| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলা : জগদীশ নায়ারণ সরকার (১৬নং কিস্তি) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ২৯২ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ১০ নভেম্বর, ২০২২

তৃতীয় অধ্যায়

বিদ্রোহী মীর জুমলা

২। মীর জুমলার কূটনৈতিক চাল

নতুন পরিস্থিতিতে মীর জুমলা ঠিক করলেন এতদিনের রক্ষণাত্মক অবস্থা ছেড়ে বেরিয়ে এসে স্থিতিশীলতার মোড়ক ভাঙবেন। সাম্প্রতিক সময়ে শত্রু হওয়াদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক রণনীতি তৈরির পরিকল্পনা করতে বসলেন। আদিল শাহের হাতে তাঁর নিদারুণ হার, তাঁকে গাণ্ডিকোটা উপহার নিতে বাধ্য করার বদলা হিসেবে মীর জুমলা কূটনৈতিক স্তরে তাঁর হারানো সম্মান উদ্ধারের পরিকল্পনা করে অন্য রাস্তায় এগোনোর পথ তৈরির উদ্যম নিলেন। বিজাপুরী সেনানায়ক খান মহম্মদকে জিঞ্জি হয়ে যাওয়ার অনুমতি না দেওয়া, মহীশূরের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থান এবং রয়ালের সঙ্গে যেচে বন্ধুত্ব চাওয়া ইত্যদি তাঁর সম্মান উদ্ধার করার কূটনৈতিক চালের অঙ্গ ছিল। তবে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপটি ছিল রয়ালের হয়ে আওরঙ্গজেবের মার্ফত গোপনে মুঘল শক্তির সঙ্গে সমঝোতার রাস্তা খোলার অঙ্ককষা উদ্যম। ঝাহুর লিখছেন, ‘ভেলোর দূর্গে শ্রীরঙ্গ ঝামেলা পাকানো শুরু করলেন। তিনি মীর জুমলার সঙ্গে চিঠি দেওয়া-নেওয়া করে ঠিক করলেন তিনি স্বয়ং এবং উকিল মার্ফত মীর জুমলা মুঘলদের নির্দিষ্ট পরিমান পেশকাশ উপহার দেবেন। রাজাকে যাতে মুঘলেরা সক্রিয়ভাবে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে, সে জন্যে মুঘলদের প্ররোচিত করার ফলে উদ্ভুত সমস্ত ঝামেলা সামলানোর ভার মীর জুমলা নিজের শক্ত আর পোক্ত কাঁধে তুলে নিলেন’। ১৬৫৩-তে মীর জুমলার মন্ত্রণায় রয়াল, গোপনে ব্রাহ্মণ দূত শ্রীনিবাসকে আওরঙ্গজেবের দরবারে পাদশাহের উদ্দেশ্যে লেখা চিঠি দিয়ে পাঠালেন। এই সমঝোতায় রয়াল বাদশাকে শুধু যে ইসলাম ধর্ম গ্রহনের প্রস্তাব দিলেন তাই নয়, একই সঙ্গে বছরে ৫০ লক্ষ হুণ [সোনার মুদ্রা], ২০০টি হাতি এবং অপরিমেয় দামি অলঙ্কার উপঢৌকন হিসেবে দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দিলেন, বিনিময়য়ে তিনি সুলতানের সামরুক ভ্রুকুটি থেকে রক্ষা পেতে মুঘল সুরক্ষা বলয়ে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন।

এই অসামান্য কূটনৈতিক পদক্ষেপে মীর জুমলা তাঁর দুর্দিনে শুধু যে রয়ালের আনুগত্য অর্জন করলেন তাই নয়, তিনি আদিল শাহ এবং তাঁর প্রাক্তন চাকুরিদাতা সুলতান কুতুব শাহের বিরুদ্ধেও কূটনৈতিকভাবে কয়েক কদম এগিয়ে থাকলেন। মীর জুমলার মধ্যস্থতার দৌত্য আওরঙ্গজেবের কাছে দক্ষিণে মুঘল শাসন বিস্তৃত করার নতুন সম্ভাবনা দ্বার খুলে দিল। রয়ালের ইসলামে ধর্মান্তরিত হওয়ার প্রস্তাব যেমন আওরঙ্গজেবের শাসক সত্ত্বাকে উৎসাহিত করল দক্ষিণে আরও বড়ভাবে ইসলামের ছত্র বিস্তারের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করতে, তেমনি কর্ণাটক যুদ্ধের লুঠতরাজের পরে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে দুই সুলতানের ওপর চাপ সৃষ্টি করার অসামান্য পড়ে পাওয়া সুযোগও তৈরি হল। তিনি দুই রাজত্বের থেকে মুঘল সাম্রাজ্যের হয়ে এত দিনের বকেয়া রাজস্ব এবং উপযুক্ত পেশকাশ পাঠানোর দাবি জানালেন। মুঘল সাম্রাজ্যের রয়ালের প্রস্তাব মেনে নেওয়ার অর্থ শুধু ইসলামের বিস্তার নয়, সাম্রাজ্য পরিচালনায় বিপুল সম্পদ অর্জনের পথ খুলে যাওয়া। এ ছাড়াও মুঘল সাম্রাজ্যের প্রধান সেনাপতি হিসেবে মীর জুমলাকে মুঘল সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ানোর সুযোগও তৈরি হল।

‘মুঘল সাম্রাজ্যের দরবারের পক্ষে জোর গলায় বরাবর আনুগত্য দেখানো’ মীর জুমলার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার জন্য আওরঙ্গজেব তাঁর হাজিবকে দায়িত্ব দিলেন। তাঁর নির্দেশ ছিল প্রয়োজনে মীর জুমলার প্রতি বদান্যতা দেখানো, যাতে সুলতানের প্রাক্তন সেনাপতি আগামী দিনে শাহী সেনা বাহিনীর অংশ হতে উৎসাহিত হন। একই সঙ্গে তিনি হাজিবকে মীর জুমলার মোট সম্পদ এবং তাঁর বাহিনীর আকার বিষয়ে অবিলম্বে সমীক্ষাপত্র পেশ করার নির্দেশ দিলেন। একই সঙ্গে যাতে পাদশাহ স্বয়ং মীর জুমলার প্রতি উতসাহী হন সে বিষয়ে দিল্লির দরবারে দরবার করতেও বললেন। কিন্তু সে সময়ে উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে পাদশাহের হাত বাঁধা ছিল। ১৬৩৬-এর আহদ (চুক্তি) অনুযায়ী সম্রাটের পক্ষে মীর জুমলা কেন, সুলতানের কোনও তুচ্ছ আধিকারিককে মুঘল সাম্রাজ্যের কাজে (ফুসলে) নিয়ে আসার সুযোগ ছিল না। তাছাড়া দারাও মীর জুমলাকে মুঘল বাহিনীতে নেওয়ার কট্টর বিরোধী ছিলেন। আওরঙ্গজেবের যুক্তি ছিল মীর জুমলা গোপনে বহুবার তাঁকে মুঘল বাহিনীতে যোগ দেওয়ার আবেদন পেশ করেছেন। তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের অংশ হতে তীব্র ইচ্ছুক। তিনি তাঁর প্রাণ দিয়ে সাম্রাজ্যের সেবা করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। এর আগেও যতদূর সম্ভব মীর জুমলার দূত ঈমান ওয়ার্দি বেগ সম্রাটের কাছে একই আবেদন পেশ করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত মীর জুমলার মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতি আত্মনিবেদনে সন্তুষ্ট হয়ে সম্রাট, মীর জুমলাকে সান্ত্বনা দিয়ে আওরঙ্গজেবকে নির্দেশ দিলেন, তাঁর অন্তর্ভূক্তির জন্য যা কিছু করা সম্ভব সে সব পদক্ষেপ করে এগিয়ে যেতে। কিন্তু তখনও পর্যন্ত সরাসরি পাদশাহ মীর জুমলাকে সাম্রাজ্যের সেনাবাহিনীতে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেননি — আশ্বাস দিয়েছেনমাত্র। তবুও সম্রাটের বার্তা পেয়ে তৎক্ষণাৎ আওরঙ্গজেব মীর জুমলার সাহায্য এবং সুরক্ষার জন্য একটি শক্তিশালী মুঘল বাহিনী পাঠিয়ে দেন এবং নিশ্চিত করেন কোনভাবেই যেন সুলতান মীর জুমলাকে মুঘল পক্ষে যোগ দিতে বাধা সৃষ্টি না করতে পারেন।

এদিকে গোলকুণ্ডায় ঘটনাপ্রবাহ দ্রুতগতিতে চূড়ান্তরূপ ধারণ করার দিকে এগিয়ে চলেছে, যার বলে আওরঙ্গজেবের পক্ষে সেই ঘটনায় আরও তাড়াতাড়ি নিজেকে জড়িয়ে ফেলার সুবর্ণ সুযোগ এসে যাবে। কুতুব শাহের সঙ্গে মীর জুমলার মতবিরোধ যখন তুঙ্গে, সুলতান তাকে চক্রান্ত করে গোলকুণ্ডায় ডেকে প্রাণ নাশ করার পরিকল্পনা করেন। মীর জুমলা পুত্রের সক্রিয় সহায়তায় নিজেকে মুক্ত করে সশরীরে কর্ণাটকে ফিরে যান। গোলকুণ্ডার সঙ্গে তার সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে গেল। তিনি কোনও দিন গোলকুণ্ডায় ফিরে না যাওয়ার চরম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। তাঁর মনোভাব আন্দাজ করে তাকে বার বার গোলকুণ্ডায় আনানোর চেষ্টা করতে থাকেন সুলতান। এই সবেতেই মীর জুমলার সন্দেহ আরও ঘণ হতে থাকে এবং তিনি নিজ সিদ্ধান্তে সিদ্ধন্তে অনড় থাকলেন। শেষ পর্যন্ত সুলতানের ভালমানুষির মুখোশ খুলে যায় এবং তিনি মীর জুমলাকে গ্রেপ্তার করে, তাকে ধরাধাম থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধন্ত নিলেন।

পাদশাহ বুঝলেন মীর জুমলার সঙ্গে মুঘল সাম্রাজ্য উপযুক্ত ব্যবহার করে নি। অবস্থার গুরুত্ব বুঝে আওরঙ্গজেব মার্ফত খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করলেন কেন মীর জুমলা কর্ণাটকে ফিরে গেলেন। আওরঙ্গজেব সমস্ত অবস্থা পর্যালোচনা করে সম্রাটকে বোঝালেন মীর জুমলা কেন বাধ্য হয়েছেন কর্ণাটকে ফিরে যেতে। কারন তিনি চাইলেও মুঘল সাহায্য তাঁর কাছে পৌঁছায় নি। তবে মুঘল বাহিনীতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তে বাধা দেওয়ার কেউ নেই বর্তমানে; সময় মুঘল বাহিনীর প্রতি সদয় হয়েছে, যত তাড়াতাড়ি তাকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া যাবে তত শীঘ্র তাঁকে মুঘল বাহিনীতে নিয়ে আসা যাবে। শুধু মাত্র মৌখিক সমঝোতার প্রতিশ্রুতিতে এক্ষেত্রে কাজ হবে না। আওরঙ্গজেব অনুভব করলেন খুব শীঘ্রই মীর জুমলাকে পাশে পেতে সক্রিয়ভাবে কাজে নামতে হবে। মুঘল আমলা সঈদ আহমেদ মার্ফত তিনি মীর জুমলাকে চিঠি লিখলেন। চিঠির বিষয়টা হল মীর জুমলা প্রকাশ্যে ঢাক ঢোল পিটিয়ে মুঘল সাম্রাজ্যে যোগ দিন। আওরঙ্গজেব তাঁকে আশ্বাস দিলেন তিনি দায়িত্ব নিয়ে নিজে পাদশাহের সঙ্গে দেখা করে মীর জুমলার নিরাপত্তার সমস্ত ব্যবস্থা জোরদার করার ব্যবস্থা করবেন। এছাড়াও পাদশাহ মহম্মদ মুনিমকে সাম্রাজ্যের পক্ষে, সাম্রাজ্যের ফার্মান নিয়ে তাঁর নিজের হয়ে শ্রীরঙ্গর সঙ্গে এবং সরাসরি মীর জুমলার সঙ্গে দেখা করার নির্দেশ দিলেন। মীর জুমলা একজন সাম্রাজ্যিক মধ্যস্থতার জন্য দূত প্রার্থনা করে সম্রাটের কাছে আবেদন পাঠালেন; সেই প্রার্থনাপত্রটি প্রত্যায়িত করলেন আওরঙ্গজেব স্বয়ং।

৩। মহম্মদ মুমিন দৌত্য

এত দিনে, ১৬৫৩-৫৪তে শ্রীরঙ্গর ইসলামে ধর্মান্তরিত হওয়ার আবেদন এবং মুঘল দরবারে তাঁর হয়ে একজন প্রাজ্ঞ মুঘল কূটনীতিবিদ মহম্মদ মুনিম সফদরখানির দৌত্যের খবর পৌছল দুই সুলতানের কানে। তাঁদের উভয়ের মনে কর্ণাটক হারানোর আশংকা উদয় হল। ‘আদিল শাহ মনে করলেন এত দিন তারা কর্ণাটকের যত সম্পদ ভোগ করে এসেছেন, সে সব মুঘল সাম্রাজ্য দখল করে নেবে। তিনি খুব তাড়াতাড়ি মীর জুমলার বিরুদ্ধে প্রত্যাঘাত করার সিদ্ধান্ত নিলেন। অন্য দিকে কুতুব শাহ মীর জুমলাকে বাবা বাছা করে শান্ত করে তাঁর পুরোনো পদ এবং মহাল দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন। ততদিনে দেরি হয়ে গিয়েছে। মুঘলেরা তার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করলেও শিরদাঁড়া সোজা রাখা উজির, মীর জুমলা ঠিক করেই নিয়েছেন, যে দু বছর পেরিয়ে গেলে তিনি হয় কুতুব শাহের দরবারে উপস্থিত হবেন, না হয় মক্কা তীর্থে চলে যাবেন।’ মীর জুমলা জানেন হায়দ্রাবাদে তাঁর সহকারী, পুত্র মহম্মদ আমিন, কুতুব শাহের দরবারে বিন্দুমাত্র সুরক্ষিত নন। তিনি স্পষ্টভাষায় আওরঙ্গজেবকে জানালেন ‘এই অবস্থায় উপযুক্ত এবং ভাল’ চুক্তি [বা প্রস্তাব] হলে তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের পক্ষে থাকতে পারবেন না হলে তাঁকে নিজের মত করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ঘটনাপ্রবাহে উদ্বিগ্ন আওরঙ্গজেব সম্রাটকে আবেদন করে বললেন সাম্রাজ্য যেন মীর জুমলাকে সরাসরি সাহায্য করবে এমন একটা প্রকাশ্য ইঙ্গিত দিক। মীর জুমলা যেন যে কোন মুহূর্তে সেনাবাহিনীতে যোগদান করতে পারেন সে ব্যবস্থাও করা হোক।

আওরঙ্গজেবের ভাবনা রূপায়ন করা বাস্তবে সহজ কাজ হল না। কুতুব শাহকে ঠেকিয়ে রাখার যে কূটনীতি নিয়েছিলেন মীর জুমলা, ঠিক সেই নীতি তিনি নিলেন আওরঙ্গজেবের সঙ্গেও। আওরঙ্গজেব মহম্মদ মুনিমকে তাঁর সঙ্গে আলোচনা চালাবার জন্য দায়িত্ব দিলেন এবং নির্দেশ দিলেন তাঁর সঙ্গে কথা বলে যেতে যতক্ষণনা তিনি মুঘল বাহিনীতে যোগ দেওয়ার পাকা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। আওরঙ্গজেব মীর জুমলাকে ইতোমধ্যে চিঠি লিখেছেন এবং সঈদ আহমেদকে কাজেও লাগিয়েছেন। তাঁর বিশ্বাসের প্রশংসা করেছেন। সুলতান যে তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন, তাও সেই চিঠিতে তিনি নিন্দা করেছেন। আওরঙ্গজেব লিখলেন তাঁর বিশ্বাস, বাইরের সব ঝঞ্ঝাট খুব তাড়াতাড়ি মিটে যাবে এবং মীর জুমলা যেন সাম্রাজ্যে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করেন, কেননা তাকে সেই সিদ্ধান্ত লাভবান করাবে। তিনি বললেন মীর জুমলা যেন তাঁর দূতের কাছে নিজের মনের কথা খুলে বলেন এবং সাম্রাজ্যে উঁচু পদ লাভের সুযোগ না হারান। কিন্তু যেহেতু তাঁর বিরুদ্ধে দুজন সুলতান জোট বদ্ধ হয়েছে, তাই সম্রাটের থেকে উপযুক্ত প্রতিশ্রুতি না পেয়ে, মীর জুমলা দূতের কাছে মুখ খুললেন না। মুনিম তাঁর সঙ্গে দেখা করার পর আওরঙ্গজেবের মার্ফত সম্রাটকে একটা আবেদন পেশ করলেন। আওরঙ্গজেব সম্রাটকে জানালেন, যতক্ষণ না সাম্রাজ্য মীর জুমলার সুরক্ষা বিষয়ে কোনও স্থায়ী সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছে ততদিন মীর জুমলা মুঘল বাহিনীতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধন্ত নিতে পারেন না। অবস্থা বুঝে সম্রাটকে তিনি মীর জুমলার চাকরির শর্ত — তাঁর পদ বৃত্তান্ত, তাকে রক্ষার জন্য নিরাপত্তার বলয় বর্ণনা এবং সেই জন্য অতিরিক্ত সেনাবাহিনী বরাদ্দ ইত্যাদি বিষয়ে জরুরি সিদ্ধান্ত নিতে অনুরোধ করলেন। যেহেতু সম্রাট শাহজাহান বার বার তাঁর মুঘল সাম্রাজ্যে যোগ দেওয়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে টালবাহানা করছিলেন, তাই মুঘল বাহিনীতে যোগ দেওয়া বিষয়ে মীর জুমলা আরও সতর্ক হয়ে গেলেন এবং পাদশাহের মনোভাবে শংকিত হয়ে পড়লেন। আওরঙ্গজেব মরিয়া চেষ্টা করলেন মীর জুমলার আশংকা দূর করার। দূত মার্ফত গোপন বার্তা বিনিময় হতে থাকল। মীর জুমলাকে শান্ত করতে আওরঙ্গজেবের পক্ষ থেকে নিশান পাঠানো হল। কুড়ি দিন পরে মীর জুমলা দুজন সেনাদূত মার্ফত পালটা একটি চিঠি আওরঙ্গজেবকে পাঠালেন। আওরঙ্গজেব সেটি সম্রাটের বিবেচনার জন্য পাঠিয়ে দিলেন এবং মীর জুমলাকে লিখলেন, তিনি যেন জীবনের সব থেকে বড় পুরষ্কারের চমক অনুভব করতে ভবিষ্যতের দিকে লক্ষ্য রাখেন। আওরঙ্গজেব জানেন দরবারে মীর জুমলাকে মুঘল সাম্রাজ্যে অংশ নেওয়ানোর বড় বিরোধী হলেন শাহজাদা দারা শুকো।

১৬৫৪-য় দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরে, মীর জুমলা বিষয়ে আওরঙ্গজেবের নাছোড়বান্দা মনোভাবে প্রভাবিত হয়ে অবশেষে পাদশাহ মীর জুমলাকে আওরঙ্গজেবের সুরক্ষায়, এবং একমাত্র আওরঙ্গজেবের উপস্থিতিতে রাজধানীতে উপস্থিত হওয়ার সম্মতি দিলেন। তিনি দুটি গোপন ফরমান জারির প্রস্তাব দিলেন একটি মীর জুমলাকে তাঁর সামনে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ, অন্যটি লিখলেন কুতুব শাহকে যাতে সুলতান, তাঁর উজির এবং উজিরের পুত্রকে মুঘল সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা না হয়ে দাঁড়ান।

মীর জুমলা ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে হঠাতই এক বছর সময় চাইলেন। উদ্দেশ্য বিভিন্ন বন্দরে ছড়িয়ে থাকা তাঁর সম্পদ উদ্ধার করা। এবং তিনি তাঁর প্রাক্তন চাকুরিদাতার সঙ্গেও কথা বলার সিদ্ধান্ত নিলেন যাতে তারা তাঁর বিরুদ্ধে না যান এবং মুঘলদের সঙ্গে তাঁর চুক্তি যাতে গোপন থাকে এই প্রস্তাবও দিলেন।

মীর জুমলার মনোভাবে আওরঙ্গজেব সম্রাটকে জানালেন এক্ষুনি মীর জুমলার উদ্দেশ্যে কোন দূত না পাঠাতে এবং মহম্মদ মুনিমের ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে। মুনিম ফিরে মীর জুমলার অবস্থান সম্রাটকে বুঝিয়ে বলবেন। তিনি সম্রাটকে এই আলোচনা বা পদক্ষেপ গোপন রখতে অনুরোধ করলেন, কারণ দুজন সুলতান যদি মীর জুমলার উদ্দেশ্য জানতে পারেন, তাহলে তারা ছলে বলে কৌশলে মীর জুমলাকে এই উচ্চপদ পাওয়া থেকে বাধা দেবে (মেরে ফেলতেও পারেন)। সে সময় সুলতানদের বাধা দেওয়া অসুবিধে হবে কেননা এই বিষয়ে দু’জন একমত হয়েছেন। সেই সঙ্গে তিনি মীর জুমলাকে বললেন (১৩ জানুয়ারি ১৬৫৫) তাঁর বকেয়া কাজগুলি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সম্পাদন করতে এবং সাম্রাজ্যের সেবায় যোগ দেওয়া সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা না করতে।

রাজধানীর পথে যাওয়া মুহম্মদ মুনিমের হাত দিয়ে আওরঙ্গজেব সম্রাটকে লিখলেন, ‘আজকের রাজনীতির বাস্তবতা হল মীর জুমলাকে শাহী সেনাবাহিনীতে যোগ দিতেই হবে। তার সামনে যে অন্য কোনও রাস্তায় যাওয়ার পথ খোলা নেই সেটা সে আমায় স্পষ্ট জানিয়েছে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সম্পত্তি উদ্ধার করাই তাঁর প্রাথমিক উদ্দেশ্য। এখন সে যে প্রকাশ্য দূরে থাকার কূটনৈতিক চাল চেলেছে সেটা তাঁর মনের কথা নয়। দূর্গ, বন্দর এবং খনি সমৃদ্ধ এই জনাকীর্ণ রাজ্যে (জোরদার সেনাবাহিনী, অতুল ঐশ্বর্য এবং কার্যকরী আধিকারিক সমৃদ্ধ) সে তাঁর সম্পদ উদ্ধার করার পরে পুরোনো আশ্রয়দাতা বিজাপুরের সুলতানের কাছে ফিরে না গিয়ে মুঘল বাহিনীতে যোগ দেবে। শাহী সাম্রাজ্যের দরবারে যোগ দেওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। বর্তমানের পদক্ষেপ শুধু একটি কূটনৈতিক চাল। যতক্ষণনা তার সম্পদ উদ্ধার হয়, ততক্ষণ তাঁর নিরাপত্তার জন্য সে দুই সুলতানকে চটাতে চাইছে না… এবং সে জন্য সে এখুনি এই দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে চাইছে না… সুন্দর ব্যবহার এবং ছলে বলে কর্ণাটকের জমিদারদের বশ্যতা অর্জন করে এবং ইখলাস হাবসির বন্ধুত্ব অর্জন করে… মীর জুমলা সুচতুরভাবে শুধু দিন গুজরাণ করে যথাযথ সময়ের জন্য অপেক্ষা করছে।’

বাস্তবে মীর জুমলা কূটনৈতিকভাবে জোরালো অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। আওরঙ্গজেব বিষয়টা সম্যকভাবে বুঝেছিলেন এবং তিনি এই অবস্থাটি পাদশাহকে বোঝাবার চেষ্টা করছিলেন। মহম্মদ মুনিমের ফেরার পরেও মীর জুমলার সঙ্গে তাঁর চিঠি চাপাটি আদান প্রদান থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ক্ষুরবুদ্ধি উজিরকে তিনি খুব সহজে বশ করতে পারেন নি এবং মুঘলদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে মীর জুমলা কিছুটা ইতস্ততও করছিলেন, বিষয়টা ঝুলিয়ে রাখছিলেন। আওরঙ্গজেব তাঁকে লিখলেন, ‘(সাম্রাজ্যকে) সেবা করার ইচ্ছের ওপর জোর রেখে নিজের ওপর আস্থা বজায় রাখ, এবং মনে রাখ তোমার জন্য অনন্ত ভাগ্যবান ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে (দৌলত সরমাদ সারমাদি?)।’ (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev