অনুবাদকের কৈফিয়ত
বাংলার কারিগর ছোট ব্যবসায়ী আর চাষিদের দৃষ্টিভঙ্গীতে উপনিবেশপূর্ব বাঙলার কারিগর অর্থনীতির ইতিহাসের খোঁজে কলাবতী মুদ্রা আর বঙ্গীয় পারম্পরিক কারু ও বস্ত্র শিল্পী সংঘ কাজ করে চলেছে। ইতিমধ্যে এই বিষয়ে কিছু বইও প্রকাশ করেছে কলাবতী মুদ্রা। কারিগর চাষী হকারদের ভাবনায় বাংলার পলাশীপূর্ব সময়ের ইতিহাস খোঁজে তারা আজও সক্রিয়। তারা মনে করে উদ্বৃত্ত অর্থনীতির কারিগর চাষী হকার নির্ভর বাংলা থেকে লুঠেরা উপনিবেশিক অর্থনীতিতে পৌঁছবার গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হল ব্রিটিশ শক্তির চক্রান্তে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলার পতন। পলাশীর হারে শুধু বাঙলার ইতিহাস নয় পালটে গেল বিশ্বের ইতিহাসও। পলাশীর পরে বাঙলার উদ্বৃত্ত অর্থনীতি থেকে যে সম্পদ, জ্ঞান আর প্রযুক্তি শুষে নিয়ে যায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, সেই সম্পদ কাজে লাগে নব্য ইওরোপের শিল্পায়ন ঘটাতে, একই সঙ্গে এশিয়া আফ্রিকা আমেরিকার সম্পদ আর শ্রমশক্তি লুঠ আর পদানত করে লুঠে গোটা ইওরোপ আর সাদা আমেরিকার বিকাশ সাধন করতে। উপনিবেশিক অর্থনীতির প্রতি নিবেদিত অধিকাংশ ইতিহাস ব্রিটিশ শাসনের সময়ের কর্মকাণ্ড, তত্ত্ব ইত্যাদি ধরে কাজ করতে উতসাহী এবং তাঁদের এই লুঠ কর্মকে প্রগতিশীল, বিকাশ আর উন্নয়নের সময় হিসেবে দাগানোর ইতিহাস রচনার অংশগ্রহন ও প্রচারে আজও ক্রিয়াশীল। অথচ ব্রিটিশপূর্ব সময়টায় বাংলার অবস্থা কী ছিল, তার খুব বেশি আলোচনা হয় নি নয়, হয়েছে, কিন্তু বড্ড অসম্পূর্ণ এবং ঔপনিবেশিক রসে জরানো, অধিকাংশ ঐতিহাসিকই চেষ্টা করছেন শিল্পায়িত ইওরোপের বিকাশের তত্ত্বের সঙ্গে মিলিয়ে মিশিয়ে বাঙলা বিকাশের রূপরেখা তৈরি করতে।
অথচ পাল, সেন, সুলতানি, মুঘল আর পলাশীর আগে আগেই নবাবি আমলে বাঙলার অর্থনীতি, শিক্ষা, সামাজিক অবস্থা বিশ্বের অন্যতম উজ্জ্বল নিদর্শন ছিল। বিশেষ করে অর্থনীতিতে সে ছিল স্বনির্ভর। সে সময় বাংলা বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উতপাদক, বিতরক অঞ্চল। পলাশী পূর্ব সময়ে ইওরোপে এমন কোনও ভোগ্য পণ্য তৈরি হয় না যা বাংলা তথা ভারত তথা এশিয়ার বাজারে বিক্রি হতে পারে। ফলে বাংলার অর্থনীতি ছিল স্বভাবিকভাবে উদ্বৃত্ত। অথচ স্বাধীনতার পর আজও পশ্চিমি প্রযুক্তি, জ্ঞান, শিক্ষায় বিপুল অযুত সম্পদ বিনিয়োগ সত্ত্বেও ভারতের অর্থনীতি বিশ্ব অর্থনীতির তুলনায় নগন্যতম হয়েই রয়েছে। কেন? সেই বিশ্লেষণ করতে আমাদের উপনিবেশপুর্ব পূর্বের সময়ের আর্থব্যবস্থা, কারিগরি উতপাদনের কাজকর্মগুলো বোঝা দরকার গভীরভাবে।
ঠিক সেই জন্যই প্রাথমিকভাবে যদুনাথ সরকারের স্মরণ নিয়েছিলাম আমরা। আমরা দেখতে চেয়েছিলাম পলাশীর ৫০ বছর আগে শেষ দৌর্দণ্ড প্রতাপ মুঘল পাদশাহ আওরঙ্গজেব মারা যান, তাঁর সময় ভারত কেমন ছিল। সেই অবস্থা বুঝতে আমরা মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন আর আহকমইআলমগিরি অনুবাদে অগ্রসর হই। তো অনেক দিন ধরেই সে সময়ের বাঙলার অবস্থা জানা বোঝার কাজ করার দিকে মন যাচ্ছিল। হাতে এসে গেল আরেকটি পথ ভাঙ্গা কিন্তু খুব বেশি প্রচার না পাওয়া জগদীশ নারায়ণ সরকারের লাইফ অব মীর জুমলা বইখানি। আওরঙ্গজেবের বহুবর্ণিল সেনাপতি মীর জুমলা বেশ কয়েক বছর বাংলা সুবায় কাটিয়েছেন। সেই সময়টার বাঙলার ইতিহাসে তিনি প্রায় নায়ক না হলেও, মোটামুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন বাঙলার নিজামতের সুবাদার হিসেবে। তার সময়ের প্রায় ৪০ বছর আগেই পর্তুগিজ শক্তিকে বাঙলার ইতিহাস অর্থনীতি থেকে ঠেলে বার করে দেওয়া হয়েছে — তাঁর পরে পরেই শায়েস্তা খানের সময় চট্টগ্রাম-সন্দ্বীপ থেকে পাত্তাড়ি গোটাবে বাকি পর্তুগিজ শক্তি। উত্থান হবে ডাচ আর ইংরেজ কোম্পানির, তারা তাঁর নেতৃত্বকে সমীহ করছে। ঠিক যে কারণে আমরা পরম পত্রিকায় ডাচ বা মুঘল অর্থনীতি বা পলাশির পরবর্তী স্বাধীনতা সংগ্রাম বুঝতে চাইছি, ঠিক সেই কারণে সেই সময়ের বাংলায় কাটানো গুরুত্বপূর্ণ আমলার জীবন আর তার সময়কে বুঝতে চাইছি, বুঝতে চাইছি সেই সময় বাংলা কোন জাদুতে সারাবিশ্বে অগ্রগণ্য ছিল। তাই এই বইটির অনুবাদকর্ম।
এছাড়া আমরা যারা মেকলের নাতিপুতি কালা সাহেবদের সন্তানসন্তি, বাল্যাবস্থা থেকেই ঔপনিবেশিক নবজাগরণীয় ভাষ্যের পরিবেশে বেড়ে উঠি তাদের কাছে উপনিবেশের শাসন আন্তরিকভাবেই কাম্য। কিন্তু এর বিপরীতে আমরা, কারিগর হকার চাষিরা মনে করি উপনিবেশপূর্ব সময় ভদ্রবিত্তের চাকরি, দালালি, উমদোরি, নব্য লুঠেরা চিরস্থায়ীবন্দোবস্তমূলক জমিদারির পৃষ্ঠপোষণা করেছে সাধারণ মানুষের ওপর লুঠ খুন আর অত্যাচার চালিয়ে। সুশীল চৌধুরী, কীর্তিনারায়ণ চৌধুরী, আবদুল করিম, ওম প্রকাশ, নরেন্দ্র কৃষ্ণ সিংহ, রমেশ চন্দ্র দত্ত পাঠে ঔপনিবেশিক পণ্ডিতদের হাতে কালমালিপ্ত বাংলা নতুন এক বিন্যাসে জেগে ওঠে। বাংলার কারিগরেরা অর্থনৈতিকভাবে যে এইউ ভূখণ্ডকে কয়েক হাজার বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে উদ্বৃত্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে তিলে তিলে গড়ে তুলেছিল তাদের জ্ঞান, দক্ষতাম প্রযুক্তি আর বাজারের প্রজ্ঞায়, তার অনেকটা শ্রেয় ৫৫০ বছরের সুলতানি মুঘল আর বাংলার নবাবি আমলকেও দিতে হয়। যে উদ্বৃত্ত বাংলাকে লুঠে, ছিবড়ে করে, অত্যাচার করে গণহত্যা চালিয়ে অবদমিত করাবার পরেও পশ্চিমি লুঠেরা নিজেদের কৃতকর্মকে বিকাশীয় মোড়কে চিত্তাকর্ষকভাবে উপস্থাপন করে, সেই অনৃতজাল উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনের কর্মীদের উদ্যোগী হয়ে চ্ছিন্ন করা প্রয়োজন। ঠিক যে উদ্দেশ্যে তারা মুঘল আমল, নবাবি আমল নিয়ে কাদা ছেটায়, আওরঙ্গজেবকে সিরাজকে ঘৃণিত পাদশাহ হিসেবে উপস্থাপন করে, যে উদ্দেশ্যে তারা প্রমান করতে চায় বাংলা বাধ্যতামূলকভাবে উপনিবেশের অঙ্কশয়ানি হতে বাধ্য হয় নিজের দোষে, সেই সব যুক্তিজাল প্রতিরোধ করা উপনিবেশপূর্ব সময়ের কর্মীদের আশু কর্তব্য। সেই ইতিহাসের ধুম্রজাল উন্মোচন করার কাজে জগদীশ নারায়ণ সরকার অনেক দূর পর্যন্ত আমাদের সহায়ক হন। আমরা দেখি কি অবলীলায় আওরঙ্গজেবের সেনাপতি বিপুল বিশাল গঙ্গা আর ব্রহ্মপুত্রের ওপর নৌকো সেতু করে প্রথমে সুজার পশ্চাদধাবন করেন তারপরে আসাম আক্রমন করেন, এই অনুবাদসূত্রে আমরা বুঝতে পারি কীভাবে সে সময়ে ডাক ব্যবস্থাপনা চলত। এই গবেষণায় জগদীশ নারায়ণ সরকারের হাতে সেই সময়কার বাংলার নৌশক্তি বা নাওয়ারার ছবি মূর্ত হয়ে ওঠে।
বইটায় মুখবন্ধ লিখেছেন আচার্য যদুনাথ সরকার। তার পরবর্তী প্রজন্মের ঐতিহাসিক বা ইতিহাসচর্চাকে কিভাবে এগিয়ে দিতে হয়, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ পেশ করেন আচার্য। এমন কোন বিশেষণ নেই যা তিনি তার প্রশস্তিতে বর্ণনা করেন নি অনুজসম লেখক সম্বন্ধে। অথচ দুজনেরই এক সময়, অনেকটা একই বিষয় নিয়ে কাজ। জগদীশ নারায়ণের বইটি পড়ে তার নিজের বইতে তথ্যের ঘাটতি চোখে পড়ছে সেটা তিনি ছোট্ট মুখবন্ধে জানাতে ভোলেন নি। অসাধারন সেই হৃদয়বত্তা, যার উত্তপে তিনি জগদীশ নারায়ণকে আবাধে বিচরণ করতে দিয়েছেন নিজের সংগৃহীত পারসিক পাণ্ডুলিপির গ্রন্থাগারে। সেই মুখবন্ধ অনুবাদ প্রথম প্রকাশনায় গেল। এর পর থেকে সরাসরি চলে যাব তাঁর বই অনুবাদে।
জগদীশ নারায়ণ সরকারের বইএর অনুবাদ পেজ ফোরএ প্রকাশ করতে দেওয়ার জন্যে সম্পাদককে কৃতজ্ঞতা জানালাম। ঠিক যেমন আকবরের জীবনী এবং আওরঙ্গজেবের অর্ধেক জীবন প্রকাশ হওয়ার সময় আপনারা, পাঠকেরা নানান সমস্যা, ভুল ইত্যাদির দিকে নজর টেনে দীপবর্তিকার মত আলো দেখিয়েছিলেন লেখককে, একইভাবে মীর জুমলার জীবন কৃতির অনুবাদের ভুল ত্রুটিগুলোর দিকে পাঠকের নজর পড়ুক। জানি অনেকেরই ইংরেজি বইটা পড়া, আমাদের মত কিছু অশিক্ষিত অন্ধকারে হাতড়ানো কারিগর সঙ্গঠনের কর্মী বাদ দিয়ে। আমারা যারা অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে ইতিহাসের কিছু ভুলে যাওয়া কুড় খোঁজার কাজ করছি, তাঁদের জন্য। বাহুল্য মানে হলে স্বচ্ছন্দে এড়িয়ে যাবেন। এই কাজ কারোর যদি কাজে লাগে সেই সময়টাকে বুঝতে, জানতে তাহলেই অনুবাদক কৃতজ্ঞ থাকবে।
বিশ্বেন্দু নন্দ
প্রথম সংস্করণের প্রশস্তি
ইন্দো-মুসলমান ইতিহাসে প্রথম শ্রেণীর অবদানের জন্য সর্বপ্রথমে লেখককে অভিবাদন জানাই। একাগ্র মনে এবং ইতিহাসচর্চার গভীরতম প্রদেশে প্রবেশ করে সাত বছর ধরে তিনি মীর জুমলার জীবনচর্চা করে নতুন সব চমকপ্রদ তথ্য অবলম্বন করে বই লিখেছেন। বেশ কিছু যায়গায় আমার হিস্টোরি অব আওরঙ্গজেবএর বেশ কিছু তথ্য শুধরেও দিতে হবে। বইটা আমার উক্ত বইএর সুখপাঠ্য সংস্করণ নয়। যদিও এই দুই বইতে আলোচিত সময়সীমা, ১৬৪৭-১৬৬৩-র মধ্যেকিছুটা মিল রয়েছে, কিন্তু বইটা কোনোভাবেই আমার বইতে ব্যবহৃত তথ্যের অনুলিখন নয়।
বর্তমান লেখক ইতিহাসের ওপর অনুবীক্ষণ যন্ত্র ধরেছেন। আর আমি দূরবীক্ষণ যন্ত্র ধরে ইতিহাস পর্যালোচনা করছি। এ ছাড়াও তিনি এমন কিছু বিষয়, ঘটনা নিয়ে আলোচনা করেছেন, সেগুলি আমি আলোচনা করিনি। বইটির মৌলিক মূল্য অসাধারণ। মাত্র একটা উদাহরণই দেওয়া যাক, এই বইটির প্রথম আট পাতা ছাড়া মীর জুমলার জীবনীর সঙ্গে আমার বইটির বিন্দুমাত্র মিল নেই। মীর জুমলার অনুসৃত প্রশাসনিক ব্যবস্থা, ব্যবসাকর্ম, ইওরোপিয় বণিকদের সঙ্গে সম্পর্ক ইত্যাদি নিয়ে বিশদে তথ্যপূর্ণ আলোচনা করেছেন লেখক। এছাড়াও সুজার বিরুদ্ধে মীর জুমলার আক্রমণের ঘটনাবলী, আমার বইতে সংক্ষেপে আলোচনা করেছি, এই বইতে বিপুল বিশদে, বিস্তৃত আকারে আলোচনা রয়েছে।
মহম্মদ গওয়ান, মালিক অম্বর এবং মীর জুমলা — এই তিন অভিজাতকে ভারতকে উপহার দিয়েছিল পারস্য (এখানে আমি পারস্য শব্দটা ব্যবহার করেছি শিয়া শব্দটা বোঝাতে)। ভারতের রঙ্গমঞ্চে এই তিন প্রায় অতিমানব (সুপারম্যান) তাঁদের সমস্ত দক্ষতা অধীতবিদ্যা আর জ্ঞান ঢেলে দিয়েছেন যুদ্ধ, কূটনীতি, প্রশাসনিক ব্যবস্থা আর ব্যবসা ব্যবস্থাপনায়। এই তিন রাজপ্রতিনিধির (কিংস অব মেন) মধ্যে মীর জুমলার ভাগ্য বিড়ম্বিত। তাঁর তুলনায় অন্য দুজন অনেক বেশি শান্তি ভোগ করেছেন। নিজেদের তাঁরা সর্বোচ্চ মন্ত্রীত্বের পদে আরোহণ করেছিলেন। মীর জুমলা সর্বোচ্চ ক্ষমতার স্বাদ পাননি, তিনি বরাবই সেবা করে গিয়েছেন, বরাবরই তিনি অধস্তন কর্মচারীই থেকেছেন। মাথায় রাখতে হবে মীর জুমলার জীবনের কৃতির অর্জন ঢেকে দেয় তার সময়ে দক্ষিণে আওরঙ্গজেরবের সরব, প্রাধান্যময় উপস্থিতির চোখ ধাঁধানো ক্রিয়াকলাপ। মীর জুমলা তাঁর উজ্জ্বল কর্ম জীবনে সাফল্যের শীর্ষে ছিলেন সতের বছর ১৬৪৬ থেকে ১৬৬২ পর্যন্ত — সেটাই আওরঙ্গজেবের উত্থানের সময়। বিখ্যাত মানুষ চিহ্নিত হন উঠে আসা বিরোধিতা তিনি কতটা সফলভাবে বুক চিতিয়ে মোকাবিলা করছেন, ভাগ্য কতটা তাঁর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এবং তিনি কিভাবে ভাগ্যের উদ্যত তর্জনীকে দুমড়েমুচড়ে নিজের সাফল্যরেখাকে সবল করছেন সেই তুল্যমুল্য আলোচনায়। এই প্রেক্ষিতে তিনজনের মধ্যে মীর জুমলা শ্রেষ্ঠতম চরিত্র।
এ ছাড়াও ঐতিহাসিক নথি-তথ্যাবলী সূত্রও মীর জুমলার প্রতি অনেক বেশি সদয়। তাঁর জীবনীকার ইওরোপিয় বণিকদের সঙ্গে মীর জুমলার আলাপ আলোচনার নথির সূত্র ধরে সেই সময়ের প্রায় দৈনন্দিন ঘটনা আলোচনা করেছেন। তাঁর জীবনের বিশাল অংশ কেটেছে দক্ষিণের গোলকুণ্ডায়। পারসিক ঐতিহাসিকদের লেখা সুলতানি যুগের ইতিহাসে এবং দিল্লির ইতিহাসে তার বহু কর্মের উল্লেখ রয়েছে। এছাড়াও কচ্ছ এবং অসমের যুদ্ধযাত্রার বিশদ দিনপঞ্জী (ডায়েরি) লিখে গিয়েছেন শিহাবুদ্দিন মহম্মদ তালিশ। তালিশের নাম আবুল ফজলের কৃতির সঙ্গে তুলনীয়। এছাড়াও ব্রিটিশ আর ডাচেদের কুঠির নানান তথ্য এবং তারিখ তাঁর যুদ্ধযাত্রা এবং অর্থনৈতিক কাজকর্মের যথাযথ সময় নির্দেশ করে। এই বিপুল তথ্যপঞ্জী অন্য কোন মধ্যযুগের আভিজাতর বীরের জীবনে পাই না।
এই সব অসামান্য তথ্য মীর জুমলার জীবনী লেখার বাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। লেখক পারসিক পাণ্ডুলিপি থেকে যে তথ্যাবলী উদ্ধার করছেন, তার অধিকাংশ আমার গ্রন্থাগারের; সে সব অমূল্য গ্রন্থ ভারতের অন্য কোথাও নেই। সেই সব তথ্য জড়ো করে তিনি যে জীবনীটি লিখেছেন, সেটা পড়ার পরে বলতে পারি বোধহয় তৎকালীন সময়ের অধিকাংশ ঘটনা বিষয় তাঁর বইতে আলোচনা করেছেন। ড. জগদীশ নারায়ণ সরকার মধ্যযুগের ইতিহাস নিয়ে যে ধরণের সুগভীর কাজ করেছেন, সাম্প্রতিক ইতিহাসে সে ধরণের কাজ হয়েছে কিনা সন্দেহ। গেজেটিয়ার বা সার্ভের কোয়ার্টারইঞ্চ মানচিত্র নিয়ে প্রত্যেকটা যায়গার নাম তিনি উদ্ধার করেছেন।
মধ্যযুগের ভারতে মীর জুমলা অন্যতম মহান চরিত্র। সেই মানুষটির বিশ্বস্ত জীবনী বইএর আকারে উপস্থিত হল।
যদুনাথ সরকার
৬ জুন ১৯৫১
মুখবন্ধ
১৯৫১ সনে প্রকাশিত দ্য লাইফ অব মীর জুমলা, দ্য জেনারেল অব আওরঙ্গজেব বহুকাল হয়েগেল ছাপা নেই। বইটির আরেকটি সংস্করণ করা দরকার, এভাবনা বহুকাল ধরে আমার মাথায় খেলছিল। বহু গবেষক খোঁজখবর করছিলেন। বইটি সংস্কার করা হল এবং আকারেও বেশ বাড়ল।
গোলকুণ্ডার প্রশাসন এবং মীর জুমলার বেড়ে ওঠার প্রয়োজনীয় বিশদ ছবি এঁকেছি আরও বিশদে তাই প্রথম অধ্যায়টি কলেবরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে মুল পাঠ আর পাদটিকায়। দ্বিতীয় অধ্যায়ও নতুন করে লিখেছি তিন খণ্ডের কে এ এন শাস্ত্রী এবং ভেঙ্কটরামনাইয়ার ফারদার সোর্সেস অব বিজয়নগর হিস্টোরি নামক তেলুগু সূত্র অনুররণ করে, যেটি এর আগে আমি ব্যবহার করিই নি এই অধ্যায় এবং ইয়াজদানি কমেমরেশন ভলিউমে প্রবন্ধ দেওয়ার আগে। এছাড়াও নতুন কিছু ফারসি সূত্র পেয়েছি পদ্মভূষণ অধ্যাপক এইচ কে শেরওয়ানির হিস্ট্রি অব কুতুবশাহী ডায়নাস্টি এবং হিস্ট্রি অব মেডিভ্যাল ডেকান (সম্পা) থেকে। চতুর্থ এবং পঞ্চম অধ্যায়ে আরও সূত্র জুড়েছি, তাতে কলেবর বেড়েছে। ষষ্ঠ অধ্যায়ে সাহায্য নিয়েছি ড অঞ্জলি চ্যাটার্জীর বেঙ্গল ডিউরিং রেইন অব আওরঙ্গজেবএদ্ (১৯৬৭) এবং সপ্তম অধ্যায়টি নতুন করে লিখেছি ড এস কে ভুঁয়্যার অসমিয়া বুরুঞ্জি থেকে প্রাপ্ত ১৯৫৭ সালের অতন বুড়া গোহাঁই এন্ড হিজ টাইমস থেকে তথ্য আহরণ করে। অষ্টম অধ্যায়ে ইতিহাসে মীর জুমলার স্থান নতুন করে লিখেছি।
দ্বিতীয় জোড়াপাতায় ইওরোপিয় সূত্র থেকে দেওয়া গোলকুণ্ডা আক্রমনএর (১৬৫০) বছর তেলুগু সূত্রে মেলে নি, নতুন ভাবে লিখেছি। নতুন জোড়াপাতা (জিঞ্জি) জুড়েছি। অসমে মীর জুমলার পশ্চদপসরণের নতুন সময় সারণি লিখেছি তার সামগ্রিক জীবন সূত্রে। সবে মিলিয়ে পাঠ্য বইএর তালিকাও বেড়েছে। এটিকে আগের তুলনায় আরও বিশ্লেষণমূলক করা গেল। দক্ষিণে মীর জুমলার কাজকর্ম, সিংহাসন লড়াই এবং পূর্ব দিকের অভিযান নিয়ে বেশ কিছু নতুন মানচিত্র জুড়েছি। সতর্কতা সত্ত্বেও ছাপার ভুল এড়ানো যায় নি।
যাদপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ড অমলেন্দু দে, ডিলিট এই সংস্করণটি আগাগোড়া দেখে এবং বইটিকে আরও কিভাবে ভাল করা যায় সেই পরামর্শ দিয়ে আমায় কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছেন। শ্রী ফণীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এমএ এরাটা এবং ইন্ডেক্স তৈরি করে দিয়ে আমায় কৃতজ্ঞ করেছেন।
আমি ধন্যবাদ জানাই রাজেশ পাবলিকেশনের এম এল গুপ্তকে শীঘ্র এবং সুন্দরভাবে ছাপাকর্ম করার জন্যে।
জগদীশ নারায়ণ সরকার
যাদবপুর, কলকাতা ৭৫
(চলবে)