তৃতীয় অধ্যায়
বিদ্রোহী মীর জুমলা
৭। আওরঙ্গজেবের শিবিরে মীর জুমলার আগমন
গোলকুণ্ডা ঘেরাও করে রাখার মাসগুলিতে আওরঙ্গজেব অধীর হয়ে মীর জুমলার আগমনের প্রতীক্ষা করছিলেন। একের পর এক গোপনীয় বার্তা পাঠিয়ে তাকে বলা হচ্ছিল এই যুদ্ধের ফলে তৈরি হওয়া সোনালি সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যেতে চলেছে, যততাড়াতাড়ি সম্ভব তিনি এসে আওরঙ্গজেবের শিবিরে যোগ দিন। কিন্তু মীর জুমলা স্বাভাবিকভাবেই নিজের ঘর না গুছিয়ে অর্থাৎ বিজিত কর্ণাটকের প্রশাসন না সামলে এবং ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সব সম্পদ না গুছিয়ে চলে আসার সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না। খাজা আরিফ মহম্মদকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল মীর জুমলাকে কর্ণাটক থেকে গোলকুণ্ডার পানে রওনা করিয়ে দেওয়ার — তিনি বিফল হলেন। ১৬৫৬-য় মীর জুমলা আওরঙ্গজেবকে জানালেন তার দেরির কারণ, এবং অনুরোধ করলেন তাঁর বক্তব্য যেন সম্রাটকে জানানো হয়। ১০ জানুয়ারি তিনি মীর জুমলাকে একবার তাঁর ভবিষ্যত পরিকল্পনা জানিয়েছিলেন অর্থাৎ ১৮ তারিখে মহম্মদ সুলতান হায়দারাবাদ পৌঁছবে এবং যতদূর সম্ভব তিনি পৌঁছবেন ২০ তারিখে। তিনি লিখলেন, ‘আমার সমস্ত চেষ্টা হবে, যেভাবে কুতুবুলমুলক মহম্মদ আমীনকে গোলকুণ্ডায় গ্রেফতার করেছে, আমি ঠিক সেইভাবেই তাকে গ্রেফতার করব। তুমি দূর্গ এবং নিজের সম্পত্তি আগলানোর ব্যবস্থা করছ ভাল কথা, কিন্তু সব কিছু ফেলে রেখে এবং সময়ের দিকে নজর রেখে যত তাড়াতাড়ি হায়দ্রাবাদে পৌছনোর চেষ্টা কর’। কুতুব শাহ মীর জুমলার পুত্রকে মুক্তি দিলেও আওরঙ্গজেব গোলকুণ্ডা আক্রমণের পরিকল্পনা থেকে সরতে রাজি ছিলেন না। তিনি মীর জুমলাকে বললেন ‘খুব শীঘ্র এসে বিশদ পরিকল্পনাটি রূপায়িত কর’, এবং মহম্মদ মুমিনকে তাকে আনতে পাঠালেন। মীর জুমলাকে আবার লিখলেন, ‘এই ঘটনার শেষ ফলের প্রতি উদাসীন থেকো না, এবং এক মুহূর্তও অপব্যয় কর না’। অধৈর্য হয়ে আওরঙ্গজেব ১১ ফেব্রুয়ারি ২,০০০ ঘোড়সওয়ারি দিয়ে আবদুল লতিফকে পাঠালেন মীর জুমলাকে আনতে। কিন্তু মীর জুমলার পথে দেরি ঘটল তাঁর সাঁজোয়া বাহিনীর শ্লথ গতির জন্য। দিনের পর দিন যায় মীর জুমলা আর আসেন না। দিন যায় আওরঙ্গজেব যত বেশি যুদ্ধে জিততে থাকেন ততবেশি কুতুব শাহ শাহেনশাহর প্রতি করজোড়ে মার্জনা ও শান্তি ভিক্ষা করতে থাকেন। সুলতান যে দিল্লিতে সম্রাটের কাছে নল চালানোর ব্যবস্থা করছেন, সেই বার্তা আওরঙ্গজেবের কাছে আসতে থাকছে নিয়মিত। জেতার মুহূর্তে যখন তাঁর আশা ফলবতী হতে চলেছে অথচ মীর জুমলা পৌছচ্ছেন না, তখন হতোদ্যম হয়ে এবং প্রায় হতাশায় ডুবে পড়ে সুবাদার তাঁর সাথীকে মার্চ মাসে লিখলেন, ‘আমি তাকে (সুলতান) প্রকাশ্যে ন্যাংটো করে দাঁড় করিয়ে দিতে পারি, আমার বিশ্বাস তুমি রাস্তায় আছ… কুতুব শাহ এখন ক্ষমা ভিক্ষা করছে… তাঁর জামাই মীর আহমদকে আমার কাছে পাঠিয়েছে এই বলে যে আমার জন্য তাঁর মা অপেক্ষা করছেন, এবং যেন আমার পুত্র তাঁর কন্যাকে বিবাহ করে… কিন্তু আমি তাকে শান্তিতে থাকতে দেব না… আমার উচ্চাশা আকাশ্চুম্বী, আমি আর অপেক্ষা করতে রাজি নই।’
অবশেষে আওরঙ্গজেবের অন্তহীন অপেক্ষার সময় শেষ হয়ে মীর জুমলার শাহী বাহিনীতে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন সফল হল। ৮ মার্চ মীর জুমলা কৃষ্ণা নদী পার হয়ে ১৮ মার্চ হাসান সাগর হ্রদের ৮ মাইল দূরে আওরঙ্গজেবের শিবিরে উপস্থিত হলেন। মীর জুমলাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য সাম্রাজ্যের ফরমান আর খিলাত নিয়ে খাজা আরিফ কৃষ্ণার তীরে পৌঁছেছিলেন।
৬,০০০ ঘোড়সওয়ার, ১৫,০০০ পদাতিক, ১৫০ হাতি এবং বিশাল সাঁজোয়া বাহিনী, বিপুল সম্পদ, নগদ অর্থ, সোনায় মোড়া অস্ত্রশস্ত্র, হিরে, নীলকান্ত মণি, জহরত, পণ্য, আসবাব ইত্যাদি নিয়ে মীর জুমলা আওরঙ্গজেবের শিবিরের দিকে চললেন। তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চললেন মালিনজী, নাসিরি খান, এবং তাকে আনতে পাঠানো মীর সামসুদ্দিন। হায়দ্রাবাদে শাহজাদা সকাশে তিনি আবির্ভূত হলেন যেন কোনও সাধারণ অভিজাত নন, খানজাদারূপে। ২০ মার্চের জ্যোতির্বিদের গণনা করা শুভ মুহূর্তে তিনি শাহী শিবিরে শাহজাদা আওরঙ্গজেব, যার ‘পরিচর্যা আর অবধানে’ তিনি অসীম দুর্ভাগ্য থেকে মুক্তি পেয়েছেন সঙ্গে দেখা করার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। তিনি, তাঁর উদ্ধারকারী আওরঙ্গজেবকে ৩,০০০ ইব্রাহিমি [মুদ্রা] পেশকাশ দিলেন, এবং কিছু উপহারও পেলেন। আওরঙ্গজেব তাঁকে, নিজের খিলাবতখানায় [অন্দরমহল] নিয়ে গেলেন, যেন সেখানে মীর জুমলা নতুন জীবন লাভ করলেন। গোলকুণ্ডার সঙ্গে শান্তি চুক্তির পক্ষকাল পরে, ১৪ এপ্রিল আওরঙ্গজেব মীর জুমলার সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। মীর জুমলা তাঁকে আর তাঁর পুত্রকে কয়েক লক্ষ টাকার উপঢৌকন দিলেন।
চতুর্থ অধ্যায়
মুঘল উজির রূপে মীর জুমলা
প্রথম ভাগ
আওরঙ্গজেবের দূত হিসেবে উজিরিকর্ম
১৬ এপ্রিল হায়দারাবাদ থেকে রওনা হয়ে মীর জুমলা আওরঙ্গজেবের সঙ্গে ইন্দৌর পৌঁছলেন। একসঙ্গে প্রায় একপক্ষকাল কাটিয়ে তাঁরা দুজনে আগামী দিনের কাজকর্ম নিয়ে বিশদে আলোচনা করলেন, বিশেষ করে রাজধানীর সিংহাসনের দিকে নজর রেখে আগামী দিনের রণসজ্জা কিভাবে সামলানো যায় সে ভাবনা ভাবতে শুরু করলেন। তাঁকে শুভেচ্ছা এবং তাঁর বন্ধুত্বের প্রতিশ্রুতি দিলেন মীর জুমলা। ইন্দৌর থেকে আওরঙ্গজেব মীর জুমলা আর তাঁর পুত্রকে দিল্লির শাহী দরবারে যাওয়ার জন্যে কাজি আরিফকে সঙ্গে দিলেন। তারিখটা ছিল ৩ মে। এখানেই শাহী ন্যায়দণ্ডধারী মহম্মদ বেগ ১০ এপ্রিলের তার পদাধিকারের ফরমান মীর জুমলার হাতে দিলেন। এই ফরমান অনুযায়ী মীর জুমলাকে মুয়াজ্জম খান (মহিমান্বিত বন্ধু) উপাধি অর্পণ করা হল এবং নাকাড়া সহ অনেক উপহার দেওয়া হল।
দিল্লিতে দরবারে যোগ দেওয়ার চিঠির অনুযায়ী মীর জুমলা ইন্দৌর ছাড়লেন ৭ মে। পথে আওরঙ্গজেবের সঙ্গে চিঠির মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে গিয়েছেন। সম্মান পাওয়ায় সংবাদে আওরঙ্গজেব তাকে অভিনন্দন জানালেন, এবং সম্রাটের ডাকের প্রতিক্রিয়ায় যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দিল্লি পৌঁছনোর বার্তা দিয়ে বললেন, পথে নান্দেরে তাঁর সঙ্গে খাজা আহমেদ আরিফ যোগ দেবেন। তিনি আরও জানতে চাইছিলেন মীর জুমলা মহম্মদ আমীনকে তাঁর সঙ্গে নিয়ে গিয়েছেন, না কী তাকে ইন্দৌরে রেখে গিয়েছেন। এছাড়াও কর্ণাটকের জমিদারদের মন জয় করতে পেরেছেন কিনা সেই প্রশ্নও মীর জুমলাকে করলেন। উত্তরে মীর জুমলা জানালেন, মীর মহম্মদ আমীন বুরহানপুর পর্যন্ত এসে প্রচণ্ড বর্ষায় আর এগোতে পারেন নি। ২৭ জুন আওরঙ্গজেব খবর পেলেন যে মীর জুমলা পাদশাহের থেকে ব্যক্তিগত চিঠি পেয়েছেন। এই খবরে আওরঙ্গজেব ভীষণ খুশি হয়ে মীর জুমলাকে লিখলেন, ‘…আমার মন ভাগ্যের ঘোমটা ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। আমি দেখতে চাই তোমার সব পরিকল্পনা সফল হচ্ছে। আমি কিন্তু তোমার বর্তমানের ছোটখাট সম্মান পাওয়ায় খুব একটা প্রীত হচ্ছি না। আমি জানি তুমি আরও ওপরের দিকে তাকয়ে রয়েছ, সেটা তোমার অধরা থাকবে না। তা খুব তাড়াতাড়ি বাস্তবে রূপ পাবেই, যদিও তাতে শত্রুদের চরম ঈর্ষা আর হাহাকার বন্ধ হবে না। (কবিতা) অপেক্ষা কর কখন তোমার ভবিষ্যতের ভোর হবে, এটাই [রাতের] শেষ প্রহর।’
দুর্ভাগ্যক্রমে আওরঙ্গজেব সাদুল্লা খানের মৃত্যুতে একজন নির্ভরযোগ্য সহসেনাপতি হারিয়েছিলেন। তাই তিনি অধীর আগ্রহে সাম্রাজ্যের বাহিনীতে মীর জুমলার মত দক্ষ মানুষ চাইছিলেন। মীর জুমলাকে পিছনে রেখে (বাফার এজেন্ট) দারার বিরুদ্ধে ঘুটি সাজাবার পরিকল্পনা করছিলেন তিনি। আওরঙ্গজেব শাহনাওয়াজ খানকে লিখলেন, ‘সাদুল্লা খানের মৃত্যুতে আমি প্রিয় শুভচিন্তককে হারিয়েছি। এখন মুয়াজ্জম খান আমার শুভাকাঙ্ক্ষী এবং বিশ্বাসী। আমার ইচ্ছে অনুযায়ী সে এগোতে শুরু করেছে। আবার ধারণা এ বিষয়ে সর্বশক্তিমান আমাদের সঙ্গে আছেন’। উল্টো দিকে দারা, মীর জুমলাকে মুঘল সামরিক বাহিনীতে নেওয়ার তীব্র বিরোধিতা করলেন – মনে মনে তাঁর আশংকা মীর জুমলা এসেছেন আওরঙ্গজেবের হাত শক্ত করতে আর দারা-জাহানারার অক্ষের ক্ষমতা ধ্বংস করতে। দারা-জাহানারা শিবিরের সমস্ত বিরোধিতা সরিয়ে রেখে, উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে যে বিপুল গোলযোগ চলছে, সেই ঝামেলা মেটাতে পাদশাহ শাহজাহান মীর জুমলার ওপরে আস্থা পেশ করার সিদ্ধন্ত নিলেন; তিনি দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করতেন দুর্দম পারসিকদের কবল থেকে কান্দাহার উদ্ধার করার ক্ষমতা একমাত্র মীর জুমলারই রয়েছে। এমনই ছিল মীর জুমলার ওপর সম্রাটের বিশ্বাস। সে বিশ্বাসের মর্যাদা তিনি সর্বদা সম্মান দিয়ে পালন করেছেন।
রাজধানীর দিকে সুসজ্জিত বাহিনী নিয়ে মীর জুমলার গৌরবময় যাত্রা শুধু তার জীবনেই নয়, কয়েক বছর পর মুঘল সিংহাসনের দখলে ভাইদের মধ্যে যে প্রতিযোগিতা শুরু হবে, তার মুখড়া শুরু হয়ে গেল এই যাত্রার মধ্যে দিয়ে। মীর জুমলা তো বটেই আওরঙ্গজেবের জীবনেও এর খুব বড় প্রভাব পড়ল। যদিও কোনও ভাই জানেন না সিংহাসনের লড়াই কবে শুরু হবে, কিন্তু প্রত্যেকেই নিজে নিজে তাদের মত করে নিজেকে তৈরি করছেন। তাই মীর জুমলার মুঘল সাম্রাজ্যে যোগ দেওয়া আওরঙ্গজেবের হাত শক্ত করল। বোঝাগেল স্বয়ং সম্রাটও মীর জুমলার যোগদানে খুবই প্রভাবিত হয়েছেন। মানুচি তখন দিল্লিতে। তিনি লিখছেন, ‘যে সব অঞ্চল তিনি পেরোচ্ছেন, সম্রাটের নির্দেশে সেই অঞ্চলের প্রশাসক তাকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন, উপঢৌকন দিয়ে সম্মান জানাচ্ছেন… দিল্লির কাছাকাছি আসতে না আসতেই সম্রাট সব সব থেকে বড় সেনানায়ককে পাঠিয়ে সসম্মানে তাকে দরবার পর্যন্ত আসার বন্দোবস্ত করলেন। রাজা রাস্তা দিয়ে গেলে রাস্তা এবং তাঁর পাশের দোকানগুলি যেমন সজ্জিত করা হয়, সম্রাটের নির্দেশ ছিল, মীর জুমলার যাত্রাপথেও ঠিক তেমনি সাজানোর।’ ২৫ রমজান ১০৬৭, ৭ জুলাই ১৬৫৬, মীর জুমলার দিল্লির কাছাকাছি আসার সংবাদ পেয়ে সম্রাট মীর আতিশ কাশিম খান এবং দানিশমন্দ খান বক্সীকে শহরের বাইরে গিয়ে তাকে অভ্যর্থনার নির্দেশ দিলেন। শুভ দিন দেখে তিনি সম্রাটের সঙ্গে দেখা করলেন এবং সভায় সভাসদেদের মধ্যে তাঁকে সব থেকে উঁচু আসনে বসার সম্মান দিলেন সে সময়ের বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধনীতম সাম্রাজ্যের ধারক বাহক সম্রাট শাহজাহান।
সম্রাট শাহজাহানের রত্ন সংগ্রহ করা নেশা ছিল। সেই সুযোগে সিঁধ কাটলেন মীর জুমলা। মীর জুমলা সম্রাটকে ১০০০ মোহর এবং কিছু দামি গয়নাগাঁটি নজর হিসেবে দিলেন যার মধ্যে ছিল কর্ণাটকের হিরের খনির কিছু বাছাই করা মস্ত আকারের হিরে। সম্রট প্রীত হলেন। সেদিন সম্রাট তাঁকে একটি বিশেষ খেলাত, দামি রত্ন খচিত তরোয়ালে দিলেন। তাঁর পদমর্যাদা হাজার সওয়ার বৃদ্ধি করলেন, এবার থেকে তিনি ৬,০০০ জাট এবং ৬০০০ সওয়ারের পদে বৃত হলেন। ৭ এপ্রিল ১৬৫৬-তে প্রধানমন্ত্রী সাদুল্লা খানের প্রয়াণ ঘটে — সাম্রাজ্য পরিচালকদের কাছে এটা একটা মহীরুহ পরনের সামিল। কিন্তু সে শূন্য পদ খালি রইল না বেশি দিন। সম্রাট তার মৃত প্রধানমন্ত্রীর পদ, সমগ্র সাম্রাজ্যের দিওয়ানিকুল বা দিওয়ানিআলম অর্থাৎ রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর পদে বরণ করলেন মীর জুমলাকে। এছাড়াও তাঁকে একটি বহুমূল্যের রত্নে সুসজ্জিত কলমদানি, সম্রাটের বিশেষ ফিলখানা থেকে ১০টা হাতি, ঘোড়াশাল থেকে ২০০ ঘোড়া, একটি মাদি হাতি, নগদ ৫ লাখ টাকা উপহার দিলেন। মীর জুমলা আওরঙ্গজেবকে তাঁর পাওয়া সম্মান এবং উপহার সম্বন্ধে জানালে উচ্ছ্বসিত শাহজাদা লিখলেন, ‘আশাকরি সর্বশক্তিমান তোমায় পাদশাহকে খুসি করার মন্ত্র উপহার দিক, যার ফলে তুমি আদতে সর্বশক্তিমানকেই আরাধনা করার কাজ করছ।’ স্বয়ং শাহজাহান কুতুব শাহকে লিখলেন, ‘দৈনিক উপহারে উপহারে সম্মানে সম্মানে মীর জুমলার আভিজাত্য যেন বেড়েই চলেছে।’ এছাড়া উপহার স্বরূপ পাদশাহ মীর জুমলাকে ৭ বছরের রাজস্বমুক্ত কর্ণাটক শাসনের অনুমতি দিলেন। কর্ণাটক এখন মীর জুমলার শাসনে এল।
১৬৫৫-৫৬ বছরটি মীর জুমলার জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। গোলকুণ্ডার অশক্ত অদক্ষ সুলতানের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়াই শুধু নয়, মীর জুমলা কর্ণাটক নিজের তাঁবে রাখতে পারলেন। সম্রাট শাহজাহানের আন্তরিক ইচ্ছেয় কর্ণাটক তাঁর নিজের জাগির হিসেবে পরিগণিত হল। সব থেকে বড় কথা হল তাঁর পুরোনো প্রভু, গোলকুণ্ডার সুলতানের ঈর্ষাগত শত্রুতার হাত থেকে বাঁচতে সাম্রাজ্যের পক্ষ্মপুটে শেষমেশ নিরাপদ আশ্রয় পেলেন। তাঁর দীর্ঘ সফল রাজনৈতিক জীবনের শিক্ষা নবিশীর দিন শেষ হল এই বছরেই। এত দিনে ভাগ্য তাকে আগামী দিনগুলোয় ঝড়ঝঞ্ঝ্বাময় রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সামলানোর রণপরীক্ষার দিকে ঠেলে দিল। তাঁর সামনে এখন নিজের অর্জিত হূনর দেখানোর আন্তর্জাতিক মঞ্চ তৈরি। তিনি কোমর বেঁধে আগামী দিনগুলোয় নিজেকে প্রয়োগ করার জন্যে তৈরি হলেন।
২। রাজস্ব প্রসাসন এবং আর্থিক বিষয়
মুঘল সাম্রাজ্যের দেওয়ানি দপ্তর মীর জুমলা সামলেছিলেন ১৫ মাসের কাছাকাছি সময় ধরে — ১৭ জুলাই ১৬৫৬-য় তাঁর পদ পাওয়ার দিন থেকে ১৬৫৭-র সেপ্টেম্বরে পদচ্যুতির দিন পর্যন্ত। ওই সময়ে তিনি পাঁচ মাস দিল্লিতে কাটান, বাকি দশ মাস তাঁর কাটে বিজাপুরের বিরুদ্ধে অভিযানে। উজির পদে কাটানোর সময় — সে রাজধানিতেই হোক বা যুদ্ধ ক্ষেত্রেই হোক, মীর জুমলা কিন্তু যুদ্ধে বা প্রশাসনে তাঁর বন্ধু, দার্শনিক, পথ নির্দেশক, যিনি তাঁর নিরাপত্তার ভার নিজের কাঁধে তুলেনিয়েছিলেন, আওরঙ্গজেবের হয়ে কাজ করার এবং তাঁর মাহাত্ম্য প্রচার করার ভূমিকা পালন করেছেন।
মীর জুমলা কেন্দ্রিয় দপ্তরে যে প্রশাসনিক ঝামেলার ব্যবস্থাপনার মুখোমুখি হয়েছিলেন, সেই অসুবিধেগুলি কী ছিল আর এখন বিশদে জানা যায় না। আদাবইআলমগিরিতে কয়েকটা রাজস্ব এবং আর্থিক ঘটনার কথা বলা হয়েছে তা মূলত দক্ষিণের। বেশ কয়েকটা উদাহরণ থেকে পরিষ্কার আওরঙ্গজেবের চাহিদা ছিল মীর জুমলা স্বয়ং পাদশাহের সামনে তাঁর পক্ষে সওয়াল করুন। আওরঙ্গজেব মীর জুমলাকে বলেছিলেন যে রামগীর (আজকের মানেকদুর্গ এবং চিন্নুর) এলাকার রোজগার হিসেবে, মুঘল হাজিব কাবাদ বেগের সামনে কুতুব শাহ বলেছিলেন মহম্মদ নাসির ১,২০,০০০ হুণ রাজস্ব দেবেন, সেই তথ্যটা বিলকুল সত্য নয়, সেটা অর্ধেক, ৮০,০০০ হুণ হবে; কুতুব শাহের হিসেব সর্বৈব মিথ্যা।
দক্ষিণের আর্থিক বিষয়ে আওরঙ্গজেব খুব আর্থিক টালমাটাল অবস্থার মধ্যে পড়েছিলেন। সেই সঙ্কট আরও বেড়ে গিয়েছিল সম্রাটের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে। জায়গিরের মূল্য থেকে মাত্র একাংশ উদ্ধার হচ্ছিল সাম্রাজ্যের। বছরে ক্ষতি বেড়েই চলছিল। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছিল জাগিরদারদের ওপরে। ফলে দক্ষিণে সেনা বাহিনীর অবস্থা চরম দুর্দশার মধ্যে অতিবাহিত হচ্ছিল। আওরঙ্গজেবের প্রস্তাব ছিল জাগিরের একাংশ তাকে এবং অন্য প্রদেশের সর্বোচ্চ আধিকারিককে দেওয়া হোক, সেটা সম্রাট মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় প্রস্তাবটা, তাঁর বেতনের নগদ অর্থ মালওয়া আর সুরাটের খাজাঞ্চির রিজার্ভ জমা থেকে দেওয়া হোক, সেই প্রস্তাবটি কিন্তু সম্রাট বিলকুলই মানেন নি। দক্ষিণজুড়ে প্রশাসনের অভাবে কৃষি উৎপাদন বিপুলভাবে মার খেল, জনসংখ্যা কমল আর স্থানীয় প্রতিশোধ সংঘর্ষ বাড়ল। শাহজাহান আওরঙ্গজেবের ওপর চাপ সৃষ্টি করলেন কৃষকদের এবং কৃষির অবস্থা উন্নতির জন্য সচেষ্ট হতে।
দক্ষিণের কুশলী দেওয়ান মুর্শিদকুলি খান [ইনি প্রথম মুর্শদকুলি, বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি নন] কেন্দ্রকে জানালেন ‘জুলুসের ২৮ তম বছরে (১৬৫৫) বীর পরগণাটি থেকে বাতসরিক রোজগারের দুই-তৃতীয়াংশ আয় হাসিল হচ্ছে। তিনি আশা করছেন, পরের বছরে আদায়ের পরিমান বাড়তে পারে। এই পরগণার আওরঙ্গজেবের উকিলদের বেতন বছরে জায়গির ছাড়া ২ কোটি দাম, কিন্তু মালুজি এবং অন্যান্য জাগিরের হিসেব বিবেচনা করেছেন এবং আশা করছেন ছাড় (তাখফিফ) দেওয়ার পরে সেই পরিমান ছমাসের মধ্যে উদ্ধার হবে’। সম্রাট মীর জুমলাকে প্রশ্ন করলেন মুর্শিদকুলির রাজস্ব সমীক্ষা সত্যি কি না, এবং শাহ বেগ খান বীর প্রদেশ না নিয়ে অন্য পরগণা কেন নিলেন। তিনি মুর্শিদকুলির সততা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। মীর জুমলা আওরঙ্গজেবকে এই বিষয়টি সম্রাটকে পরিষ্কার করে ব্যাখ্যা দিতে বললেন, কেন শাহ বেগ খান বীর প্রদেশ জায়গির হিসেবে নিলেন না। (চলবে)