দ্বিতীয় পর্ব
মীর জুমলার কর্ণাটক ভাগ্য
৩। নতুন ব্যবস্থায় মীর জুমলার মনোভাব
তাঁর তৈরি ডাকচৌকির একাংশ দুই রাজ্যের সুলতান ধ্বংস করে দিলেও সংবাদ পাওয়ার সমস্যা ছিল না – তিনি দক্ষিণে তাঁর নিয়ন্ত্রিত এলাকায় আগুন ধরানোর সংবাদগুলো পাচ্ছিলেন। কর্ণাটকের সব ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে মীর জুমলা বদ্ধ পরিকর হলেন। এখন তার বিজিত অঞ্চল মুঘল সাম্রাজ্যের অধীন। কর্ণাটক তাঁর নিজস্ব জায়গির। আমর আগেই দেখেছি, কর্ণাটকে নিজের প্রশাসনিক পকড় আরও গভীর করতে, এবং ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সম্পদ একজায়গায় জড়ো করতে, আওরঙ্গজেবের গোলকুণ্ডা দখলের ডাকে তিনি বহু দেরি করে মুঘল শিবিরে যোগ দিয়েছিলেন। মুঘল সাম্রাজ্যের উজিরের পদে যোগ দেওয়ার পরেও কর্ণাটকের নানান বিষয় তিনি গভীর মনোযোগী হয়ে সমাধান করেছেন। কিন্তু বাস্তবিকভাবে কর্ণাটকের ঘটমান বর্তমান থেকে বহু দূরে দিল্লিতে থেকে দেখতে পাচ্ছিলেন তাঁর পুরোনো শত্রুরা কূটনীতির চালে আর পরস্পরের মধ্যে জোট তৈরি করে দাঁত-নখ শানিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে কর্ণাটক দখলের উদ্দেশ্যে। তাঁর সাধের কর্ণাটক শত্রুরা ছিঁড়েখুঁড়ে খাচ্ছে আর তিনি অসহায় হয়ে দিল্লির দরবারে উজিরগিরি করছেন। সেই মুহূর্তের বাস্তবতায় তাঁর পক্ষে সরাসরি কর্ণাটক দেখভাল সম্ভব নয়। তাঁর প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে জোটবাঁধা শত্রুদের কবল থেকে কর্ণাটককে বাঁচাতে তাঁকে নির্ভর করতে হচ্ছিল আওরঙ্গজেব আর কিছু বিশ্বস্ত কর্মচারীর ওপর। কর্ণাটক এখন মুঘল অঞ্চল। তার অর্থ সেটি মুঘল সেনাবাহিনীর সুরক্ষায় থাকার কথা। কাবিল শাহের স্তোকবাক্যে তাঁর ধারণা হয়েছিল আওরঙ্গজেব কর্ণাটক বাঁচানোর দায়িত্ব বিষয়ে সচেতন। মীর বারবার আওরঙ্গজেবকে তাঁর জায়গির কিভাবে সামলাতে হবে সে বিষয়ে বিশদ নির্দেশনামা পাঠাচ্ছিলেন। বিশেষ করে নিজের হাতে তৈরি করা ডাকচৌকিগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে তিনি অনেক বেশি চিন্তিত হচ্ছিলেন। এগুলি আক্রান্ত হওয়ার পর আওরঙ্গজেবের হাজিবকে নির্দেশ দেন ডাকচৌকিগুলি নতুন করে গড়ে তোলার। আওরঙ্গজেব তাঁর বন্ধুর অনুরোধে সাড়া দিচ্ছিলেন, যদিও কিছু কিছু ঘটনা তাঁর ইচ্ছের বাইরে ঘটছিল, তবুও তিনি মীর জুমলাকে চিন্তা করতে বারণ করলেন। কুতুব শাহের দখলদারি মনোভাব বাড়তে থাকার খবরে মীর জুমলার চিন্তা বাড়ল বই কমল না; তাঁর ক্রমশঃ মনে হচ্ছিল আওরঙ্গজেব তাঁর নির্দেশ মানছেন না। মীর জুমলার জায়গির রক্ষায় তাঁর উৎসাহ কম।
৪। মীর জুমলার সন্দেহ দূর করার উদ্যম নিলেন আওরঙ্গজেব
আগেই বলেছি আওরঙ্গজেব বুঝেছেন, কর্ণাটক বিষয়ে মীর জুমলা বেশ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। শাহী উজিরের মনে তৈরি হওয়া সন্দেহ দূর করতে তাঁকে বেশ গা ঘামাতে হয়েছিল। মীর জুমলা জানেন সন্দেহবাতিক বাবা, শাহজাহান সম্বন্ধে অতীতে আওরঙ্গজেব কড়া মন্তব্য এবং চড়া মনোভাব প্রকাশ করেছেন। কিন্তু কর্ণাটক রক্ষা নিয়ে চিঠিপত্রে শাহেনশার সিদ্ধান্তে সুর নরম করায়, অরঙ্গজেবের উদ্দেশ্য নিয়ে মীর জুমলার সন্দেহ জাগতে শুরু করে। মীর জুমলার মনে হল তাঁকে আশ্বস্ত করার চিঠির ভাষাটিও একই নরম-সরম সমঝোতামূলক ছিল। তিনি মীর জুমলার শত্রুদের প্রতি বিশ্বাসভঙ্গ, পরশ্রীকাতরতা এবং মিথ্যাচারের অভিযোগ আনলেন। শয়তনি পরিকল্পনাকারীদের সক্রিয়তায় কর্ণাটকের কী হাল হয়েছে সে সব কথা তিনি বন্ধুকে বর্ণনা করলেন এবং পরিবেশ শান্ত রাখতে তাঁকে কোন কোন পদক্ষেপ করতে হয়েছে তাও বললেন। বন্ধুর উদ্বেগ নিরসন করতে তিনি গোয়েন্দা সমীক্ষা, আমলাদের ক্ষেত্র সমীক্ষা এবং অন্যান্য শুভচিন্তকদের দেওয়া অভিযোগপত্র এবং সম্রাটকে পাঠানো তাঁর আবেদনপত্রজুড়ে মীর জুমলাকে একটা বিস্তৃত চিঠি লিখলেন। ১৬৫৬-র আগস্ট মাসে উজির মীর জুমলাকে কর্ণাটক নিয়ে তাঁর পদক্ষেপের প্রতি আস্থা পেশ করতে বলে লিখলেন, ‘সাম্রাজ্যিক সমস্ত কাজে চিন্তামুক্তভাবে জুড়ে থাক,/ভেবোনা আমি তোমার ভাল চাই না। (কবিতা) তুমি সকলের হৃদয়ে রয়েছ। /কেউ তোমার সমকক্ষ নয়।’
চিঠিগুলোতে তিনি লিখছেন, কীভাবে সম্রাট তাঁর ওপর চরম অবিশ্বাস করা সত্ত্বেও মন দিয়ে সাম্রাজ্য সেবা করে চলেছেন। নানান শর্তে তাঁর হাত বাঁধা থাকা সত্ত্বেও তিনি কিভাবে সদা সতর্ক হয়ে, সুচারুরূপে কর্ণাটকে সেনার পরিমান বাড়ানো, কিলাদার এবং সীমান্তে থাকা সেনানায়কদের দায়-দায়িত্ব পালন, তাদের সদা সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। উজিরকে মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি কোনভাবেই জায়গিরের ব্যবস্থাপনায় ঢিলে দিচ্ছেন না। তাঁর শত্রুদের আক্রমণকে তিনি কোনওভাবেই ছোট করে দেখছেন না। তাঁর যতটুকু পদক্ষেপ নেওয়ার ছিল, নিচ্ছেন।
৫। মীর জুমলার কর্ণাটক বাঁচানোয় আওরঙ্গজেবের পদক্ষেপ সমূহ
বাস্তবে, মীর জুমলার অনুপস্থিতিতে কর্ণাটকে যে দুর্যোগের পরিবেশ তৈরি হয়েছে তাকে সামলাতে যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করেছেন বন্ধু আওরঙ্গজেব, সে তথ্যটা সত্য। তিনি গোলকুণ্ডার মুঘল হাজিব, কাবাদ বেগকে হায়দারাবাদ এবং সিদ্ধাউতের মধ্যের এলাকায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া ডাকচৌকিগুলো নতুন করে তৈরি করে দেওয়ার প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়েছেন; দেওয়ান মুর্শিদকুলি খান, প্রবীন আমলা মহম্মদ তাহিরকে নির্দেশ দিয়েছেন তুইউলদারদের আওতায় থাকা গোমস্তাদের বকেয়া কাজগুলি সম্পাদনে সচেতন করে দেওয়ার জন্যে; আগ্রাসী সুলতানকে সরাসরি জানিয়েছেন কোনভাবেই বর্তমান রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা ভাঙা যাবে না; মীর জুমলা দিল্লি না পৌছনো পর্যন্ত কোনও প্রশাসনিক রদবদল এবং ডাকচৌকির ওপর হামলা প্রশ্রয় দেওয়া হবে না; সম্রাটের ফরমান ছাড়া সুলতানের কর্ণাটক দখল করা শুধু হঠকারী পদক্ষেপ তাই নয় অপরিণামদর্শী কাজ বলেও তিনি আক্রমকণকারীদের হুঁশিয়ারি দিলেন। যদি মুঘল সাম্রাজ্যের নতুন প্রভাবশালী উজির মীর জুমলা তাঁর বিরুদ্ধে সম্রাটের কানে অভিযোগ তোলেন, তাহলে কর্ণাটকে আগুণ জ্বলতে পারে। তিনি সুলতানকে হুঁশিয়ারি দিলেন কর্ণাটক সীমান্ত থেকে সেনাবাহিনী সরিয়ে নেওয়ার জন্যে আর সম্রাটের নির্দেশের জন্যে অপেক্ষা করতে।
বারংবার আওরঙ্গজেবের হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও দারার উস্কানিতে ডাকচৌকির ওপর হামলা বন্ধ হল না এবং সীমান্ত থেকে সেনা প্রধান আবদুল জব্বারকে সরিয়েও নেওয়া হল না। আওরঙ্গজেব মীর জুমলাকে বিষয়ের বাস্তবতাগুলো জানালেন। মীর জুমলা এই বিষয়গুলো সরাসরি সম্রাটের সামনে অকুতোভয়ে উপস্থিত করলেন। সম্রাটের নির্দেশক্রমে আওরঙ্গজেব সুলতানকে জানালেন, মহালগুলির প্রশাসনে কয়েকজনকেমাত্র রেখে তিনি যেন আবদুল জব্বারকে সীমান্ত থেকে তুলে নেন এবং ইসমাইল বেগের নেতৃত্বে বাহিনী পাঠিয়ে ডাকচৌকিগুলি সারানোর ব্যবস্থা করেন। মীর জুমলা সম্রাটের কাছে আর্জি পেশ করে বললেন, মহম্মদ শরিফকে হায়দ্রাবাদে পাঠিয়ে ডাকচৌকিগুলি সারাবার ব্যবস্থা করারার নির্দেশ জারি করতে আর আওরঙ্গজেবকে অনুরোধ করলেন তাঁর দূত মার্ফত সুলতানকে এবিষয়ে চিঠি পাঠাতে। নিজের লেখা চিঠি এবং মহম্মদ শরিফ মার্ফত (আগস্ট ১৬৫৬) আওরঙ্গজেব সুলতানকে হুঁশিয়ারি দিলেন যাতে তিনি সম্রাটের পাঠানো ফরমান অবজ্ঞা না করেন। উদ্বিগ্ন মীর জুমলা কাবাদ বেগকে ডাকচৌকি সারানোর কাজে দেরি হওয়ায় জন্যে দোষী ঠাওরালেন। নানান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নির্দেশ অমান্য করা অযত্ন, অদক্ষ এবং দীর্ঘসূত্রী মনোভাবের জন্য তাঁকে দায়ি করলেন। মীর জুমলার অনুরোধে আওরঙ্গজেব কাবাদ এবং তাঁর হিন্দু বন্ধুদের শাস্তির ব্যবস্থা করলেন যাতে এই উদাহরণে সংশ্লিষ্টদের চৈতন্য হয়। তাঁকে হাজিবের পদ থেকে সরিয়ে আহমদ বেগকে নিয়োগ করা হল এই মনোভাবে যে নতুন পদাধিকারিক হিসেবে তিনি যথাযথভাবে নির্দেশ পালন করবেন এবং ঘটনাবলী আর সুলতানের মনোভাব আর চাহিদা সম্বন্ধে সম্রাটকে যথাযথ এবং তথ্যসন্ধানী সমীক্ষা পাঠাবেন। ১৬৫৬র শেষের দিকে আওরঙ্গজেব নির্দেশনামা জারি করে বললেন খানের (মুয়াজ্জম খান, মীর জুমলা) নামে হায়দারাবাদ থেকে কর্ণাটকের মধ্যে যে ক’টি ডাকচৌকি রয়েছে সেগুলি ঠিকঠাক পরিচালনা এবং সুরক্ষা দিতে সরাসরি সাম্রাজ্যের সেবায় অন্তর্ভূক্ত করা হল (সরকার-ই-জাহানমদার) এবং কুতুব শাহকে এ বিষয়ে গড়বড় না করতে হুঁশিয়ারি দিলেন।
কাম্বামের ব্যাপারটা আওরঙ্গজেব সমাধান করতে গেলে নিজের জামাই মার্ফত আওরঙ্গজেবকে সুলতান অনুরোধ পাঠিয়ে বলেন সেখানে যেন তিনি ইসমাইল বেগকে না পাঠান। শাহজাদা এই চিঠিটা আওরঙ্গজেবকে পাঠিয়ে দিলেন কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে শ্বশুরকে হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়ে রাখলেন ‘তাঁর শয়তানি অযত্নের ফল তিনি পাচ্ছেন এবং তাঁর ফলে কর্ণাটকে যদি কোন সমস্যা তৈরি হয় বা গোলযোগ শুরু হয়, তাহলে তাঁর ফল ভোগ করবে আপনার উত্তরাধিকারী (তাজালউল কাওয়াঈদ উইলিয়ত মাউরুসি)’ ।
আওরঙ্গজেব, সুলতানের হিন্দু বিদ্রোহে উসকানি দেওয়া নিয়ে তোব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বললেন, ‘এই বিদ্রোহের কী কারণ আমি বুঝতে পারছি না, যার ফল শুধুই ক্ষতি। তুমি আর তোমার জমিদারেরা এই অব্যবস্থা থেকে কী লাভ করলে আমায় বুঝিয়ে দাও। জমিদারদের সতর্ক করে চিঠি লেখ, তোমার আধিকারিকদের তুলে নাও, নাহলে… তুমি লজ্জায় নিজের দাঁতে নিজের আঙুল কাটতে বাধ্য হবে।’ কর্ণাটকের জায়গির মীর জুমলার হাতে দেওয়া দেওয়ার শাহী সংবাদে আওরঙ্গজেব, হাজি শফি মার্ফত প্রত্যেককে, বিশেষ করে জমিদারদের, কর্ণাটকে থাকা তাদের সেনাপতিদের, সেখানকার মুঘল আধিকারিকদের (কাজি মহম্মদ হাশিম, কৃষ্ণা এবং খাজা মহম্মদ আরিফ কাবাদ বেগ হাজিব) এবং কুতুব শাহকে বিশদ বিবরণ আর হুঁশিয়ারি দিয়ে চিঠি লিখলেন। বিশেষ করে রয়ালকে লেখা চিঠিতে ভয় এবং আশার (বিম ও উমিদ) কথা বললেন। কাজি মহম্মদ হাশিম, কৃষ্ণা এবং অন্যান্যদের নেতৃত্বে একটি মুঘল বাহিনী সিদ্ধাউতে গিয়ে আবদুল জাব্বারকে পরাজিত করল। কিছু দিনের জন্য হতাশায় এবং ক্ষতিতে সুলতান নিজেকে সংযত রাখলেন। ডাকচৌকি পুরোনো দিনের মত কাজ করতে লাগল।
১৬৫৬-র শেষের দিকে আওরঙ্গজেব কুতুব শাহকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বললেন তিনি যদি জমিদারদের উস্কানি দেওয়া বন্ধ না করেন, এবং দখল করা সাম্রাজ্য-নিয়ন্ত্রিত মহাল থেকে তাঁর সেনা তুলে না নেন, এবং এই কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত কামগার বেগের হাতে (প্রশাসনের ভার) তুলে না দেন তাহলে তিনি বাধ্য হবে কুতুব শাহের গোলকুণ্ডা রাজ্য দখলের অভিযান শুরু করার। মহালগুলির যত রাজস্ব সুলতান তুলেছেন সেগুলি হস্তান্তর করা নিয়ে কামগারের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতেও নির্দেশ দিলেন।
বীজাপুরের বিষয়ে ২১ জুন ১৬৫৬ তারিখের সুলতানের কাজকর্ম বিষয়ে উল্লেখ করে মীর জুমলার চিঠি হাতে পাওয়ার অনেক আগেই আওরঙ্গজেব মালুজি আর তাঁর ভাইকে নিজের দেহরক্ষী নিয়োগ করলেন। মাথায় রাখা দরকার মালুজির ভাই জিঞ্জি দখলে কিলাদারের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিল এবং মীর জুমলা তাঁকে স্বয়ং সাম্রাজ্যের কাজে নিয়োগ করারও সুপারিশ করেছিলেন। আওরঙ্গজেব বুঝলেন দিল্লির দরবারে বীজাপুরের বিরুদ্ধে আনা কোন আভিযোগ টিঁকবে না, তিনি মীর জুমলাকে সাংকেতিক ভাষায় চিঠি লিখতে বললেন। বীজাপুরের সুলতানকে মুঘল হাজিব মার্ফত হুমকি দিলেন।
আওরঙ্গজেব মীর জুমলার আধিকৃত কর্ণাটকে দক্ষিণের বিভিন্ন ক্ষমতাবানের দখলদারি আভিযান দুভাবে নিয়ন্ত্রণ করছিলেন, ১) তাদের হুমকি চিঠি পাঠিয়ে, ২) কূটনীতি প্রয়োগ করে। মীর জুমলার নির্দেশে শাহজী ভোঁসলার সঙ্গে বহু চিঠিচাপাটি আদান প্রদান করে তাঁকে আলাপ আলোচনার গতিপ্রকৃতি জানিয়ে রাখছিলেন। কর্ণাটক রক্ষায় সুলতান আর দারার যৌথ চক্রান্ত রুখতে শাহজীর সাহায্যের বদলে তিনি তাঁকে বিশেষ কিছু সুবিধে দিয়েছিলেন। ভবিষ্যতে পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে, হিন্দু বিদ্রোহ রুখতে শাহজীকে চিঠি লিখলেন আওরঙ্গজেব। প্রয়োজনে তিনি মীর জুমলাকেও চিঠি লিখতে অনুরোধ করে বললেন সম্রাটের কাছে আদিল শাহের বাহিনীর ওপর আক্রমণের ছক বিষয়ে শাহজীর যে আবেদনটি বেকার পড়ে রয়েছে সেই পরিকল্পনার ভাগ্য কী দাঁড়াল সেটা তাঁকে জানানো হোক। তাঁর চিঠিটি শেষ হচ্ছে, ‘আদিল শাহের মত অবিশ্বাসী মানুষের ওপর আঘাত হানার প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে সে বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র মাথা ব্যথা নেই, বরং এটিকে অতীব প্রয়োজনীয় কাজ বলে আমি মনে করি। (কবিতা) তোমার যা ভাল, আমারও ভাল তাই।’
৬। আওরঙ্গজেবের প্রতি মীর জুমলার যুক্তিহীন অবিশ্বাস
মীর জুমলার জায়গির কর্ণাটক বাঁচাতে আওরঙ্গজেব কী কী ভূমিকা নিয়েছিলেন, সে সম্বন্ধে আওরঙ্গজেবের মুনসি কাবিল খানের চিঠিতে যে অসাধারণ বর্ণনা যে বিন্দুমাত্র আওরঙ্গজেব স্তাবকতা নয়, চিঠিটার বর্ণনা পড়লে পাঠকের মালুম হবে। চিঠি থেকে প্রমান হয় কর্ণাটককে ঘিরে সামরিক সুরক্ষা বলয় তৈরি করার প্রশংসা আওরঙ্গজেবের প্রাপ্য। নানান তথ্যের সমাহারে আমরা দেখতে পাচ্ছি, আওরঙ্গজেব কর্ণাটক বাঁচাতে নিজের বিচারবুদ্ধিমত উদ্যোগ নিয়েছিলেন আর কিছু মীর জুমলার পরামর্শক্রমে পদক্ষেপ করেছিলেন। প্রত্যেকটি পদক্ষেপের যুক্তি বর্ণনা করে মৃদুভাষায় যে সব চিঠি আওরঙ্গজেব আর তাঁর মুনসি, মীর জুমলাকে লিখেছেন, তাতে প্রমান হয় যে মীর জুমলার দখল করা কর্ণাটক ভূখণ্ড রক্ষায় আওরঙ্গজেব যথেষ্ট আন্তরিক ছিলেন; তাই তাঁর প্রতি মীর জুমলার সন্দেহ শুধু ভিত্তিহীন ছিল তাই নয়, আওরঙ্গজেব যে দুরবস্থার মধ্যে থেকেও সেই নিরাপত্তাবিধানের কাজটি করেছিলেন, সেই সম্মানটুকু আওরঙ্গজেবের মীর জুমলার থেকে প্রাপ্য ছিল। দূরে বসে খবর পাওয়ার দেরিতে মীর জুমলার মনে ক্ষোভ জমেছে এই সঙ্গত অভিযোগ করাই যায়, বিশেষ করে যেভাবে সুলতানি আক্রমণ ডাকচৌকিগুলির ওপরে নেমে আসছিল, সেই সংবাদ পাওয়ার পর দূর দিল্লিতে বসে তাঁর পক্ষে মাথা ঠাণ্ডা রাখা খুব কঠিন ছিল ঠিকই — কিন্তু আওরঙ্গজেবের ওপর মীর জুমলার অবিশ্বাস যে খুব একটা ন্যয়সঙ্গত এ কথা আমরা আজ আর বলতে পারব না। কর্ণাটকে যে সব ঘটনা ঘটেছিল, সে সব কিন্তু দিল্লিস্থ সম্রাট আর তাঁর উজিরের কাজকর্মের নীতিতেই ঘটছিল। দুজনেই চেয়েছিলেন এলাকায় থাকা আওরঙ্গজেব কর্ণাটকের নিরাপত্তায় দায়িত্ব নিন। কিন্তু অকুস্থলে দাঁড়িয়ে আওরঙ্গজেব যে রণনীতি আর কূটনীতি অনুসরণ করেছিলেন, সে সব ছিল তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের ফল। সেগুলি ক্ষতস্থান হয়ত উপশম করে কিন্তু আরোগ্য করে না – কারণ আরোগ্যের দাওয়াই দখনের সুবাদারের হাতে ছিল না। আওরঙ্গজেবের হাতে প্রয়োজনীয় সেনাবাহিনীর জোর ছিল না, যথেষ্ট সেনা রাখার অনুমতি ছিল না, দরবার নিরপেক্ষ হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার যথেষ্ট ক্ষমতা ছিল না। একটা বিষয় পরিষ্কার, মীর জুমলা কর্ণাটক থেকে চলে যাওয়ার পর সেখানকার শাহী বাহিনীর পরিমান কমিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়াও বহু ঘটনা তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে গিয়েছিল। যেমন এর আগে আমরা দেখেছি, দারার উচ্চাশা পুরণের গোপন চক্রান্তের ফলে কুতুব শাহের গোঁ বাড়ছিল এবং আওরঙ্গজেবের হুমকিকে বারংবার উপেক্ষা করতে জোর দিচ্ছিল এবং পরোক্ষে তাঁকে অপমানও করছিলেন। দারার উতসাহে এবং তাঁকে খুঁটি হিসেবে ব্যবহার করে দুই দক্ষিণী সুলতানই আওরঙ্গজেবের হুঁশিয়ারি প্রকাশ্যে অমান্য করার সাহস পায়। দরবারের কাজকর্মে তারা বুঝতে পারছিল আওরঙ্গজেবের ওপর শাহেনশা পুরোপুরি বিশ্বাস করেন না। সম্রাট আওরঙ্গজেবের থেকে বার বার জবাবদিহি চেয়ে পাঠাচ্ছেন এমন গুজবও কৌশলে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল দুই সুলতানের পক্ষ থেকে। আওরঙ্গজেব প্রকাশ্যেই মীর জুমলাকে বলেছিলেন সম্রাটকে বলা বা লিখে জানানো বক্তব্যের প্রভাব পড়ছে না। তিনি উজিরকে বলেন ডাকচৌকিগুলি ঠিকঠাক কাজ করা মুশকিল কেননা, ইন্দৌর আর বুরহানপুরের জায়গিরের মধ্যেকার ডাকচৌকিগুলির কর্মীরা কোনও অজানা কারনে মন দিয়ে কাজ করছে না। (চলবে)