| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলা : জগদীশ নায়ারণ সরকার (৩০নং কিস্তি) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ২৩৩ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২২

দ্বিতীয় খণ্ড

সিংহাসনের যুদ্ধ মুঘল হিন্দুস্তানের পূর্বদেশের দিকে ঢলল

সুজাকে ধাওয়া করলেন মীর জুমলা

৭। মীর জুমলার রাজমহল দখল

বীরভূমের জমিদারের বিশ্বাসঘাতকতার সঙ্গে সাম্রাজ্যের বাহিনীর অগ্রগতির সংবাদ পেয়ে সুজা রাঙ্গামাটি ছেড়ে রাজমহলের দিকে চললেন (২৭ মার্চ)। এখানে তিনি কিছুদিন আগেই শিবির ফেলেছিলেন। মীর জুমলার নেতৃত্বে বাহিনী সুজার ঢাকা পালিয়ে যাওয়ার পথ রোধ করতে উখরা থেকে উত্তর-পূর্বের দিকে মুর্শিদাবাদের গঙ্গা ধরে সুজার বর্তমানের অবস্থানের ৩০ মাইল কাছে বেলঘাটায় পৌঁছনোয় সুজার দোদুল্যচিত্ত সন্দিহান সঙ্গীরা একে একে তাঁকে ছেড়ে যেতে শুরু করে। সুজার প্রতি বিশ্বস্ত থাকার দুটি অবশ্যম্ভাবী পরিণতি সুজার বন্ধুরা দেখলেন, বিপুল পরিমান সাম্রাজ্যের বাহিনীর হাতে কচুকাটা হওয়া এবং অথবা অসভ্য আরাকানের দিকে পালিয়ে যাওয়া।

গঙ্গার পর পাড়ে মীর জুমলার নেতৃত্বে সাম্রাজ্যের বাহিনী শিবির গড়ার খবরে সুজা তাঁর দিকের (পশ্চিম) তীরটিকেও নিরাপদ মনে করলেন না আর যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত মাথা থেকে বার কলরে দিলেন। আলিবর্দি খানের এবং তাঁর নিজের বাহিনী মিলিয়ে যেহেতু ৫-৬ হাজার থেকে খুব বেশি হলে ২০ হাজারের বেশি হবে না, ফলে শাহী বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের সিদ্ধান্তে যে বাহিনীতে বিদ্রোহ দেখা দিতে পারে তা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। সেনাপতিদের দলের প্রধান মির্জা জান বেগ, যার পদবী খান জামানএর পরামর্শক্রমে সুজা তাঁর শিবির তুলে নিয়ে এলেন তাণ্ডায়, গৌড়ের চার মাইল পশ্চিমে (যেখানে তাঁর নিরাপত্তার জন্য একদিকে রয়েছে গঙ্গা আর অন্যদিকে প্রচুর নালার সমাহার) শাহী সেনাবাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে এবং নতুন করের নৌবাহিনী তৈরি করে নিজের কমতে থাকা ক্ষমতাকে নতুন করে গড়ে তোলার কাজ শুরু করলেন। সুজা এই যুদ্ধটা নতুন করে দীর্ঘস্থায়ী রূপ দিতে চাইছিলেন নৈবাহিনী এবং গোলান্দাজ বাহিনী সম্বল করে। ১৬৫৯-এর ৪ এপ্রিল সুজা রাজমহল ছেড়ে ১৩ মাইল দক্ষিণে দেওগাছিতে গঙ্গা পার হলেন, এবং তাণ্ডায় আসতে তাঁর পরিবার নিয়ে ফিরোজপুরে এলেন। গঙ্গাজুড়ে নৌবাহিনী এবং পরিখা তৈরি করতে আলাপ আলোচনা শুরু করলেন।

সুজার রাজমহল ত্যাগের সংবাদ পৌঁছল বেলঘাটায় মীর জুমলার শিবিরে। শাহজাদার ছেড়ে যাওয়া রাজধানী এলাকা দখল করতে সঙ্গে সঙ্গে শাহজাদাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি উত্তরের দিকে অভিযান করলেন। ১৩ এপ্রিল তিনি একটি রথে জুলফিকার খান, এবং শাহজাদাকে নিয়ে রাজমহল প্রবেশ করে সেখানকার প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত করলেন ৫০০০ বাহিনীর সেনাপতি জুলফিকার খানকে। প্রশাসনিক এবং সামরিক বিভাগ সামলানোর জন্যে সাহায্যকারী হিসেবে দিলেন সৈয়দ ফিরোজ খান, জবরদস্ত খান, রাজা ইন্দ্রদুম্ন এবং দেবী সিংহকে। আলমগিরনামা বলছে রাজমহলে সুজার বিশাল রসদ ভাণ্ডার এবং সেনাবাহিনীর বহু সেনা মীর জুমলার হাতে এল। তিনি লুঠ না করে, তাদের প্রতি সুবিচার দেখয়ে নিজেদের দলে টেনে নিলেন। সম্রাটের নির্দশে শহরের নিরাপত্তা এবং ফর্টিফিকেশন ঢেলে সাহা হল। এই কাজটার দায়িত্বপ্রাপ্ত হলেন বাঙালি খোজা প্রশাসক ইতিবর খান। এই কাজটা আগামী ৩ বছর ধরে চলবে। সুজার সেনাবাহিনীর ৪০০০ সেনা তাঁর সঙ্গে গঙ্গা পেরোতে পারে নি, তাঁরা রাজমহলে ফিরে এলে নতুন প্রশাসনে তাদের নিয়ে নেওয়া হয়। রাজমহল থেকে হুগলী পর্যন্ত গঙ্গার ডানদিকের তীরের সমগ্র দেশটা মীর জুমলার দখলে চলে এল। এবার থেকে ব্রিটিশ কুঠিয়ালেরা তাকে বিজয়ী বাঙলার নবাব হিসেবেই সম্বোধন করবে।

তৃতীয় পর্ব

গঙ্গায় যুদ্ধ

১। নতুন যুদ্ধক্ষেত্রে মীর জুমলার সমস্যা

বাংলায় প্রবেশ করে শাহজাদা শাহ সুজা গঙ্গার পশ্চিম পাড় দখল নিয়ে যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণের রশি হাতে তুলে নিলেন।

পূর্বভারতে সিংহাসনের লড়াই এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে দাঁড়িয়ে। দাদা সুজাকে হারাতে মীর জুমলার ওপর নির্ভর করছেন আওরঙ্গজেব। সুজা হারলে তাঁর সিংহাসনের আর কোনও শাহী বৈধ চ্যালেঞ্জার থাকছে না। বড় ভাই পালাচ্ছে, ছোট ভাই জেলে। এখনও শক্ত প্রতিরোধের দেওয়াল তুলে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছেন মেজো ভাই শাহ সুজা। দিল্লিতে বসে সমস্ত সময় তাঁর মন পড়ে আছে বাংলার রণাঙ্গনের দিকে।

কিন্তু বাংলায় শাহী সেনাপতি মীর জুমলা স্বস্তিতে নেই, বরং তিনি বেশ বেকায়দাতেই পড়লেন। এতদিন মীর জুমলা লড়াই করেছেন শুকনো যুদ্ধ মাটিতে। বিপুল সংখ্যক পদাতিক, দুরন্ত মধ্য এশিয় তীরান্দাজি ঘোড়সওয়ার আর বন্দুকচি সুইভেল আর বিশাল বিশাল কামানওয়ালা গোলান্দাজ বাহিনীর রণনৈতিক দক্ষতার ওপর নির্ভর করে যুদ্ধ জিতেছে শাহী বাহিনী। খাজওয়া যুক্ষেত্রে দেখেছি অসামান্য রণনীতিবিদ মীর জুমলার শুকনো মাটিতে লড়াই করার অভিনব সামরিক পরিকল্পনা সুজাকে বিন্দুমাত্র স্বস্তি দেয় নি, তাকে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালাতে হয়েছে। শাহী বাহিনীর কাছে হারের পরে পালানোর রাস্তায় কোনও সময়ই শাহ সুজা তাঁর পিছু নেওয়া মীর জুমলার নেতৃত্বে শাহী বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সাহস পান নি — একই সঙ্গে মাথায় রাখতে হবে মীর জুমলা অযথা রক্তক্ষয় এড়াতে ঘুরপথে বাংলায় প্রবেশ করেছেন — কিন্তু মীর জুমলা ঘুর পথ বেছে নিয়েছেন স্বইচ্ছায়, শাহ সুজার চাপে পড়ে নয়। কিন্তু যে মুহূর্তে শুকনো বিহার থেকে সিংহাসনের যুদ্ধ বাংলায় জলজ পরিবেশে প্রবেশ করল, তখনই তিনি বেকায়দায় পড়লেন। শুকনো পরিবেশে যুদ্ধ করে অভ্যস্ত মীর জুমলা বাংলার ভিজে পরিবেশে সেনাপত্য করতে বিন্দুমাত্র তৈরি ছিলেন না। এখানে পদাতিক বাহিনী কার্যকর নয়, ঘোড়সওয়ার বাহিনীও তার গতি হারায় আর বিশাল বিশাল নদী বিশাল বিশাল জলাশয় আর শেষ দেখা না যাওয়া হাওর এলাকায় বড় কামান ততটা কার্যকর নয়। এই বস্তব অবস্থা অনুবাধন করে মীর জুমলার জীবনীকার জগদীশ নারায়ণ সরকার বলছেন বাংলায় ‘যুদ্ধ এক নতুন স্তরে উন্নীত হল’।

মীর জুমলার মত রণবিদ জানেন বাংলায় যুদ্ধ প্রস্তুতি শুকনো অঞ্চলের প্রস্তুতির মত হবে না। যারা শুকনো পরিবেশ থেকে বাংলায় যুদ্ধ করতে আসছেন, তাঁকে আবশ্যিকভাবে নতুন ধরণের, বাংলার পরিবেশের সঙ্গে মানানসই যুদ্ধ প্রকরণ তৈরি করতে হবে। এই তত্ত্ব আকবর বাংলা আক্রমণে হাড়ে হাড়ে বুঝেছিলেন। বাবার ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে জাহাঙ্গীর বাংলাজুড়ে বহু কষ্টে মুঘল শাসন বিস্তারে সমর্থ হন। সে সময় থেকে বাংলায় মুঘল বাহিনী যথেষ্ট শিক্ষা পেয়ে নাওয়ারা বাহিনী তৈরির ওপর জোর দিয়েছিল। কিন্তু বাংলায় ঢোকার আগেই সুজা জানতেন শুকনো জমিতে যুদ্ধ-দক্ষ মীর জুমলার পক্ষে ভিজে বাংলায় রণনীতি তৈরি এবং রণসাজ সাজানো খুব সহজ কাজ হবে না। বাঙলা মূলত নদীমাতৃক দেশ, যুদ্ধ হবে নদী নির্ভর, বিশাল আকারের গঙ্গা নির্ভর, স্থল নির্ভর নয়। তিনি জানেন তখনও মীর জুমলার বাহিনীর সঙ্গে একটিও যুদ্ধ নৌকো নেই। বাংলায় যুদ্ধ নৌকো না নিয়ে যুদ্ধে নামার অর্থই হল যুদ্ধের আগেই শত্রুর কাছে হার মেনে নেওয়া। বাংলা সেনাবাহিনীর চতুরঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ এবং আবশ্যিক অঙ্গ নাওয়ারা। এত দিন শুকনো মাটিতে লড়াই করার সময় সুজা, মীর জুমলার রণনীতি অনুযায়ী তাঁর রণনীতি তৈরি করতে বাধ্য হচ্ছিলেন — তিনি মীর জুমলার ছুঁড়ে দেওয়া প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন মাত্র, নিজে উত্তর ছুঁড়ে দিতে পারছিলেন না। কিন্তু বাংলায় নিজের চেনা পরিবেশে ঢুকে তিনি ঘটনার রাশ হাতে নেওয়ার সুযোগ পেলেন। দেড় দশকের বেশি সময় বাংলার ক্ষমতাকেন্দ্রে কাটানো শাহ সুজা এই অঞ্চল নিজের হাতের তালুর মত চেনেন। তিনি জানেন নদী নির্ভর বাংলা জয় করা মীর জুমলার পক্ষে খুব সহজ হবে না। এই মুহূর্তে মীর জুমলা সমস্যায় আছেন। যুদ্ধ জিততে গেলে সেই সমস্যা তাঁকে সমাধান করতে হবে — এবং সেটা সহজ কাজ নয়। এত দিন মীর জুমলা যুদ্ধে তাঁকে নাকানিচোবানি খাইয়েছেন, কিন্তু বাংলায় যুদ্ধের রশি, শুরুর সময়ে অনেকটা শাহ সুজার হাতে চলে এল।

মাঝখানে গঙ্গাকে সাক্ষী রেখে দুইপাড়ে যুযুধান দুই বাহিনী বাংলার নবাব আর শাহী সেনা মুখোমুখি হল। শত্রুদলের থেকে কিছুটা হলেও সুজা রণনীতিতে এগিয়ে ছিলেন। সুজার জোর ছিল প্রচুর সাধারণ ডিঙ্গি এবং যুদ্ধ ডিঙ্গি (ফ্লোটিলা)। তাছাড়া বাংলায় ঢুকে সুজা আরও নৌকো যেমন জবরদখল করলেন, তেমনি যাতে অন্যান্য যুদ্ধ নৌকো শত্রুপক্ষের কবলে না পড়ে, তাঁর জন্য তিনি পোড়ামাটি নীতি নিলেন — তাঁর বাহিনীতে যত পরিমাণ নৌকো ছিল, মধ্যবঙ্গের আশেপাশে অঞ্চলে তার থেকে অনেক বেশি ডিঙ্গি আর জলযান ডুবিয়ে পুড়িয়ে দিলেন। উল্টোদিকে মীর জুমলার বাহিনীতে শুধু রয়েছে স্থলে যুদ্ধ করার মত পদাতিক বাহিনী, ব্রিটিশদের ভাষায় ‘উড়তা বাহিনী’, পদাতিক, কামান ইত্যাদি যা জলযুদ্ধে খুব একটা কার্যকর নয় — খুব বেশি হলে নাওয়ারার সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে মাত্র। মীর জুমলা বাঙলা অভিযানে আসার সময় নৌবাহিনী সঙ্গে আনার কথা হয়ত ভাবেনই নি। তাছাড়া তাঁর আরও বড় অসুবিধে ছিল নাওয়ারা নিয়ে সুজার পোড়ামাটি নীতি। সুজা যেহেতু তাঁর বাঙলা প্রবেশের আগে থেকে বহু নৌকো দখল এবং ডুবিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছেন পোড়ামাটির নীতি নিয়ে, সেহেতু মীর জুমলার পক্ষে নতুন করে নৌবাহিনী তৈরি করা প্রবল চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়াল। এছাড়াও তার সঙ্গে বলা মত ভারি গোলান্দাজ বাহিনীও ছিল না — সুজাকে দ্রুত ধাওয়া করার রণনীতিতে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে মাত্র ৮টা কামান এনেছিলেন। উল্টোদিকে সুজার বাহিনীতে দক্ষ ইওরোপিয় গোলান্দাজ বাহিনী ছিল; বিশেষ করে পর্তুগিজরা ছিল; আর ছিল হুগলী, তমলুক এবং নোয়াখালির দোআঁশলা (মেস্টিকো) গোলান্দাজ বাহিনী। বিপুল বেতন এবং সুখদ ভবিষ্যতে স্বপ্ন দেখিয়ে বাহিনীতে হাজারো এই ধরণের গোলান্দাজে ভর্তি করান শাহজাদা সুজা। এই গোলান্দাজেদের অধিকাংশ ডাচেদের হাতে জাফনাপাটন এবং শ্রীলঙ্কা থেকে উতখাত হয়ে ফেরা পর্তুগিজ বাহিনী। তাণ্ডাতে তাঁবু ফেলে বিপুল যুদ্ধ ডিঙ্গি এবং গোলান্দাজ বাহিনী সম্বল করে সুজা সাম্রাজ্যের বাহিনীর উল্টোদিকের তীরে রাজমহল থেকে বাকারপুর, ফিরোজপুর থেকে সুতি পর্যন্ত এলাকা নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেললেন। সুজার হাতে থাকা কামান বাহিনী আর নাওয়ারা ফ্লোটিলা বহর — দুয়ের আক্রমণ বিপক্ষের কাছে দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠল। যেহেতু স্থলযুদ্ধের মত গোলান্দাজ বাহিনীকে আর এক জায়গায় বসিয়ে রাখার প্রয়োজন হল না, গোলান্দাজেরা নৌকোয় কামান রেখে জলে ভেসে ভেসে অবাধে যুদ্ধ করতে পারে। খুব কম স্থল বাহিনী নিয়ে তিনি মীর জুমলার মুখোমুখি হতে না পারলেও নৌযুদ্ধে তিনিই সেরা প্রমানিত হলেন। বাঙলার ভৌগোলিক অবস্থা তাকে বিপক্ষের ওপর খবরদারির সুযোগ করে দিল। সুজার রণনীতিতে মীর জুমলার বিশাল বিপুলাকায় শাহী বাহিনীর অগ্রগতি থমকে গেল, দুঃস্বপ্নের দিন বেড়েই চলল গুণোত্তর প্রগতিতে। বালেশ্বরের কুঠিয়ালেরা মীর জুমলার রণনীতি জানতে পারেন নি। কিন্তু তাদের স্পষ্ট নিদান ছিল (৩০ এপ্রিল ১৬৫৯) এই বছরে যদি মীর জুমলাকে যুদ্ধ জিততে হয়, তাহলে সেটি করতে হবে বর্ষার আগেই। নচেৎ তিনি বিপাকে পড়বেন। কিন্তু মীর জুমলার পক্ষে এই লক্ষ্য পূরণ প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল মীর জুমলার নৌ এবং গোলান্দাজ বাহিনী অপ্রতুলতার জন্য। নৌসেনা অপ্রতুলতার জন্য তিনি পশ্চিম পাড় থেকে পূর্ব পাড়ে যেতে বিপুলাকার গঙ্গা পেরোতে পারলেন না। মীর জুমলা এমনই দয়ে পড়ে রইল যে, শাহী বাহিনীর হাত থেকে সুজার বাহিনী, তাঁর তৈরি রাজধানী রাজমহল ছিনিয়ে নিল। ফলে মীর জুমলা শত্রুকে ধাওয়া করার সিদ্ধান্তে বাধ্য হয়ে ছেদ টানলেন।

মীর জুমলার রাজমহল দখল করার ১৩ এপ্রিল ১৬৫৯ থেকে ১২ এপ্রিল ১৬৬০ সুজা ঢাকায় প্রবেশ করার এক বছর আদতে মীর জুমলার বিফলতার নিদর্শন। আরও নির্দিষ্টভাবে বললে সুজার চমৎকার রণনীতির কাছে মীর জুমলার হারের সময়। যদিও শেষ পর্যন্ত অসামান্য রণপণ্ডিত মীর জুমলা অবস্থা বুঝে নিদান তৈরি করলেন, নিজের ভাবনাকেও ঢেলে সাজালেন এবং যুদ্ধ করতে করতে সুযোগ সুবিধের মত তিনি ভাবনা পাল্টলেন বলেই বাংলার শাহজাদা নবাব সুজার রক্ষণ ভাঙতে সক্ষম হলেন সেনানী শ্রেষ্ঠ মীর জুমলা। এই নাটকটি তিন অঙ্কে সমাপ্ত হবে। যুদ্ধ চলার মধ্যেই মাঝে মধ্যে ভাগ্যলক্ষ্মী ঢেঁকির মত কখনো এক পক্ষ কখনো অন্য পক্ষে ঢলে পড়তে থাকেন। প্রথম অঙ্কে সুজা গঙ্গায় আত্মরক্ষামূলক রণনীতি অনুসরণ করয়েছেন। এবং তাঁর রক্ষণাত্মক যুদ্ধ প্রচেষ্টা শেষ হয় ১৬৫৯-র ৮ জুন শাহজাদা মহম্মদ সুলতান দল বদল করে সুজার দলে চলে যাওয়ার পর। দ্বিতীয় অঙ্ক অনুষ্ঠিত হয় পশ্চিম পাড়ে সুজা আক্রমণাত্মক হয়ে উঠে রাজমহল দখল করে নেওয়ায়, যদিও শেষ পর্যন্ত রাজমহল অঞ্চল দখলে রাখতে পারেন নি। তৃতীয় অঙ্কে মীর জুমলা আক্রমনাত্মক হয়ে ওঠেন এবং যুদ্ধের ঢেঁকির একপ্রান্ত চিরকালের মত হেলে যায় পশ্চিম পাড়ের দিকে, তিন দিক থেকে আক্রান্ত হয়ে উঠে সুজাকে পূর্ব পাড় চিরতরে ছেড়ে যেতে হয়।

২। মীর জুমলার দোগাছিতে প্রথম প্রত্যাঘাত

মীর জুমলা বুঝলেন তিনি সিংহাসনের যুদ্ধ পূর্বপ্রদেশে নতুন ধরণের যুদ্ধ নাট্যশালায় দুর্বিপাকে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছেন। অবস্থা বৈগুণ্যে খানিকটা বিহ্বল হয়ে গেলেও, বহু যুদ্ধের পোড় খাওয়া সেনাপতি হিসেবে অসীম আত্মবিশ্বাসে ভর করে মীর জুমলা পুরুষকার নির্ভর করে বিরুদ্ধ পরিবেশকে নিজের পক্ষে আনার উদ্যম নিলেন। আমরা আগেই বলেছি মীর জুমলা সুজার কবল থেকে রাজমহল (১৩ এপ্রিল) দখল নিয়েছেন। রাজমহলের নিরাপত্তা শক্তিশালী করার পরে তাঁর প্রথমতম কাজ হল, ছলে বলে কৌশলে যথেষ্ট পরিমাণ যুদ্ধ নৌকো জোগাড় করে সুজার মুখোমুখি হওয়া। তিনি জানেন জলযুদ্ধযান না নিয়ে বাংলার যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কোনোভাবেই শাহী বাহিনীর পক্ষে টেনে আনা যাবে না, জেতার দিকে এক পাও এগোন যাবে না। প্রায় দিন পনের ধরে দূর দূর এলাকায় খোঁজ করে বেশ কিছু যুদ্ধজলযান জোগাড় হল।

নৌকো ছাড়া এই পূর্ব প্রদেশে সুজার বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে লড়াই করা যাবে না এই তত্ত্ব বুঝে তার নিদান হিসেবে বেশ কিছু যুদ্ধনৌকো দখলে নিয়েছেন। রাজমহলে আর সময় নষ্ট না করে, শাহজাদাকে নিয়ে পরের দিনই ১৪ এপ্রিল আরও ১৩ মাইল দক্ষিণে দোগাছি পৌঁছে তিনি যুদ্ধ শিবির তৈরি করলেন। দোগাছিতে শি৯বির পাততে পারতেই তাঁর নজরে এল নদীর মধ্যে একটা উঁচু ভূমিওয়ালা চর। পোড়খাওয়া সেনাপতি হিসেবে চরের অবস্থান দেখে মীর জুমলা বুঝে ছিলেন এই ভূমিটির অপরিসীম রণনৈতিক গুরুত্বকে। তাঁর উল্টো দিকে বাকারপুরে সুজার সেনাপতি সৈয়দ কুলি গোলান্দাজ বাহিনী নিয়ে শিবির করে ছিলেন। সুজা ছিলেন গোলান্দাজ বাহিনীর পিছনের শিবির পেতে। নদীতে সুজার যুদ্ধ ডিঙ্গি টহল দিচ্ছিল। মীর জুমলার সঙ্গে যেহেতু তখনও ডিঙ্গি নেই — তিনি চরে পৌঁছতেই পারলেন না; উল্টে সুজার বাহিনী রাতে চর দখল করে সেখানে দমদমা বা উঁচুতে গোলান্দাজ বাহিনী বসিয়ে বিপক্ষের বাহিনীর ওপরে গোলান্দাজির পরিকল্পনা ছকতে থাকে।

কিছু দিন পরে হাতে কয়েকটা ডিঙ্গি এল। মীর জুমলা নাওয়ারা নির্ভর যুদ্ধের পরিকল্পনা ছকলেন। তাঁর প্রাথমিক উদ্যম হল চর দখল করা। সেটা সম্ভব করতে গেলে সুজার বাহিনীর ওপর আক্রমণ করতে হবে। নাওয়ারা করে নদী পেরিয়ে চরে ঘাঁটি গেড়ে বসা সুজার বাহিনীর ওপরে সরাসরি হামলা চালাবার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হল। প্রথম রাত থেকে শুরু করে মধ্যরাত পর্যন্ত শাহী বাহিনী ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে মীর জুমলার দক্ষ ব্যবস্থাপনায় এবং ব্যক্তিগত নির্দেশে নৌকো বাহিত হয়ে তাঁর ২,০০০ পদাতিক, সঙ্গে অন্যান্য সেনাপতির সেনা যেমন জুলফিকার, ফতে জং, রশিদ খান আনসারি, লোদি খান, সুজন সিং বুন্দেলা, তাজ নিয়াজি সহ নানান অনুগামী এবং ২০০ বেলদার আর কয়েকটি কামান নিয়ে গোপনে চরে নেমে ঘাঁটি গাড়লেন। পরের দিন সকাল হতে না হতেই সুজার বাহিনী বিপক্ষকে দেখতে পেয়ে জোর আক্রমন চালালেও শাহী বাহিনীর সঙ্গে পেরে ওঠে না, সুবা বাহিনীর ছেড়ে যাওয়া চরে মীর জুমলার বাহিনী স্থায়ী সেনা ঘাঁটি গাড়ল।

পরের দিনই সুজার বাহিনীর অন্যতম প্রধান সেনাপতি সেনাপতি ফিদায়ি খান বিশাল নৌ বহর আর বেশ কিছু ইয়োরোপীয়দের নিয়ন্ত্রনে থাকা নৌবহর নিয়ে চরে মীর জুমলার বাহিনীর ওপর জোরদার আক্রমন শানালেন। বহুক্ষণ ধরে চরের দুপাশে দুপক্ষের মধ্যে গোলাগুলি চলল। দুপাশ ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় ভরে গেল। ধোঁয়ার আড়ালে ফিদায়ি খান তড়িঘড়ি চরের এক দিকে নেমে এসে পা রেখে পরিখা কাটতে না কাটতেই তাকে আক্রমন শানালেন সেনাপতি তাজ নিয়াজী আর তাঁর আফগান যোদ্ধারা। কিছু সময় ধরে সমানে সমানে তালে তাল ঠোকাঠুকি চলল দুপক্ষের মধ্যে। তীরে বসে এই হাতাহাতি লড়াই দেখতে দেখতে মীর জুমলা লড়াইয়ের ফল কী হবে, সেটি সর্বশক্তিমানের ইচ্ছের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। বহু যুদ্ধের পর শেষ পর্যন্ত সুজার বাহিনী পিছু হঠতে বাধ্য হয় এবং তাদের কয়েকটি ডিঙ্গি ডুবেও যায়। সেই চরে আরও একটি সুজার বড় বাহিনী আক্রমণ করলে বিশাল যুদ্ধ চলে। দুপক্ষের গোলান্দাজদের গোলান্দাজির গর্জনে নদীর জলের মাছও যেন অস্থির হয়ে উঠছিল। সব শেষে রণকৌশলগত দিক থেকে চরটি মীর জুমলার বাহিনী সুরক্ষিতভাবে দখল করে। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev