| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলা : জগদীশ নায়ারণ সরকার (২৬নং কিস্তি) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ৪৪৪ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২২

তৃতীয় খণ্ড

বীজাপুর অভিযান ১৬৫৭-৫৮

চতুর্থ ভাগ

৪। পারেনদায় মীর জুমলার ব্যর্থতা

মীর জুমলার পরামর্শ দেওয়ার ক্ষমতায় আওরঙ্গজেবের অগাধ বিশ্বাস এবং তাঁর প্রতি কাজে উজিরের পরিকল্পনার ওপর নির্ভরতা প্রকাশ করলেও, ইতিহাস সচেতন মানুষের কাছে দুই বন্ধুর লক্ষ্যের পার্থক্য স্পষ্ট ধরা পড়ে। আশা-নিরাশা, উদ্বেগ এবং নড়বড়ে সময়ের এই মাসগুলিতে আওরঙ্গজেব মীর জুমলার মরিয়া হয়ে পারেনদা দখল প্রচেষ্টাকে অন্তরকরণে সমর্থন দেন নি। তার মনে হয়েছিল, পারেন্দা দখলের চেষ্টা তাকে লক্ষ্যচ্যুত করিয়ে দিতে পারে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে দিল্লির সিংহাসন দিকে লক্ষ্য করে এগোনোর যে কর্মপদ্ধতি সাজাচ্ছেন, কেল্লা দখলের উদ্যমে তাঁর সেই বড় মঞ্চ দখলের পরিকল্পনায় আঁচড় কাটুক, তিনি চান নি। অন্যদিকে মীর জুমলা অন্যান্য ঝামেলা, অসুবিধে ঝেড়ে ফেলে পারেনদা দখলকে পাখির চোখ করে এগিয়েছেন। তার প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল পারেনদার কিলাদারকে তার পক্ষে নিয়ে আসা। ১৪ নভেম্বরের মীর জুমলার এই প্রস্তাবে আওরঙ্গজেব কিলাদারকে ১৭ নভেম্বর একটি নিশান লিখে পাঠান, যাতে বলা ছিল যে মীর জুমলার হাতে দেরি না করেই কেল্লার চাবি তুলে দিতে। বিদর ছাড়ার আগে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় দক্ষ মীর জুমলাকে আওরঙ্গজেব লিখে পাঠালেন, যে কোনও উপায়ে কিলাদারকে জিতে নাও। মীর জুমলার প্রস্তাবে তিনি বীজাপুরের মুঘল হাজিব মহম্মদ আমনকে একটি নিশান পাঠান এবং একই সঙ্গে মীর জুমলাকে বলেন তিনি কী চান, সেটা বীজাপুরী প্রধানমন্ত্রী ইখলাস খানকে লিখুন।

কিন্তু সোনা [অর্থাৎ ঘুষ] দিয়ে চাবি হাতবদলের নীতি সফল হল না। মীর জুমলা বাধ্য হয়ে বল প্রয়োগ করলেন। মহম্মদ সুলতানকে বুরহানপুরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত সমর্থন না করে তিনি আওরঙ্গজেবকে বললেন, তার নেতৃত্বে তিনি যেন পাথরি থেকে সেনা পারেনদায় পাঠানোর প্রস্তাব দিলেন। উনিরের আশা বড় শক্তি দেখলে বীজাপুরীরা পিছু হঠতে পারে। কিন্তু আওরঙ্গজেব পালটা প্রশ্ন করলেন ‘[বাড়তি] সেনা কোথায় পাব? কিছু শাহজাদার সঙ্গে যাবে, আর কিছু আমার সঙ্গে থাকবে। অবশ্যি যারা এখানে রয়েছে তারা আমার সঙ্গে থাকবে কিনা ঠিক হয় নি, সেটা ঠিক হবে দিল্লি থেকে নির্দেশ আসার পরে। মহম্মদ সুলতানের নেতৃত্বে খুব কম পরিমান সেনা তোমার দিকে যাওয়ার প্রস্তাব আমার পছন্দ নয়। আর যারা হিন্দুস্তান যেতে চায়, তাদের ইচ্ছেতেও যদি আমি বাধ সাধি, তাহলেও কি এই ক’টিমাত্র সেনা নিয়ে তোমার ইচ্ছে পূর্ণ করা কি সম্ভব? তেমন বড় বাহিনী না নিয়ে মহম্মদ সুলতানের পক্ষে তোমার কাছে যাওয়া কতটা যথাযথ হবে? হাতে যে পরিমান সেনা আছে, সেটা নিয়ে তোমার কাছে গিয়ে কি কোন কাজ হবে’? দ্বিতীয়ত, আওরঙ্গজেব মনে করতেন দারা সরাসরি ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করার পর থেকে, দরবারের রাজনৈতিক পরিবেশ পুরোপুরি তাঁর বিরুদ্ধে চলেগেছে। তিনি মীর জুমলাকে বললেন এর ফলে বীজাপুরে সেনা মোতায়েন করা খুব একটা কাজের কাজ হবে না। আওরঙ্গজেবের বা মীর জুমলার কোনও প্রস্তাবেই সম্রাট অর্থাৎ দারা কান দেবেন না। গুজরাটের সুবাদার পদচ্যুত হয়েছে। মালওয়ায় শায়েস্তা খানের বদলি অবশ্যম্ভাবী। আওরঙ্গজেব তাঁর বয়স্ক বন্ধু-সেনানায়ককে একটাই দাওয়াই দিলেন, বিন্দুমাত্র দেরি না করে সিংহাসনের লক্ষ্যে পরিকল্পনা তৈরি করতে তাঁর পাশে এসে দাঁড়ানো।

মীর জুমলার পারেন্দায় সেনা পাঠাবার প্রস্তাবকে প্রকাশ্যে ভাল পরিকল্পনা বললেও, মীর জুমিলার কর্ম পদ্ধতিটি আওরঙ্গজেবের এক্কেবারেই পছন্দ হয় নি। তবুও তাঁর ভাবনায় সায় দিয়ে ৪ নভেম্বর এধার ওধার থেকে কয়েকজন সৈন্য জোগাড়যন্ত্র করে মহম্মদ সুলতানের নেতৃত্বে পারেনদার দিকে পাঠালেন। ছেলেকে স্পষ্ট নির্দেশ দিলেন মীর জুমলার প্রত্যেকটা নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করতে। তিনি মনে করেন, সেই মুহূর্তে মীর জুমলার মাথা ঠাণ্ডা রাখা তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য একান্তই প্রয়োজনীয়। মীর জুমলাকে অনুরোধ করলেন তার পুত্রকে পথ দেখাতে [আতলিক হতে?]।

সম্ভবতঃ ঠিক সময়ে তিনি যে পারেনদা দখল করতে পারেন নি, তাঁর ব্যর্থতায় দিল্লি তার প্রতি অসন্তুষ্ট, এমন একটি ধারণা মীর জুমলা আওরঙ্গজেবকে লিখে পাঠিয়েছিলেন, যার উত্তরে আওরঙ্গজেব তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন বীজাপুরীদের এ বিষয়ে কী মনোভাব এবং কিলাদারের সিদ্ধান্ত না নিতে পারার প্রেক্ষিতের বিষয়টা হয়ত সম্রাট জানেন। দিল্লিতে আধিকারিককে ডেকে পাঠানোর কল্পনায় জল ঢেলে আওরঙ্গজেব লিখলেন, ‘নবাব! তোমার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। দিল্লির ফরমানে যখন অভিজাতরা রাজধানীর দিকে রওনা হয়ে গিয়েছে, তার ফল কী ঘটবে তুমি জান। তারা (বীজাপুরীরা) সর্বশক্তিমানের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করছে যাতে এই ধরণের ঘটনা আরও ঘটুক; আমি কিন্তু বার বার আমি তোমায় সাবধান করে বলছি, এ সব বিষয়ে মন দিও না, আমি সেনা পাঠাচ্ছি যাতে তোমার এত দিনের কাজ নষ্ট না হয়ে যায়। আমি সময় নেব না’। এবারে আওরঙ্গজেবের আশা জাগল, মীর জুমলা সব কিছু ছেড়ে তার সঙ্গে দেখা করতে আসবেন।

বলপ্রয়োগ করার মীর জুমলার নীতি বিফল হল। মুহম্মদ সুলতানের পৌঁছবার এক সপ্তাহের মধ্যে মীর জুমলা আওরঙ্গজেবকে লেখা এক চিঠিতে (৯ নভেম্বর) নিজের বিজাপুর নীতির ব্যর্থতা স্বীকার করলেন। কাজি নিজামা তখনও বীজাপুরীদের থেকে ক্ষতিপূরণ সংগ্রহ করতে পারেন নি। বীজাপুরীরা তখন আরও অকুতোভয়। ততদিনে তারা দারার সমর্থন পেয়েছে। ব্যর্থতার সংবাদে সান্ত্বনা দিয়ে আওরঙ্গজেব মীর জুমলাকে লিখলেন, ‘বিজাপুরী এবং দিল্লির সিংহাসন দুটোরই জন্যেই কী কী নীতি আমরা নিতে পারি সেগুলো বিশদে জানাও, কেননা সাম্রাজ্যের সেনাবাহিনীর গুপ্ত তথ্য, স্থানীয় বাহিনীগুলির যাতায়াত, রাজস্বের অবস্থা, শত্রুপক্ষকে আক্রমণের তথ্য, সময়, অবস্থা সব কিছুই তোমার নখদর্পণে রয়েছে’।

৫। বীজাপুরীদের সঙ্গে সমঝোতা করে মীর জুমলার পারেনদা ত্যাগ

কয়েক মাসের উদ্বেগ, সুচিন্তা, বিফল শ্রম সত্ত্বেও আওরঙ্গজেবের পক্ষ থেকে দিল্লি, গুজরাট এবং বাঙলার সমস্ত ঘটনা এবং তার নিজস্ব প্রস্তুতির খবর মীর জুমলাকে নিয়মিতভাবে জানানোর ব্যত্যয় ঘটেনি, যাতে মীর জুমলা তাঁকে দ্বিধাহীনভাবে এসব বিষয়ে নিরন্তর পরামর্শ দিয়ে যেতে পারেন। সম্ভবত তিনি আওরঙ্গজেবকে মুরাদ, সুজা বিষয়ে তাঁকে তার ভাবনা বলেছেন, যদিও ও দিক থেকে কী পরামর্শ পেয়েছেন তা এখন আর জানা যায় না।

দক্ষিণ থেকে অভিজাতদের দিল্লিতে ডেকে নেওয়া, দিল্লি এবং সাম্রাজ্য জুড়ে ঘটে চলা একটাও তুচ্ছ বা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বিষয়ে সম্রাটের সিদ্ধান্ত নিতে না পারা এবং সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে দারার ক্ষমতায় আরোহণের সংবাদ প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আওরঙ্গজেব নিজের এতদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা প্রয়োগ করে নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে পারেন্দায় বলপ্রয়োগ করেও মীর জুমলা সমস্যার সমাধান করতে পারবেন না। আওরঙ্গজেবের সে মুহূর্তে সব থেকে বড় চিন্তা দিল্লির রাজসিংহাসন দখল। তিনি সে পরিকল্পনা ছকতে এবং বাস্তবায়নের কাজে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন। এই কাজ মীর জুমলাকে সঙ্গে না পেলে, সেটা যে বেশ কঠিন হয়ে যাবে সে তথ্য আওরঙ্গজেবের অজানা ছিল না। কিন্তু আওরঙ্গজেব স্পষ্ট জানতেন মীর জুমলা মাথা উঁচু না করে পারেনদা ছাড়বেন না। ফলে তাঁকে এবারে পারেনদা সমস্যা সমাধানে মীর জুমলার পাশে দাঁড়াবার সিদ্ধান্ত নিতে হল — না হলে মীর জুমলার পক্ষে সেখান থেকে সম্মান রক্ষা করে বেরিয়ে আসা অসম্ভব। যদি পারেনদা সহজে জয় না করা যায়, তাহলে অন্তত বর্তমানে যে অবস্থা সেখানে আছে তার থেকে খারাপ হতে দেওয়া যাবে না, এই ভাবিনা নিয়ে আওরঙ্গজেবের মীর জুমলাকে সাহায্য করার পরিকল্পনা করলেন। নিজের দুঃসহ পরিস্থিতিতেও তিনি মীর জুমলার কঠোর বাস্তবতা অনুধাবন করে তার পাশে দাঁড়ানোর ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিলেন।

তাঁর প্রাথমিক কাজ হল তিনি সিংহাসনের লড়াইতে উত্তরের দিকে বাহিনী নিয়ে রওনা হওয়ার পরে দুই সুলতান যেন দক্ষিণে মীর জুমলার সামনে নতুন কোনও বিপদ সৃষ্টি না করেন সেই বিষয়টা নিশ্চয় করা। ১৬৫৭-র অক্টোবরের শেষের দিকে আওরঙ্গজেব তাঁকে লিখলেন ‘দক্ষিণে বিকাশের ভিত্তি স্থাপন করতে আপাতত এই ঝামেলার মুহূর্তে দুই সুলতানকে পাশে পাওয়া আর শান্ত রাখা জরুরি’। আওরঙ্গজেব আদিল শাহকে চিঠি লিখে বীজাপুর অভিযানের সমস্ত দায় চাপিয়ে দিলেন মীর জুমলার ওপরে, ‘তার শয়তানি প্ররোচনায় আমি বীজাপুর আর গোলকুণ্ডা অভিযান করেছি’। তিনি প্রস্তাব দিলেন, পারেনদা দুর্গ এবং তার আশেপাশের অঞ্চলগুলো, কোঙ্কণ এবং ওয়াঙ্গির মহাল — যেগুলো একদা সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত করে নেওয়া হয়েছিল, এবং তার সঙ্গে কিছু দুর্গ এবং মহাল যেগুলি মীর জুমলার অংশ হিসেবে খালসাইসরকারের অন্তর্ভূক্ত হয়েছিল, সেগুলি বাদে গোটা কর্ণাটক আগের মতই আদিল শাহের হাতে থাকবে।

বীজাপুরি সমস্যা সমাধানে মীর জুমলাই একমাত্র অনুঘটক হতে পারেন বুঝেই আওরঙ্গজেব, তিনি এগিয়ে এসে বিজাপুরী সমস্যা সমাধানে কাঁধ লাগালেন। মীর জুমলাকে লিখলেন, ‘আপাতত পেশকাশ সংগ্রহ আর দেশ জয়ের ভাবনা মাথা থেকে বার করে দাও। শুধু দেখ তারা যেন তোমার দেখানো ভালবাসাকে আঘাত না করে, তাহলেই আমরা এক্ষুণি এই ঝামেলা থেকে মুক্ত হতে পারব। তোমার ভাল প্রস্তাব এবং প্রতিশ্রুতিতে প্রভাবিত হয়ে হয়ত বীজাপুরীরা খুব একটা ঝামেলা পাকাবে না। তারা যদি ঝামেলা না করে তাহলে খুব সহজে নতুন সেনাবাহিনী তৈরি করা যাবে। জোর করতে গেলে হিতে বিপরীত হবে, এখন তার সময় নেই। এই রকম চরম অবস্থায় তোমায় বন্ধুত্বের মুখোশ পরা খুব জরুরি। দেখ বেশি সময় না নিয়ে কত দূর এগোন যায়’।

আওরঙ্গজেব যে কর্মপদ্ধতি মীর জুমলাকে বাতালেন সেটি আদতে প্রচ্ছন্ন হুমকি আর কূটনৈতিক সান্ত্বনার কুশলী মিশেল। মীর জুমলা শাহজাদা মহম্মদ সুলতানের আর আওরঙ্গজেবের আবির্ভাবের খবর কাগজে লেখার ব্যবস্থা করলেন, যাতে বীজাপুরীদের ওপর যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি হয়। মুঘল-পন্থী শান্তিবাদী বীজাপুরী প্রধানমন্ত্রী ইখলাস খানের মন জেতার জন্য সমস্ত কূটনৈতিক দাঁওপ্যাঁচ প্রয়োগ করলেন তিনি। ইখলাস খানকে বীজাপুরীদের বোঝাতে বলা হল যে, যুদ্ধটা দিল্লির নির্দশে তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। যুদ্ধ ঘটেছিল সম্রাটের ফরমানে। এখন যেহেতু সম্রাট রাষ্ট্রের ওপর সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন, সেই যুদ্ধের আর প্রয়োজন নেই। ইখলাস খান এবং মীর জুমলা, আওরঙ্গজেবের সঙ্গে অনাগ্রাসন চুক্তি নিয়ে দরকষাকষি করছেন। মীর জুমলা ক্ষতিপূরণ আর এলাকা দখলের দাবি থেকে সরে আসবেন ঠিকই কিন্তু একই সঙ্গে বীজাপুরকেও চুক্তির মান রাখতে হবে এবং সে জন্যে বিদর, কল্যাণী এবং অন্যান্য এলাকার দাবি ছাড়তে হবে। দক্ষিণে মুঘলদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করা যাবে না। মীরকে এমনভাবে বিষয়টা বোঝাতে হবে যাতে বীজাপুরীদের মনে হয় তারাই এই ঘটনায় সব থেকে বেশি লাভবান হচ্ছে।

কিন্তু এই পরিকল্পনাও সফল হল না। মুঘল বিরোধী, মুল্লা আহমদ নাটিয়ার প্ররোচনায় ১১ নভেম্বর খুন হলেন সমঝোতাপন্থী ইখলাস খান। সমঝোতার ঘোমটা সরিয়ে এখন মীর জুমলাকে উদ্ভুত পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিকল্পনা ছকতে হল। তার হাতে এখন নাটিয়াকে পাশে টানা ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই। আওরঙ্গজেবকে এই প্রস্তাব দিয়ে চিঠি লিখলেন এবং সঙ্গে তাঁকে লেখা নাটিয়ার একটি চিঠিও জুড়ে দিলেন। সতর্ক ভাষায় আওরঙ্গজেব মীর জুমলার এই পদক্ষেপকে সমর্থন জানাতে বাধ্য হলেন।

৬। পারেন্দা থেকে মীর জুমলার পশ্চাদপরণ

বীজাপুরী সম্ভাব্য আক্রমণের খোরাক হয়ে, শাহজাদা মহম্মদ সুলতানের সঙ্গে পারেন্দা কেল্লার বাইরে পরিখার ধারে ঘাঁটি গেড়ে থাকা সুবুদ্ধির কর্ম নয় বুঝেই আওরঙ্গজেব, সীমান্ত নির্ধারণের কাজ আগামী দিনে কোন এক সময়ের জন্য মুলতুবি করে মীর জুমলাকে পশ্চাদপসরণের নির্দেশ দিলেন। মীর জুমলাকে প্রলুব্ধ করতে আওরঙ্গজেব প্রস্তাব ছিল কুতুব শাহের কবল থেকে কাম্বাম দখল করার জন্যে আভিযান করুন। আর যদি মনে হয়, মীর জুমলা মহম্মদ সুলতানকে আহমদনগর পাঠিয়ে দিয়ে কয়েকদিন সেখানে তাকে বসিয়েও রাখতে পারেন।

অন্যদিকে মীর জুমলা আওরঙ্গজেবকে পালটা প্রস্তাব দিলেন (১৮ নভেম্বর) তার সঙ্গে যোগ দিয়ে বীজাপুরীদের শায়েস্তা করতে। আওরঙ্গজেব বললেন, খান মহম্মদের হত্যার কারণ দেখিয়ে এক্ষুনি তাদের শাস্তি দিতেই পারি, সেই শাস্তিটা তাদের জন্য বাকিও আছে। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে তার বীজাপুরে এখুনি যাওয়া ঠিক হবে না বলেই মত প্রকাশ করলেন। জীবিত থাকাকালীন খান মহম্মদ আমায় বলেছিলেন, বীজাপুরীরা বিশ্বাসঘাতক আর মিথ্যাচারী। মুল্লা আহমদ সারা বছর ধরে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সফল হয়নি। এটা এই মুহূর্তে, আমাদের বিজাপুর সংক্রান্ত পরিকল্পনা সফল হওয়ারও নয়। সেনারা সম্রাটের স্বাস্থ্য ভাঙ্গার খবরে এবং অন্যান্য ঘটনায় হতোদ্যম হয়ে পড়েছে। তারা এতই গোলযোগে পড়ে রয়েছে যে তা ব্যখ্যার অতীত। তিনি তাই মীর জুমলাকে বললেন বীরএ বসে থেকে এই নষ্ট ঘটনায় সময় ক্ষয় না করে সেই মুহূর্তেই ফিরে আসুন।

তার চিঠির উত্তর পাওয়ার জন্য পান্দেরায় অপেক্ষা করে থেকে থেকে, চিঠি না পেয়ে মীর জুমলা বীরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন মহম্মদ সুলতানকে সঙ্গে নিয়ে। ২৬ নভেম্বরের শাহজাদার মীর জুমলার এক চিঠির উত্তরে সাঙ্কেতিক ভাষায় আওরঙ্গজেব লিখলেন, অসম্ভব মানসিক যন্ত্রণায় তিনি কাটাচ্ছেন এবং কেন মীর জুমলার তার সঙ্গে অবিলম্বে যোগ দেওয়া দরকার সেটাও জানালেন। যদি বীজাপুর সমস্যা তাদের দুজনকে আরও দীর্ঘকাল ব্যস্ত রাখে আর তার ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সেনাবাহিনীকে তিনি একত্র না করতে পারেন, তা হলে তিনি হয়ত সিংহাসন দখলের সুযোগটাই হারাবেন (যদি ইতোমধ্যে সম্রাটের মারা যাওয়ার খবর আসে)।

৬ ডিসেম্বর নাগাদ, বুরহানপুরের জমিদারদের দমন করতে এবং নর্মদা পর্যন্ত এলাকাকে বিদ্রোহীমুক্ত করতে পারেন্দা থেকে আওরঙ্গজেব মহম্মদ সুলতানকে ডেকে নিলেন। শাহজাদা মহম্মদ মুয়াজ্জমের সঙ্গে সেনাবাহিনীর একটি অংশ দিয়ে পারেন্দায় পাঠালেন এবং মীর জুমলাকে বললেন বীরে তার সঙ্গ দিতে, যাতে বীজাপুরীদের সবক শেখানো যায়। এখানে মধ্য ডিসেম্বরে মীর জুমলা আওরঙ্গজেবের সচিবের সঙ্গে তিনিটি গোপন বৈঠক করেন।

৭। মীর জুমলাকে দরবারে ডেকে পাঠানো হল

৬ নভেম্বরের মহম্মদ আমীন খানের পাঠানো চিঠির সূত্রে মীর জুমলা ইঙ্গিত পেয়েছিলেন, যে দারা তাঁর বিরুদ্ধে দরবারে পাকা ঘুঁটি সাজাচ্ছেন এবং এই বিষয়ে তিনি পুত্রকে চিঠি লেখার আগে আওরঙ্গজেবের পরামর্শ চেয়ে পাঠান। ৯ নভেম্বরের চিঠিতে আওরঙ্গজেব লিখলেন, অজ্ঞকে প্রজ্ঞা শেখানো যায় না। বোকাকে কিভাবে আঘাত করবে তা তোমার নিজস্ব প্রজ্ঞার ওপর নির্ভর করবে। বড় শাহজাদার (দারা) নির্দেশের প্রেক্ষিতে তোমার দীর্ঘকালের সঞ্চিত প্রজ্ঞার ওপর নির্ভর করে একটি সুদীর্ঘ ভূমিকা লিখে তার সাজানো মিথ্যাকে খণ্ডন কর। তুমি যা মনে করে সেটাই লেখ।

কিন্তু মীর জুমলা দারার চাল নিষ্ফল করতে পারলেন না। ডিসেম্বর ১৬৫৭র শুরুতেই মুরাদ এবং সুজার সঙ্গে আওরঙ্গজেব হাত মিলিয়েছেন এই খবর দারার কাছে ছিল, শাহজাহানের নাম নিয়ে দারা দক্ষিণ থেকে মীর জুমলা এবং সেনাপতিদের ডেকে পাঠালেন কেননা তাদের বেশি দিন দক্ষিণে থাকা আওরঙ্গজেবের সেনা সাজানোয় সাহায্য করবে এবং তার ভবিষ্যতের সিংহাসন দখলের পক্ষে হুমকি স্বরূপ হবে। ১৯ তারিখ মীর জুমলাকে দিল্লিতে ডেকে নেওয়ার ফরমান হাতে পেলেন আওরঙ্গজেব। দিল্লির এই ফরমান আওরঙ্গজেবকে হতাশার অতল গহ্বরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। মীর জুমলার দক্ষিণ থেকে দিল্লিতে চলে যাওয়া চরম অমঙ্গলের ইঙ্গিত। সমান্তরালভাবে তিনি খবর পাচ্ছেন দারা, সুজার বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন। সেই জন্যেই তার সব থেকে বড় সাথী মীর জুমলার দক্ষিণে থাকাটা খুব জরুরি বলেই আওরঙ্গজেব মনে করলেন। ২২ তারিখ হতাশ সুবাদার মীর জুমলাকে একটা চিঠি লিখলেন নিজের হাতে, সাম্রাজ্যের মন্ত্রীকে বন্ধু সম্বোধন করে, ‘সর্বশক্তিমান তোমায় সাহায্য করুন! আমার নিজের অশান্তি নিয়ে কি আর বলব! আমি জানি না কিভাবে দিন কাটছে! আমার হাতে অন্য কোনও নিদান নেই। ধৈর্য ধর’!

৮। মীর জুমলাকে গ্রেফতার করলেন আওরঙ্গজেব

অবশেষে হঠাতই আওরঙ্গজেব যেন নিজেকে ফিরে পেলেন। অভিজ্ঞ, দক্ষ, বুদ্ধিমান, কুশলী, কূটনীতিতে দক্ষ, অভিজ্ঞ সেনানায়ক, এবং সব থেকে বড় কথা বিপুল ঐশ্বর্যের অধিকারী মীর জুমলা যদি ক্ষমতায় থাকা শাহজাদা দারার সঙ্গে সিংহাসনের যুদ্ধে যোগদেওয়াটা তার পক্ষে সব থেকে বড় দুর্ভাগ্য আর অভিশাপের কারণ হবে। দিল্লির বড় শাহজাদার শেষতম অভিসন্ধি বিফল করতে দক্ষিণের সুবাদারকে সক্রিয় হয়ে মাঠে নামতেই হল। আওরঙ্গজেব জুমলাতুলমুলক মীর জুমলাকে মহম্মদ মুয়াজ্জমকে নিয়ে বীর ছাড়তে নির্দেশ দিলেন ২৭ ডিসেম্বর। কিন্তু কঠোর নির্দেশ দিলেন, তার সঙ্গে দেখা না করে যেন কেউই দিল্লির পথ না ধরেন। জীবনের সব থেকে খোশামুদে চিঠি লিখলেন আওরঙ্গজেব মীর জুমলাকে –অভিহিত করলে, তাঁর সব থেকে বড় বন্ধু, আত্মনিবেদনকারী শুভচিন্তক হিসেবে, এবং বললেন তার প্রজ্ঞার প্রতি আসীম সম্মান রয়েছে — ‘আমি জানি তুমি নিজের কথার ওজনকে সব থেকে বেশি গুরুত্ব দাও। তোমার হিন্দুস্তানে যাওয়া যে আমার ক্ষমতা, শক্তি এবং শৌর্য বাড়াবে তাই নয়, তোমার সফলতা আমার সফলতারূপে চিহ্নিত হবে। আমার হৃদয়ের শুভেচ্ছা রইল। তুমি সাক্ষাতে প্রায়ই বলতে তোমার জীবনের সর্বোচ্চ আশা যে তুমি আমায় মুঘল হিন্দুস্তানের সিংহাসনে দেখতে চাও, এবং সেই লক্ষ্য পূরণে তোমার জীবন তোমার সম্পদ সব উতসর্গীকৃত করেছ। এখন সময় এসেছে তোমার নিজের কথাকে নিজের নিবেদনকে সত্য প্রমান করার। যতক্ষণ তুমি জীবিত রয়েছে, ততক্ষণ আমি আমার জীবনে কাউকে এত গুরুত্ব দিই না। তোমার প্রতি ভালবাসা, পক্ষপাত দেখাতে কেউ আমায় রুখতে পারবে না। আমার কাছে এস। তোমার পরামর্শক্রমে আমি সিংহাসন দখলের পথে অগ্রসর হওয়ার পরিকল্পনা রচনা করব’।

১৬৫৮-র ১ জানুয়ারি মীর জুমলা আহমদনগরে পৌঁছলে তিনি তাকে গ্রেফতার করে দৌলতাবাদ কারাগারে বন্দী করলেন। তার সব সম্পত্তি, ইওরোপিয়দের ব্যবস্থাপনায় রাখা গোলাবারুদ এখন আওরঙ্গজেবের দখল নিলেন। যে সময় তার প্রচুর সম্পদ দরকার, সেসময় মীর জুমলার সম্পত্তি তার হাতে এসে পড়ায়, তার লক্ষ্য পূরণ সহজ হয়ে গেল। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev