| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলা : জগদীশ নায়ারণ সরকার (২৮নং কিস্তি) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ৩৫৬ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ২২ নভেম্বর, ২০২২

পঞ্চম অধ্যায়

সিংহাসন দখলের লড়াই

প্রথম পর্ব

খাজওয়ার লড়াই

খাজওয়ায় মীর জুমলা

দক্ষিণে থেকে তখনও মীর জুমলা খণ্ডেশ এবং কর্ণাটকের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছেন। দিল্লিতে ক্ষমতার হাত বদল হয়েছে। বিদ্রোহী আওরঙ্গজেব-মুরাদ জোট ক্ষমতা দখল করেছে। নতুন সম্রাট হয়েছেন আওরঙ্গজেব আলমগির। দারা বিপুল সম্পদ আর বন্দী বাবা শাহজাহান আর দিদি জাহানারার পরামর্শে আগরা ছেড়ে দিল্লিতে ঘাঁটি গাড়লেন। আওরঙ্গজেব তাঁর পিছু নিলে, তিনি পাঞ্জাব হয়ে সিন্ধু নদীর দিকে পালাচ্ছেন। সম্পদশালী দাদার বিরুদ্ধে লড়াই চালানোর পরিকল্পনায়, বিশাল বাহিনী নিয়ে তাঁর পিছু নিয়েছেন নতুন সম্রাট আওরঙ্গজেব। ১৬৫৮-র সেপ্টেম্বরের দিকে মুঘল হিন্দুস্তানে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যায়। দারার পিছু নেওয়া সম্রাট খবর পেলেন সুজা দিল্লি অভিযানে আসছেন। দারাকে ধরার পরিকল্পনা মাথা থেকে বার করে আওরঙ্গজেব সুজার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে পিছি ফিরলেন। সেনাপতিদের পাঞ্জাব থেকে সুজা বিরোধী অভিযানে ডাকিয়ে নিলেন। মীর জুমলাকেও দক্ষিণ থেকে জলদি তলব পাঠালেন। সম্রাটের ইচ্ছে বাঙলার নবাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মীর জুমলা তাঁকে পরামর্শ দিন, পথ দেখান, এবং জেতার পথ তৈরি করুন।

মীর জুমলা সম্রাটের সমস্যা বুঝলেন। তিনি খণ্ডেশের প্রশাসন বিশ্বস্ত প্রশাসকের হাতে দিয়ে দিল্লি যাওয়ার পরিকল্পনা করলেন। নভেম্বরের শেষে সুজার পথ রোধ করার জন্য আগ্রা থেকে আওরঙ্গজেবের নির্দেশে এলাহাবাদের দিকে মহম্মদ সুলতানের নেতৃত্বে একটি বিশাল বাহিনী রওনা হয়েছে। পাদশাহ ২১ ডিসেম্বর কামান ইত্যাদি সাঁজোয়া অস্ত্র না নিয়ে ঝাড়া হাতপায়ে বড় বাহিনী নিয়ে দিল্লির দিকে ফিরছেন। শাহজাদার সঙ্গে তিনি কোরা-গৌতমপুরে ২ জানুয়ারি ১৬৫৯-তে যোগ দেবেন। খবর পেলেন কোরা-গৌতমপুরে শাহজাদা মহম্মদ সুলতান, শাহ সুজার পথ রোধ করেছেন। সুজা ৩০ ডিসেম্বর কোরা-গৌতমপুরে পৌঁছে একটি বড় সমতল এলাকায় হাতে কাটা হ্রদের ধারে স্কন্ধাবার সাজালেন। সাম্রাজ্যের সৈন্যের শিবিরের থেকে তাঁর তাঁবু তখন আট মাইল দূরে। তাঁর জোর ইওরোপিয়দের নেতৃত্বে দক্ষ গোলান্দাজ বাহিনী। মীর জুমলাও খণ্ডেশ থেকে রওনা হয়ে শাহজাদা আর সম্রাটের মিলিত বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিলেন যুদ্ধের দু-দিন আগে, ৩ জানুয়ারি।

মীর জুমলার আগমনে শাহী সেনা প্রস্তুতিতে চনমনে ভাব এল। ৩ জানুয়ারি আওরঙ্গজেব সম্ভবত মীর জুমলার পরামর্শে, তাঁরই তৈরি করে দেওয়া পরিকল্পনায় যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাপতিদের শাহী টুকরিগুলোর অবস্থান বর্ণনা এবং যুদ্ধনীতি তৈরি করলেন। ৪ তারিখ ভোরে পরিকল্পনা অনুযায়ী সেনা সাজানো হল ‘নব্বই হাজার অশ্বারোহীর চলার খুরের ধুলোয় আকাশ ঢেকে গেল’। সকাল ৮টায় খোদ প্রধান সেনাপতি সম্রাট আওরঙ্গজেব বিশাল যুদ্ধ হাতিতে চড়ে বাহিনী পরিদর্শনে গেলেন। তাঁকে মাঝখানে রেখে বিকেল ৩টে নাগাদ যুদ্ধক্ষেত্রে সুজার বাহিনীর মুখোমুখি হল শাহী বাহিনী। সুজাও বাহিনী সাজেলেন। শিবিরের ১ কিমি দূরে গোলান্দাজ বাহিনীকে মোতায়েন করলেন। নিজে এগোলেন না — মাঝখানের থাকলেন। দিনের আলো থাকতে থাকতে দুপক্ষের টুকটাক গোলান্দাজির দেওয়ানেওয়া চলতে লাগল। বেশি গোলা ছুঁড়ল সুজার বাহিনী। শাহী বাহিনীও তার মত করে উত্তর দিল। খুব বেশি লড়াই হল না। যদিও মাসুম বলছেন রাতেও যুদ্ধ হয়েছে, কিন্তু আলমগিরনামায় অনেক বাস্তবসম্মত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। আমি এই যুদ্ধ বর্ণনায় যদুনাথ সরকারের সঙ্গে আলমগিরনামাও অনুসরণ করেছি।

ছোটখাট গুলিবারুদ আদানপ্রদান হতে হতেই সুজার গোলান্দাজ বাহিনী তার প্রাথমিক অবস্থান ত্যাগ করে, লটবহর নিয়ে পুরনো শিবিরের যায়গায় ফিরে যায় প্রধান সেনাপতির থেকে আগামী কালের যুদ্ধের নির্দেশ নিতে। যুদ্ধের পরিবর্তিত পরিস্থিতি বোঝার সহজাত দক্ষতায় সুজার গোলান্দাজ বাহিনীর ছেড়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ বড় টিলার চূড়া দখল নিলেন মীর জুমলা। শাহী বাহিনীর সেনানায়কেরা রাতভোর কঠোর পরিশ্রম করে ৪০টি কামান তুলে শত্রুর সেনার দিকে তাক করে পরের দিনের সকালের জন্য অপেক্ষা করে রইলেন। আওরঙ্গজেব প্রত্যেক সেনানায়ককে যুদ্ধের জন্য চূড়ান্তভাবে তৈরি থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। সেনাদের বর্ম খোলায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেন তিনি। তারা শীতের রাতে বর্ম পরে থাকল, ঘোড়ার জিন হাওদা নামানো হল না। শুধু অশ্বারোহীরা ঘোড়া থেকে নেমে মাটিতে ঘুমলেন। সেনাপতিরা সারা রাত নিজেদের বাহিনীর সঙ্গে সজাগ থাকলেন। সন্ধ্যে থেকে মাঝ রাত পর্যন্ত মীর জুমলা স্বয়ং সেনা বাহিনীর প্রস্তুতি খুঁটিয়ে দেখলেন। আওরঙ্গজেবের বাহিনী দেহে আর মনে যুদ্ধ প্রস্তুত।

খাজওয়ার যুদ্ধ

৫ জানুয়ারি ১৬৫৯। তখনও ভোর হয় নি। সম্রাট নামাজ আদায় করছেন [কাফিখান বলছেন তখনও ৪/৫ ঘড়ি রাত বাকি আর আহকম বলছে রাতে আড়াই পহরে]। দূরে চিৎকার শোনা গেল। অগ্রগামী বাহিনীর আওয়াজ ক্রমশ জোরে শোনা যাচ্ছে। ঘোড়ার চিৎকার ভারবাহী পশুর দৌড়নোর আওয়াজও বাড়ছে। শাহী সেনাবাহিনীতে বিভ্রান্তি বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ার সুযোগে কিছু সেনা নিজেদের শিবির লুঠ করল। অন্ধকারে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কিছুক্ষণ পরে প্রহরীদের বার্তায় বোঝা গেল শাহী বাহিনীর ডানদিকের অক্ষ রক্ষা করা রাজপুত বাহিনীর নেতা যোধপুরের মহারাজা যশোবন্ত সিংহ বিশ্বাসঘাতকতা করে রাতের অন্ধকারে সুজার বাহিনীর পক্ষ নিয়ে শাহী বাহিনীর ওপর গোলা ছুঁড়েছেন। শোনা যায় যশোবন্ত সুজাকে গোপনে বার্তা পাঠিয়ে বলেছিলেন, তিনি রাতের অন্ধকারে বিশ্বাসঘাতকতা করে নিজেদের বাহিনীর ওপর গোলা ছুঁড়ে উথালপাথাল কাণ্ড ঘটিয়ে দেবেন। গোলার আওয়াজ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্রাট আওরঙ্গজেবকে তৈরি হওয়ার সুযোগ না দিয়েই শাহজাদা সুজা, তার বিশাল বাহিনী নিয়ে ডানদিকে যশোবন্তের অক্ষ হয়ে শাহী বাহিনীর কেন্দ্রে ঢুকে পড়বেন। তার সঙ্গে যোগ দেবে যশোবন্তের ১৪,০০০ ঘোড়সওয়ার। যৌথ বাহিনী শাহজাদা মহম্মদের শিবির তছনছ করে পালিয়ে যাবে। নিজের বাহিনীর ওপর কিছুক্ষণ গোলান্দাজিতে বেশ কিছু ক্ষয়ক্ষতি করে যশোবন্তের বাহিনী পালিয়ে গেল। তারা যে ধাক্কাটা দিতে চেয়েছিল, সেটা স্থায়ী বা জোরালো কোনটাই হল না। মানুচি বলছেন, বিপদের সময়ে মীর জুমলা নতুন করে সেনা বাহিনীর ব্যবস্থাপনা সামলালেন।

শাহী বাহিনী চক্রান্তের ধাক্কা সামলে দেয় দুটি প্রক্রিয়ায় — প্রথমত আওরঙ্গজেবের অসামান্য ঠাণ্ডা মাথা, বাহিনী পরিচালনায় মীর জুমলার রণনৈতিক দক্ষতার মিশেল আর দ্বিতীয়ত, যশোবন্ত সুজাকে যে পড়ে পাওয়া সুযোগ তৈরি করে দিল, সেটি নিতে শাহজাদার ইতস্তত করা। মোদ্দা কথা যুদ্ধের মোড় ঘোরানো পরিস্থিতি না বোঝার অদক্ষতার দাম সুজা দিলেন। সুজা যশোবন্তের বার্তা পেয়েছিলেন, যশোবন্তের তৈরি গোলমালের শব্দও শুনতে পেয়েছিলেন কিন্তু ভরসা করে নিজের শিবির ছেড়ে এগোতে পারেন নি। হয়ত ধারণা হয়েছিল যশোবন্ত, আওরঙ্গজেবের চক্রান্তে তাকে ভুলিয়েভালিয়ে বাহিনীর মধ্যে ডেকে নেওয়ার চাল চেলেছেন, যাতে তাকে গ্রেফতার বা হত্যা করা যায়। সমরবিদ, কূটনীতিবিদ হিসেবে আওরঙ্গজেবের এতই (অ)খ্যাতি ছড়িয়েছিল ছিল যে একদা দারা পক্ষীয় সেনাপতি যশোবন্ত সিংহের পাঠানো বিশ্বাসঘাতকতার বার্তাকে শাহ সুজা ভরসা করতে পারেন নি – তাঁর মনে হয়েছিল এটা আওরঙ্গজেবের ধুর্ত চালও হতে পারে। সুবর্ণ সুযোগ পেয়েও সুজার, শাহী বাহিনীকে আক্রমণের সিদ্ধান্ত না নেওয়ার ফলে বাংলার সুবাদারের জীবন বিপন্ন হল। যদিও ভীমসেন সাক্সেনার দাবি, বিপক্ষকে চিঠি পাঠানোর চক্রান্তটি জুমলার পরামর্শে সুজাকে বন্দী করার জন্যে যশোবন্তকে দিয়ে করিছেন আওরঙ্গজেব। কিন্তু সে সময়ের একটিও পারসিক সাহিত্যে ঘটনাটা যে মীর জুমলার চক্রান্ত, সে তথ্যের সমর্থন পাওয়া যায় না।

মাথা ঠাণ্ডা করে শাহীবাহিনীর বিশৃঙ্খলা মীর জুমলাকে দিয়ে সামাল দিলেন আওরঙ্গজেব। মুহূর্তের মধ্যে বিভিন্ন ডিভিশনের সেনানায়কদের কাছে চৌকিদার পাঠিয়ে উদ্বিগ্ন না হওয়ার বার্তা দেওয়া হল। আওরঙ্গজেবের নেতৃত্বের গুণে সেনাপতিরা বুকে বল পেল। আগের দিনের সেনা সাজানোর পরিকল্পনা একই রেখে শুধু ডান দিকের যশোবন্তের যায়গায় নেতৃত্ব দিতে দেওয়া হল ইসলাম খানকে। বাহিনীর সামনে নিয়ন্ত্রণহীন খোলা মাঠ ছেড়ে দিয়ে মোতায়েন করা হল সঈফ খানকে। আওরঙ্গজেব একমাত্র মীর জুমলাকে ক্ষমতা দিলেন প্রয়োজনমত যুদ্ধের অভিমুখ লক্ষ করে সেনাবাহিনীর আক্রমণ বা প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনার।

ভোরে আওরঙ্গজেব বিশালকায় যুদ্ধ হাতি করে বাহিনীর সাজসজ্জা দেখতে বেরোলেন। যশোবন্তের গোলযোগের ধাক্কায় শাহী বাহিনী কিছুটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে গিয়েছিল। তাঁকে দেখে ইতস্ততভাব করা সেনাপতিরা ফিরে এল। অনেকেই ফিরে এলেন না। তবুও সুজার ২৩,০০০ সেনার তুলনায় আওরঙ্গজেবের বাহিনীর পরিমান দাঁড়াল ৫০,০০০। সামনে আবদুল্লা খানের শিকার বাহিনীর কারোয়ালেরা দাঁড়িয়ে। তাদের পিছনে অগ্রগামী বাহিনীর জুলফিকার খান এবং মহম্মদ সুলতান। ডান দিকে ইসলাম খান। বাঁ দিকে খানইদৌরান আর জয় সিংহের পুত্র কুমার রাম সিংহ। প্রত্যেকের বাহিনীতে ১০,০০০ সেনা। সামনে গোলান্দাজ বাহিনীর ঢাল সাজানো। ইলতিমস বা ছোট অগ্রগামী বাহিনী নিয়ে আছেন বাহাদুর খান। মূল রিজার্ভ ৩,০০০ করে দুদিকে ছড়ানো আছে দাউদ খান এবং সুজন সিংহের নেতৃত্বে। কেন্দ্রে ব্যানার নিয়ে ২০,০০০ সেনা নিয়ে আছেন স্বয়ং সম্রাট। তাঁর ডান দিকে আমিন খান আর বাঁ দিকে মুর্তাজা খান। পিছনে ছোট বাহিনী নিয়ে টহল দিচ্ছেন খাওয়াস খান। তৃতীয় পুত্র মহম্মদ আজমকে নিজের হাতির পিছনে নিয়ে আওরঙ্গজেব ভরকেন্দ্রে আসীন। তাঁর পিছনে সহায়কের ভূমিকায় মীর জুমলা।

শাহ সুজার কাছে খবর ছিল শাহী বাহিনীর বহর ৯০,০০০। ফলে তাঁর ছোট বাহিনীকে নতুন আকারে সাজাতে হয়েছিল। তিনি গোলান্দাজ বাহিনীর পিছনে দীর্ঘ লাইন তৈরি করলেন। তার ডান দিকে রইলেন পুত্র জৈনুদ্দিন মহম্মদ আর সৈয়দ আলম ৫,০০০ বাহিনী নিয়ে, বাঁদিকে হাসান খাসেগি ৪,০০০ সেনা নিয়ে। পিছনে দুদিকে রইলেন ইসফানদিয়ার বেগ সৈয়দ কুলি। কেন্দ্রে দ্বিতীয় পুত্র বুলন্দ আখতার আর ১০,০০০ বাহিনী নিয়ে রইলেন শাহ সুজা। এখানে শেখ জরিফ আর সৈয়দ কাশিমের নেতৃত্বে দুটো রিজার্ভ ছিল।

শাহী বাহিনীর সঙ্গে সুজার বাহিনীর লড়াই শুরু হল সকাল আটটায়। খাজওয়ার যুদ্ধ ছিল দুপক্ষের কামান, হাউই, গাদাবন্দুক এবং হাতে ধরা গ্রেনেড আর সাঁজোয়া বাহিনীর লড়াই। দুপক্ষই দুপক্ষকে সমান তালে আক্রমণ করছে। মীর জুমলা সম্রাটের হাতির পিছনের হাতিতে বসে পরামর্শ দিচ্ছিলেন। সুজার বাঁ দিক থেকে তিনটি আহত উন্মত্ত হাতি নিয়ে সাম্রাজ্যের ডানদিকের সৈন্য স্তম্ভে সৈয়দ আলম আক্রমণ করলে শাহী বাহিনীর দাক্ষিণের যুদ্ধ-অভিজ্ঞ বহু পোড়খাওয়া সেনানায়ক ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। সুজার বাহিনী যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্রাটের হাতির দিকে আক্রমন শানায়। সে মুহূর্তে সম্রাটকে পাহারা দিচ্ছিল মাত্র ২,০০০ সেনা। এটিই ছিল যুদ্ধের নির্ণায়ক সময়। আক্রান্ত সম্রাটের আহত হওয়া বা পালিয়ে যাওয়ার অর্থই হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে গোটা বাহিনীর হার মেনে নেওয়া। বরাবরের মত যুদ্ধে শান্ত, অকুতোভয়, পাহাড়ের মত অটল হয়ে সম্রাট দাঁড়িয়ে থাকলেন। মাহুতকে হাতির চার পা দৃঢভাবে জমিতে শেকল দিয়ে আটকানোর নির্দেশ দিলেন যাতে হাতি ভড়কে পালিয়ে যেতে না পারে। ঠাণ্ডা মাথায় তিনি যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিলেন। তিনি বন্দুকচি জালাল খানকে আক্রমণ করা তিনটে হাতির সামনের হাতির মাহুতকে গুলি করার নির্দেশ দিলেন। মাহুত গুলিবদ্ধ হয়ে পড়ে গেলে। মাহুতহীন হাতিকে ঘিরে ধরল শাহী হাতি বাহিনী। বাকি দুটোর ওপর একইরকমভাবে আক্রমন শানিয়ে ডান দিকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল। লড়াই চললেই বিপক্ষের আক্রমণের ধাক্কা প্রতিহত হল। সম্রাট কিছুটা নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ পেলেন। ছত্রভঙ্গ হওয়া অবিকৃত মুখে ডান দিকের ছড়িয়ে যাওয়া সেনাবাহিনীকে নতুন করে সেনা সাজানোর নির্দেশ দিলেন মীর জুমলাকে, যাতে বাহিনী তার আশ্বাসে নতুন করে বল পায়। মীর জুমলা সংবাদ বাহকদের হাত দিয়ে সেনাপতিদের ভয় না পেয়ে প্রতিআক্রমণের নির্দেশ দিলেন। সেনাপতিরা বাহিনীর সব থেকে দুর্যোগের সময়ে ধীর স্থির সম্রাট আর মাথা ঠাণ্ডা পরামর্শদাতাকে দেখে বুকে বল পেলেন। যুদ্ধের গতি চিরতরে পালটে গেল। সম্রাট ডান, বাম এবং মধ্য – এই তিন পক্ষের শাহী বাহিনীকে একযোগে সুজার বাহিনীর কেন্দ্রে গিয়ে আঘাত করার নির্দেশ পাঠালেন। এই ধাক্কা সুজার পক্ষে সামলানো সম্ভব হল না। সুজা হাতি থেকে নেমে ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে গেলেন। যুদ্ধ তখন অনেকটা সমানে সমানে চলছিল। কিন্তু সুজা আওরঙ্গজেবের মত নিপুল আক্রমণের সামনে দাঁড়িয়ে নার্ভ ধরে রাখতে পারলেন না। পশ্চিমি মুসাফিরেরা বলেছেন সুজা জিততেও পারতেন। হাতি থেকে নামার ফলে সুজার পরাজয় হয় – বার্নিয়ের এই বিশ্লেষণ ব্যবহার করেছেন ঐতিহাসিক স্টুয়ার্ট। যদুনাথ সরকার বলছেন এটা স্রেফ বাজারি গুজব। চাপে পড়ে সুজার পালিয়ে যাওয়ার তথ্য তাঁর সময়ের একজনও পারসিক ঐতিহাসিক লেখেন নি। বিন্দুমাত্র বিশ্বাসযোগ্য তথ্য নয়। সুজা যখন বুঝলেন তার আর জেতার আশা নেই, তিনি ঘোড়ায় চেপে দ্রুত গতিতে পালালেন।

সাম্রাজ্যের ঐতিহাসিকেরা আওরঙ্গজেবের এই যুদ্ধ জয়ে সর্বশক্তিমানের হাত দেখেছেন কেননা সুজার আক্রমণে আওরঙ্গজেবের বাহিনীর নানান দিকের ফাঁকফোকর খুলে হাট হয়ে পড়ছিল। আওরঙ্গজেবের শক্তি ছিল সেনাবাহিনীর প্রাচুর্য। তবে এই বিশ্লেষণেরও ভিত্তি নেই। অন্তত দ্বিগুণের বেশি সেনা ছিল আওরঙ্গজেবের বাহিনীতে। সুজার সেনাপতিদের বিশ্বাসঘাতকতাও সুজার হারে একটা বড় ভূমিকা পালন করেছে। কাম্বু বলছেন, মুরাদ কাম সাফাভি (মুকররম খান) এবং আবদুল রহমান সুলতান (বলখের প্রাক্তন রাজা নজর মহম্মদ খানের পুত্র) পক্ষ পরিবর্তন করে সুজার সেনার দিকে আক্রমণ শানালে সুজা সে সমস্যা সামাল দিতে পারেন নি এবং তার পরেই সুজার সমস্ত প্রতিরোধ চুরচুর হয়ে ভেঙ্গে পড়ে।

তবে অধিকাংশ পারসিক ইতিহাসেই খাজওয়া জয়ে মীর জুমলার অবদানের কথা লেখা নেই। হয়ত তাদের মনে হয়েছিল, তাতে সম্রাটের সম্মান হানি হবে। তবে কিছু পারসিক ইতিহাস এবং মানুচির লেখাতে মীর জুমলার অবদানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ব্রিটিশ কুঠিয়াল সূত্র থেকে জানতে পারছি, সেই যুদ্ধে মীর জুমলা যুদ্ধের গতিপথ সুজার থেকে আওরঙ্গজেবের দিকে টেনে নিয়ে আসতে ব্যক্তিগত দক্ষতার স্বাক্ষর পেশ করেছিলেন। মীর জুমলা আওরঙ্গজেবের দক্ষিণ হস্ত ছিলেন, তারই যোগ্য মন্ত্রণায় আওরঙ্গজেব যুদ্ধের রণনীতি পাল্টেছিলেন। মীর জুমলার নিজস্ব দক্ষ সাঁজোয়া বাহিনী ছিল। তাদের গোলাগুলি ব্যবহারের কুশলতা প্রবাদপ্রতিম। শাহী ঐতিহাসিকেরা লিখছেন বাঁশের মধ্যে বারুদ ভরে বিশেষ ধরণের হাউই তৈরি করেছিলেন তিনি। সেটি গ্রনেডের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর ছিল। বালেশ্বরের কুঠিয়াল সুজার ভুল চালে তাঁর হারের নিদান খুঁজেছেন। তাঁরা মনে করেন এই যুদ্ধে আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলার দক্ষতা আর সুজার অযোগ্য রণনীতিতে বাংলার নবাব ১২,০০০ পদাতিক হারান। কুঠিয়ালের বিশ্লেষণের সঙ্গে কাম্বুর দেওয়া সূত্র অনেকটা মিলে যায় — তিনি বলছেন হাত হাউই (হুক্কাদারণ) বাতাসে ভর দিয়ে উড়ে গিয়ে পড়ত বিপক্ষের বাহিনীতে আর তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিত। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev