| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলা : জগদীশ নায়ারণ সরকার (১৯নং কিস্তি) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ৫৭৯ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ১৩ নভেম্বর, ২০২২

চতুর্থ অধ্যায়

মুঘল উজির রূপে মীর জুমলা

প্রথম ভাগ

আওরঙ্গজেবের দূত হিসেবে উজিরিকর্ম

২। রাজস্ব প্রসাসন এবং আর্থিক বিষয়

উত্তরে আওরঙ্গজেব সেই বছরের এবং আগের বছরের আয়ের, কৃষি উতপাদনের বিস্তৃত সংখ্যাতত্ত্ব পাঠালেন, যাতে মীর জুমলা বিষয় বুঝে যথাযথ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে পারেন। তিনি জানালেন শাহ বেগ, বীর প্রদেশ নেন নি বীরের দুর্দশা বা কৃষির অব্যবস্থার (খারাবি ও বিরাণি) কারণে নয় বরং অন্য কোনও কারণে। গোলকুণ্ডা দখলের লড়াইতে শাহ বেগ খানকে আহমদ নগর থেকে ডেকে পাঠানো হল। তিনি তাঁর পরিবারের জন্য আলাদা আলাদা ছড়য়ে ছিটিয়ে থাকা জাগির না নিয়ে ঠিকঠাক একটি অখণ্ড পরগণা চাইছিলেন যাতে মাত্র একটা পরগণা থেকে তিনি একলপ্তে রোজগার করতে পারবেন। আওরঙ্গজেব তাকে ঐ পরগণাটি দিলেন বার্ষিক সাড়ে তিন কোটি দামের বিনিময়ে, যেটি খতিয়ানে (লেজারশিট বা আফ্রাদিতাউজি) দেখানো ছিল। গোলকুণ্ডা থেকে ফিরে আওরঙ্গজেব দেখলেন বীর পরগনা জুড়ে দিয়ে তাঁর মনসব বাড়ানোর প্রস্তাব সম্রাট অনুমোদন করেন নি। পরগণাটি তিনি শাহ বেগের থেকে কেড়ে নেওয়া যুক্তিযুক্ত মনে করলেন না। মুর্শিদকুলি খানের সম্বন্ধে শাহজাহানের মনে ওঠা দ্বিধা দূর করতে তিনি মীর জুমলাকে লিখলেন, ‘মুর্শিদকুলি একজন শিরদাঁড়া সোজা আর কর্মদক্ষ (রাস্তওদুরস্তি অস্ত) আমলা। তিনি মিথ্যে সমীক্ষা লিখতে পারেন না। তিনি যে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন, সেটাই তার জোর। তার সপক্ষে আলাদা করে বলার প্রয়োজন পড়ে না। তিনি অত্যন্ত সেবাপরায়ণ (কর-আমাদান) আধিকারিক। তাকে শাস্তি দিয়ে বসিয়ে না রেখে যদি সাম্রাজ্যের কাজে লাগিয়ে রাখা যায় তাহলে ভাল হয়।’ আওরঙ্গজেব প্রস্তাব দিলেন, তবুও যদি মনে হয় মুর্শিদকুলির কার্যকলাপে প্রশ্নবোধক চিহ্ন মুছে ফেলা যাচ্ছে না, তাহলে একজন আধিকারিক পাঠিয়ে তাঁর কাজ তদন্ত করে দেখা হোক। তিনি প্রস্তাব দিলেন, ‘পাদশাহকে এটা জানিও… আমি যেমন করে বিষয়গুলি উপস্থাপন করি ঠিক সেই ভাবে কাজটা সমাধা কোরো।’

এটা আমরা জেনে গিয়েছি যে উজির মীর জুমলা, খুরদর্দ (তৃতীয় পারসিক মাস) মাস পর্যন্ত ইরাজ খান আর তাঁর ভাইয়ের বেতন নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন এবং আওরঙ্গজেব জানিয়ে দিয়েছিলেন এই ব্যবস্থা আগামী দিনেও কার্যকর হবে।

সম্রাটের নির্দেশে আগামী দিনের ভর্তুকির অর্থনীতি সামলাতে ‘মীর জুমলা জুমলাতুলমুলকি’ দাক্ষিণের করণিকদের (মুতসুদ্দি) লিখলেন, যাদের মনসব বাড়ানোর দরকার হয়ে পড়েছে, আর যারা নতুন মনসব পাবে, তাদের জাগিরের বেতন অর্ধেক হয়ে যাবে এবং সাম্রাজ্যের সনদের সঙ্গে সঙ্গে তাদের বেতন পৌঁছবে, তাঁর আগে নয়। এই নির্দেশের পরে দক্ষিণের দেওয়ানেরা এটি বাস্তবায়িত করার জন্য উদ্যোগী হলেন। কিন্তু এই বেতন পাওয়ার সময় দীর্ঘায়িত করার নির্দেশে দক্ষিণের যে সব মনসবদার সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেন, তারা পাদশাহকে আবেদন করে বললেন যে, তারা এতই গরীব হয়েগেছেন যে তাঁদের পক্ষে একজন করে উকিল দিল্লি পাঠিয়ে তাদের বিষয় সম্রাটের সভায় তোলার আর্থিক সামর্থ নেই। অবস্থা বিগড়োচ্ছে দেখে আওরঙ্গজেব তাদের অভিযোগ সংবাদচিঠিতে জুড়ে সম্রাটের বিবেচনার জন্য পাঠিয়ে দিলেন। প্রতিক্রিয়ায় সম্রাট নির্দেশ বদলে বললেন সনদ যাওয়া পর্যন্ত বেতন বাকি থাকবে না। সিদ্ধান্ত হল দক্ষিণের রাজস্ব আধিকারিককে বক্সী মার্ফত অনুমোদিত নির্দেশটি পাঠানো হবে, তখনই অর্ধেক বেতনটি পাওয়া যাবে এবং সনদ স্থানীয়ভাবেই প্রচার করা হবে।

দক্ষিণে আওরঙ্গজেবের সময়ে যে সব মনসবদার প্রথমবার পদনিয়োগ পেয়েছেন, বা যাদের মনসব বেড়েছে, এবং যাদের নাম বক্সী সাফি খান দিল্লিতে আওরঙ্গজেবের উকিলকে পাঠিয়েছেন, তাদের বিষয়ে আওরঙ্গজেব, দিল্লিতে সম্রাট শাহজাহানের বক্সী ইতিকদ খানকে সাম্রাজ্যের মহাফেজখানা থেকে তথ্য যাচাই করতে অনুরোধ করে বললেন তাদের দপ্তরে সরাসরি সাম্রাজ্যের অনুমোদন না পাঠিয়ে, তাদের নামের সঙ্গে সাম্রাজ্যের পাঞ্জা বসিয়ে দেওয়া হোক। তিনি আরও প্রস্তাব করলেন, আগামী দিনে এইভাবে প্রত্যেক মাসে আলাদা আলাদা করে হিসেব পাঠিয়ে দেওয়া হোক যাতে সম্রাটের অনুমোদন নিয়ে সেটি অবিলম্বে আওরঙ্গজেবের উকিলের হাতে পৌঁছে যায়। তিনি চাইলেন ইস্তিয়াক খান এই বিষয়ে দিল্লিতে হাত ধুয়ে পড়ে থাকুক, কেননা এই বিষয়টি সাম্রাজ্যের স্বার্থ সংহতির জন্য জরুরি এবং এটি মানুষের ক্ষোভ দূর করবে।

৩। মীর জুমলার পৃষ্ঠপোষকতা

সাম্রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ফলে মীর জুমলা তাঁর অনুগামীদের অনুগ্রহ বিতরণের প্রভূত ক্ষমতা অর্জন করলেন। তিনি যেহেতু সম্রাটের কৃপাদৃষ্টির ভাগিদার, এবং শাহজাহানের ওপর তাঁর অসীম প্রভাব ছিল, তাই আওরঙ্গজেব চাইতেন তাঁর পছন্দের আমলাদের স্বার্থে তিনি যেন সম্রাটকে প্রভাবিত করেন। দক্ষিণের বক্সী, সাফি খানের ওপরে সম্রাট অপ্রসন্ন ছিলেন, তাকে সভায় ডাকিয়ে এনে শাস্তিও দিয়েছিলেন। সাফি খানের শাস্তি বিষয়ে শাহজাদা মীর জুমলাকে জানালেন আমলার প্রতি পাদশাহের যে অপ্রীতি তৈরি হয়েছে, সেই বিষয়টাই ভিত্তিহীন এবং তাঁর শাস্তি দিয়ে তাঁর ওপর অন্যায় অবিচার করা হয়েছে। তাঁর মত আমলার দক্ষতা প্রশ্নাতীত, তাঁর মত যোগ্য প্রার্থীর জন্য দক্ষিণে বক্সী বা ওয়াকিয়ানবিস ছাড়া অন্য পদ নেই। এরকম যোগ্য মানুষকে কোন কারণ ছাড়া শাস্তি দেওয়া এবং অপমান করা হয়েছে। তিনি চিঠিতে লিখলেন, ‘খান, মীর জুমলাকে উঁচু দৃষ্টিতে দেখেন, ফলে তাঁর হয়ে ওকালতি/মধ্যস্থতা করা যুক্তিযুক্ত হবে’ এবং একই সঙ্গে জুড়লেন, ‘…তোমার দপ্তর থেকে এই জটিলতার সমাধান করতে হবে।’ দক্ষিণের দক্ষ এবং অভিজ্ঞ দেওয়ান মুর্শিদকুলির বিষয়টিও মাথায় রাখতে বললেন। পরলোকগত পনঘাটের দেওয়ান আজম খানের পুত্র আহমদ নগরের সার্বিক দায়িত্বে থাকা মুলতাফত খানের (১৬৫৬) বিষয়টিও হিসেবে রাখতে বললেন।

একই সঙ্গে উজিরকে মুনসি কাবলি খান, উপযুক্ত এক আধিকারিক এবং অসাধারণ সেনানী আজম খান খেসগির কথাটাও হিসেবের মধ্যে রাখতে অনুরোধ করলেন। মুরাদকে বহুকাল সেবা করে খেসগি বিজাপুর সরকারে যোগ দিয়েছে এবং সে তার কাজ দায়িত্ব সহকারে সম্পাদন করে। আওরঙ্গজেব তাকে ডেকে পাঠান কিন্তু তাকে সাধারণ ৫০০ জাট এবং ১০০ সওয়ারের মনসব পদ দেন। তিনি এতে সন্তুষ্ট নন, তাঁর লক্ষ্য সম্রাটের দরবার।

৪। আওরঙ্গজেবের অমূল্য সঙ্গী মীর জুমলা

সম্রাটের দরবারে মীর জুমলার উল্কার মত উত্থানে, আওরঙ্গজেব এত দিন দরবারের [দারা-জাহানারা ক্ষমতাচক্রের প্রাবল্যে] নানান সমস্যার মুখোমুখি হয়ে নিজের অভিপ্সা এবং উচ্চাশা পূরণ করতে পারছিলেন না, সেগুলোর আপাতত সমাধানের সুযোগ তৈরি হল। মীর জুমলার দায়িত্ব এবং তাঁর ভাগ্যের উড়ানে যে প্রতিশ্রুতি আওরঙ্গজেব তাকে দিয়েছিলেন, সে সব সত্য হওয়ায় তার প্রতি আওরঙ্গজেবের ভালবাসা আরও বাড়ল। আওরঙ্গজেবের দক্ষিণের শিবির থেকে মীর জুমলা উত্তরের দরবারে উজির হিসেবে চলে যাওয়ার পর চিঠির পর চিঠিতে তাঁর প্রতি গভীর ভালবাসা, বন্ধুত্ব আর বন্ধু বিচ্ছেদে তীব্র বেদনার প্রেমানুভূতি — একজন প্রেমিক তাঁর প্রেমিকাকে ছেড়ে গেলে যে ভাব উদয় হয় সেটা বারবার আকুতি সহকারে জানিয়েছেন — ‘তোমার সঙ্গে থাকার আকুল ইচ্ছে থাকলেও নিষ্ঠুর সময় আমাদের মধ্যে একটা বিচ্ছেদের কঠোর দেওয়াল তুলে দিয়েছে। (কবিতা) সে এল আর গেল। আমার হৃদয়কে সমবেদনা জানাতে কিন্তু বেশিক্ষণ অপেক্ষা করল না। সর্বশক্তিমান (আমাদের) মিলন ঘটাবার পথ উন্মুক্ত করে দিন…’। আওরঙ্গজেব মীর জুমলাকে বললেন তিনি তাঁর চিরকাল বাধ্য হয়েই থাকবেন। ২৭ জিকাদা/৬ সেপ্টেম্বর ১৬৫৬ (?)য় মীর জুমলার চিঠির উত্তরে তিনি লিখছেন, ‘শুধু সাদায় কালোয়, হৃদয় থেকে উৎসারিত প্রেমানুভূতি আর বন্ধুত্বকে বিচার করা যায় না। যে অকপট উদ্দেশ্য তুমি চিঠিতে প্রকাশ করেছ, এবং আজকাল করে চলেছ, তাতে আমার প্রতি তোমার বিশ্বাসের প্রতিফলন দেখছি। আমি হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে সেটা অনুভবও করছি। আমি নিশ্চিত জানি, সব পরিকল্পনা ভাবনাচিন্তা রূপায়নে ভাগ্য তোমার সাথে থাকবে। সর্বশক্তিমান তোমায় সেই শক্তি প্রদান করুন।’ এই উচ্ছ্বসিত ভাবের প্রকাশে একটা বিষয়ই নিশ্চিত করে, উজির মীর জুমলা দক্ষিণে দেওয়ানের অমূল্য জোটসঙ্গী ছিলেন।

[আওরঙ্গজেব, ভিক্টোরিয়বাদ আর উপনিবেশপূর্ব বন্ধুত্বভাব প্রকাশ। তাও প্রগতিশীলদের কাছে মধ্যযুগ নিরন্তর গালি খায়। উপনিবেশিক ইতিহাস আওরঙ্গজেবকে চরম পুরুষতান্ত্রিক কঠোর সাম্রাজ্যবাদী হিসেবে দেখিয়েছে — হয়ত তিনি তা ছিলেনও। সমলিঙ্গ বন্ধু, সমলিঙ্গ সখা বা আত্মীয়ের প্রতি বন্ধুত্ব, ভালবাসা প্রকাশের যে দর্শন ভিক্টোরিয় ভদ্রবিত্তীয় রাষ্ট্র সাহিত্য কাঠামো ঠিক করে দেয়, উপনিবেশপূর্ব সময়ে ঠিক সেটা যে ছিল না তা আমরা সাম্রাজ্যের ধারক বাহক আওরঙ্গজেব-মীর জুমলার চিঠিপত্রে আওরঙ্গজেব বন্ধুর প্রতি যে ভাষায় বিচ্ছেদভার লিখছেন পাঠ করলে বুঝতে পারি। আওরঙ্গজেব যে শব্দে দক্ষিণের সুবাদারের দরবার থেকে ছেড়ে উত্তরের সম্রাটের দিল্লির দরবারে চলে যাওয়া, তাঁর থেকে ৩০ বছরের বড় অধস্তন বন্ধু রাজপুরুষের প্রতি ভাব প্রকাশ করেছেন, সে শব্দে, ভাবে আমরা আজ আর পুরুষ বন্ধুর প্রতি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করি না। আমি মূলত বিষম-যৌনতা যাপন করি, সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষিত হই না — আসলে ভিক্টোরিয় দর্শনে আপাদমস্তক জারিত উপনিবেশিক প্রাণী – যতই নিজেকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করি না কেন — ভিক্টোরিয়বাদকে যতই গালি দিই না কেন। আমি কোনও দিনই আমার কোনও ঘনিষ্ঠ পুরুষ বন্ধু, আত্মীয়ের প্রতি আওরঙ্গজেবের ভাষায় কথা বলিনি, ভবিষ্যতেও ভাব প্রকাশের ইচ্ছে নেই – আমি জানি সমাজ বর্তমানের খিস্তি সমলিঙ্গ-প্রেমী ঠাওরাবে, সেটা আমার কাছে অতীব অস্বস্তির — যার প্রতি আমি ভাব প্রকাশ করছি, সে আরও ঝামেলায় পড়বে। অথচ কী অবলীলায় এক সাম্রাজ্যের প্রতিভূ অন্য আরেক সাম্রাজ্য আমলা-বন্ধুকে প্রেমাস্পদের ভাষায় সম্বোধন করেন। এটা আওরঙ্গজেবের চিঠিপত্র পড়লে আন্দাজ করা যায় — যদিও আমার ধারণা ফারসি থেকে তাঁর চিঠিপত্র ইংরেজিতে অনুবাদ করার সময় অনুবাদকেরাও আমার মতই বাক্য তৈরি, শব্দ বাছা বা সামগ্রিক ভাব প্রকাশ ইত্যাদিতে অস্বস্তিতে পড়ে ভিক্টোরীয় মূল্যবোধের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে মূল ভাবের বারোটা বাজিয়েছেন। তাতেও যতটুকু পেয়েছি, তার মূল্য অন্তত আমার কাছে অপরিসীম।]

৫। উজির মীর জুমলার শাহজাদা দারার বিরুদ্ধাচরণ

নিজের স্বার্থপূরণে উজিরকে ব্যবহার করা আওরঙ্গজেবের মূল উদ্দেশ্য ছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন দরবারে দারার অগ্রগতি রুখতে পারলে তাঁর উচ্চাশা পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু মীর জুমলা সবে দিল্লিতে এসেছেন, সঙ্গীসাথীহীন। আওরঙ্গজেব জাহানারাকে অনুরোধ করলেন, মীর জুমলার প্রতি সদয় ব্যবহার করতে এবং তাকে প্রত্যেক বিষয়ে সমর্থন করতে। জাহানারা সম্মতি জানালে তিনি মীর জুমলাকে বললেন অবিলম্বে ঈশা বেগের মাধ্যমে জাহানারাকে ‘অদেখা’ সাহায্যের জন্য ধন্যবাদ জানাতে। প্রয়োজনে জাহানারার সমর্থন জোগাড়ের জন্য অনুরোধ করা হোক। দরবারে জাহানারা ছাড়া মীর জুমলার অন্য কোন খুঁটি ছিল না — ‘তিনি তাঁর সম্মান জাহানারার পায়ের কাছে লুটিয়ে দিয়েছেন’। এছাড়াও আওরঙ্গজেব তাঁকে অন্যান্য অভিজাতর সঙ্গে ভাল ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে বললেন, ‘জ্ঞানী ব্যক্তিকে বারবার পরামর্শ দেওয়া জরুরি নয়’।

দিল্লির দরবারে মীর জুমলার কূটনৈতিক দক্ষতার প্রভাব দেখা গেল অচিরেই। প্রত্যেকেই বুঝলেন এক প্রভাবশালী মানুষের আগমন ঘটেছে, যার মাথায় স্বয়ং শাহেনশাহের অভয় হাত আছে। আমরা আগেই দেখেছি, কর্ণাটকে থাকাকালীন তিনি, বিজাপুরী সুলতানের প্রতি বিদ্বিষ্ট শাহজী ভোঁসলাকে মুঘলদের পাশে দাঁড়াবার জন্য রাজি করিয়েছিলেন। শাহজীকে দেওয়া মীর জুমলার প্রতিশ্রুতিটি প্রত্যায়িত করেন আওরঙ্গজেব। দরবারে মুঘল উজির হিসেবে এসে দারার ইচ্ছের বিপক্ষে গিয়ে শাহজীর প্রতি পুরোনো প্রতিশ্রুতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি সম্রাটকে সেই বিষয়ে এগোতে পরামর্শ দিলেন। তাঁর প্রস্তাবে আওরঙ্গজেব সম্মতি দিয়ে খুব তাড়াতাড়ি সমস্যা সমাধানের পরামর্শ দিয়ে বললেন, শাহজীর সঙ্গে লোক দেখানো দরকষাকষি যেন তিনি চালিয়ে যান।

বিজাপুরের দেওয়া পেশকাশের অর্থ আর পণ্য নিয়ে আওরঙ্গজেব নয়ছয় করেছেন, এই বিষয়টি নিয়ে দারা সম্রাটকে আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন। মীর জুমলা বিষয়টা জানতেন। মীর জুমলা সম্রাটের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় এই বিষয়ে আওরঙ্গজেবের পক্ষ নিয়ে সওয়াল করেন এবং সম্রাট কিছুটা হলেও বিষয়টা বুঝতে পারেন। মীর জুমলা যেভাবে বিষয়টা সম্রাটের সামনে উপস্থিত করেছেন এবং সফলও হয়েছেন, সেটা আওরঙ্গজেবের কাছে খুবই চিত্তগ্রাহী বিষ্ময় হিসেবে উপস্থিত হয়েছিল। উকিলের পাঠানো সমীক্ষা থেকে বিষয়টা জেনে আওরঙ্গজেব, মীর জুমলার মুনসি কাবলি খানকে তাঁর প্রভু সম্বন্ধে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন ‘আমি এর থেকে অনেক বেশি কাজ মীর জুমলার থেকে প্রত্যাশা করি (চশমাদস্ত মা আজ ইশান পেশ আজ ইন অস্ত)। আমি জানি আমার ভালর জন্য সে একটাও পদক্ষেপ থেকে নিজেকে বিচ্যুত করে না। আমি যা তাকে করতে বলছি, তাঁর থেকেও অনেক বেশি কাজ সে করার যোগ্যতা রাখে এটা আমার বিশ্বাস’। আওরঙ্গজেব, দিল্লিতে মীর জুমলাকে জানালেন সাম্প্রতিক অতীতে আদিল শাহ সম্রাটকে এমন কিছু চোখ ধাঁধানো পেশকাশ পাঠাতে পারেন নি, পাঠিয়েছেন বাজে কিছু রদ্দি মালপত্র আর মাত্র ৪ লাখ টাকা (যদিও প্রতিশ্রুত ছিলেন ৯ লাখ টাকা)। আবুল হাসান যথাযোগ্যভাবে এসব সম্রাটের সামনে উপস্থিত করবে। এই বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে সম্রাটের সামনে উপস্থিত করতে উজিরকে বললেন, এবং যদি এই প্রশ্নটা যদি আবার ওঠে, তাহলে ‘উত্তরটা এমন দিও যাতে শত্রুরা (এক্ষেত্রে দারা) পস্তায়’।

৬। দক্ষিণের সুবাদারের সঙ্গে সম্রাটের উজির মাধ্যমে মধ্যস্থতা

গোলকুণ্ডা লুঠের মাল (জিকাদা, ৩০তম জুলুস) নিয়ে সম্রাটের সঙ্গে আওরঙ্গজেবের সঙ্গে বিপুল বিতর্ক তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ের ঘটনাপ্রবাহ থেকে পরিষ্কার মীর জুমলা আওরঙ্গজেবের হয়ে দরবারে একপ্রকার আওরঙ্গজেবের উকিলের মতই কাজ করছিলেন। আওরঙ্গজেবের প্রতি সম্রাটের অনাস্থার প্রেক্ষিতে যেভাবে শাহজাদা নিজের কাজকর্ম সমর্থন করে পাদশাহকে চিঠি লেখেন এবং মীর জুমলাকে সম্রাটের সঙ্গে মধ্যস্থতা করতে অনুরোধ করেন, সে তথ্য থেকে পরিষ্কার, সম্রাট আর তাঁর দক্ষিণের সুবাদারের মধ্যে মীর জুমলা সংযোগ সূত্র হিসেবে তার দায়িত্ব পালন করতেন। সম্রাটের অভিযোগ ছিল তাঁকে না জানিয়ে গোলকুণ্ডায় কুতুব শাহের থেকে বেশ কিছু দামি রত্ন আওরঙ্গজেব এবং তাঁর পুত্র উপহার স্বরূপ নিয়েছেন। সম্রাটের এই ধারণাটির বিরুদ্ধে আওরঙ্গজেব নতুন উজির মীর জুমলাকে প্রতিবাদ পত্র লেখেন। শায়েস্তা খান এবং মীর জুমলা যৌথভাবে কুতুব শাহের পাঠানো ১ কোটি ১৫ লক্ষ টাকার পেশকাশ নিরীক্ষণ করার পরে স্বয়ং মীর মন্তব্য করেন এই অকিঞ্চিৎকর উপহার সম্রাটের কাছে নিয়ে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। মীর জুমলার কাছে খবর ছিল সুলতান, আওরঙ্গজেবের উপস্থিতিতে সম্রাটকে উপহার দিতে চান না। দুজনের ঝগড়ার খবর মীর জানতেন। আওরঙ্গজেব মীর জুমলাকে জানান যে সম্রাট গোটা পেশকাশ এই তাড়াতাড়ি নিজের কব্জায় করতে চাইলেন যে আওরঙ্গজেবের পক্ষে সুলতানদের থেকে পেশকাশ নিয়ে যথাবিহিত মর্যাদায় সম্রাটের কাছে পাঠানোর পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। দরবারে আওরঙ্গজেবের এই বেকায়দা অস্বস্তিতে দুই সুলতানই উচ্ছ্বল হয়ে ওঠেন। শেষ পর্যন্ত কীভাবে সমগ্র পেশকাশ, এমনকি তাঁকে আর তাঁর পুত্রকে দেওয়া উপহারটুকুও একযোগে দিল্লিতে সুলতানের দরবারে পাঠিয়েছিলেন, সেই সংবাদ আওরঙ্গজেব মীর জুমলাকে দিয়েছেন (মীর জুমলা দেখেছেন, সেগুলি ছিল কালো দাগওয়ালা একটি হিরে, চার হাজার টাকাও দাম নয় এমন নীলকান্তমণির আংটি)। তিনি মীর জুমলাকে লেখেন আমার যদি কিছু লুকোনোর থাকত, তাহলে সেগুলি আমি কেন তোমায় দেখাতাম… আর আর আমি মাত্র কয়েকটি হিরে জহরত নিয়ে কি করব যখন আমার সারা জীবন-অলঙ্কারই উতসর্গ করে দিয়েছি সম্রাটের পায়ে?

এই পেশকাশ মামলায় মীর জুমলাকে আগ্রহী করে তোলা আওরঙ্গজেবের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। তিনি উজিরকে অভিযোগ করলেন তাঁর নিজের নগদ সহ যে টাকা সম্রাট পেশকাশ বাবদ আদায় করেছেন, তাতে তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষতি হয়েছে ২০ লক্ষ টাকা। দক্ষিণী সেনাবাহিনী ৬ মাসের বেতন পায় নি। সেই সুযোগে সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ দেখা দেয়, তাহলে সম্রাট বিপুল সাম্রাজ্য রক্ষার যে দায়িত্ব তাঁকে দিয়েছেন, সে কাজটি যথাযোগ্যভাবে পালন করা সম্ভব নাও হতে পারে। বিশেষ করে যখন সুলতান আদিল শাহ মীর জুমলার রাজ্য কর্ণাটকের দখল নেওয়ার শেষ চেষ্টা করে চলেছেন, তাকে নিরাপত্তা দেওয়া, এবং একই সঙ্গে অন্যান্য প্রদেশের শান্তিরক্ষা করা খুব কঠিন হয়ে যাবে। সাম্রাজ্যের বাহিনী এবং দুই সুলতানের মিলিত বাহিনীর তুলনামূলক শক্তি সম্বন্ধে মীর জুমলার ধারণা আছে। আওরঙ্গজেবের মনে হয়েছে গোলকুণ্ডা অভিযান তাঁর এবং পুত্রের জীবনে শুধুমাত্রই তিক্ত অপমান বয়ে এনেছে। তিনি মীর জুমলাকে বললেন এই সমস্ত তথ্য সুযোগ সুবিধে মত সম্রাটের সামনে উপস্থিত করতে। যেহেতু মীর জুমলা নিজে গোলকুণ্ডা ভাগ বিষয়ে সম্রাট এবং সুবাদার কাবলি খানের আলাপ সম্বন্ধে বিশদে জানেন, ফলে উজির যখন সম্রাটকে তাঁর বক্তব্য পেশ করবেন, তখন সমস্ত দক্ষতা দিয়েই যেন সেই কাজটি সম্পন্ন করেন। এর ফলে হয়ত সরাসরি আওরঙ্গজেবের কোনও ঐহিক উপকার হবে না, কিন্তু এর মাধ্যমে যদি সম্রাটের মনে যে বিক্ষোভ তৈরি হয়েছে সেটি যদি দূর হয়ে যায় সেটাই তাঁর কাছে বড় পাওনা হবে। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev