| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলা : জগদীশ নায়ারণ সরকার (২৩নং কিস্তি) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ২৮০ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২২

দ্বিতীয় পর্ব

মীর জুমলার কর্ণাটক ভাগ্য

৯। দিল্লির সিংহাসন দখলের লড়াইএর সময় এবং তাঁর পরের কর্ণাটক

দিল্লির পাদশাহ শাহজাহানের অসুস্থতা জনিত পরিস্থিতিতে উদ্ভুত শাহী ভাইদের মধ্যে সিংহাসন দখলের লড়াইএর শুরুতে মীর জুমলাকে দৌলতাবাদে ছদ্ম-গ্রেফতার করলেন আওরঙ্গজেব, সেই সঙ্গে তাঁর সম্পত্তি এবং গোলাবারুদ অস্ত্রশস্ত্রও ১৬৫৮-র জানুয়ারি মাসে দখল নিতে শুরু করে আওরঙ্গজেবের হয়ে পাদশাহের প্রশাসন। তাঁর কর্ণাটক তালুকও সাম্রাজ্যের পক্ষে দখল করেন আওরঙ্গজেব সরকার। কর্ণাটকের রাজনৈতিক অবস্থার এই তাত্ত্বিক পরিবর্তনটি বুঝেশুনেই করেছিল শাহী সাম্রাজ্য যাতে সেই ভূখণ্ডের যথাযথ আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিধান করা যায়। ফলে ফেব্রুয়ারিতে সিংহাসনে লড়াইএর উদ্দেশ্যে উত্তরের দিকে সৈন্যবাহিনী নিয়ে এগিয়ে চলা আওরঙ্গজেব তাঁর পূর্বের সহৃদয়তার কথা মনে করিয়ে দিয়ে কুতুব শাহকে হুঁশিয়ারি দিয়ে লিখলেন, তাঁর প্রশাসন যেন মানুষজনকে হেনস্থা না করে, কৃষকদের দুর্দশায় না ফেলে, এবং মুঘল সেনা বাহিনীর অবর্তমানে কর্ণাটকে গোলযোগ তৈরি করার চেষ্টা না করে। আওরঙ্গজেব লিখলেন, সুলতান যেন কর্ণাটকের প্রশাসন তত্ত্ব তাত্ত্বিক অবস্থা থেকে সহজেই প্রায়োগিকতার স্তরে পৌঁছতে পারে, সেই চেষ্টা যেন করেন। সুলতানের সঙ্গে বন্ধুত্বেরর কড়ার করে তিনি লিখলেন, রুঢভাষী এবং দুর্বিনীত দূত মহম্মদ সৈয়দের যায়গায় প্রয়োজনে মৃদুভাষী আবদুল মাবুদকে দূত হিসেবে নিয়োগ করুন এবং কর্ণাটকের সীমান্তকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করার উদ্যোগ নিন।

আওরঙ্গজেবের উত্তরে অভিযানের সুযোগে, দক্ষিণে মুঘল বাহিনী হ্রাসের কারণে কুতুব শাহ গোলকুণ্ডা এবং সিদ্ধউত মীর জুমলার বাহিনীর হাত থেকে ছিনিয়ে নিলেন। সুলতানের এই আগ্রাসী মনোভাবে কর্ণাটক নতুন গোলযোগের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়াল। আওরঙ্গজেব নিজেকে ‘হিন্দুস্তানের রাজা’ হিসেবে ঘোষণা করায় দ্বিধাহীন চিত্তে কর্ণাটক নিয়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অবস্থা তৈরি করলেন। কুতুব শাহকে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বললেন চক্রান্ত না করে এবং তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত না নিয়ে মীর জুমলার এলাকা ফিরিয়ে দিন আর কর্ণাটক থেকে সেনা বাহিনী তুলে নিন। ততদিনে ছদ্ম-কারাগার থেকে মীর জুমলাকে ছেড়ে তাঁকে খণ্ডেশের সুবাদার ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। মীর জুমলা হায়দারাবাদ থেকে কর্ণাটক পর্যন্ত যে সব ডাকচৌকি স্থাপন করেছিলেন, সেগুলিকে রক্ষা করার নির্দেশ দিলেন।

তবুও কুতুব শাহ কর্ণাটক বিষয়ে আগ্রাসী মনোভাব ত্যাগ করলেন না। ১৬৫৮-র আগস্টের মীর জুমলা বিরোধী বিদ্রোহে বাহিনী হঠিয়ে সুলতানের বাহিনী পুনামাল্লি দখল নিলেও, মীর জুমলার সেনাপতি টুপাকি কৃষ্ণ পরে সেটি দখল করেন। পুনামাল্লি ঘিরে থাকা শাহী বাহিনীর বিরুদ্ধে সুলতান পুনামাল্লিতে আরও বড় বাহিনী পাঠালেন। কৃষ্ণ একই সঙ্গে ডাচেদের পুলিকট এবং ব্রিটিশদের কুঠি অবরোধ করলেন। অক্টোবরে গোলকুণ্ডার সেনানায়ক কুতুব বেগ, টুপাকিকে শুধু হারলেন তাই নয়, তাঁকে আহত করে গ্রেফতার করলেন, মাদ্রাজ এবং স্যান থোমের আশেপাশের অঞ্চল দখল নিলেন।

আজমেঢ়ে (মার্চ ১৬৫৯) দারার বাহিনীকে হারিয়ে সুজার সঙ্গে যুদ্ধ করার সময়েও দক্ষিণে সুলতানের এলাকার দিকে নজর হঠান নি আওরঙ্গজেব। এতদিন তিনি সাম্রাজ্যের দূত কৃষ্ণ রাও-এর বিষয়ে যেমন সিদ্ধান্ত নেন নি, তেমনি মীর জুমলার জায়গির কর্ণাটক দখল রাখার আর হাত ছাড়া হয়ে যাওয়া অংশগুলো উদ্ধারের আশাও ছাড়েন নি। সম্রাট আওরঙ্গজেব হুঁশিয়ারি দিয়ে বললেন হিন্দুস্তানের যুদ্ধ শেষ হলেই, তিনি মীর জুমলার নেতৃত্বে গোলকুণ্ডা এবং কর্ণাটক দখলে বাহিনী পাঠাবেন — ‘কর্ণাটকের জায়গিরদারি মীর জুমলাকে দেওয়া হয়েছে… কোনভাবেই সেটা ফেরত নেওয়া যাবে না… তোমার বাহিনীকে বল দূর্গ আর মহলগুলি মীর জুমলার বাহিনীর হাতে ছেড়ে (গোলকুণ্ডায় সরে) আসতে… কিন্তু তুমি যদি উদ্দেশ্য পথ না পাল্টাও, তা হলে এই বর্ষার পরেই হিন্দুস্তান থেকে [মুঘল] শত্রুর নাম মুছে দেব। মীর জুমলা গোলকুণ্ডা আর কর্ণাটক দখল নেবে… সময় এসেছে তোমায় উপড়ে ফেলার। মুহূর্তের মধ্যে তোমার সম্মান পথের ধূলায় লুটোবে। তোমার দেশ থেকে তুমি মুছে যাবে।’ সুজা রাজমহল থেকে তাণ্ডার দিকে গেলে, দক্ষিণে আওরঙ্গজেব গাণ্ডিকোটা কেল্লার দিকে মীর আহমদ খাওয়াফি ওরফে মুস্তাফা খানকে পাঠালেন, নতুন করে সুলতানদের সঙ্গে মীর জুমলার দ্বন্দ্ব পরিবেশ তৈরি হল। আমরা দেখলাম মীর জুমলার কর্ণাটক বিষয়ে আওরঙ্গজেবের নীতি তার নিজস্ব চাহিদা, পেশা এবং সিংহাসন দখলের ভাগ্যের ওপরে নির্ভরশীল ছিল।

মীর জুমলা মুঘল সাম্রাজ্যের উজির পদে নিযুক্ত হয়ে দক্ষিণ থেকে উত্তরে যাওয়ায় তার মধ্যস্থ টাপা টাপ (তাবাতাবাই?) গোলকুণ্ডা এবং মছলিপত্তনমে তার স্বার্থ, সম্পত্তি এবং ব্যবসা রক্ষায় থেকে গেলেন। বন্দরে কুতুব শাহের কর্মচারীরা তার জাহাজ থেকে পণ্য বাজেয়াপ্ত করলে টাপা টাপএর সঙ্গে সরাসরি লড়াই বাধার উপক্রম হল। বিজাপুর অভিযানের শুরুতেই পাদশাহের আপত্তির উত্তরে কুতুব শাহ লিখলেন, ‘আমি বার বার বলার চেষ্টা করেছি, বন্দরের আধিকারিকদের সাম্রাজ্যের জাহাজ আটকানোর ক্ষমতা (? ঔদ্ধত্য) নেই, জাহাজটিকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে মাত্র, ১০% শুল্ক মেটালে সাম্রাজ্য সরকারের সম্মানিত আধিকারিক মীর জুমলার জাহাজ, সম্পত্তি এবং পণ্য ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’ তিনি বিনীতভাবে সম্রাটকে জানালেন শুধু মীর জুমলার পণ্যই নয়, অন্যান্য জাহাজের পণ্যের ওপর শুল্ক নেওয়া গোলকুণ্ডার বহুদিনের প্রথা।

গোলকুণ্ডাতে তাঁর কর্মদাতার মৃত্যুর পরও টাপা টাপ তাঁর মালিকের সম্পত্তি আওরঙ্গজেবের গোলকুণ্ডা প্রশাসন দখল নেওয়ার আগেই গুদামঘর থেকে বহুমূল্য সম্পদ সরয়ে নিয়েছিলেন। মীর জুমলা নামটা তখনও এতই প্রভাবশালী ছিল যে, তাঁর মৃত্যুর চার বছর পরেও তাঁর পুত্র মহম্মদ আমিন খুব সম্মানিত ব্যক্তি হসেবে গণ্য হতেন এবং তাঁর প্রতিনিধি মীর মহম্মদ হুসেইন টাপা টাপা কার্যত বন্দর প্রধান হিসেবে কাজ করেগেছেন।

তৃতীয় খণ্ড

বীজাপুর অভিযান ১৬৫৭-৫৮

১। মীর জুমলার বিজাপুর অভিযানের পরিকল্পনা রূপায়ন

মীর জুমলা উজিরের পদে থেকেই ১৬৫৭-৫৮-র বীজাপুর অভিযানের পরিকল্পনা করলেন। আগের বছরের গোলকুণ্ডা অভিযানের মতই মীর জুমলা এবং আওরঙ্গজেব এই পরিকল্পনাও তৈরি করেছেন যৌথভাবে। গোলকুণ্ডা অভিযানের ভাবনাটা এসেছিল আরঙ্গজেবের মাথা থেকে, বীজাপুর অভিযানের পরিকল্পনার ভাবনা ভেবেছিলেন উজির মীর জুমলা। আগের অধ্যায়েই আমরা দেখেছি দক্ষিণ অভিযানে সম্রাটের অনুমতি নিতে আওরঙ্গজেব মীর জুমলা অনুরোধ করেছিলেন যাতে তিনি কর্ণাটক নিয়ে আগ্রাসী কুতুব শাহকে শাস্তি দিয়ে গোলকুণ্ডা দখলের গোপন ইচ্ছে পূরণ করতে পারেন। কর্ণাটক সমস্যা সমাধানের জন্য আওরঙ্গজেব চেয়েছিলেন দক্ষিণের অভিযানে স্বয়ং উজিরই নেতৃত্ব দিন। মীর জুমলার ধারণা ছিল কুতুব শাহ আর রয়াল উভয়েই শেষ হয়ে যাওয়া আগ্নেয়গিরি, এদের নিয়ে মাথা ঘামানো বিলাসিতা। বরং বীজাপুর তখনও যথেষ্ট ভীতিপ্রদ ভূমিকা পালন করতে পারে। তিনি মনে করতেন একমাত্র বিজাপুরী সুলতানকে ধ্বংস করলেই কর্ণাটক নিরাপদ হবে, দক্ষিণে শান্তি ফিরে আসবে। হয়ত এই কারণেই মীর জুমলা আওরঙ্গজেবকে প্রস্তাব দেন যাতে তিনি দুই সুলতানের আদত উদ্দেশ্য (হকিকত-ই-কাসাদ) নিয়ে বিস্তারিত তথ্য পাদশাহকে পাঠাতে, যাতে তিনি আগেভাগেই সম্রাটকে দারার শান্তি উদ্যমের সক্রিয় বিরোধিতার পরিবেশ এবং বীজাপুর অভিযানের জন্য কার্যকর অনুমতি নিয়ে রাখতে পারেন। সম্রাটকে উজির অনুরোধ করলেন কর্ণাটকের জ্বলন্তু অবস্থা সামলাতে তাঁর বদলে শাহ বেগ খানকে অভিযানে পাঠানো হোক। উদ্দেশ্য ছিল নিজেকে বীজাপুর অভিযানের জন্য তুলে রাখা। ১৬৫৭র অক্টোবরে আওরঙ্গজেব মীর জুমলাকে লিখছেন, ‘এই বিষয়ের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত তোমার নির্দেশে সব কাজ করেছি, কোনও কাজেরই বিরুদ্ধতা করি নি, অন্য প্রস্তাবেও শুরু থেকে আমি তোমার ইচ্ছেতেই চলব।’ যেহেতু তাঁর পক্ষে আদিল শাহকে শান্ত রাখা জরুরি হয়ে পড়ছিল, তাই তিনি লিখলেন, ‘মীর জুমলার শয়তানি চক্রান্তে (বাধ্য হয়ে) আমি আপনার রাজ্য এবং গোলকুণ্ডা আক্রমণ করেছি…’।

দক্ষিণ নিয়ে মীর জুমলার অগাধ জ্ঞানের জন্যে আওরঙ্গজেব দক্ষিণের যে কোনও বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে তাঁর ওপর নির্ভর করতেন। দক্ষিণের ক্ষমতা কেন্দ্রে দীর্ঘকাল সক্রিয় থাকার জন্যে মীর জুমলা জানতেন দক্ষিণী দরবার এবং প্রশাসন, প্রতিটা ভূমিভাগ এবং কোন আমলাকে কোন শর্তে বাগে আনা যায় সে সবের গোপন খুঁটিনাটি। লক্ষ্যে পৌঁছনোর দ্রুততায় এবং লক্ষ্য পূরণের সুযোগ পাওয়ার জন্যে নিজেকে এবং গোপনে চুক্তিবদ্ধ হওয়া বন্ধুদের কীভাবে কাজ লাগানো যায় সেটা তিনি ভালভাবে বুঝতেন। তিনি জানতেন বিজাপুর নিয়ে তাঁকে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হলে মীর জুমলার স্মরণাপন্ন হতেই হবে।

বাস্তবে, দুজনেই বেশ কিছু সময় ধরেই কুতুব শাহের কর্ণাটক বিষয়ে আগ্রাসী মনোভাব আঁচ করে বীজাপুর দখলের ভাবনা ভাবছিলেন। মহম্মদ আদিল শাহের মৃত্যুর আগে থেকেই মীর জুমলা আর আওরঙ্গজেব বীজাপুরী সুলতানকে শাস্তি দিতে, বিজাপুরী আমলা আর সেনা নায়কদের মন কিভাবে জেতা যায় এবং সম্রাটের অনুমতি পাওয়া যায় সেই পরিকল্পনা ছকা চলছিল। মীর জুমলা কিভাবে সম্রাটকে প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন সে ইতিহাস আজ হারিয়েগেছে; তবে পারসিকদের কবল থেকে কান্দাহার উদ্ধারের স্বপ্ন আপাতত কুলুঙ্গিতে তুলে রেখে, কান্দাহার অভিযানের বদলে আদিল শাহের মৃত্যু উত্তর কালে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে দক্ষিণে সেনা বাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্তে সম্রাটকে রাজি করাতে মীর জুমলার অন্তত চার মাস সময় লেগেছিল। এই সংবাদে আওরঙ্গজেব অতীব প্রীত হয়ে মীর জুমলাকে লিখলেন, ‘আমি জানতে পেরেছি, আদিল খানের মৃত্যুর পর তুমি এই দিকে আসার অনুমতি পেয়েছি… আমি বিশ্বাস করি এই ঘটনাপ্রবাহ বিষয়ে তবদির করতে মানসিক অবস্থা ঠাণ্ডা এবং স্থিতিশীল রাখবে, এবং প্রত্যেক রসদ তৈরি রাখবে। শ্রেষ্ঠ কাজটি শেষ করতে যেন কর্তব্যচ্যুত হতে না হয়। অন্তিম লক্ষ্যর দিনে নজর রেখে একাগ্র হও যাতে পরিপূর্ণ শান্তি আসে এবং তোমার শ্রম নিরর্থক না হয় আর যা চাইছি সেই পথে যেন অভিষ্ট সিদ্ধি লাভ হয়’।

২। মীর জুমলার কর্তব্য

৪ নভেম্বর ১৬৫৬-তে বিজাপুরের মুঘল হাজিবের থেকে আদিলশাহের মৃত্যুর সংবাদ আওরঙ্গজেবের কানে পৌঁছল। হাজিব আওরঙ্গজেবকে জানালেন ১০ নভেম্বর আদিল-পুত্র মহম্মদ আমনকে দ্বিতীয় আলি আদিল শাহ উপাধি দিয়ে অভিজাতরা বিজাপুরের সুলতান হিসেবে সিংহাসনে অভিষেক করিয়েছেন। তৎক্ষণাৎ আওরঙ্গজেব সম্রাটকে সংবাদটা পৌঁছে দিয়ে বীজাপুর আক্রমণের অনুমতি চান। এ প্রসঙ্গে মীর জুমলাকে লিখলেন, ‘বিজাপুরের খবরটি যদি ঠিক হয়, এবং বিজাপুর সালতনত সংক্রান্ত বিপুলাকৃতির পরিকল্পনাটিকে যদি আমাদের সফল করাতে হয়, তাহলে তুমি এই বিষয়টি সম্রাটের সামনে পেশ করে, যা করার দরকার হয়, করতে দ্বিধা কোরো না।’

মীর জুমলার সামনে দুটি পরিষ্কার কাজ ছিল, দারার দিক থেকে সম্রাটকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্য বিফল করতে সম্রাটের থেকে আগেভাগেই বীজাপুর অভিযান পরিকল্পনার সম্মতি আদায় করা। একই সঙ্গে সম্রাটের সম্মতিতে দক্ষিণের সুবাদারের চাহিদা অনুযায়ী সমগ্র পরিকল্পনা রূপায়নে সেনা আর মালামাল নিয়ন্ত্রণে আওরঙ্গজেবের নেতৃত্ব কায়েম করা। দারার আশঙ্কা ছিল, মীর জুমলার নেতৃত্বে সাম্রাজ্যের সেনা বীজাপুরের অভিযানে নামলে শাহী কাঠামোয় ভাই আওরঙ্গজেবের পকড় আরও জোরদার হবে, তার নাম আরও বড়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে। আওরঙ্গজেবের উত্থান রুখতে দারার প্রস্তাব দিলেন যদি অভিযান জরুরিই মনে হয়, তাহলে স্বয়ং পাদশাহ দক্ষিণে মুঘল সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিন। শায়েস্তা খানের নিয়ন্ত্রণে থাকা মালওয়ার সেনা বাহিনীকে আওরঙ্গজেবের তলবের পরিকল্পনায় দারা সফলভাবে বাদ সাধলে, আওরঙ্গজেব মীর জুমলাকে অনুরোধ করলেন তিনি যেন স্বতঃপ্রণোদিতভাবে উদ্যোগী হয়ে সম্রাটকে বুঝিয়ে যততাড়াতাড়ি সম্ভব পুরো মালওয়া সেনা বা তার একটা অংশের নেতৃত্ব দিয়ে দক্ষিণে আসেন। বাকি বাহিনী সম্রাটের সঙ্গে আসুক। মীর জুমলাকে লিখলেন ‘মালওয়ার সেনার দক্ষিণে আসা জরুরি। আমার ডাকে সক্কলে এগিয়ে আসবে না। তবে যদি সম্রাট এগিয়ে আসেন তাহলে সক্কলে দ্রুত আসতে বাধ্য হবে’। আওরঙ্গজেবের উত্তেজনার প্রকাশ ঘটল উজিরকে লেখা চিঠিতে, ‘এই ধরণের ঝামেলা খুব সহজেই সামলানো যায়। কিন্তু বড় ঝামেলাগুলোর শেকড় উপড়োতে তবির [সতর্ক কৌশল] ব্যবহার না করাটা খুব বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তুমি দেখ সেনা বাহিনীতে ঢুকতে পার কী না। তোমায় ছাড়া এই কাজে এগোনো আর সফল হওয়া মুশকিল হবে’।

আওরঙ্গজেবের বিশ্বাস ছিল, দক্ষিণ অভিযানের সাফল্যের একমাত্র পূর্ব শর্ত হল মীর জুমলার শীঘ্র উপস্থিতি। চিঠির পর চিঠিতে তিনি উজিরকে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন তার (উত্তর থেকে দক্ষিণে) আসা কেন জরুরি এবং দেরি করার অর্থ সুযোগ হাত ছাড়া হয়ে যাওয়া। ‘কাজের তদবিরের সফলতা নির্ভর করছে তোমার যাত্রাকালের সময়ের ওপর। এই দেশের সমস্যা সম্বন্ধে তোমার জ্ঞান যথেষ্ট; (তোমার আসার পর) আমাদের বৈঠকে তুমি অনেক কথা বলবে, এবং প্রত্যেক পদক্ষেপে কী কী করা দরকার আমায় জানাবে (আমি সেটা শুনব)’। আওরঙ্গজেব ভাবলেন মীর জুমলা দক্ষিণে না আসা পর্যন্ত আহমদনগরের বাইরে সেনা নিয়ে বেরোনো ঠিক হবে না। তিনি লিখলেন, ‘তুমি যদি সত্যিকারে এখানে আসার জন্যে মন বেঁধে থাক তাহলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে এস, সব কিছুই খুব তাড়াতাড়ি সমাধান করতে হবে…’। ১৬৫৬-র ডিসেম্বরের মাঝ সময়ে আওরঙ্গজেব আবার মীর জুমলাকে লিখলেন, ‘তোমার সঙ্গে মিলনের ইচ্ছে আর আগ্রহ দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে, সে অনুভূতিকে তাড়াতে পারছি না। তাড়াতাড়ি চলে এস, সময় বয়ে যায়, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ব্যাপারটার সুরাহা করতে হবে। তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করাই মঙ্গল’।

বীজাপুরী অভিযানের সাফল্যের দ্বিতীয় শর্ত ছিল, প্রয়োজনমত গোলাবারুদের ব্যবস্থা করা। সম্রাটের নির্দেশে মীর জুমলা আওরঙ্গজেবকে জানালেন, দক্ষিণের দুর্গগুলি থেকে কিছু পরিমান গোলাবারুদ বীজাপুর সীমান্তে পাঠানো যেতে পারে। দৌলতাবাদ দুর্গে প্রচুর গোলাবারুদ রয়েছে, সাম্রাজ্যের গোলাবারুদ ভাণ্ডারের দারোগা মীর শামসুদ্দিনকে সম্রাট নির্দেশ দিলেন ভাণ্ডারটির মজুদ সমীক্ষা দক্ষিণের সুবাদারকে পেশ করতে। নিরীক্ষণ শেষে তিনি আওরঙ্গজেবকে জানালেন, ব্যবহার করার মত একটামাত্র বড় কামান রয়েছে, সেটিকে বয়ে নিয়ে আসা কঠিন, এবং নিয়ে এলেও সেটি যে চাহিদা মত কাজ করতে পারবে এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যাচ্ছে না। যুদ্ধপূর্ব সামরিক সমীক্ষায় বোঝা গেল মুঘল নিয়ন্ত্রিত দাক্ষিণের দুর্গের ভাণ্ডারে মজুদ গোলাগুলি বা কামান গোলকুণ্ডা এবং বীজাপুরী দুর্গগুলোর নিরাপত্তা বেড়া ভাঙ্গার জন্য যথেষ্ট নয়। আওরঙ্গজেব মীর জুমলাকে আবারও জানালেন তিনি যদি দক্ষিণে আসার কথা এবং দক্ষিণের ইস্যুগুলোকে নিয়ে এগোনোর কথা ভাবেন তাহলে সম্রাটের অনুমতি নিয়ে নিজের গোলাবারুদ সঙ্গে আনতে হবে। শাহী বাহিনীর গোলাবারুদের ওপর নির্ভর করলে ভুল হবে। মীর জুমলাকেও বলা হল সম্রাটের এ বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গী আওরঙ্গজেবকে জানিয়ে দিতে। উজির মীর জুমলার অতীত যুদ্ধ-সাফল্যে গোলাবারুদ খুব বড় ভূমিকা পালন করেছিল এবং সেই ভাণ্ডারের সমস্তটাই কিন্তু তিনি দিল্লি আনার ব্যবস্থা করলেও, সেগুলো তখনও রাস্তায় ছিল, নান্দের পার হয় নি। সেখান থেকে সেগুলিকে (আওরঙ্গজেবের শিবিরে) বয়ে নিয়ে যাওয়া খুব বড় কাজ ছিল না। মীর জুমলার এসে পৌঁছনোর খবরে আওরঙ্গজেব সেইগুলি ধারারে পাঠানোর প্রস্তাব দিলেন।

আওরঙ্গজেব বুঝলেন একই সঙ্গে বিশ্বস্ত, দক্ষ এবং যুদ্ধ পরীক্ষিত সেনাবাহিনীর মাথাদের ওপরে নির্ভর করতে হবে। এখন শুধুই মীর জুমলার বন্ধুত্বের ওপরে নির্ভর করা ভুল হয়ে যাবে। তিনি মীর জুমলাকে বললেন শাহ নওয়াজ খান, মির্জা মহম্মদ মাশাদির মত আওরঙ্গজেবপন্থী সেনানায়ককে দরবারে ডেকে (সম্রাটের) অনুমতি নিয়ে সঙ্গে নিয়ে আসতে। এছাড়াও কুরখানা (অস্ত্র কারখানা) প্রধান, প্রয়াত তারবিয়ত খানের পুত্র দারোগা সইফুদ্দিনকে সঙ্গে নিতে বললেন। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev