দ্বিতীয় খণ্ড
সিংহাসনের যুদ্ধ মুঘল হিন্দুস্তানের পূর্বদেশের দিকে ঢলল
সুজাকে ধাওয়া করলেন মীর জুমলা
৫ জানুয়ারি যুদ্ধে হেরে রণক্লান্ত, বিধ্বস্ত, হতাশ, বিষণ্ণ সুজা বিহারের দিকে পালিয়ে গেলেন, যেন তার রেকাবে পা নেই, হৃদয়ে আর শক্তি অবশিষ্ট নেই। সুজাকে নিঃশ্বাস ফেলার সময় না দিয়ে, মীর মহম্মদকে তার পিছনে লাগিয়ে দিলেন আওরঙ্গজেব। সম্রাট খাজওয়ায় আরও এক সপ্তাহ থাকলেন।
মীর জুমলাও সম্রাটের সঙ্গে কিছু দিন রইলেন। ১১ জানুয়ারি সম্রাট তাকে ৭ হাজারি মনসবদারিত্বে (হফত হাজারি হফত হাজার সওয়ার) সম্মানিত করলেন। সাম্রাজ্য সেবার স্বীকৃতি স্বরূপ আরও কিছু পছন্দের উপহারও দিলেন। খাজওয়া থেকে ফেরার পথে মীর জুমলা সম্রাটের সঙ্গে গঙ্গার দিকে ঘুরতে গেলেন। ১৪ জানুয়ারি দিল্লির পথে রওনা হওয়ার আগে, সম্রাট মীর জুমলাকে পলাতক ভাইয়ের খোঁজে এবং স্থানীয়দের হাত থেকে বিহার-বাঙলা উদ্ধারের দায়িত্ব দিলেন। সবথেকে বড় কথা, তার পুত্রের আতালিক (দিগদর্শক, শিক্ষক) হওয়ার অনুরোধ করলেন। তুর্কো-মোঙ্গল কৃষ্টিতে শাহজাদার আতলিক হওয়া খুব বড় সম্মানের বিষয় ছিল। বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানী এবং দক্ষ ব্যক্তিত্বই এই অভূতপূর্ব শাহী সম্মান পেয়েছেন। মুঘল সেনাবাহিনীর রীতি অনুযায়ী মীর জুমলা এবং শাহজাদাকে মিলিয়ে একটা যৌথ কামান তৈরি হল। মীর জুমলাই সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ, বহাল আর বরখাস্তর চূড়ান্ত ক্ষমতা পেলেন। ৭০ বছরের বৃদ্ধ মীর জুমলা নতমস্তকে ৪০ বছরের যুবা সম্রাটের দেওয়া এই গুরু দায়িত্ব নিজের মাথায় তুলে নিলেন। সম্রাটকে প্রতিশ্রুতি দিলেন, শত্রুর হাত থেকে বাংলার সিংহাসন এবং রাজমুকুট বাঁচিয়ে তাঁর ভাইকে সমুদ্রের জলে ছুঁড়ে ফেলবেন।
১৪ জানুয়ারির কিছু সময় পরে শাহজাদা মহম্মদ সুলতানের বাহিনীকে জোরদার করতে চললেন মীর জুমলা। শাহজাদার বাহিনীর সঙ্গে মীর জুমলার বাহিনী যোগ দেওয়ার পরে শাহী বাহিনীর আকার দাঁড়াল ৩০ হাজার সেনার। আলমগীরনামা সূত্রে মীর জুমলার সঙ্গে থাকা ২৭ জন সেনানায়কের নাম হল ১। জুলফিকার খান (তাবরেজি), ২। ইসলাম খান (বাদাকশি), ৩। কুঁয়র রাম সিংহ, ৪। দাউদ খান (কুরেশি), ৫। ফিদায়ি খান (বাখরাজি), ৬। রাজা ইন্দ্রদুম্ন ধামধেরা, ৭। রাও ভাও সিংহ হাদা (রাও ছত্রশালের পুত্র), ৮। ইশতিশাম খান, ৯। ফতে জঙ্গ খান (রুহেলা), ১০। রাও অমর সিংহ চন্দ্রাওয়াত, ১১। ইখলাস খান খোয়েসগি, ১২। খাওয়াস খান, ১৩। এক্কাতজ খান (আসল নাম আবদুল্লা), ১৪। রশিদ খান (আনসারি), ১৫। লোদি খান, ১৬। সৈয়দ ফিরোজ খান বারহা, ১৭। সৈয়দ শের খান বারহা, ১৮। সৈয়দ মুজাফফির খান বারহা (খানইজাহান), ১৯। জবরদস্ত খান (রুহেলা) ২০। আলি কুলি খান, ২১। কিজিলবাস খান, ২২। ইস্কন্দর রুহেলা, ২৩। কাকার খান, ২৪। দিলোয়ার খান, ২৫। নেকনাম খান, ২৬। নিয়াজি খান, ২৭। কাদিরদাদ আনসারি এবং আরও বহু ছোট বড় সেনানী। সম্রাট মীর জুমলাকে নির্দেশ দিলেন দুর্ধর্ষ রোজবিহানী সেনা — রাসুল, মহম্মদ এবং চিরাগকে সঙ্গে নিতে। তাদের প্রত্যেকেই যুদ্ধবিদ্যায় চরম অভিজ্ঞ, দৌড়বীর, এবং আত্মনিবেদনের মূর্ত প্রতীক। বাদশাহ বললেন আহমদ এবং মহম্মদ মুরাদও খুব সাহসী এবং দাঙ্গাকারী, তাদেও সঙ্গে নিতে হবে।
২। খাজওয়া-পাটনা
পলাতক শাহজাদা শাহ সুজা খাজওয়া থেকে ৩০ মাইল গেলেন চার দিনে। এলাহাবাদে গঙ্গা পেরিয়ে ঝুসিতে শিবির ফেললেন। সাম্রাজ্যের সৈন্য বাহিনী এগিয়ে আসছে খবর পেয়ে একদা এলাহাবাদের দারার সেনানায়ক, পরে সুজার দিল্লি অভিযানের সঙ্গী তাহাওয়ার খান উপাধি ওয়ালা বারহার সৈয়দ, সৈয়দ কাশিম, আওরঙ্গজেবের সেনানায়ক বাহাদুর খানের হাতে নিজের খানইদৌরানটি দুর্গ সঁপে দিলেন ১২ জানুয়ারি। বেনারসের পাঁচ মাইল পূর্বের গঙ্গার তীর বাহাদুরপুরে পৌঁছে বেনারসের তার পূর্ব-শিবিরের জন্য কাটা পরিখা এবং সুরক্ষা দেওয়াল সারালেন, ঢালু যায়গায় (র্যাম্পার্ট) চুনার থেকে আনা ৭টি কামান বসালেন, অন্যান্য দুর্গ থেকে আরও কামান আনার পরিকল্পনা করলেন। মনস্থির করলেন অনুসরণকারীদের এখানেই জবাব দেবেন। বিপদ ঘণ হয়ে এলে গঙ্গায় নোঙ্গর করা ছিপ নৌকোর বহর নিয়ে পালানোর ব্যবস্থা করে রাখলেন।
রাস্তায় বিন্দুমাত্র দেরি না করে মীর জুমলা এলাহাবাদে মহম্মদ সুলতানের বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিলেন। শাহজাদার কাছে খুড়োর বেনারসে উঁচু টিলায় রাখা ৭টি কামানের প্রস্তুতির খবর পৌঁছল, কিন্তু এটাও জানাগেল বাহাদুরপুরে কাকা ভরা গঙ্গা নদী পার হতে পারেন নি নৌকোর অভাবে। মীর জুমলা শাহজাদাকে পরামর্শ দিলেন চুনারের দিক থেকে এগোনোর। গঙ্গার ওপরের প্রবাহের দিকে এগিয়ে মীর জুমলার পরামর্শে শাহজাদা এলাহাবাদে হেঁটে নদী পার হয়ে ৪ দিনের মাথায় খেরি এবং কুন্তিত হয়ে চুনার পৌঁছলেন। সাম্রাজ্যের নির্দেশে অযোধ্যার সুবাদার ফিদায়ি খান গোরখপুর থেকে গঙ্গার উত্তর পাড় ধরে পাটনার দিকে এগোলেন। শাঁড়াশি আক্রমণের সম্ভাব্যতার আশংকায় সুজা হতাশ হয়ে বাহাদুরপুর থেকে পাটনার পানে রওনা হলেন; শহরে না ঢুকে শহরের বাইরে তিনি জাফর খানের বাগানে এলেন ১০ ফেব্রুয়ারি ১৬৫৯। শাহজাদা মহম্মদ সুলতান বেনারসের চাচার ছেড়ে যাওয়া পরিখা ঘুরে দেখলেন, দুদিন বিশ্রাম নিয়ে মীর জুমলার পরামর্শে এবং পথ নির্দেশনায় পাটনার দিকে চললেন।
৩। পাটনা-মুঙ্গের
পুত্রের বিয়ে উপলক্ষ্যে সুজা পাটনার পূর্ব দিকের অঞ্চলে বহুদিন নষ্ট করে পাটনার ২০ মাইল পশ্চিমে পৌঁছলেন। পিছনে ভীম বেগে, পরিকল্পনামাফিক তাড়া করছে মীর জুমলার নেতৃত্বে সাম্রাজ্যের বাহিনী। সামনে বিশাল চওড়া উপত্যাকার নিরাপত্তাহীনতা, সুরক্ষার অভাবে চিন্তিত এবং আশংকিত হয়ে সুজা আরও পূর্বের দিকে মুঙ্গেরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। পৌঁছলেন ১৯ ফেব্রুয়ারি। তাকে ধাওয়া করা অগ্রগামী সাম্রাজ্যের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ খাড়া করার জন্য তৈরি হলেন (১৮ ফেব্রুয়ারি-৬ মার্চ)। শহরের নিরাপত্তা খুঁটিয়ে দেখে সেটির সুরক্ষা আরও জোরদার করলেন। গঙ্গার তীর আর দক্ষিণের পাহাড়ের নিচের দুর্গের মাঝখানের পুরোনো নড়বড়ে দেওয়াল সারালেন। শহর জুড়ে যে সব উঁচু এলাকা ছিল সেখানে আক্রমণাত্মক হাতিয়ার যেমন, কামানের সারি, হাতি-উটের সুভেল, হাউইওয়ালা, বন্দুকচিদের সাজিয়ে বসালেন। বিভিন্ন রণনৈতিক কোণে বিদেশি সেনানায়ক গোলান্দাজদের বসিয়ে পাহাড়ের তলার গুরুত্বপূর্ণ এলাকাটি (দামিনিকোহ) খড়গপুরের রাজা, রাজা বাহারোজের হাতে তুলে দিলেন।
সুজা পাটনা ছেড়ে যাওয়ার ৮ দিনের মাথায় ২২ ফেব্রুয়ারি পাটনায় পৌঁছে অপেক্ষারত ফিদায়ি খানের সেনার সঙ্গে যোগ দিল শাহী বাহিনী। মীর জুমলা বিহারের সুবাদার নির্বাচন করলেন দাউদ খানকে। মুঙ্গেরের দিকে রওনা হয়ে যাওয়ার সময় খবর পেলেন জেকপুরায় বিরোধীপক্ষ জোরদার নিরাপত্তার চাদরে শহরকে মুড়ে ফেলেছে। মার্চের শুরুর দিকে মুঙ্গেরের পথে প্রচুর বাধা পেয়ে কী ধরণের রণনীতি অবলম্বন করা যায়, সে বিষয়ে শাহজাদা পরামর্শের জন্য মীর জুমলার দ্বারস্থ হলেন। সুজার ছিদ্রহীন নিরাপত্তায় আঘাত না করে মীর জুমলা ঠিক করলেন তার পিছনের সরবরাহের যে শিকলি সুজা তৈরি করেছেন সেটিকে কেটে দেওয়ার। সোনাদানার উপঢৌকন আর কার্যকরী শাহী হুমকি এবং ‘উপযুক্ত’ পরামর্শে মোড়া চিঠি দিয়ে তিনি রাজা বাহারোজকে হাত করে খড়গপুর পাহাড়জুড়ে রাজমহলের কঠিন পথ চড়াইউতরাই ভরা ঘুরপথে পাহাড়ি হিংস্র জন্তু, পথ রোধ করা দ্রুম, পাহাড়ি সমাজভরা এলাকা সে সময় যার নাম ছিল ‘বাড় জঙ্গল’, নিশানা লাগিয়ে সহজ করে নিলেন। মীর জুমলা শুধু শুধু রক্তক্ষয়ী মুখোমুখি লড়াই এড়ালেন তাই নয় এবং অযথা শক্তি ক্ষয় না করে পরিকল্পিত রণনীতির মাধ্যমে শত্রুকে পিছনে ছেড়ে বহু পথ এগিয়ে গেলেন। জুলফিকার খানকে দিয়ে কাঠুরে আর নিজের বাহিনীর বেলদারদের কাজে লাগিয়ে তিনি পথের বাধা বিশাল বিশাল গাছ কাটলেন। গাছভরা পাহাড় পেরিয়ে শাহজাদাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুর পথে মীর জুমলা মুঙ্গেরের সমতলে পৌছলেন।
৪। মুঙ্গের-গিরিডি
বিশ্বস্ত জমিদারের বিশ্বাঘাতকতা, পলাতক শাহজাদার বাহিনীকে হতবুদ্ধি করে দেওয়া সম্রাটের সেনাপতির রণনীতির ধাক্কা সহ্য করতে না পেরে ৬ মার্চ সুজা আবার পালালেন। আলমগিরনামা থেকে আমরা জানতে পারছি, তিনি তেলিয়াগিড়ি পেরিয়ে রাঙ্গামাটি এলেন। রাঙ্গামাটিতে ১৫ দিন শিবির ফেলে (১০-২৪ মার্চ) নাওয়ারা (যুদ্ধ নৌকো বহর) সক্রিয় করে নদী পাহারায় বসালেন। গড়ি বা তেলিয়াগড়ির সুরাক্ষা কামান দিয়ে সাজালেন। বীরভূম আর ছোটনগরের জমিদার খোওয়াজা কমল আফগানকে গঙ্গা থেকে বীরভূম পর্যন্ত অঞ্চল রক্ষার দায়িতে দিলেন, যাতে পাহাড় থেকে নেমে আসা মীর জুমলার যে কোন ঝটতি আক্রমন প্রতিরোধ করতে পারেন।
মুঙ্গের থেকে ৪০ মাইল পূর্ব পিয়ালাপুরে অবস্থান করার সময়ে মীর জুমলা খবর পেলেন শাহ সুজা আরও পূর্বের দিকে পালাচ্ছেন। মহম্মদ সুলতানের কিছু সেনা নতুন দখল করা অঞ্চলে রেখে, প্রশাসনিক এবং বাকি সেনা না আসা পর্যন্ত দুর্গের সুরক্ষারভার অস্থায়ীভাবে মহম্মদ হুসেইন সালদুজের ওপর দিয়ে নিজে বাহিনী নিয়ে ছুটলেন সুজার পিছনে। পিয়ালপুরে শুনলেন সুজা গড়িতে তাঁবু ফেলেছেন। তিনি সম্রাটের মহম্মদ সুলতানের বিপুল বাহিনী নিয়ে গেলেন রাজমহলের কাছে যাতে সুজার পালিয়ে যাওয়ার রাস্তায় বাধা তৈরি করা যায়। গঙ্গা থেকে দক্ষিণের পাহাড় পর্যন্ত এলাকার সুজার সুরক্ষা ঢাল সাজানো ছিল বিপুল সাঁজোয়া বাহিনী সাজিয়ে আর গঙ্গার রাস্তা পাহারা দিচ্ছিল নাওয়ারা বহর। সেই সময়ে বাঙলার প্রবেশপথ বলে পরিচিত তেলিয়াগড়ি এবং সকরিগলিকেও এই সুক্ষা বহরের মধ্যে জুড়ে নেন শাহ সুজা।
সুজার জোরদার সুরক্ষার বহরের খবরে মহম্মদ সুলতান মীর জুমলাকে প্রশ্ন করলেন, তিনি কি সরাসরি গড়িতে সরাসরি গিরিসঙ্কট দিয়ে আক্রমণ করবেন? শোনা যায় মীর জুমলা তাকে কিছুটাই ব্যঙ্গভরে বলেছিলেন, ‘তোমার ক্ষেত্রে এটি অসম্ভব নয় কেননা তুমি প্রখ্যাত তৈমুরের বংশধর, এই কাজে তোমার উপযুক্ত কেউ নেই, কিন্তু, এই ধরণের (গিরি) যুদ্ধে প্রচুর মানবসম্পদ ক্ষয় হয়, ফলে এই অঞ্চলে যুদ্ধ করা উচিত নয়। যে কাজ কূটনৈতিক এবং কৌশলী রণনীতিতে কাজে সম্পন্ন করা যায়, সে কাজে কেন লোকক্ষয় করব? ফলে আমার সামনের মূল কাজ, যুদ্ধ না করে প্রজ্ঞা এবং নীতিকৌশলে (তবদির) কাজ উদ্ধার।’
৫। গড়ির কাছে মীর জুমলার রণকৌশল পরিবর্তন
মুঙ্গেরে দেখেছি, বর্তমানে এখনও দেখছি, কৌশল আর কূটনীতিকে তাঁর শক্তি বানিয়ে ফেলে কাজ উদ্ধার করে চলছিলেন মীর জুমলা। আবারও তিনি সুজার বিরুদ্ধে রণনীতি হিসেবে পথ ধরলেন বিপুল অর্থ ছড়িয়ে। বীরভূমের জমিদারকে তিনি স্বপক্ষে নিয়ে এলেন যেভাবে তিনি খড়গপুরের জমিদারকে সাম্রাজ্যের পক্ষে নিয়ে এসেছিলেন। এই রণনীতিতেই আগামী দিনের পথের সুরক্ষা অর্জন করলেন। মুঙ্গেরের দক্ষিণ-পূর্ব পাহাড়ি অঞ্চলটি মানুষখেকো হিংস্র শ্বাপদে পরিপূর্ণ। অঞ্চলের ফলাবনত গাছ এবং খাদ্য এবং পানীয় জল সরবরাহের জন্য চাষের জমিতে ক্ষতি না করে তিনি এগিয়ে চলার পরিকল্পনা করলেন। এই দুটি বিষয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে রাজা বাহারোজের পণ্য সরবরাহের দক্ষতাকে শাহী বাহিনীর সঙ্গে জুড়ে নিয়ে ঝাড়খণ্ডের পথে পা বাড়ালেন মীর জুমলা।
মীর জুমলা এবং জুলফিকারের নেতৃত্বে হাতির যূথ আর ঘোড়সওয়ার বাহিনীর সাহায্যে কাঠুরে এবং বড় কুঠার নিয়ে পথ দেখানো শাহী বাহিনীর বেলদারেরা গাছ কেটে পথ তৈরি করল। বাহিনীকে তৈরি করা পথ বোঝাতে পথের দুপাশে পতাকা পুঁতে দেওয়া হল। সেনাবাহিনী নতুন তৈরি পথে শুধু দিনের বেলা চলল এবং রাতে বিশ্রাম নিল। ঝাড়খণ্ড বাংলায় ঢোকা পথটা সরু, ন্যাড়া পাহাড়ি গিরিসংকটে পরিপূর্ণ এবং অঞ্চলে গাছগাছালির বিন্দুমাত্র চিহ্ন নেই। বেহুদা পথটি ধরে মীর জুমলার নেতৃত্ব এবং শৃঙ্খলার জোরে শাহী বাহিনী তুরন্ত গতিতে এগিয়ে চলল। বাহিনীর ডানদিকে ছিল রথ নিয়ে ২,০০০ সেনার সেনানায়ক জুলফিকার, বাঁদিকে ইসলাম খান এবং ফিদায়ি খান ৫০০০ করে সেনা নিয়ে, ১৫টি ঘোড়সওয়ার বাহিনীর সুরক্ষায় শাহজাদাকে সামনে রেখে থাকলেন মীর জুমলা, কুঁয়র রাম সিং, ইখলাস খান খোয়েসগি, রাও ভাও সিং হাদা, সৈয়দ মুজফফর খান। বাঁদিকে অতিরিক্ত সুরক্ষা হিসেবে ২০০০ সেনা নিয়ে দাউদ খান এবং ডনদিকের ২,০০০ সেনা নিয়ে রশিদ খান। পথে গভীর জঙ্গল পার হতে ১২ দিন লাগল। এর পরে খোয়াজার জমিদারি, উখলা (উখড়া) এবং সিউড়ি পেরিয়ে বীরভূমের সমতলে শাহী বাহিনী পৌঁছল ২৮ মার্চ।
৬। রাজপুতেরা ছেড়ে গেল
প্রকৃতির প্রতিবন্ধকতা মীর জুমলা জয় করতে পারেন। কিন্তু মানুষের অবিশ্বাস, স্বার্থবোধ এবং ভীরুতার দাওয়াই তাঁর কাছে ছিল না। অভিযানের শেষের দিকে কুঁয়র রাম সিং (মীর্জা রাজার পুত্র), রাও ভাও সিং (রাজা ছত্রশাল হাদার পুত্র), অমর সিং, চতুর্ভূজ চৌহানের মত রাজপুত সেনানায়কেরা মীর জুমলাকে ছেড়ে আগ্রার পথে ফিরে যান। অপ্রত্যাশিত এই বিশ্বাসঘাতকতায় মীর জুমলার সেনাবাহিনীর শক্তি অনেকটা কমে গেল। রাজপুতদের আগরা ফিরে যাওয়ার দুটি কারণ ঐতিহাসিকেরা দিয়েছেন। সুজাপন্থী ঐতিহাসিক মাসুমের বক্তব্য, রাজপুতেরা যে পরিমান অর্থ দাবি করেছিলেন মীর জুমলা সেটা পূরণ করেন নি। শোনা যায় তাদের দাবির উত্তরে মীর জুমলা বলেছিলেন, ‘আপনারা সাম্রাজ্যের জায়গিরদার এবং বিপুল পরিমান বেতন পান। (এখন অভিযানের সময়) বেশি সম্পদ খরচ করা উচিৎ হবে না। এই মুহূর্তে আপনাদের এত বড় চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। যখন বাঙলা দেশ দখল হবে, দারোগা নির্বাচন হবে, তখন আপনাদের চাহিদা পূরণ করা যাবে।’
এই ঘটনাকে পরবর্তী কালের উপনিবেশিক আমলের ঐতিহাসিকেরা সাম্প্রদায়িক রঙে রাঙিয়ে উপস্থাপন করেছেন। রাজপুত সেনানী রাম সিং, ভায়োঁ সিং নাকী শুনেছিলেন আওরঙ্গজেব রাজস্থানে মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ বানাচ্ছেন, হিন্দুদেরও ধরে ধরে কতল করবার পরিকল্পনা করেছেন। রাজপুতেরা নিজেদের জীবনও মীর জুমলার সেনাপতিত্বে খুব একটা সুরক্ষিত বোধ করছিলেন না। ধর্মীয়ভাবে অসুরক্ষিত বোধ করায় তারা ধর্মান্ধ সম্রাটের সেনাবাহিনী ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
কিন্তু এই ব্যখ্যা কতদূর যৌক্তিক সেটা আজ ভেবে দেখার। মনে রাখা দরকার সব রাজপুত সেনানী কিন্তু মীর জুমলাকে ছেড়ে যান নি। রাজা ইন্দ্রদুম্ন শাহী বাহিনীর সঙ্গে থেকে যান। আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আমরা ভুলে যাই, দুই রাজপুত পলাতকের সঙ্গে যোগ দিলেন দুই মুসলমান সেনাপতি শের বেগ এবং সৈয়দ সুজাত খান। এটা শুধু অমুসলমানেদের বাহিনী ছাড়ার ঘটনা ছিল না। আজ আমরা জানি রাজপুতদের বিশ্বাসঘাতকতা শুধুমাত্র আর্থিক দাবিদাওয়া পূরণ না হওয়ার জন্যে হয় নি, এটা ছিল স্রেফ বাহানা। শাহী বাহিনী ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সঙ্গে জড়িয়েছিল মুঘল সাম্রাজ্যের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে চলতে থাকা সিংহাসন লড়াইএর একটা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক-সামরিক ঘটনার ভুল সংবাদ পাওয়া।
বাহিনী থেকে রাজপুত এবং অন্যান্য সেনাপতির ছেড়ে চলে যাওয়ার খবরে স্বয়ং সম্রাট আওরঙ্গজেব তদন্তের নির্দেশ দিলেন আলিকুলি খানকে। তিনি এটির মূল কারণ খুঁজে বার করেন। তদন্তের সমীক্ষাটি সরকারি ইতিহাস, আলমগীরনামাতে উল্লিখিত রয়েছে। আজমেঢ়ে (দেওরাই ১৪-১৪ মার্চ) শাহী বাহিনীর বিরুদ্ধে দারার জেতার মিথ্যা সংবাদ এবং আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্যে পালিয়ে যাওয়ার একটা উড়ো খবর আসে পিয়ালপুরে। এই দুটি খবর জুড়ে, একে সম্রাটের পরাজয় ভেবে সেনাবাহিনীর একটি অংশ হতোদ্যম হয়ে পড়ে। রাজপুতদের ধারণা হল যুদ্ধ জিতে রাজপুতানাজুড়ে দারা তাদের সমাজের প্রতি প্রতিহিংসার নামিয়ে আনতে পারেন। এছাড়াও সুজাকে তাড়া করতে গিয়ে যেভাবে মীর জুমলা ঘুরপথ ধরেছেন, তাতেও বাহিনীর সেনাপতিদের মীর জুমলার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে সন্দেহ জাগছিল। তাদের মনে হচ্ছিল দারার জয়ের সংবাদ মীর জুমলার কাছেও পৌঁছেছে। তিনি হয়ত পথ খুঁজছেন আওরঙ্গজেবের পালানোর পথ ধরে শাহজাদা সুলতান মহম্মদকে সঙ্গে নিয়ে গোপন দাক্ষিণাত্যে পালিয়েও যাওয়ার।
পলাতকেদের বোঝানোর বা শাস্তি দেওয়ার পথে না গিয়ে মীর জুমলার বাহিনী তখনও প্রায় ২৫,০০০ পদাতিক সমৃদ্ধ, দারার প্রায় দ্বিগুণ, আরও দুরন্ত গতিতে আঘাত করার পরিকল্পনাকে এগিয়ে চলল। (চলবে)