আন্দাজ করতে পেরেছিলেন তিনি। মূল ঘটনা ঘটার বহু আগে থেকেই মীর জুমলা নিজের সুরক্ষা বলয় তৈরি করার উদ্যম নিয়েছেন। কুতুব শাহকে কর্ণাটকের রাজস্ব পাঠানো বন্ধ করে দিলেন। একটাও পাইও তিনি আর গোলকুণ্ডার খাজাঞ্চিতে দিতে রাজি নন — কারণ ‘কুতুব শাহকে তাঁর সুলতান হিসেবে স্বীকার করেন না, বরং তাঁর চরমতম শত্রু হিসেবে গণ্য করেন’। তার সাফল্যে কুতুব শাহ ঈর্ষান্বিত হতে পারেন, এমন একটা কিছু আন্দাজ করে, নিজেকে বাঁচাবার জন্যে তিনি পারস্যের শাহের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরিকল্পনা ভাঁজলেন। তাঁর ভাবনা হল পারস্যের যে ভূমি তাঁকে জন্ম দিয়েছে, উপযুক্ত কাজের সুযোগ পেলে মাতৃভূমি পারস্যে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেও তিনি পিছপা হবেন না। এ বাবদে প্রথম কাজ হল ইরাণ সম্রাটের দরবারে তাঁর বর্তমান দুর্দশা, সুযোগ, কর্মদক্ষতা ইত্যাদি ব্যাখ্যা করে চিঠি পাঠিয়ে মন জয় করার চেষ্টা করা। ১৬৫৩-য় দূত মার্ফত পারস্যের উজির, খালিফাইসুলতানকে দুটি বন্ধুত্বপূর্ণ চিঠি পাঠালেন, উভয়ের মধ্যে যে সাংস্কৃতিক বন্ধন রয়েছে তা যেন বজায় থাকে এবং তিনি অতীতের মতই আগামী দিনে শাহের সেবার জন্য প্রস্তুত’। রাজ পরিবারকে পূর্ব সেবার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে পারস্যের দ্বিতীয় আব্বাস শাহকে আবেদন করলেন, যদি কর্ণাটকের রাজনৈতিক অবস্থা তাঁর সম্মান নিয়ে টিকে থাকার জন্য অসহনীয় হয়ে দাঁড়ায় তাহলে তিনি তাঁর সমস্ত স্থাবর সম্পত্তি নিয়ে পারস্যে চলে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত। উত্তরে শাহ জানালেন তাঁর সব স্মরণ রয়েছে এবং উপযুক্ত সময় এলে তিনি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবেন। বাস্তবে ইরাণের শাহ, কুতুব শাহ আর মীর জুমলার বিরোধ সমর্থন করলেন না। তিনি পরোক্ষে কুতুব শাহের সঙ্গে মীর জুমলাকে বিরোধ মিটিয়ে নেওয়ার কথা বললেন।
শাহের উত্তর অনেক পরে এল। শাহের এই ভাসা ভাসা উত্তর মীর জুমলার মনোমত হল না। যদিও তাঁর প্রথম থেকে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় নিশ্চিত ধারণা দিচ্ছিল পারস্য থেকে ঠিক সময়ে তাঁর কাছে সদর্থক সাহায্য প্রস্তাব আসবে না। চিঠি আসার আগেই জন্মভূমিতে পারস্যে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত মাথা থেকে দূর করে দিলেন। শত শত অভিবাসিত পারসিকের মত তিনিও দক্ষিণ এশিয়ায় থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন মনের ধন্ধ কাটিয়ে। আশেপাশের পরিবেশ থেকেই প্রার্থিত সুরক্ষা বলয় খোঁজায় মন দিলেন গোলকুণ্ডার প্রাক্তন উজির মীর জুমলা। প্রথমে ভাবলেন তাঁর প্রভুর একদা শত্রু রয়ালের বন্ধুত্ব চাইবেন। তাঁর ধারণা হল কর্ণাটকের প্রতিবেশী রাজ্যের শাসকই তাঁর সুরক্ষার সত্যিকারের উৎস হতে পারেন। তিনি যে কোন আক্রমনের হাত থেকে তাকে বাঁচাবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁর নিরাপত্তার সমর্থন আদায় করলেন। ইতিমধ্যে কুতুব শাহের বিরোধিতার মাত্রা আন্দাজ করে, সুলতানের বিষ নজরে থাকা বেশ কিছু যোগ্য সুলতানি সেনাপতিকে তিনি নিজের দিকে টেনে সামরিক বলয় জোরদার করলেন। একই সঙ্গে তিনি বিজাপুরের আদিল শাহকে জানালেন তাকে কর্ণাটক উপহার হিসেবে তুলে দিতে চান। আদিল শাহ স্বপ্নেও ভাবেন নি, মালিক অম্বরের মত যোগ্য সেনানায়কের প্রয়াণের পরে দক্ষিণে এক বিরোধী রাজ্যের উপযুক্ত প্রাক্তন দক্ষ কর্মচারী তাঁর স্বার্থে সাহায্যের প্রস্তাব দিতে পারেন।
এই ধরণের বেশ কয়েকটা কুশলী কূটনৈতিক চালে তিনি প্রাথমিকভাবে প্রাক্তন চাকরিদাতা সুলতানের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাবার ব্যবস্থা করলেন, যাতে নিজের উদ্যোগেই নতুন ধরণের একটা স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে তুলতে পারেন এবং আক্রান্ত হলে প্রতিবেশীর সাহায্য পান। সেই নীতিতেই তাঁর মনে হল ছোট ছোট রাজারা নয় বরং তাঁর নিরাপত্তা ছাতা হতে পারে বিপুল বিশাল অমিত ক্ষমতাধর মুঘল সাম্রাজ্য। তিনি গোপনে দক্ষিণের মুঘল সুবাদার শাহজাদা আওরঙ্গজেবকে কৌশলী বার্তা পাঠানো শুরু করলেন। সময়টা ঠিক তাঁর পক্ষে মুঘলদের সঙ্গে বার্তা চালানোর জন্যে উপযোগী ছিল না। তিনি যদি আগে উতসাহ প্রকাশ করতেন তাহলে হয়ত তাকে সাহায্যের জন্য মুঘলেরা সক্রিয় হয়ে উঠতে পারত। যদিও মুঘল সাম্রাজ্যের বিশাল কাঠামোয় অতিধীর সিদ্ধান্ত নেওয়ার তুলনায় আওরঙ্গজেব অনেক বেশি ক্রিয়াশীল চটপটে এবং দ্রুত কাজ সারতে ভালবাসেন। দক্ষিণে বসে তিনি ভাবলেন মীর জুমলার মত উপযুক্ত মন্ত্রী যদি তাঁর অধীনে আসে, তাহলে কর্ণাটকের মত সম্পদশালী রাজ্য দখলের সুপ্ত বাসনা বাস্তবে রূপ পেতে পারে। ওয়ান্ডিওয়াস দখলের সময়ে আওরঙ্গজেব মীর জুমলাকে দূত মার্ফত বার্তা পাঠিয়ে জানিয়েছিলেন, তিনি তাঁকে পাশে পেতে চান। তখন মীর জুমলা আওরঙ্গজেবকে জবাব দেন নি। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মীর জুমলা মুঘল সুবাদারের অতীত বার্তা নির্ভর করে আওরঙ্গজেবের দূতকে জানালেন ‘যোগাযোগ, বন্ধুত্ব এবং ভালবাসার সমস্ত দরজা খোলা থাকবে’। সুলতান এবং উজিরের মধ্যে চলতে থাকা দ্বন্দ্ব পরিবেশ অনুধাবন করে আওরঙ্গজেব গোলকুণ্ডায় মুঘল হাজিব [দরবারি প্রতিনিধি, মুঘলদের ভাষায় ওকিল/উকিল] মুইজ্জুলমুলকের ভাই আবদুল লতিফকে, সেই মুহূর্তে মীর জুমলার বাস্তব অবস্থা অবস্থা বুঝে তাঁর বিষয়ে সমস্ত কিছু তদন্ত করে, সেই সমীক্ষা জমা দেওয়ার জন্যে গোপন চিঠি লিখলেন। (চলবে)