| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলা : জগদীশ নায়ারণ সরকার (৩১নং কিস্তি) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ৩৬১ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২২

তৃতীয় পর্ব

গঙ্গায় যুদ্ধ

৩। সুতিতে মীর জুমলার নৌঅভিযান

রণনৈতিকভাবে মীর জুমলার প্রথম আঘাতটিকে ডাকাবুকোর মত হঠকারীর মত মনে হতে পারে কিন্তু গভীরে দেখলে তিনি যথেষ্ট পরিকল্পনা মাফিক এই আক্রমণের ধার সাজিয়েছিলেন। তিনি নৌকো জোগাড় করলেন প্রায় বিদ্যুতগতিতে। সুজার বিরুদ্ধে তিনি প্রথম লড়াইতে জিতলেন কেননা সুজার নিজের নৌবাহিনীর গরিষ্ঠতা এবং দক্ষতার ওপর চরম আত্মসন্তুষ্ট ছিল। যেহেতু মীর জুমলার নৌ বাহিনীর আকার বড় ছিল না, তাই শাহী বাহিনীর নৌযুদ্ধ করার ক্ষমতাকে পাত্তা দেয় নি। মীর জুমলার যে এই ধরণের প্রায় গেরিলা আক্রমণও দক্ষভাবে সাধন করতে পারেন, সেটাও আন্দাজ করতে ব্যর্থ হয়েছেন সুজা। এই হার থেকে শিক্ষা নিয়ে সুজা নতুন করে, নতুনভাবে আক্রমন শানাতে কোমর বাঁধলেন। তাঁর বিশাল নৌবহর মূলত রাজমহল থেকে দেওগাছির মধ্যে টহল দিচ্ছিল। কিন্তু রাজমহলে যেখানে নদী সবথেকে চওড়া, সেখানে শাহজাদা সব থেকে বেশি গোলন্দাজ নৌকোর টহল দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। বিপক্ষের রণনীতি পরিবর্তন স্টাডি করে মীর জুমলা বুঝলেন হাতে মাত্র কয়েকটি নৌকো আর নৌকোয় ঘুরন্ত ছোট ছোট কামান নিয়ে ছোট ছোট বাহিনীতে ভাগ হয়ে ওপারের তীরে বিপক্ষের সদা জাগ্রত বাহিনীর ওপর গেরিলা আক্রমণের রণনীতি এই মুহূর্তে আর সফল হবে না। তিনি জানেন দীর্ঘ বিফল লড়াই-এর হার থেকে তারা শিক্ষা নিয়ে নতুন রণনীতিতে উপনীত হয়েছে। এর পরে আর বিপক্ষের বাহিনীকে এই ধরণের হঠাত যুদ্ধে হারানো সম্ভব হবে না। মীর জুমলাকে বিপক্ষের চাল চলন বুঝে, রণনীতি পরিবর্তন করতে হল। তিনি সময় নিলেন। উত্তরে রাজমহল থেকে ২৮ মাইল দক্ষিণ পূর্বে সুতির মধ্যের এলাকা কয়েকজন বাছা বাছা সেনা নায়ককে দায়িত্ব দিলেন; রাজমহলের দায়িত্ব দিলেন মহম্মদ মুরাদ বেগকে, সুজার শিবিরের উল্টোদিকের তীরে দোগাছির নেতৃত্ব দিলেন শাহজাদাকে, তাঁর সঙ্গে জুড়ে দিলেন জুলফিকার খান এবং ইসলাম খান এবং বিশাল বাহিনীর অধিকাংশ সেনা; আরও আট মাইল দক্ষিণে দুনাপুরে আলিকুলি এবং মীর জুমলা নিজে হাজার সাতেক সেনা নিয়ে সুতিতে শিবির করলেন।

বহু দিনের পরিকল্পনার রণনৈতিক ফসল ছিল সুতিতে মীর জুমলার নিজের ঘাঁটি গেড়ে বসা। তখনও তার হাতে যথেষ্ট পরিমাণ নৌবহর ছিল না। সুতিতে নদীর পরিসর খুবই সরু। স্থানীয়দের থেকে খবর পেলেন এখানে নদী নাব্যতা এতই কম যে স্বচ্ছন্দে হেঁটেই নদী পার হওয়া যায়। এইভাবে তিনি নদী পেরিয়ে সুজার বাহিনীকে আক্রমন করে হতোদ্যম করে দিতে চান। এর আগেও তিনি এই রণনীতি প্রয়োগ করে জিতে এসেছেন। শাহজাদাও মীরের এই প্রস্তাব মেনে নিয়েছেন। তিনি কঠোর নির্দেশ দিয়ে ঘোষণা করে দিলেন, সুজার বাহিনী আর নৌবহরকে নদী পার হয়ে মীর জুমলার তীরের কাছাকাছি আসতে দেওয়া যাবে না। নির্দেশ অনুযায়ী নদীর সমস্ত ফেরি এবং পারাপার করার রাস্তা বন্ধ হল। এই নিষেধাজ্ঞা এবং নজরদারি এতই কঠিন এবং কড়া ভাবে প্রয়োগ করা হল যে ছিঁচকে চোরেরাও সেই কয় দিন চুপিসাড়েও নদী পার হতে পারে নি, যদি কেউ ধরা পড়ত তাদের নাক কান কেটে ফেলা হত।

সুতিতে শিবির ফেলার পরের দিন মীর জুমলা নদী পার হওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু নদীর গভীরতা বুঝতে ভুল হয়েছিল তাঁর। স্থানীয় মানুষের কথায় তিনি প্রতারিত হয়েছেন। দেখা গেল ১৪ দিন আগে যে জলস্তর ছিল, সেটা হঠাত বেড়ে গেল। বেশ কিছু ক্ষতি হল ঠিকই, কিন্তু খুব বড় দুর্ঘটনা থেকে সেনাবাহিনী বেঁচে গেল।

মীর জুমলা উল্টোদিকে অবস্থান করছে বুঝে সুজা সুতির উল্টোদিকের পাড়ে নুরুল হাসান, দুনাপুরের উল্টদিকে ইসফান্দিয়ার মামুরি, মামুরির বড় ছেলে জায়িনুদ্দিনকে তাণ্ডায় দায়িত্ব দিলেন। জায়িনুদ্দিন পরিবারের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে জেনানা মহলকে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে গেল।

মীর জুমলা অতি গোপনে উল্টো দিকের তীরে সেনানী পাঠাবার রণনীতি তৈরি করে যেতে লাগলেন, পরিকল্পনা, কোন একদিন তিনি নিজে নেতৃত্ব দেবেন। এই কাজে তাঁর দরকার প্রচুর নৌকো। তিনি পদস্থ আধিকারিকদের হুগলি, কাশিমবাজার বা এই সব এলাকায় যে কোন ধরণের নৌকো — কিস্তি বা ঘুরাবের খোঁজে পাঠালেন। হুঁশিয়ারি দিলেন স্থানীয় শক্তি নাওয়ারা দখলে ব্যর্থ হলে তাঁর পরিবার এমন কি তাঁর দেশকেও তিনি ধুলোয় গুঁড়িয়ে দিতে দ্বিধা করবেন না। হুঁশিয়ারিতে ফল ফলল। ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে তারা শয়ে শয়ে নৌকো জোগাড় করে এনে দিল মীর জুমলাকে। জুলফিকারও তাকে ৪০টি নৌকো দিল। মীর জুমলা মনে হল এই নৌকোগুলির সাহায্যে সুজার যে কোন আক্রমন আটকানোর অবস্থায় তিনি আছেন। মীর জুমলা পূর্ব তটের ৪০ ৫০ লিগ [১ লিগ = ৫.৫৬ কিমি] এলাকা তাঁর নৌবাহিনী নিয়ে টহল দিতে লাগলেন। এত দিন বাংলায় সুজার রণনীতি অনুযায়ী নিজের রণনীতি সাজাতেন মীর জুমলা। এবারে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাথম রণনীতি সাজিয়ে, সেই রণনীতি অনুযায়ী সুজাকে প্রতিক্রিয়া দেখানোর করার চেষ্টা করলেন।

পশ্চিম পাড় হাতছাড়া হয়ে গেলে সুজা শত্রু বাহিনী লক্ষ্য করে গোলা দাগতে ৮টি বিশাল কামান বসালেন। অন্যদিকে মীর জুমলা তাদের ওপর আক্রমণ রুখতে এক রাত্রিতে তিনি ১০ টা নৌকো বোঝাই করে বাছাই সেনা পাঠালেন বিপক্ষের কামান দখল করতে। কিন্তু সেটি সফল হল না। তিনি সময় পরিবর্তন করলেন। পরের দিন দিনে দুপুরে ২০ সেনা পাঠানোর পরিকল্পনা করলেন এবং তাঁর এই পরিকল্পনা অযাচিতভাবে সফল হল। বাতাসে অনুকূলে তর তর করে উজিয়ে গিয়ে হঠাত আক্রমনে বিপক্ষকে হতচকিত করে দিয়ে আটটি কামান এবং ব্যাটারিগুলি কোন ক্ষয় ক্ষতি ছাড়াই তুলে নিয়ে এল।

৪। ৩ মে ১৬৫৯, মীর জুমলার হার

মীর জুমলা স্পষ্টভাবে জানেন, তাঁর বাহিনী যথেষ্ট পরিমান যুদ্ধনৌকোর অভাবে পূর্বাঞ্চলের যুদ্ধক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে আছেন। তিনি এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে, তাঁর চরিত্র বিরোধী, বিগত যুদ্ধ সাফল্যের কারণে অতিরিক্ত আত্মপ্রসাদ এবং বিপুল আত্মবিশ্বাসে ভর করে বিপক্ষের ওপর আরও বড় হামলার পরিকল্পনা করলেন। কিন্তু ততক্ষণে সুজার বাহিনী নিজেদের ঢিলে ঢালা সুরক্ষা কষে বেঁধে নিয়েছে — সেনানায়ক নুরুল হাসানকে বদল করে দক্ষ সেনানী বারহার সৈয়দ আলমকে (খান-ই-আলম) যুদ্ধ সামলানোর দায়িত্ব দিয়েছেন। ১০টা কামানের গোছা তীরের উঁচু জায়গায় আলগোছে ফেলে রেখে বিপক্ষ বাহিনীকে আক্রমনের টোপ দেখিয়ে পিছনে সৈয়দ আলম এবং মুথাশাম খানের নেতৃত্বে কয়েকটি যুদ্ধ হাতির সেনাবাহিনী লুকিয়ে রাখলেন। ২ মে রাতে মীর জুমলার একটা বাহিনী টোপ গিলে আক্রমনে গেল কিন্তু সে আক্রমণ স্বাভাবিকভাবে বিফল হল। ৩ তারিখ ভোরে মীর জুমলার ৭৩টি যুদ্ধনৌকো করে কাশিম খান এবং শাহবাজ খানের নেতৃত্বে ২,০০০ সেনার বাহিনী উল্টোদিকের তীরে গিয়ে বাধাহীনভাবে উঠে পরিখায় উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে টোপ হিসেবে কয়েকজনকে বসিয়ে রাখা সেনা আক্রমন করে এলাকা দখল নিতে না নিতেই, মওকা পেয়ে সুজার বাহিনী যুদ্ধ হাতি নিয়ে রে রে শদে তেড়ে আসে এবং মীর জুমলার ছোট বাহিনীকে ঘিরে ধরে কচুকাটা করতে থাকে। আক্রমনকারীরা প্রবল পরাক্রমে যুদ্ধ করলেও উল্টো দিকে বসে থাকা মীর জুমলা হতাশ এবং আতঙ্কিত অবস্থায় দেখতে থাকেন নিজেদের সেনার ওপরে আক্রমন, এবং সেই আক্রমন ঠেকাতে পারে না। প্রায় অর্ধেক সেনা মারা যায়। ৫০০ গ্রেফতার করে মালদা ফিরোজপুর ও অন্যনায় এলাকায় পাঠানো হয়, কিছু সেনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এই হারের ব্যাপকতা হারের থেকেও বেশি হল। নৈতিকভাবে মীর জুমলার বাহিনী ভেঙ্গে পড়ার অবস্থা হয়। তিনি নিজেও হতাশ হয়ে পড়লেন। এই দুর্বিপাক তাঁর বর্ণময় সামরিক জীবনে চির কলঙ্কের দাগ হয়ে থেকে গেল। কিন্তু মানুষটা তো অদম্য। সব বিফলতা ঝেড়ে ফেলে নতুন করে জেতার পরিকল্পনা নিলেন। এই হার লজ্জাজনক আগামী দিনের লড়াইতে আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিল, এবং তিনি এর পর থেকে সদা সতর্ক হয়েই তাঁর আগামী যুদ্ধের সব রণনীতি তৈরি করতেন।

সুজার পক্ষের ঐতিহাসিক মাসুম মীর জুমলার হারের কারণ ঠিকভাবেই নিরূপন করেছেন, এই আক্রমন হয়ত সময়োচিত এবং প্রাজ্ঞার প্রকাশ ছিল না। তিনি শত্রুর বহর না আঁচ করেই বেহুদা আক্রমণ করতে মুয়াজ্জম খান বাহিনী পাঠিয়েছিলেন। আশাছিল শাহী সেনা আরও একবার বিপক্ষকে বেমওকা পেয়ে যাবে। মীর জুমলা কিন্তু সত্যিকারের বিপক্ষের ওজন, রণনীতি আঁচ না করেই আক্রমনের পরিকল্পনা রচনা করেছিলেন। নিজের সেনা আর রণনীতির ওপর অত্যধিক আস্থা এবং নিজের ক্ষমতা আর অহং-এর বহিঃপ্রকাশ এই বিফল আক্রমনের জনক। যদুনাথ সরকার বলেছেন — বিপক্ষকে তুচ্ছ করতে গিয়ে মীর জুমলা বাহিনীর অনেক ক্ষতি ডেকে আনলেন। রোজবিহানী অনুগামীদের প্রতি স্বগতোক্তির মত করে এক লেখায় মীর জুমলা দুঃখ করে বলছেন, এখন আমার বয়স ৭০। পরিণত বয়সে এই রকম হারের মুখোমুখি হলাম! এ অভিজ্ঞতা না হলেই ভাল হত। ব্রিটিশ কুঠিয়ালেরা বলছে শাহী বাহিনী ছোট ছোট ডিঙ্গিতে আক্রমণে আসছিল আর সুজার বাহিনী ছিল জালিয়ার মত বড় নৌকোয়। সুজার বাহিনীতে ছিল প্রচুর গতিশীল কোষা নৌকোর বহর। তবে আমরা যেন ভুলে না যাই মাত্র ৬টি নৌকোয় ১,০০০ সেনা এনেছিল মীর জুমলার বাহিনী, তাই তাদের সব নৌকো যে ছোট ছিল একথা সত্যি নয়। তাও বলা যায় সত্যই মীর জুমলা বাহিনীর নৌকগুলি তুলনামূলোকভাবে ছোট তো ছিলই এবং কিছুটা সেনাপতির পরিকল্পনা দোষে যে হার যে হয়েছে সেটা না স্বীকার করা মুর্খামি হবে।

৫। নতুন আক্রমণের পরিকল্পনায় মীর জুমলা

পুরোনো হারের হতাশা ঝেড়ে ফেলে নতুন আক্রমণের দাবার গুটি সাজাতে বসলেন মীর জুমলা। নষ্ট হয়ে যাওয়া নৌকোগুলি তাঁর নতুন পরিকল্পনায় বাধ সাধছিল যেমন, তেমনি নতুন রণনীতি তাঁর চরম একাগ্রতা মনোযোগ দাবি করছিল। হুগলি, মুর্শিদাবাদ এবং বর্ধমান থেকে নৌবহরের আরও সরঞ্জাম জোগাড়ের চেষ্টা করতে লাগলেন। নৌকো কারিগর এবং চলতি নৌকো জোগাড়ে আবার নেমে পড়ল তাঁর বাহিনী। নদীতে চলাচল করা যত বড় নৌকো সব হুকুম দখল নেওয়া হল, মুকসুদাবাদ পেরিয়ে কোন নৌকোই দক্ষিণে আর আসতে পারছিল না। পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে ইওরোপিয় ডাচ বা ব্রিটিশ সেনানীদের জোগাড়ে বিহার বাংলায় মীর জুমলা তাঁর পদমর্যাদা কাজে লাগালেন। কাশিমবাজার থেকে মাত্র ৩৫ মাইল দূরে থাকায় তিনি ডাচে কোম্পানির ডাক্তার এবং গোলান্দাজ বাহিনীকে বাহিনীতে যোগ দিতে বললেন। ব্রিটিশেরা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এল না, কিন্তু ডাচ নির্দেশক ম্যাথায়াস ভ্যান্ডেনব্রোক হুগলী থেকে তাঁর সঙ্গে মোলাকাত করতে এলেন। জনশ্রুতি সাম্রাজ্যের সেনাপ্রধান ডাচেদের সহায়তার বিনিময়ে দুলক্ষ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এর আগে ১৬৫৯-র জুলাই মাসে ডাচ প্রধান নির্দেশক মীর জুমলাকে সব ধরণের সাহায্য দেওয়ার এবং তাদের যত শ্লুপ কামান রয়েছে সে সবগুলি মুঘল সাম্রাজ্যের হয়ে নদী পাহারা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

মীর জুমলা এই যুদ্ধের প্রাবল্যের মধ্যে বসে ওডিসায় আওরঙ্গজেবের শাসন বিস্তৃতির পরিকল্পনা করলেন। সাম্রাজ্যকে সাহায্য করার জন্য বালেশ্বর এবং অন্যান্য ওডিয়া শহরের প্রশাসনকে দূত এবং নির্দেশাবলী পাঠালেন। বালেশ্বরে সুজাপক্ষী আধিকারিককে চিঠি লিখে মুহম্মদ সুলতানের সঙ্গে দেখা করার নির্দেশ দেন। কিন্তু সুজাপক্ষীয় প্রশাসকেরা তখনও সুজার সঙ্গ ছাড়তে ভয় পাচ্ছিল কারণ তখনও সুজার জেতার মিথ্যে খবর পূর্বপ্রদেশে পূর্বে ক্ষমতায় থাকা পক্ষীয়রা ছড়াচ্ছিল। ব্রিটিশরা বিশ্বাস করত ব্যবসায়ী মীর জুমলা খুব শীঘ্রই বন্দর শহর বালেশ্বর দখল করবেন। তখন আর বালেশ্বর শহরের প্রশাসকের মীর জুমলার পক্ষ নেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় থাকবে না।

মীর জুমলা বুঝলেন যত প্রাবল্য দিয়ে নদীর সামনে ঘাঁটি গেড়ে বসা শাহ সুজার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে নামা যাক না কেন, তাদের সহজে হঠনো যাবে না, বরং এই আক্রমণে শাহী বাহিনীর বিপুল ক্ষয়ক্ষতিই ভবিতব্য। বহুকালের যুদ্ধ অভিজ্ঞতায় বুঝলেন দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিতে সুজার বাহিনীর পিছন দিকে আক্রমন না করতে পারলে সমস্ত উদ্যম বিফলে যাবে। সিংহের গুহায় সোজাসুজি নয়, কায়দা করে ঢুকতে হবে। বিপক্ষকে পূর্ব, পশ্চিম এবং উত্তর দিক থেকে আক্রমন করতে হবে। এই পরিকল্পনা বাস্তবে রূপায়ণ করতে তার একমাত্র সহায়ক হতে পারেন বিহারের সুবাদার দাউদ খান।

সুবাদার দাউদ খানকে চিঠিতে মীর জুমলা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নতুন সেনা জোগাড় করতে লিখলেন। ইঙ্গিত দিয়ে বললেন রণজয়ী হাদি বা আবদুল মাল আলি খান বা কাকারদের মত আভিজাত সেনানায়কের বাহিনীকে দলে টানতে গেলে তাদের সামনে সিন্দুকের ডালা হাট করে খুলে দিতে হবে। তাছাড়া যতগুলো পারা যায় কস্তি এবং ঘুরাব (কামান দাগার নৌকো) যুদ্ধ নৌকো সংগ্রহ করে প্রত্যেক নৌকোয় প্রয়োজনীয় গোলাবারুদ কামান দিয়ে সাজিয়ে বাংলায় পাঠাতে। বন্যার সময়টা এড়িয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেনা নিয়ে চলে আসতে বললেন। তিনি জানেন নৌকো তৈরি আর তার সমর সজ্জা করতে যথেষ্ট সময় লাগবে, ফলে বড় নৌকো পরে পাঠালেও চলবে। বাঙলা পানে আসতে গিয়ে কোশি পার হওয়ার সময় তিনি যেন চিরাগ বেগের নেতৃত্বাধীন রোজবিহানী বাহিনী এবং সুতিতে রশীদ আর দেওগাছিতে মহম্মদ সুলতানের সঙ্গে আগামী দিনের কর্তব্য বিশদে আলোচনা করে নেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল দাউদ খান, রশিদ এবং চিরাগের যুক্ত বাহিনী গঙ্গার বাম পাড়ে সুজার বাহিনীকে আক্রমন করবে এবং তার পরেই দাউদের নৌকোয় মীর জুমলা বিপক্ষের ওপর আক্রমন করে শেষ পেরেকটি মেরে শত্রুর শেকড় উপড়োবার কাজটি সমাপ্ত করবেন।

৬। শাহজাদা মহম্মদ সুলতানের পক্ষ বদল

৩ মের হারের ক্ষত পূরণ করতে এবং আগামী দিনে যাতে আর নতুন করে বিপক্ষের আক্রমণের মুখে না পড়তে হয়, সে পরিকল্পনা তৈরি করতে নতুন করে যখন আক্রমণের ঘুঁটি সাজাতে ব্যস্ত ছিলেন মীর জুমলা, তখনই ৮ মে রাতে বিনা মেঘে বজ্রাঘাতের সংবাদ এল মীর জুমলার কাছে। শাহী বাহিনীর সহযোগী সেনানায়ক শাহজাদা মহম্মদ সুলতান দেওগাছির শিবির ছেড়ে সুজার শিবিরে যোগ দেয়। স্বয়ং সম্রাট পুত্র শাহজাদার সুজার বাহিনীতে যোগ দেওয়ার সংবাদে হয়ত মীর জুমলার সমগ্র শাহী বাহিনীই ছত্রভঙ্গ হয়ে যেত, কিন্তু পোড় খাওয়া বহু যুদ্ধের সেনানী মীর জুমলা উপস্থিত বুদ্ধি, সেনানীদের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ এবং অপরিসীম সাহসের জন্য সেই বাহিনী টিকে গেল শুধু নয়, আবার নতুন করে সুজার বাহিনীর ওপর আক্রমণের পরিকল্পনা করা শুরু হল।

শাহজাদার পালানোটা অবশ্যম্ভাবীই ছিল। সুজার মেয়ের প্রতি দীর্ঘকালের ভালবাসা, সিংহাসনের প্রতি তাঁর দুর্নিবার টান, মহম্মদ সুলতানকে শাহ সুজার বারবার সিংহাসনের লোভ দেখানো ছাড়াও শাহী বাহিনীতে তাঁর মীর জুমলার নিচে থাকা, মীর জুমলার নামে বিষ ঢেলে তাঁর মন শাহী বাহিনীর প্রতি বিমুখ করে দেওয়া, নানান কারণে সম্রাটের নির্দেশে মীর জুমলা তাকে গ্রেফতার করতে পারেন, এরকম একটা খবর সুকৌশনে ছড়িয়ে দেওয়ার পরে তাঁর মনে গ্রেফতার হওয়ার একটা ভয় ছিলই। সুজাপন্থী ঐতিহাসিকদের বক্তব্য, পুত্রের প্রতি সম্রাটের বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়েছিল দুটি বিষয় নিয়ে — প্রথমটি ছিল মীর জুমলা নাকী সরাসরি সম্রাটকে চিঠি লিখে জানান যে ৩ তারিখের যে ব্যর্থ অভিযান হয়, সেই অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া নিয়ে তাঁর পুত্র মহম্মদ সুলতানের লোকদেখানো অজ্ঞতা এবং বাহিনীর প্রতি প্রকাশ্য অবহেলা ব্যর্থতার অন্যতম কারণ। দ্বিতীয়ত একটি কবিতা সূত্রে জানতে পারা যাচ্ছে সম্রাটের নির্দেশে সেনাবাহিনীর আনুগত্যের পারদ খোঁজ করা নিয়ে দুই ওয়াকিয়ানবিশ বা গোয়েন্দার মতের বিরুদ্ধে শাহজাদা উল্টো মত প্রকাশ করেছিলেন। সেটা সম্রাটের কাছে শাহজাদার নামে বিষোদ্গারের মত করে পৌঁছয়। এই বিষয়ে সম্রাট মীর জুমলাকে লেখেন, সাধারনই হোক বা গুরুত্বপূর্ণ, তোমার ওখানে [বাংলায়] বা এখানে [মুঘল হিন্দুস্তানে] অধিকাংশ সামরিক ঘটনা তোমার নির্দেশে পরিচালনা করি। যদি আমার পুত্র তোমার নির্দেশ পালন করতে ব্যর্থ হয় আর তুমি যদি মনে কর তোমায় আর তাঁর দরকার নেই, তোমার কাজে সে উদ্বৃত্ত হয়েছে, তাহলে শীঘ্রই তাকে দিল্লিতে ফেরত পাঠিয়ে দেবে। সম্রাটের এই নির্দেশকে ওয়াকিয়ানবিশ বা গোয়েন্দারা মনে করছিল বাস্তবে সম্রাটপুত্র মহম্মদ সুলতানের গ্রেফতার করে দিল্লি পাঠানোর নির্দেশ। শাহজাদা এই চাপে মাথা ঠিক রাখতে না পেরে ধৈর্য হারিয়ে এক রাতে নদী পেরিয়ে তাঁর কাকার শিবিরে আশ্রয় নেওয়াকেই নিশ্চিত নিরাপত্তা হিসেবে গণ্য করলেন।

সুতি শিবিরে এই সংবাদ পৌঁছনোর পরে মীর জুমলা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান। শাহী বাহিনীকে শান্ত করে তিনি পরের দিন সকালেই দেওগাছির দিকে রওনা হয়ে যান। রাস্তায় আওরঙ্গজেবের নিযুক্ত চরেদের সঙ্গে দেখা হয়, তারা পলায়ন কাণ্ডে হতবুদ্ধি শাহজাদার রক্ষীদের কবল থেকে পালাতে পেরেছিল। তাদের থেকে মূল খবরটা পেয়ে তিনি নিশ্চিন্ত হন।

দেওগাছিতে পৌঁছে দেখলেন শিবিরের অবস্থা ছিন্নভিন্ন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। মীর জুমলা ঘুরে দেখলেন প্রত্যেকেই নির্দেশ অমান্য করতে বসে রয়েছে, শিবির জুড়ে দিশাহীনতা এবং হতাশার পরিবেশ। কিন্তু মীর জুমলা মানুষের জন্ম নেতা। ৫ দশকের পোড়খাওয়া সেনাপতি রাজনীতিবিদ হিসেবে ছিন্নভিন্ন বাহিনীর মনোবল বাড়ানোর উপযুক্ত দাওয়াই তাঁর অজানা নেই। যুদ্ধ সমিতির বৈঠকের আগে শুধু সেনাপতিদের বৈঠক নয়, সেনাবাহিনীর সেনাদের সমাবেশে বক্তৃতা দিতে উঠলেন মীর জুমলা মুয়াজ্জম খান। সেনাদের মনোবল বাড়াবার জন্য ফুলেল ভাষায় উত্তেজনাময় বক্তৃতা দিলেন — আজকে যাকে ভোকাল টনিক আখ্যা দিই। উপস্থিত অধিকাংশ সেনাই মনে করছে আগামী দিনের সুজার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ক্রমাগত হার হতেই থাকবে। তিনি সেনাদের এই মানসিকতার প্রতিবাদ করে তিনি বললেন, ‘তোমরা শেয়ালের মত পালিয়ে বেড়ানো শত্রুর ভয়ে মরছ? সে আমাদের দেখে পালাচ্ছে, না তার ভয়ে আমরা পালাচ্ছি’? তাঁর অসামান্য রঙ্গিন শব্দভরা বক্তৃতায় তাদের মনে জেতার বিশ্বাস পুরে দিলেন, ‘হে আমার সেনাদল, শত্রুকে আজ সূর্যের মত উজ্জ্বল মনে হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তোমরা আমায় জান, আমি তো মেঘ, আমি উজ্জ্বল সূর্যকে কালো পর্দা দিয়ে ঘিরে ফেলব… আমি তাদের ফিরিঙ্গিদের (পর্তুগিজ) কাছে তাড়িয়ে নিয়ে যাব। শাহজাদার পালিয়ে যাওয়া আমাদের বাহিনীতে বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়বে না — এটা কোনও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাই নয়। তিনি বললেন, সম্রাট আমার ওপর বিশ্বাস পেশ করে, একমাত্র আমাকেই সেনাপতি নির্বাচন করেছেন, শাহজাদাকে আমার সঙ্গে শুধু পরামর্শ করার জন্যে পাঠিয়েছিলেন, এর বেশি কিছুই নয়। আমি আছি, শত্রুদের পরিকল্পনা সব গ্রাস করে নেব’। বক্তৃতার শেষ পর্বে এসে আগামী দিনে তাদের কর্মপদ্ধতি, তাদের পরিকল্পনা ইত্যাদি আলোচনা করে গোটা বাহিনীর মন জিতে নিয়ে সমগ্র বাহিনীর মন-মানসিকতার পরিবর্তন আনলেন আওরঙ্গজেবের প্রধানতম সেনাপতি মীর জুমলা। তাঁর বক্তৃতা, তাঁর রাগের বহিঃপ্রকাশ, প্রত্যেকটি ছোট-বড় সেনার মনে মধ্যে সেঁধিয়ে গিয়ে আশার চেতনা বইয়ে দেওয়ার ক্ষমতা সামগ্রিকভাবে সিংহাসনের লড়াইয়ের প্রাথমিক উদ্দেশ্যপূরণে সহায়ক হল। যে সব সেনা কয়েক মুহূর্ত আগেও নড়বড়ে হয়ে বিদ্রোহের তোড়জোড় করছিল, তারা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মীর জুমলাকে তাদের একমাত্র নেতা রূপে বৃত করে নিল। উত্তেজিত মীর জুমলা সেনাপতিদের হয়ে তাদের পদন্নোতি এবং বেতন বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে সম্রাটকে চিঠি লেখার প্রতিশ্রুতি দিলেন। খাজাঞ্চিখানার দারোগাকে সেনাদেরকে তিন মাসের অগ্রিম দিতে নির্দেশও দিলেন।

সেনাদের মন জিতে মীর জুমলা শাহজাদার ছেড়ে যাওয়া মালপত্র নিতে আসা একটা বাহিনীকে পিটিয়ে তাড়িয়ে দিলেন এবং পলাতক শাহজাদার সম্পত্তি এবং খাজাঞ্চিখানা, সম্রাটের নামে ক্রোক করারও নির্দেশ দিয়ে তাঁর সেনাদলকে সম্রাটের বাহিনীতে অন্তর্ভূক্ত করে নিলেন। মীর জুমলার নেতৃত্বের গুণে নেতাহীন একটি বাহিনীও মনে নতুন আগুণ জ্বেলে এগোল। এ প্রসঙ্গে আকিল খান মন্তব্য করলেন আমরা একজন শাহজাদাকে মাত্র হারালাম।

ফিদায়ি খানকে সুতি ইসমান খানকে দেওগাছি রেখে এবং জুলফিকারকে রাজমহলে পাঠিয়ে আবারও তিনি তাঁর পুরোনো অবস্থান সুতিতে ফিরে গিয়ে ১০ জুনে রশিদ খানকে দাউদ খানের কাছে এবং তাঁর পরে কাজি কেরিয়ার কাছে পাঠালেন।

বাংলায় তখন পূর্ণ বর্ষা। মীর জুমলা তাঁর বাহিনীকে ছাউনিতে পাঠিয়ে দিলেন। তাঁর রণনীতি হল মনোযোগ এবং প্রত্যাহার। দেওগাছি দুনাপুর এবং সুতি থেকে সেনা তুলে নিয়ে শুধু দুটি জায়গায় সেনা রাখলেন। স্বয়ং তিনি ১৫,০০০ সেনা নিয়ে মাসুমবাজারে (মুর্শিদাবাদে) একটি উঁচু জায়গায় রইলেন। রাজমহলে রইলেন জুলফিকার খান, ইসলাম খান, ফিদায়ি খান, সৈয়দ মুজফফর খান, ইখলাস খান, রাজা ইন্দ্রদুম্ন, কিজিলবাস খান এবং অন্যান্যরা। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev