১। মীর মহম্মদের পারস্য থেকে প্রস্থান
সেই কবে থেকেই বিদেশী ভাগ্যসন্ধানী আর মুসাফিরদের প্রিয় দেশ ভারতবর্ষ। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শত থেকে সপ্তম শত পর্যন্ত ইসলাম পূর্ব সময়ে পারসিকেরা ভারতবর্ষে এসেছেন কেউ বাস করতে, কেউ সুফি হিসেবে, কেউ জয় করতে, কেউ জ্ঞান অর্জন বা জ্ঞান বিতরণ করতে, কেউবা প্রশাসনিক কাজে, কেউ ভাড়াটে সেনা হিসেবে, কেউ আবার রাজত্ব কায়েম করতে। পারস্য বৃহত্তর সাধারণ ইসলামি আন্দোলনের অংশ হয়ে উঠলে, পারস্য থেকে ভারতবর্ষে অভিবাসনের প্রবণতা আরও বাড়তে থাকে। মধ্যযুগে পারস্য ছিল এশিয় সভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশিদার। স্বাভাবিকভাবে পারস্য থেকে বহু প্রখ্যাত ভারতবর্ষে অভিবাসিত হয়ে এসে ইতিহাসের পাতায় স্থায়ীভাবে ঠাঁই করে নিয়েছেন। অভিবাসিত প্রখ্যাতদের মধ্যে প্রধানতমরা ছিলেন মহম্মদ গাওয়ান, মীর্জা গিয়াস বেগ, ইতিমদ্দৌলা, মীর্জা রুস্তম সাফাভি, মীর জুমলা ইত্যাদি। মাথায় রাখতে হবে শুধু মুঘল হিন্দুস্তান নয়, দাক্ষিণের সুলতানি রাজত্বগুলোর সঙ্গেও পারস্যের আরও গভীর সখ্যের কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। এমন কী দক্ষিণের রাজ্যগুলোয় পারসিকেরা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে আসীনও হয়েছেন। অথচ মুঘল হিন্দুস্তানে উল্টো ঘটনা। পারসিকেরা সেখানে সেনাবাহিনীতে এবং অসামরিক প্রশাসনে অংশ নিতেন। তাঁদের পক্ষে ক্ষমতার উচ্চতমপদে আসীন হওয়া সম্ভব হয় নি। মীর মহম্মদ সৈয়দ মীর জুমলার ক্ষেত্রে এই ঘটনা ব্যতিক্রম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল; তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক সিঁড়িতে আরোহন করে উজির, দেওয়ানিকুল বা প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হয়েছেন। পারসিকদের ক্ষেত্রে এটাকে সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম হিসেবে ধরতে হবে। তাঁকে মুঘল সরকারের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রের উচ্চতম উপাধিও দেওয়া হয়েছিল।
মীর মহম্মদ সৈয়দ আর্দিস্তানি তাঁর নাম। কিন্তু আমরা তাঁকে চিনি উপাধি মীর জুমলা নামে। মীর জুমলা পাওয়া উপাধি – তিনি ইতিহাসে এই নামেই প্রখ্যাত হয়েছেব। মীর জুমলা উপাধি বহু যুগে বহু সরকারি আমলা, অভিজাত পেলেও ইতিহাসে এক সময় আওরঙ্গজেবের ডান হাত, প্রধান সেনাপতি, বাংলার নবাব মীর মহম্মদ সৈয়দই মীর জুমলা নামে এক ডাকে আজও চিহ্নিত হন। তাঁর পারিবারিক নাম গণ ইতিহাস আর স্মৃতি থেকে প্রায় মুছে গেছে। মীর জুমলা উপাধি ছাড়াও তাঁকে প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস চেনে মুয়াজ্জম খান, খানইখানান, সিপাহসালার, ইয়ারইবফাদার উপাধিধারী আমলারূপে। পারিবারিক নামে ব্যবহৃত শব্দগুলো থেকে পরিষ্কার পারস্যের ইস্পাহানের আর্দিস্তান শহরে অভাবী সৈয়দ পরিবারে তাঁর জন্ম। জন্ম সাল ১৫৯১। ইসপাহান এক সময় ইরাণের রাজধানী ছিল। তাঁর পিতার নাম মির্জা হাজারু, আর্দিস্তানের অখ্যাত তেল ব্যবসায়ী। পরিবারে নিদারুণ গরীবি সত্ত্বেও ছোটবেলায় মীর জুমলা মন দিয়ে পড়াশোনা আর প্রয়োজনীয় জ্ঞানার্জন করেন। পড়াশোনায় সাফল্য তাঁকে জনৈক হিরে ব্যবসায়ীর দপ্তরে কাজ জুটিয়ে দেয়। আর্দিস্তানের সেই ব্যবসায়ীর দক্ষিণ ভারতের গোলকুণ্ডার হিরে খনির সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল। গোলকুণ্ডা ছিল সে সময়ের পৃথিবী অন্যতম প্রধান হিরে ব্যবসার কেন্দ্র। মীর জুমলার প্রথম জীবনে হিরে চেনার জ্ঞান এবং হিরে ব্যবসায় বিষয়ে প্রথম যুগের কর্ম জীবনের অভিজ্ঞতা মধ্য বয়সে ক্ষমতার সিঁড়িতে উঠতে সাহায্য করেছে।
তিনি বেড়ে উঠেছেন পরিবারিক তীব্র গরিবির মধ্যেই। প্রথম জীবনের অপার দুঃখ কষ্ট তাঁকে স্বচ্ছলতার পথে যেতে প্রণোদনা দিয়েছে, ব্যতিক্রমী পথ নিতে বাধ্য করেছে। বাল্য বয়সে শায়খইইসলামের প্রভাবে পারস্যজুড়ে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে। অত্যাচারের মুখে দাঁড়িয়ে তাঁর মতই বহু শিয়াপন্থী প্রিয় জন্মভূমি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। বহু পরে, তিনি যখন দক্ষিণ ভারতে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক সফলতা লাভ করে রাষ্ট্রের উচ্চতম আমলা হিসেবে স্বীকৃত, সে সময় পারস্যের উজির নবাব খালিফইসুলতানকে লেখা এক চিঠিতে মীর জুমলা লিখেছেন, তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন ১) নিজের জীবনযাপনের মান উন্নত করতে, ২) তাঁর পরিবারের বয়স্ক, বৃদ্ধ আত্মীয়স্বজনের মুখে খাদ্য তুলে দিতে, ৩) পারসিক শায়খ-ই-ইসলামের অত্যাচার থেকে নিজেকে আর পরিবারকে রক্ষা করতে। তিনি লিখলেন ‘গরীব, অনাথ, অসহায়দের সম্পত্তি দখলের জন্য পারসিক শায়খ-ই-ইসলামের অত্যাচার এবং জুলমএর কাহিনী দুর্ভাগ্যক্রমে জনগণের জীবনে চরম সত্য হয়ে দেখা দিয়েছিল। সুন্নিরা এখানে (ভারতবর্ষ) শাহজাহানের দরবারে এসে তাদের দেশের সেই দুর্দশা, অনাচার সম্বন্ধে অভিযোগ করেলে তারা উত্তর পেয়েছে, এই গোষ্ঠীর এরকমই সাজাই হওয়া উচিত। পারস্যজুড়ে প্রশাসনিক টালমাটাল অবস্থার জন্যে বহু বিদেশি বণিক ভারতবর্ষ থেকে পারস্যে পণ্য পাঠানো বন্ধ করে দেয়। সে সময় অনেকেরই বিশ্বাস ছিল, ইরাণের তুলনায় হিন্দোস্তান শান্তি আর সমৃদ্ধির দেশ। শায়খ-ই-ইসলামের প্রাদুর্ভাবের দরুন বহু ভারতবর্ষীয় ব্যবসায়ী পারস্যের বাজারের উদ্দেশ্যে পাঠানো পণ্য রাস্তা থেকেই ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। উচ্চপদে বসে থাকা বিচারপতির দেশে, জনগণের জীবনে এ ধরণের দুর্যোগ অভিশাপের মত নেমে এলে দেশজুড়ে অরাজক অবস্থা তৈরি হয়। আপনার মত জ্ঞানীকে এ বিষয়ে বেশি বলা বাহুল্য বলেই মনে করি। আশ্চর্যের বিষয় হল, ভারতবর্ষেও কিন্তু শরিয়তি আইন প্রযুক্ত হত। অথচ ইসলামি ধর্ম, বিচার, সমৃদ্ধির জন্মস্থান ইরান সত্যের পথ থেকে সরে গেছে’।
মীর মহম্মদ তাঁর অধীত জ্ঞান সম্বল করে পারস্যের হিরে ব্যবসায়ীর দপ্তরে কাজ শুরু করলেন। সে সময় তাঁর কর্মদাতা কিছু পারসিক ঘোড়া গোলকুণ্ডার রাজাকে বিক্রি করার পরিকল্পনা করেছিলেন। পশ্চিম এশিয়, বিশেষ করে পারসিকদের চোখে গোলকুণ্ডা ছিল ভারতের এল ডোরাডো। তিনি ঘোড়া নিয়ে আসার গুরু দায়িত্ব পেলেন। কোন তারিখে ভবিষ্যতের মীর জুমলা জন্মভূমি পারস্য ছেড়ে বিদেশ গোলকুণ্ডায় পৌছে ছিলেন সেটা জানা না গেলেও, তিনি অবশ্যই ১৬৩০-এর পূর্বেই মধ্য বয়সে গোলকুণ্ডায় পা রাখেন। আমাদের নায়ক মীর মহম্মদ অভিবাসিত হয়ে গোলকুণ্ডায় এসে কীভাবে জীবনধারণ করতেন সে সম্বন্ধেও আমরা আজও অন্ধকারে। ইতিহাস এ বিষয়ে চুপ। ইওরপিয় পর্যটকেদের পরস্পর বিরোধী মন্তব্যে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পোঁছনো উচিত হবে না। মানুচি আর বার্নিয়ে বলছেন মীর মহম্মদ ঘোড়া ব্যবসায়ীর সঙ্গী হয়ে এসে তিনি গোলকুণ্ডায় রাজকীয় পরিবারের জন্য আমদানি করা পারসিক ঘোড়ার তদারক করতেন। আবার মানুচিরই অন্য এক সূত্রে পাচ্ছি তিনি বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘরে ঘোড়া বিক্রির দায়িত্ব পেয়েছিলেন। কোনটা ঐতিহাসিক সত্য আজ নির্ধারন করা মুশকিল। তবে তিনি যে ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে গোলকুণ্ডায় পৌছচ্ছেন এবং দেশে না ফিরে সেখানে বসবাস করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এ তথ্যটা বেশ পরিষ্কার। গোলকুণ্ডা রাজ্যই যে তাঁর ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে উত্থানের স্বর্ণিল সিঁড়ি তৈরির বাহন হয়ে উঠবে, সেটা তিনি হয়ত তাঁর পরিণত বয়সে সেই রাজধানী শহরে এসে আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। নিজ কর্মদক্ষতায় পারসিক দেশের এক অখ্যাত সাধারণ অভদ্রবিত্তীয় চাকুরে মীর মহম্মদ, ভবিষ্যতে মীর জুমলা নাম নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের পাতায় চিরস্থায়ী স্থান করে নেওয়ার জন্যে তৈরি হলেন।
২। গোলকুণ্ডায় কর্ম জীবন আরম্ভ
ভাগ্য দেবতার প্রিয় পাত্র হয়ে উঠেছিলেন মীর মহম্মদ। তিনি পারসিক দেশজাত। কিন্তু তাঁর বংশ গৌরব খুব একটা বলার মত কিছু ছিল না। তাঁর সময় বংশপরম্পরা সামাজিক উন্নতির পথে জরুরি চলক ছিল, তিনি নিজ দক্ষতায় সে চটান ভেঙ্গেছিলেন। কালক্রমে তিনি অসামান্য ক্ষুরধার দক্ষতা অর্জন করবেন, আশাকে বাস্তবে নামিয়ে এনে আকাশ ছুঁতে বাধ্য করবেন। ব্যবসা বিষয়ে প্রভূত জ্ঞান-সম্পন্ন অভিজ্ঞতা তাঁকে অপরিসীম সাফল্যের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেবে। তিনি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন, একমাত্র সম্পদের জোরই বাস্তবের স্বাধীনতা আর ক্ষমতার ধারক-বাহক। সেই তত্ত্ব অনুসরণ করে সম্পদ আহরণে উদ্যমী হলেন।
গোলকুণ্ডা পৌঁছনোর অল্প সময়ের মধ্যে গোলকুণ্ডার এক ব্যবসায়ীর দপ্তরে হিরে ব্যবসায়ীর দপ্তরে শিক্ষা-নবীশরূপে কাজ পেলেন। অতীতের পারসিক হিরে ব্যবসায়ীর দপ্তরে কাজের অভিজ্ঞতা তাঁকে সেই চাকরিতে বহুদূর এগিয়ে দিল। বেশি দিন তিনি সেই ব্যবসায়ীর কাছে কাজ করেন নি। ক্রমশঃ নিজেই ব্যবসায়ী হওয়ার রাস্তা খুঁজে পাবেন। নিজের হিরে ব্যবসা গড়ে তুলবেন। বেনামিতে কয়েকটি হিরের খনি নিজের আওতায় নিয়ে এসে, স্বদক্ষতা এবং পরিশ্রমে সেগুলিকে ব্যবসায়িকভাবে লাভযোগ্য করে হিরে ব্যবসায়ে সফলতার স্বাদ পাবেন।
বিশ্ব জোড়া হিরে বাণিজ্যের কেন্দ্র তখন গোলকুণ্ডা। হিরে তা৬র ভাগউ ঘুরিয়ে দিল। হিরে ব্যবসায় অংশগ্রহনেই তাঁর জীবনে জাগতিক সমৃদ্ধির সূত্রপাত ঘটল। সে সময়ের আরেকটি লাভের ক্ষেত্র, সমুদ্র বাণিজ্যে অংশ নিয়ে ক্রমশঃ তিনি সেই রাজ্যের বড় ব্যবসায়ীদের অন্যতম মাথা হিসেবে পরিগণিত হলেন। তাঁর ব্যবসায় বহু জাহাজ দেশে বিদেশে যেত। রাজনৈতিক জীবনের উন্নতিতে তাঁর হিরে ব্যবসার সমৃদ্ধির সম্পদ কাজে লাগালেন। ব্যবসার উদ্বৃত্ত অর্থ বিনিয়োগ করে তিনি গোলকুণ্ডার সুলতান মহম্মদ কুলি কুতুব শাহের দরবারে ঢুকলেন। তাঁর মধুর ব্যবহার আর খরুচে স্বভাবে মুগ্ধ হয়ে রাজ অলিন্দের দরবারিরা মীরের রাজনৈতিক উচ্চাশা পূর্ণ করার জন্যে নিজেদের সর্বস্ব যোগাযোগ কাজে লাগালেন। হাত খোলা স্বভাবের দরুন মীর জুমলা ক্ষমতার সিঁড়িতে ওঠার ধাপগুলো নিশ্চিত আর সহজ করে নিজের মত শাহিয়ে নিলেন।
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কুঠির তথ্য বলছে ১৬৩৪ পর্যন্ত গোলকুণ্ডায় তিনি বড় ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন নি। অন্তত ১৬৩৫-৩৬য় শর-ই-দপ্তর-শাহীতে (রাজকীয় নথি রক্ষক) তিনি সাধারণ কর্মী, শিল্লাদার পদে কাজের নথি পাচ্ছি। এর পরের সময়ে তিনি দ্রুত রাজকীয় প্রশাসনের ওপরের দিকে ওঠা শুরু করবেন। সুলতান, নবাব আল্লামি ফাহামি শেখ রাজ্যের পেশোয়ার দপ্তর দেখা শোনার জন্য এর বহু পরে মুহম্মদবিন খাতুনএর সুপারিশে তাঁকে মীর জুমলা উপাধি দেবেন। পেশওয়া পদে নির্বাচিত পদাধিকারিককে রাষ্ট্রের বেশ গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক কাজের দায় সামলাতে হত। পেশওয়া পদের কাজ হল অন্যান্য রাজ্য, রাষ্ট্রের কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগায়োগ রাখা, তদের রাষ্ট্রের বক্তব্য জানা শোনা জানানো ইত্যাদি। এছাড়াও রাজ্যের নানান প্রশাসনিক কাজ যেমন মামলা করা, চাষের জমির এলাকা বাড়ানো, জনগণের জীবনের মানোন্নয়ন করা ইত্যাদিও করতে হত পেশোয়া দপ্তরের প্রধানকে।
নবাব নিজে বড় প্রশাসক ছিলেন। তিনি ক্ষমতায় আসার আগে রাজ্য প্রশাসনে এবং সেনা বাহিনীতে বেশ কিছুটা বিশৃঙ্খলা চারিয়েগিয়েছিল। তিনি সেগুলো দূর করার চেষ্টা করছেন তার দক্ষতা অনুসারে। তাঁর তৈরি প্রশাসনিক কাঠামোয় একটা প্রাচীন রাজনৈতিক তত্ত্ব প্রমান হল, অদক্ষ রাজার প্রশাসনে রাজ্য জুড়ে যখন স্বজন পোষণ আর দুর্ণীতি বেড়ে চলে, সেই অবস্থার সুয়োগ নিয়ে কোনও কোনও যোগ্য ব্যক্তি সুলতানের কাছাকাছি পৌঁছনোর রাস্তা খুঁজে নিয়ে অসামান্য গুরুত্ব অর্জন করে বিপুল ক্ষমতা দখল করেন। ঠিক একই সময়ে সেই ব্যক্তির ওপরে ওঠার উচ্চাশা এবং হঠাত পাওয়া প্রতিপত্তিতে অসন্তুষ্ট হয়ে কিছু মানুষ সেই ব্যক্তিটির বিরুদ্ধে দরবারে সুলতানের কান ভারি করা এবং চক্রান্তের জাল বিছিয়ে সুলতানের মনকে সেই ব্যক্তির প্রতি বিষিয়ে তুলবেন। এই কাণ্ডটা মীর জুমলার কর্ম জীবনে বহুবার ঘটবে।
গোলকুণ্ডা রাষ্ট্রের বেসামরিক এবং সামরিক প্রশাসন খুব দক্ষ হাতে নিয়ন্ত্রিত হত না। ১৬২৬-এ ক্ষমতায় আসার পর আবদুল্লা কুতুব শাহ প্রশাসনিক এবং সামরিক বিশৃঙ্খলা আটকানোর উদ্যোগ নিলেন। তিনি রাজ্যের প্রশাসনে এবং সেনাবাহিনীতে আইনের শাসন প্রয়োগ করতে একজন দক্ষ উদ্যমী পেশোয়া এবং মীর জুমলার মত ব্যক্তিত্বকে আসফ পদে দায়িত্ব দেওয়ার জন্যে খোঁজ শুরু করলেন। দুই আমলার নিযুক্তি এবং কর্মকাণ্ড রাজধানী নির্ভর ছিল। সুলতানের আশা ছিল দুটি দপ্তরই সলতানতের স্তম্ভ হয়ে কাজ করবে। সুলতান নবাব আল্লামি মীর মহম্মদ মুমিন পেশোয়ার শাসনকালের শেষ সময়ে এবং ১৬২৪-এ এন্তেকালের পর পেশোয়া পদটির অস্তিত্ব ছিল নামেই। সেই পদে কোনও আমলাই দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিল না। পেশোয়ার কাজ স্বয়ং সুলতান দেখাশোনা করতেন। বারো বছরের সুলতান আবদুল্লা কুতুব শাহ সিংহাসনে আরোহন করার পর তাঁর মা হায়াত বকশি বেগম জামাই শাহ মহম্মদকে পেশোয়া পদে বসালেন। কিন্তু শাহ মহম্মদ অযোগ্য প্রশাসক ছিলেন। শাহজাহানের দুই দূত আদিল শাহ আর নিজাম শাহ তাঁর অযোগ্যতা হাতেনাতে প্রমান করেন। তিনি বেশ কিছু আর্থিক দুর্ণীতিতেও জড়িয়ে পড়লেন। সুলতান তাকে পদচ্যুত করে যোগ্য পেশোয়া নায়েব পেশোয়া শেখ মহম্মদ, বংশগত উপাধি ইবনইখাতুন, পেশোয়াইকুল পদে নিয়োগ করলেন (১৬২৯, ২২ এপ্রিল, রমজান ৯ ১০৩৮ হিজরা)। এছাড়া সুলতান, মনসুর খাঁ হাবসিকে আইনিমূলককে পদন্নোতি দিয়ে মীর জুমলার মত উচ্চপদের দপ্তরে তাঁর ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদের (লশকর-ই-রিকাব) হাবিলদার রূপে নিয়োগ করেন। সমস্যা হল, অসামরিক প্রশাসনের কাজকর্ম দেখা শোনার থেকে সামরিক বাহিনীর ভালমন্দ নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন। সুলতান লেখালিখির, নথিকরণ করার সরকারি বয়ান-পদ্ধতি খুব ভাল জানতেন না, সরকারি প্রশাসন নিয়ন্ত্রণেও খুব একটা দক্ষ ছিলেন না। এক ব্রাহ্মণকে করণিকের কাজে নিযুক্ত করলেন। স্বয়ং সুলতান তাঁকে নিযুক্ত করায় ব্রাহ্মণ ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে স্বমূর্তি ধারণ করলেন। তিনি গরীব চাষীদের অভাব অভিযোগ শুনতেন না, যারা তাঁর রাজ্যেকে বাঁচিয়ে রেখেছে তাঁদের স্বার্থ দেখা জরুরি মনে করতেন না। সেনা প্রশাসন অযোগ্য স্বজন পোষিত কর্মচারী ভরে গেল। স্বার্থান্বেষী মানুষদের কান ভাঙানিতে উত্তেজিত হয়ে সুলতান পুরোনো কিছু যোগ্য এবং গুণগ্রাহী আধিকারিককে বরখাস্ত করে নতুন অযোগ্য আধিকারিক নিযুক্ত করলেন। মনসুর খাঁ হাবসির মত অযোগ্য মানুষের কথায় প্রভাবিত হয়ে প্রশাসনে আধিকারিকদের হেনস্থা করতে থাকলেন।
১০৩৮ আলহজ্জ্ব, ১৬২৮-এর অক্টোবরে মনসুর খাঁয়ের মৃত্যুর পরে মীর জুমলা দপ্তরের পদটা ফাঁকাই পড়েছিল, সুলতান এই পদে কাউকেই নিযুক্ত করেন নি। ১৬৩৪ পর্যন্ত সরইখাহিল দপ্তরের আধিকারিক স্বাধীনভাবে এই দপ্তরের কাজকর্ম দেখাশোনা করতেন। ১৬৩১-এর কয়েক মাসের জন্য শেখ মহম্মদ, গোলকুণ্ডার পেশোয়া দেওয়ান হিসেবে কাজ সামলেছিলেন। কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ তাঁর বিরুদ্ধে দরবারি ষড়যন্ত্র রচনা করলেও তিনি সেই সব অদক্ষ ষড়িদের জাল কেটে বেরিয়ে আসলেন। সুলতান তাকে নতুন করে পেশোয়া পদে নিযুক্ত করার ইচ্ছে প্রকাশ করলেন। কিন্তু শেখ মহম্মদ এই পদ গ্রহণে অস্বীকার করলেন। সুলতান তাঁকে মীর জুমলা (জুমলাতুল মুলকি) পদে নিযুক্ত করাতে চাইলেন। পদটি মূলত নানান বিষয়ে সুলতানকে পরামর্শ দেওয়ার জন্যে তৈরি। বহু অনুনয় বিনয়ের পর ৯ শাওয়াল ১০৪৩, ২৯ মার্চ ১৬৩৪ সালে তিনি পদ স্বীকার করেন। তাঁর ভাইপো শেখ মহম্মদ তাহিরকে অধস্তনরূপে (পদটির নাম সর-ই-খাহিল, তাঁর আগে পদে ছিলেন মীর ফাসিউদ্দিন) নিয়োগ করা হয়। প্রশাসনের রশি এবার থেকে শেখ মহম্মদের যোগ্য হাতে সমর্পিত হল। অসামরিক প্রশাসনে এবং সামরিক প্রশাসনে আইনের শাসন বলবত করার চেষ্টা শুরু হল। প্রত্যেক দপ্তরের জন্য বিশদ নীতি প্রণীত হল। সরকারি নথিপত্রে দেখা যাচ্ছে তিনি বেশ দক্ষ আধিকারিক ছিলেন। (চলবে)