দ্বিতীয় পর্ব
মীর জুমলার কর্ণাটক ভাগ্য
৭। গোলকুণ্ডা আক্রমণের দ্বিতীয় পরিকল্পনায় বাধ সাধলেন মীর জুমলা
১৬৫৬র মাঝের দিকে মীর জুমলার মনে কর্ণাটক এবং তাঁকে নিয়ে মীর জুমলার স্বার্থ না দেখার যে সব রটনা ছিল সে সব দূর করার উদ্যম নিলেন আওরঙ্গজেব। তাঁর অবস্থান ছিল সমস্যা সমাধানের সূত্র আসতে হবে দিল্লি থেকেই। দক্ষিণের সুবাদারের ইচ্ছে ছিল যে এই বিষয়ে মীর জুমলা সম্রাটের সামনে তাঁর রাজনীতি যথাযথভাবে উপস্থাপন করুক, যাতে তিনি দুই সুলতানকে চিঠি লিখে তাদের শয়তানি কাজকর্মে দাঁড়ি টানতে বাধ্য করেন। কিন্তু ক্রমশঃ তিনি বুঝতে পারছিলেন দক্ষিণের অবস্থা শুধু হুমকি জারি করে সামলানো যাবে না, প্রয়োজন ছিল সরাসরি মেঠো রণনীতির। তিনি সুলতানি রাজ্য আক্রমণের রাস্তা অবলম্বন করার পক্ষপাতী ছিলেন। দারার চক্রান্ত আর উস্কানি রুখতে সুলতানি রাজ্য দুটিকে আক্রমন করার প্রস্তাব মীর জুমলাকে পাঠালেন ‘তুমি যদি মনে কর যে আমি তোমার কাজে অবহেলা করছি, তাহলে আমি বলব তোমারও মনে রাখা উচিত এই দুর্বিসহ অবস্থা থেকে উত্তরণের একটা দায় সম্রাটের ওপরও বর্তায়, যাতে কর্ণাটক বিষয়ে (নীতি গ্রহণে) ত্রুটি না থেকে যায়’। তিনি আবারও বললেন, ‘তুমি গোলকুণ্ডার অবস্থা ভালভাবেই জান। এই বিষয়ের তদ্বির নির্ভর করছে সম্রাটের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর, এবং আশা করব, তুমি বিষয়টি তাঁর সামনে এমনভাবে উপস্থিত করবে যাতে কর্ণাটক বিষয়ে যারা লোভ করছে তাদের বিচ্ছিন্ন ও নির্বিষ করে দেওয়া যায়’। আওরঙ্গজেব কোনও দিনই আতঙ্ক তৈরি করার মত বক্তব্য পেশ করা মানুষ ছিলেন না — তিনি সোজা কথা সোজা ভাবেই বলতেন। কিন্তু, মনে রাখা দরকার হিন্দু বিদ্রোহ দমন করতে, তিনি চেয়েছিলেন দিল্লির বাহিনী এসে যেন ‘আমাদের কাজ’ হিসেবে কর্ণাটকের সামনে চোখ রাঙিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আবদুল জব্বারের নেতৃত্বে কুতুব শাহী বাহিনীকে হঠিয়ে দেয়, কেননা ‘এখন আর শুধু চোখ রাঙ্গানি, হুমকি দেওয়ায় কাজ হচ্ছে না’। ঘটনা ক্রমশঃ পেকে উঠতে শুরুল। মুঘল দূত হাজি শফি কোনও রকমে প্রাণ বাঁচিয়ে কর্ণাটক থেকে বহু কষ্টে পালিয়ে এলেন। সে সময় আওরঙ্গজেব সরাসরি মীর জুমলাকে প্রস্তাব দিলেন খুব দেরি হয়ে যাওয়ার আগে অন্তত একবারও তিনি সম্রাটের অনুমতি নিয়ে দাক্ষিণে আসতে – ‘দিনের পর দিন অবস্থা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, তুমি যা ভাল মনে কর, কর। তুমি যদি অবস্থা সামলাতে চাও তাহলে তাড়াতাড়ি এস, যাতে আমরা দুজন হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করতে পারি। ভবিষ্যতে ঘটনার নিয়ন্ত্রণের রাশ হাত থেকে বেরিয়ে গেলে কিন্তু কোনও উদ্যমই যথেষ্ট বলে প্রমাণিত হবে না। আমি জানি তুমি কত বড় সেবা কার্যে জড়িয়ে আছ, তোমার জ্ঞান প্রজ্ঞা দূরদৃষ্টি অতুলনীয়; তাই তাড়াতাড়ি বিষয়টাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পরিকল্পনা প্রস্তুত কর, অমনযোগী হয়ো না’।
শেষ পর্যন্ত আওরঙ্গজেব কুতুব শাহী রাজত্ব উচ্ছেদের লক্ষ্যে মনস্থির করে, শাহী বাহিনী নিয়ে দিল্লি থেকে দক্ষিণে সামরিক অভিযান করার প্রস্তাব দিলেন মীর জুমলাকে – ‘সুলতানের বিধ্বংসী মনোভাব আর তাকে ঘিরে থাকা বোকা মাথামোটা মানুষের চক্রান্তের কথা তোমার অজানা নেই। এই জন্যই আমি কুতুবউলমুলককে উচ্ছেদ করতে চাই এবং আমি চাই না তাঁকে ক্ষমতায় রাখার প্রস্তাব আমাকে কেউ দিক। কর্ণাটকের ভবিষ্যতের দিকে লক্ষ্য রেখে এবং বর্তমানের সময় সারণী দেখে আমার মনে হয়েছে, কাজটা ফেলে রাখা যাবে না, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সমাধা করতে হবে। বিষয়টা সুলতানকে পাঠানো চিঠিতে বিশদে বলা হয়েছে, এবং চিঠির বিষয়টি তুমি নিশ্চই সম্রাটকে বোঝাবে এবং দেখবে এটিকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাস্তবে রূপায়িত করা যায়, এবং দেরি না করে ফরমান জারি করানোর ব্যবস্থা করবে।’ দাক্ষিণে তিনি শাহী বাহিনী বাড়াবার প্রস্তাব দিয়ে বললেন প্রয়োজনে কাজি মহম্মদ হাসিমের নেতৃত্বে একটি বাহিনী যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কর্ণাটকে পাঠাবার ব্যবস্থা করা হোক।
আশ্চর্যের হল, আওরঙ্গজেব সরাসরি মীর জুমলাকে দাক্ষিণের জরুরি সামরিক অভিযানে নেতৃত্ব দিতে অনুরোধ করছেন। তিনি দক্ষিণে ঘটেচলা ঘটমান বর্তমান পরিষ্কার করে মীর জুমলার সামনে পেশ করলেন — (১) সুলতানেরা সাম্রাজ্যের নির্দেশিকা সুবাদারি নিশান এবং সুবাদারের হুঁশিয়ারি অমান্য এবং উপেক্ষা করেছেন, (২) সুলতান হিন্দু রাজা জমিদারদের উষ্কানি দিয়েছেন যাতে তারা বিদ্রোহ করে, (৩) বীজাপুরের সহায়তায় একটা বড় ধরণের সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা করছে সুলতান, এবং (৪) এই ছোট বাহিনী নিয়ে তাঁর পক্ষে মীর জুমলার জায়গির বাঁচানো মুশকিল। মীর জুমলাকে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, হয় তিনি সম্রাটকে রাজি করিয়ে আওরঙ্গজেবের সামরিক অভিযানের অনুমতি নিন, না হয় তাঁর ১২ বছরের শ্রমের ফল দখল রাখার কথা মন থেকে মুছে ফেলুন। দাক্ষিণের অবস্থা এবং সেই সমস্যার সমাধান সম্পর্কে এক মত হয়েও দুজন উচ্চপদস্থ আমলা উদ্দেশ্যর কাঙ্ক্ষিত বিধেয় বিষয়ে এক মত হতে পারলেন না। আওরঙ্গজেব চাইলেন মীর জুমলা কর্ণাটকের রাজনীতিতে মাথা ঢুকিয়ে, তাদের পদের ওজন ব্যবহার করে দাক্ষিণের চালু সমস্যার সমাধান করুণ, আর মীর জুমলা চাইলেন এই কাজটা শুরু হোক বীজাপুর আক্রমণ দিয়ে। এই নিয়ে দুজনের মধ্যে তীব্র মত বিরোধ দেখা দিল। উজির দিল্লিতে বসে বুঝতে পারছিলেন না কেন আওরঙ্গজেব তাঁর প্রস্তাবে দ্বিধান্বিত হচ্ছেন, সাড়া দিচ্ছেন না। আওরঙ্গজেব জানালেন তিনি অতীতে বারংবার উজিরের প্রস্তাবমতই কাজ করেছেন — ‘কেন তুমি এই অবস্থায় এই পরিস্থিতিতে আমার অবহেলা দেখছ, যার মূল্য অঙ্কের খাতায় ধরে না? আর এই দেশটার নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতের বাইরে বেরিয়ে যাক, আমাদের শত্রুরা উৎসাহিত হয়ে আমাদের নিয়ে মৃত্যুমিছিল করুক সেই পরিকল্পনায় আমি কী করে সায় দেব? সর্বশক্তিমান না চান, এই চিন্তা আমার মন কুরে কুরে খাচ্ছে। অবাক হয়ে যাচ্ছি তুমি একে বাধ্যতা হিসেবে ধরে নিলে’।
কর্ণাটকের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, এই প্রশ্নে শাহী শিবিরেই সুবাদার-উজিরের মধ্যে খাড়াখাড়ি বিভাজন এবং শাহী শিবিরের দক্ষিণে সামরিক অভিযানের সম্ভাব্যতায় যখন সারা দাক্ষিণ উত্তাল, বীজাপুরি সুলতানের হঠাত মৃত্যু দক্ষিণের রাজনীতিতে নতুন বাঁকের সৃষ্টি করল। বীজাপুর হয়ে উঠল আপাতত সর্বভারতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু।
৮। ১৬৫৭-৫৮ সালে বীজাপুর আক্রমণের সময় কর্ণাটক
বীজাপুর আক্রমনে মানসিকভাবে প্রস্তুত হলেন মীর জুমলা। কর্ণাটকে হিন্দুদের জোরালো প্রভাবশালী বিদ্রোহ দমন করতে তিনি সম্রাটকে বাধ্য করলেন বেটুল রাজ্যের অন্তঃপাতি বীর পরগণার শাহ বেগ খানকে, দক্ষিণ অভিযানে তাঁর সামরিক সহায়ক হিসেবে ঘোষণা করতে। একই সঙ্গে মীর জুমলাকে আক্রমণের জন্যে দক্ষিণে পাঠানো হচ্ছে, সম্রাটের মাধ্যমে এই বার্তা ছড়িয়ে দিয়ে তিনি দক্ষিণী সুলতানদের রক্ষণাত্মক খোলসে ঢুকিয়ে অতিরিক্ত ভয়ের পরিবেশ তৈরি করারও ব্যবস্থা করলেন। মীর জুমলার প্ররোচনায়, দক্ষিণের সুভাদার আওরঙ্গজেব বড় বাহিনী তৈরির কাজে সময় নষ্ট না করে, তক্ষুণি হাতে যে বাহিনী ছিল (৫০০০ ঘোড়সওয়ার) সে সব নিয়ে শাহ বেগ খানকে অভিযানের নির্দেশ দিলেন এবং রাস্তায় মীর জুমলার গোমস্তা কাজি মহম্মদ মহসিনের বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিতে নির্দেশ দিলেন। ১৬৫৬-র ৩০ নভেম্বর সরফরাজ খান, যদু রায় আর তাঁর ভাই, জওহর খান, উদাচরম, শাহ বেগ রওনা হয়ে বীর হয়ে ইন্দৌরে পৌছলেন ১৫ ডিসেম্বর। কুতুব শাহের রাজত্ব এলাকার রায়তদের ওপর লুঠ চাপিয়ে আর মীর জুমলার প্রশাসনিক এলাকাগুলিতে রায়তদের ক্ষতি না করে মূল গন্তব্যের দিকে রওনা হল যুক্ত শাহী বাহিনী। উদ্বিগ্ন উজিরকে শান্ত করতে আওরঙ্গজেব তাঁকে কাজির স্বাক্ষরওয়ালা শেষতম মূল নথিপত্র [ডেসপ্যাচ] এবং তাঁর সঙ্গে শাহ বেগ খানকে পাঠানো তাঁর নিজের নির্দেশনামাটি জুড়ে পাঠালেন। এতে শাহ বেগ খানের কর্ণাটকে পৌছবার তারিখ ছিল ৭ জানুয়ারি, ১৭৫৭।
শাহ বেগের অভিযান কার্যকর প্রমাননিত হল। আবদুল জাব্বার হায়দ্রাবাদ রক্ষায় বাধ্য হয়ে পিছিয়ে এলেন। আওরঙ্গজেবের রাজনৈতিক চালে অকম্মা হয়ে যাওয়া অভিশপ্ত রয়াল এবং অন্যান্য বিদ্রোহী জমিদার মীর জুমলার কর্ণাটক থেকে বীজাপুরী কর্ণাটকে পালিয়ে গেলেন।
কয়েকটি বিতর্কিত মহালের রাজস্ব তোলা নিয়ে কুতুব শাহ আর মীর জুমলার আধিকারিকদের মধ্যে ঝগড়া, সীমান্ত গোলযোগ পর্যন্ত পৌঁছল। সুলতান সম্রাটকে অভিযোগ করে বললেন, মীর জুমলা হয় তাঁকে প্রতিশ্রুত বছরে দেয় ৪ লাখ হুণ (কুড়ি লাখ টাকা) দিন, না হয় সম্রাট তাঁকে এল্লোর আর রাজামুন্দ্রির মত কৃষ্ণার দক্ষিণ অঞ্চলের তাঁর জায়গির থেকে বকেয়া উদ্ধার করতে অনুমতি করুণ।
মীর জুমলা তখন দিল্লিতে বীজাপুর আভিযানে সম্রাটের অনুমতি নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তিনি সম্রাটকে (২৬ নভেম্বর ১৬৫৬) উদ্ধার করা উপযুক্ত পেশকাশের মধ্যে ১৫ লক্ষ টাকা, ৯ তাং (২৬ রতি বা ২১৬ সুর্খ) ওজনের বড় হিরে (যার দাম ২,১৬,০০০ টাকা) সহ অন্যান্য দামি গয়না, চারটি সোনা আর রূপার শিকলিতে মোড়া ২০টা হাতি উপহার দিলেন। সম্রাট সুলতানের উত্তরাধিকারীদের মীর জুমলা নিয়ন্ত্রিত জায়গির এলাকায় হাত না বাড়িয়ে উদয়গিরি কেল্লা দখল রাখতে নির্দেশ দিলেন। সম্রাট সুলতানের উত্তরাধিকারীদের লিখলেন, ‘কর্ণাটকে প্রচুর হিরের খনি রয়েছে… (মুয়াজ্জম) খান আমাকে সেই খনির একটি ৯ তাংএর বড় হিরে উপহার দিয়েছে… তুমি আমায় এ ধরণের পেশকাশ বা উপহার দাও নি। ফলে ঐ এলাকার দায়িত্ব আমি মীর জুমলাকেই দিলাম… তুমি কর্ণাটক আর তাঁর খনিগুলির ওপর তোমার দাবি তুলে নাও। অনভিজ্ঞ মানুষের পক্ষে আদিল শাহ এবং অন্যান্য অবিশ্বাসীর হাত থেকে ঐ এলাকা রক্ষা করা সম্ভব নয়।’ ঠিক হল সম্রাটের নির্দেশ অমান্য করা হলে মুহম্মদ আমিন খান বড় বাহিনী নিয়ে কর্ণাটকের জমদারদের হাত থেকে পিতা মীর জুমলার কর্ণাটক জায়গির রক্ষা করবেন, প্রয়োজনে নতুন যে সব দেশ তিনি দখল নেবেন, সেই সবের অধিকার তাঁর হবে।
সম্রাটের আদেশে সন্তুষ্ট না হয়ে বীজাপুর অভিযানের সুযোগ নিয়ে কুতুব শাহ নতুন করে কর্ণাটক দখলের পরিকল্পনা তৈরি করলেন। তিনি আওরঙ্গজেবকে বললেন মীর জুমলার কিছু আধিকারিক কুতুব শাহী কাম্বাম এবং উদগির দখল করার চেষ্টা করছে এবং এই এলাকাগুলি সম্রাট মীর জুমলাকে দেওয়ার আগে থেকেই তার অধিকারে ছিল।
আওরঙ্গজেব সতর্ক হয়ে শাহ বেগ খানকে নির্দেশ দিলেন,
১) যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কর্ণাটক পৌঁছন এবং মীরের আদেশের জন্য অপেক্ষা করুন,
২) অভিজ্ঞ সৎ বক্সী ওয়াকিয়ানবিশ আবদুল মাবুদকে বলুন বিবাদ বিষয়ে যথাযথ তদন্ত করে সমীক্ষাপত্র পেশ করতে,
৩) এ বিষয়ে কাজি মহম্মদ হাশিমের সাহায্য নিতে,
৪) আর মীর জুমলার ডাকচৌকিগুলি কর্মক্ষম করতে।
মীর জুমলা আওরঙ্গজেবকে অভিযোগ করলেন কুতুব শাহের আধিকারিকেরা কাম্বাম এবং উদগিরের মধ্যের এলাকা দখল করে নিয়েছে, এবং মীর জুমলার কর্ণাটকের জায়গিরের ১৬০ মাইল ভেতরে তাদের সীমান্ত টেনে নিয়ে এসেছে। এই সংবাদ পেয়ে আওরঙ্গজেব শাহ বেগ খানকে নির্দেশ দিলেন আবদুল মোবাদকে না পাঠিয়ে তাকেই তদন্ত করতে যেতে। যদি মীর জুমলার অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে শাহ বেগ যে শুধু সুলতানের কর্মীদের ভর্তসনা করবেন তাই নয়, তাদের তাড়িয়ে দেবেন এবং দেখবেন যাতে একটাও গ্রামের কোস সুলতানের সীমান্তের ভিতরে না থাকে।
১৬৫৭-র জুলাইতে তদন্ত শেষে দেখা গেল সুলতানের অভিযোগ সর্বৈব মিথ্যা, উদগির তো দূরস্থান, একটাও সুলতানি গ্রাম মীর জুমলার অধিকারে আসে নি। অঞ্চল দখল করতে সুলতান মিথ্যা অভিযোগ সাজিয়েছিলেন এবং সম্রাটের নির্দেশনামা উল্লঙ্ঘন করেছেন। এই সংবাদে আওরঙ্গজেব শাহ বেগকে নির্দেশ দিলেন সুলতানি সেনা কত পরিমান রাজস্ব আদায় করেছে সেই পরিমানটি জানতে এবং উদগির ছাড়া সেই গ্রামগুলিতে মীর জুমলার বাহিনীকে বসিয়ে দিতে এবং উদগীর দূর্গে শুধু কেল্লাদারকে রেখে সুলতানি বাহিনীকে এলাকা ছাড়া করতে।
ইতিমধ্যে শাহজী ভোঁসলে বীজাপুর এবং কর্ণাটকে মুঘল দখলদারির পরিকল্পনায় ব্যস্ত থাকার সুযোগ নিয়ে কুর্ণুলের হাবসি কিলাদার সিদ্দি জৌহরের সঙ্গে জোট বেঁধে কর্ণাটকের কিছু অংশ দখল করেন। মুঘলদের বীজাপুর অভিযানের খবর পেয়ে সিদ্দি তাঁর পাশ থেকে সরে যান এবং শাহজী মীর জুমলার বাহিনীর হাতে একের পর এক অঞ্চল হারাতে থাকেন।
বীজাপুর অভিযান মীর জুমলার কর্ণাটকের ওপর অন্য ধরণের প্রভাব ফেলল – মাদ্রাজের কাছে থাকা তাঁর বাহিনীর কাছে খাদ্য সামগ্রী পৌছনোর কাজে ব্যঘাত ঘটল – সেই এলাকাটি জমিদারেরা নিয়ন্ত্রণ করছিল। মীর জুমলার সেনানায়ক টুপাকি কৃষ্ণাপ্পা নায়ক একটি হঠাত আক্রমণ শানিয়ে রয়ালের লুঠেরা বাহিনীকে পরাস্ত করেন। শাহী গেরিলা আক্রমণে ১০০ বেশি সেনা নিহত হয় নি ঠিকই, কিন্তু হঠাৎ পরাজয় হিন্দু মনোবলে জোর আঘাত হানে। রয়াল এবং তাঁর সাহায্যকারী শাহজী জিঞ্জির কাছে বড় দুর্গ আর্নির দু মাইল ভেতরে ঢুকে যেতে বাধ্য হন। তাঁরা বীজাপুরীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে বাহিনীর মনোবল বাড়াবার চেষ্টা চালালেও, টুপাকির আবার আক্রমণে তাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
কর্ণাটকের অবস্থা কিছুটা উন্নতি ঘটলে আওরঙ্গজেব শাহ বেগ খানকে ফিরে আসতে নির্দেশ দিলেন। তিনি কোক্কানুর এবং তাঁরই নির্দেশে গোরুমকোণ্ডায় কাজি মহম্মদ হাশিম এবং অন্যান্য সেনানায়কের নেতৃত্বে একটি বাহিনী রেখে এলেন।
আওরঙ্গজেবের কর্ণাটকের নীতি এবং কর্ম নির্ধারণে মীর জুমলার ভূমিকা খুব কম ছিল না। আওরঙ্গজেব সংক্রান্ত ব্যাপারে তিনি বাস্তবিকই তীব্র স্নায়ুচাঞ্চল্যে ভুগছিলেন — আমরা আগেই দেখেছি, আওরঙ্গজেবের কর্ণাটকের বিষয়ে কর্মসম্পাদনের আন্তরিকতা নিয়ে তাঁর সন্দেহ অমূলক ছিল। কিন্তু মাথায় রাখতে হবে, তাঁর সেই চাঞ্চল্য স্বাভাবিকও ছিল। অকুস্থলে দাঁড়িয়ে আওরঙ্গজেবকে প্রত্যেক (দুঃ)ঘটনায় নতুন নতুন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। আওরঙ্গজেব উজিরকে নিয়ে কিছুটা শঙ্কিতই ছিলেন, কিন্তু তাঁর প্রস্তাব বাস্তবের মাটিতে রূপায়িত করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধান্বিত হননি। মীর জুমলা তাঁকে প্রয়োজনীয় কূটনীতি (যেমন শাহজীরর সঙ্গে সম্পর্ক) এবং সেনাবাহিনী কিভাবে যাবে, আধিকারিকদের কোথায় বদলি করতে বা শাস্তি দিতে (যেমন কাবাদ বেগ) হবে, সেসব বিষয়ে নিয়ত নির্দেশ দিতেন। যেহেতু প্রত্যেকটার সঙ্গে সম্রাটের নির্দেশ জুড়ে থাকত, ফলে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দক্ষিণের মুঘল সুবাদারের পক্ষে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোন সুযোগ ছিল না, বরং মীর জুমলার প্রত্যেকটি সিদ্ধান্ত বাধ্য হয়ে মেনে নিতে হয়েছিল যাতে সম্রাটের প্রিয়পাত্র মীর জুমলা, সম্রাটের বিশ্বাসের পাত্র দারাকে কোণঠাসা করে তাঁর দক্ষিণে আগ্রাসী নীতি অনুমোদন করিয়ে নিতে পারেন। মীর জুমলার অসীম ধৈর্য, অসম্ভব কূটনৈতিক দক্ষতা এবং যোগ্যতা, ক্ষমতাকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা, দক্ষিণের ভূগোল, সমাজ ইত্যাদি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট জ্ঞান, এবং সব থেকে বড় কথা তাঁর ছিল অসীম সম্পদ ভাণ্ডার — এই সব জড়ো করে তিনি অন্যান্য দক্ষ আধিকারিককে টপকে সম্রাটের দক্ষিণ সংক্রান্ত নীতিকে সদর্থকভাবে প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন। এইসব বিষয় বিবেচনা করে দ্বিধাহীনভাবে বলা যায় ১৬৫৬-৫৭-য় মুঘল সাম্রাজ্যের দক্ষিণ নীতির মূল মাথা ছিলেন মীর জুমলা। (চলবে)