| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলা : জগদীশ নায়ারণ সরকার (৩২নং কিস্তি) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ২৭০ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২২

চতুর্থ পর্ব

গঙ্গার পশ্চিমের যুদ্ধ

১। মীর জুমলার বাড়তে থাকা অস্বস্তি

শাহজাদা মহম্মদ সুলতানের, সেনাপতি মীর জুমলার শিবির ছেড়ে যাওয়া যুদ্ধের মোড় ঘোরানোর মত ঘটনা ছিল। এত দিন ধরে সুজার আক্রমণ সামলে, তারপরে নিজেকে তৈরি করে গঙ্গার যুদ্ধে প্রায় একতরফা আক্রমন করে আসছিলেন মীর জুমলা, আঘাত সামলাচ্ছিল বিপক্ষ পলাতক দল, বিশেষ করে মীর জুমলার রাজমহল দখল করার পরের সময়ে। রাজমহল হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার পরে সুজা যুদ্ধক্ষেত্রে আত্মরক্ষামূলক রণনীতি অনুসরণ করছিলেন। গঙ্গা যুদ্ধের গতি পালটে এই প্রথম অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রতিআক্রমনে যেতে শুরু করলেন সুজার বাহিনী। শেষ বারের মত তার পুরোনো প্রশাসনিক এলাকার যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি জ্বলে উঠবেন। এবার যুদ্ধ নতুন পর্বে প্রবেশ করল তাই নয়, দৃশ্যপটও পরিবর্তন হয়ে গেল। শাহজাদা পশ্চিম পাড় থেকে পূর্ব পাড়ে চলে যাওয়ায় যুদ্ধের প্রকোপটা ঢলে পড়ল গঙ্গার পশ্চিম দিকে। সুজা এবারে তার হারানো রাজ্যপাট, রাজমহল আক্রমণের সুচিন্তিত প্রস্তুতি শুরু করলেন।

শাহজাদার শিবির পরিবর্তনের ধাক্কা সামলে নিজের বাহিনীকে ভোকাল টনিক দিয়ে প্রকাশ্যে তরতাজা করে তুলতে পারলেন ঠিকই, কিন্তু বাহিনী থেকে গুরুত্বপূর্ণ রাজপুরুষের পক্ষ পরিবর্তনের ফলে সাধারণ সেনার মধ্যে যে প্রবল নীরব ধাক্কা তৈরি হল, সেটা মীর জুমলার যুদ্ধ সাজ তৈরিতে মানসিকভাবে হাজারো বাধা তৈরি করল। শাহজাদা চলে যাওয়ায় সৈন্যর সংখ্যা কমে যায় নি ঠিকই কারণ তিনি একাই দল ছেড়েছেন, বড় দল নিয়ে বাহিনী ছাড়তে পারেন নি; কিন্তু মনে মনে মীর জুমলা বুঝতে পারছিলেন, শাহজাদা চলে যাওয়ার পরে পরেই তাঁর বাহিনী যেন তার কেটে যাওয়া যন্ত্রের মত বেসুরো বাজছে। যেহেতু মীর জুমলার যুদ্ধ সমিতির আলোচনায় শাহজাদা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতেন, তাই তার বাহিনীর যুদ্ধ করার পদ্ধতি এবং সেনা বাহিনীর গোপন খবরাখবর তাঁর নখদর্পণে ছিল। সে সব গোপন তথ্য সুজাকে যুদ্ধের মাঠে কয়েক কদম এগিয়ে দিল বলাই বাহুল্য। আর শুধুই শাহজাদার উপস্থিতি সুজার বাহিনীকে এতটাই চাঙ্গা করে তুলল যে তারা নতুন করে যুদ্ধের শেষ দেখতে তীব্র প্রতিআক্রমনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। বালেশ্বরের ব্রিটিশ কুঠিয়ালেরা ১৫ ডিসেম্বর চমৎকৃত হয়ে দেখল, সুজা এখন সিংহাসন লড়াইয়ের পূর্ব ভারতের যুদ্ধক্ষেত্রে গঙ্গা যুদ্ধের শেষ পর্ব নিয়ন্ত্রণ করার অবস্থায় চলে এসেছেন। তাছাড়া আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বর্ষার উতপাত। মীর জুমলার অগ্রগমনকে বেশ কিছুটা পিছিয়ে দিল বর্ষা আর বন্যা। বাংলার বর্ষাকালের প্রলয়ঙ্করী জলস্রোত শুধু যে দু পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ অদেখা ৬০ মাইলের অলঙ্ঘ বাধা তৈরি করল তাই নয়, মীর জুমলার বিশাল বড় বাহিনীর জন্যে যাতায়াতে প্রবল প্রাকৃতিক সমস্যা তৈরি করল তীব্র বর্ষার জলকাদাভরা বাংলার রাস্তা। বর্ষায় পূর্বাঞ্চলের যুদ্ধক্ষেত্র মীর জুমলার পক্ষে শুধুই লড়াই করার অনুপযুক্ত হয়ে উঠল না, তার থেকেও বড় কথা হল মীর জুমলা আশংকায় থাকলেন বর্ষায় তাঁর বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে রসদ সরবরাহের সব কটা পথ সুজা না বন্ধ করে দেন।

এই সবক’টি কারণ মিলে আশংকার গহ্বরে ডুবে গেল শাহী বাহিনীর সেনাপতিরা। অন্যদিকে সুজা নতুন উদ্যমে মীর জুমলার বাহিনীকে আক্রমণের পরিকল্পনা রচনা শুরু করে দিলেন। সুজার বাহিনীর কাছে প্রধান প্রশ্ন হল, মুকসুদাবাদ না রাজমহল, কোন শিবিরে তারা আগে আক্রমন শানাবে। বহু বাগবিতণ্ডার পর সিদ্ধান্ত হল গঙ্গার পশ্চিম পাড়ের রাজমহলেই প্রথম আক্রমণ শানানো হবে — এখানেই পুরোনো প্রচুর রসদ রাখা আছে — সে সব কাজে লাগানো যাবে। মুকসুবাদা আক্রমনে অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা দেখলেন সেনাপতিরা। গঙ্গা ভেসে থাকা নৌবহর থেকে মুর্শিদাবাদের উঁচু টিলায় বসে থাকা মীর জুমলার বাহিনীর ওপর আক্রমণের অনেক অসুবিধে রয়েছে। সুজার আশংকা ইওরোপয়রা তার ডাকে সাড়া দেয় নি — এ সময় হুগলী এবং কাশিমবাজারের কুঠিয়ালেরা একসঙ্গে যদি মীর জুমলার পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যেতে পারে, যুদ্ধের লাগাম তার হাত থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু রাজমহলে গঙ্গা থেকে সরাসরি কামান দাগা অনেক সুবিধের। রাজমহল দখল হয়ত যুদ্ধের গতিপথ পাল্টাতে পারবে না, কিন্তু পলাতক বাহিনীর খোয়া যাওয়া সম্মান উদ্ধার করতে সাহায্য করবে। রাজমহলে ঘাঁটিগেড়ে থাকলে আরও একটা গুরিত্বপূর্ণ কাজ হবে — উত্তর-পশ্চিম থেকে দাউদ খান বা দক্ষিণ থেকে মীর জুমলার শিবির থেকে ত্রাণ নিয়ে পৌঁছনোর বাহিনীর ওপর আক্রমণ শানানো যাবে।

সুজার রণনীতিতে রাজমহল দখল করে শাহী বাহিনীকে হাতে মারার সঙ্গে সঙ্গে হুগলী মুর্শিদাবাদের ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির থেকে যোগান যাওয়া রসদের সরবরাহ কেটে ভাতে মারারাও পরিকল্পনা হল। মুর্শিদাবাদ থেকে গঙ্গা বক্ষ দিয়ে যে রসদের ভাণ্ডার পাঠানো হচ্ছিল মুর্শিদাবাদে, সেগুলি সুজার বাহিনী দখল নিল। বিহার এবং বাঙলার পশ্চিম অঞ্চলের বহু জমিদারকে নিজের দিকে টেনে এনে সুজা তার নিজস্ব রসদের ভাণ্ডারটি জোরদার করলেন। শুধু গঙ্গাই নয়, রাস্তা ধরে পাঠানো রসদের বহরও দখল করতে শুরু করে সুজার বাহিনী। মাজোয়ার রাজা হরচাঁদকে সুজা প্রলুব্ধ করে সেই অঞ্চলের প্রত্যেক বণিককে গরুর গাড়ি বোঝাই করে খাদ্যশস্য নবাবি বাহিনীর শিবিরে পাঠানোর হুকুম জারি করলেন। ৫ জুলাইয়ের কাশিমবাজারের জমিদারকে লেখা এক চিঠি থেকে জানা যাচ্ছে, যে কাউকে বেনিয়া বা সেনার টাকাকড়ি বা অন্যান্য সম্পদ লুঠ করার পূর্ণ অধিকার দিয়েছিলেন সুজা এই শর্তে যে তার বাহিনীর চাহিদা মত তাকে রসদ পৌঁছতে এবং যুদ্ধ হাতি সরবরাহ করতে হবে। হুগলি আর কাশিমবাজারের মধ্যে সুজার বিনা বাধায় লুঠ করার ছাড়পত্র দিয়ে জারি করা নিশানের বয়ান বিপুল ত্রাসের রাজত্ব তৈরি করাল। বানিয়ারা লুঠের আশংকায় তাদের রসদ নিয়ে এমন কি হরকরাও চিঠিপত্র নিয়েও বেরোনো বন্ধ করে দিলেন।

২। সুজার রাজমহল দখল

মীর জুমলার নিয়ন্ত্রণ থেকে বাংলার রাজধানী রাজমহল বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হল। তিনি শহর শাহী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেন না। নৌবাহিনীর অভাবে দূর থেকে অসহায় হয়ে দেখলেন আস্তে আস্তে শত্রুর শক্তিশালী নৌবহরে তাজমহল জলবদ্ধ হয়ে শাহী বাহিনীর হাতছাড়া হয়ে যেতে বসেচে। অবরুদ্ধ শহরের বাসিন্দাদের জন্য তিনি ত্রানের জন্য যে বিপুল রসদ পাঠালেন সে সব রাস্তায় সুজার বাহিনী অবলীলায় লুঠ করে নিল। শহরে শুরু হল খাদ্যের অভাব। ঐতিহাসিক মাসুম স্বচ্ছল রাজমহল শহরে অসহায় মানুষের তৈরি মন্বন্তরের পরিবেশের বিবরণ লিখেছেন — দানা শস্য সোনার মুদ্রা দিয়েও পাওয়া যায় না; নষ্ট, দুর্গন্ধ মোটা চাল আর ডালের দাম হল টাকায় ন’সের; …খাদ্যের অভাবে মানুষ বিষ খেল; মাংসের দাম প্রতি সের হল একটাকা; গরীবেরা নিজেদের মাংস চিবিয়ে খেল; কেউ কেউ নিজেদের ঠোঁট চেবাতে শুরু করল অসহায় হয়ে; মাসুমকে দানা শস্য কেনার জন্য ২০-৩০টাকাও খরচ করতে হয়েছে; ফাঁকা দোকানের সামনে কুকুর বেড়াল অভুক্ত অবস্থায় বসে থাকতে থাকতে মরে গেল; মন্দির মসজিদ জনশূন্য হয়ে পড়ল; মন্বন্তরের লেলিহান শিখা গ্রাস করল বাংলার রাজধানী রাজমহল শহরকে। শহরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়া মীর জুমলার রোজবিহানী সেনাদের মনে হল যে রুটির একটা টুকরো যেন জলের মত প্রাণদায়ী। আকিল খান বলছেন, নিজেদের যকৃতের রক্ত পান করে জলের তেষ্টা মেটাতে লাগল মানুষ। মন্বন্তরের সঙ্গে জুটল বর্ষার সময়ে বন্যার হাহাকার। ঘোড়া আর গরুর মরতে থাকল শয়ে শয়ে। রাজমহলে মীর জুমলার বাহিনী অবরুদ্ধ হয়ে এখন তখন অবস্থা। হতাশ, বিশৃঙ্খলতার ঘড়া কাণায় কাণায় পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় সেনাপতিদের রাজমহল ছেড়ে যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় দেখা গেল না।

মানুষ যখন চরম অসহায় অবস্থায় পড়েছে, সেই মুহূর্তে সুজা আক্রমণ করলেন। বিপক্ষের বিন্দুমাত্র প্রতিরোধ না পেয়ে রাজমহলের দক্ষিণে পাটুরা দখল নিয়ে সুজার সেনাপতি শেখ আব্বাস রাজমহল দখল করার সমরসজ্জা শুরু করলেন। কিছু সময় পরে সুজা পশ্চিম তীর পার হওয়ার জন্য ছটফট করতে লাগলেন। তাণ্ডায় সেরাজুদ্দিন জাবরি, মীর আলাউদ্দিন, দেওয়ান মুহম্মদ জামান এবং মীরইজামানকে রেখে তিনি পাটুরার দিকে রওনা হলেন ১৮ আগস্ট। ২২ আগস্ট নৌবহর নিয়ে রাজমহল দখল করলেন। সাম্রাজ্যের সেনানীদের মধ্যে উঁচু স্থানে থেকেও অসুস্থ জুলফিকার খান লড়াই দিতে পারলেন না, যতটুকু লড়াই করার রাজা ইন্দ্রদুম্ন করলেন। শহরের সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা ইসলাম খান এবং ফিদায়ি খান শত্রুর আক্রমণের সামনে দাঁড়িয়ে হতোদ্যম হয়ে যৌথভাবে আক্রমণ রোখার পরিকল্পনাটাই তৈরি করে উঠতে না পেরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মার খেলেন। সক্কলে মিলে ঠিক করলেন শহর ছেড়ে মুর্শিবাদাদে মীর জুমলার কাছে ফিরে যাবেন। পাহাড়ের তলায় নতুন শহরের মধ্যে দিয়ে শত্রুর গোলাগুলির সয়ে সাম্রাজ্যের বাহিনী শহর ছেড়ে রওনা হল, সরকারি ইতিহাসে বলা হয়েছে সুজার সেই আক্রমণ যথেষ্ট জোরদার ছিল না, তাও সেই আক্রমন রুখতে ব্যর্থ হল শাহী বাহিনী। শাহী বাহিনীর ছেড়ে যাওয়া সমস্ত রসদ দখল নিল আক্রমণকারীরা। রাজমহলের সঙ্গে সুজার নিয়ন্ত্রণে এল গঙ্গার পশ্চিম পাড়। সুজা সিংহাসন দখলের যুদ্ধে বাঙলা প্রদেশের চলতে থাকা লড়াই নিয়ন্ত্রণ করার অবস্থায় পৌঁছলেন।

ছত্রভঙ্গ হয়ে সুতির শিবিরে পৌঁছনো সেনাবাহিনীকে একহাত নিলেন মীর জুমলা, ‘হতচ্ছাড়া তোমরা যুদ্ধের উপযোগী বাহিনীই নও। ছেঁড়া খোঁড়া পোষাক, বাগানের বাইজিদের সঙ্গে ফুর্তি আর বেলেল্লাপনা করা মাতালদের মত চেহারা চরিত্র নিয়ে সুজার বাহিনীর মুখোমুখি হয়েছিলে? পুরুষের মূল্য তার সাহসিকতায়, আর সাহসিকতার নীতি দাঁড়ায় মনুষত্বের মহিমার ওপর নির্ভর করে। তোমাদের মত বুড়ো শেয়ালদের সেই চরিত্র রক্ষা করার যোগ্যতা নেই। তোমরা দক্ষ সেনাপতিহীন, দক্ষতাহীন, উদ্যমহীন একটা তুশ্চু বাহিনীর কাছে হেরে পালিয়েছ’। সেনানায়কের এই কুবাক্যের একমাত্র প্রতিবাদ করলেন অসুস্থ জুলফিকার। তিনি প্রতিবাদ জানিয়ে বললেন, সম্মানিত সেনাপতিদের মনুষত্বহীন ভীরু বলার অধিকার সেনানায়কের নেই। জুলফিকার নিজে দারা এবং সুজার যশোবন্ত সিংএর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন, কিন্তু তাকে সেনাবাহিনীকে বাঁচিয়ে নিয়ে যুদ্ধস্থল ছাড়তে হয়েছে সুজার বাহিনীর পরাক্রমে নয়, তার চতুরতার জন্য এবং রসদের অভাবের জন্য নয়, খালি পেট থাকার জন্য, মন্বন্তরের প্রকোপের জন্যে। জুলফিকারের বাক্যের সারবত্তা অনুভব করে মীর জুমলা তাদেরকে সান্ত্বনা দিলেন। তিনি তাদের পূর্বের বীরত্বের জন্য ধন্যবাদ দিয়ে বললেন, তিনি যে রাজমহল শহর দখল করেছিলেন, সেই শহরটাকে সুজার আক্রমণের প্রাবল্যের জোরে নয়, রসদের অভাবে ছেড়ে আসতে হয়েছে, সেই দুঃখ তার চিরকাল থাকবে। তিনি বাকি সেনাদের হতাশ হতে বারণ করলেন এবং রাজমহল উদ্ধারের আশা ছাড়তে বারণ করলেন। বাহিনীকে বিশ্বাস জাগিয়ে তিনি বললেন এই শহর সুজার বাহিনীর হাত থেকে উদ্ধার করাই তাঁর এখনকার ব্রত।

হঠাত আক্রমন করে বিপক্ষকে হতচকিত করে দিয়ে সুজা রাজধানী রাজমহল দখল নিলেন ঠিকই, কিন্তু মীর জুমলার দক্ষিণের রসদের যোগানের রাস্তা বন্ধ করা এবং মীর জুমলাকে একাকী করার কাজ করতে পারলেন না। মুর্শিদাবাদের সেনা ছাউনিতে বর্ষাকাল জুড়ে সেনাপতি মীর জুমলা বিন্দুমাত্র বিশ্রাম নেন নি, বরং তার বিপুল সেনাবাহিনীর সংখ্যাধিক্যের জোরে তিনি হুগলীর দিকে আসা এবং হুগলীর থেকে দক্ষিণের দিকে বেরোনো রাস্তা পরিষ্কার করার কাজের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করলেন। জুলাই মাসে তিনি ৫০০ ঘোড়ার মনসবদার ফৌজদার (মহম্মদ শরিফ?) নিয়োগ করে কাশিমবাজার থেকে হুগলির মধ্যের রাস্তা পরিষ্কার করার কাজে হাত দেওয়ালেন যাতে তিনি অবাধে বাণিজ্য কেন্দ্র হুগলি এবং এমন কি দক্ষিণ ভারতে যাওয়ার পথের শুরু মেদিনীপুরও দখল করতে পারেন। একই সঙ্গে বাহিনীর গোয়েন্দা দলকে দক্ষিণ বঙ্গে আবাধে বাহিনী নিয়ে চলাফেরা করা সুজাপন্থী জমিদারদের ওপরে নজরদারিরতে লাগালেন। এর উত্তরে সুজা, হিজলির প্রশাসক মির্জা ইসফানদারকে (ব্রিটিশদের নথিতে মেজর স্পিলন্ডার) ৬০০০ পদাতিক এবং ৫০০ ঘোড়সওয়ার আর কিছু গেরিলা (জলবা) বাহিনী নিয়ে হুগলির প্রশাসকের হাত শক্ত করার দায়িত্ব দিলেও মির্জা ইসফানদার ঠিক সময়ে অকুস্থলে পৌঁছতে পারেন নি। কাশিমবাজারের ব্রিটিশ কুঠিয়ালেরদের ধারণা ছিল মীর জুমলার বাহিনীকে কঠিন পরীক্ষার মধ্যে পড়তে হবে হয়ত, সেই পরীক্ষাটা তাদের দিতে হল না; শেষ পর্যন্ত নির্বিঘ্নে হুগলী দখল নিলেন। সেপ্টেম্বরের শুরুতে যখন মীর জুমলার বাহিনী মেদিনীপুর দখল নিচ্ছে তখনও বিপক্ষ মেদিনীপুর শহরে পৌঁছতে পারে নি, সুজার বাহিনী ১৭ কিমি দক্ষিণ-পূর্বে নারায়ণগড় শহরে পৌঁছেছে।

৩। বেলঘাটা, গিরিয়ার যুদ্ধ

রাজমহল দখল করে উজ্জীবিত সুজা পরের কাজকর্মের কথা ভাবতে শুরু করলেন। তিনি রাজমহলের দিকে অভিযান করা দাউদ খানের বিরুদ্ধে অভিযান করবেন না কী দক্ষিণে মীর জুমলার বাহিনীর ওপর আক্রমন করবেন এই দ্বন্দ্বে পড়লেন। বর্ষা শেষ হওয়ার মুখে। শাহজাদা মহম্মদ আজমের পরামর্শে তিনি নিজে মীর জুমলার বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ায়ের ময়দানে নামার সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁর মনে হল মীর জুমলাকে হারাতে পারলে দাউদ খানের অভিযান ব্যর্থ হবে। যদিও তিনি দাউদ খাননের অভিযানকে বিন্দুমাত্র তুচ্ছ করলেন না। দাউদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযানের দায়িত্ব দিলেন ফিদায়ি খান এবং খোয়াজা মিশকিকে (ইতিবর খান)। বর্ষা শেষ হতে না হতেই, দুমাসের মধ্যে সুজা ৮০০০ বর্ম পরা সেনা নিয়ে খাসা এবং ঘুরাব নৌকো সহযোগে রাজমহল থেকে দুনাপুর, দোগাছি এবং সুতি হয়ে বেলঘাটা পৌঁছলেন।

ছাউনিতে অকাম অবস্থায় নিজের বাহিনীকে বসিয়ে রাখেন নি মীর জুমলা। যুদ্ধ উপযোগী করে সাজিয়ে বাহিনীকে তিনি তুললেন। ঠিক হল রথে নেতৃত্ব দেবেন জুলফিকার খান, ডানদিকে মুজফফর, বাঁয়ে ফিদায়ি খান (খান কোকা), গোলান্দাজ বাহিনীর নেতৃত্বে মহম্মদ মুরাদ বেগ আর মহম্মদ আঘর (উইঘুর) হারনাওয়াল(?) হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। সুজা বাহিনীর মুখোমুখি হতে মাসুমবাজার থেকে ২০ মাইল দূরে বেলঘাটায় তিনি ভাগীরথীর তীরে কেটে ভেতরে ঢুকে যাওয়া একটি গভীর নালাকে পরিখা হিসেবে বেছে নিলেন। একটি বাহিনী মূল বাহিনীর কাছে, অন্য বাহিনীটি এক মাইল দূরে রেখে তিনি তাদের মাথা সুরক্ষা আচ্ছাদনে ঢাকলেন। একতাজ খান বাঁদিকের বাহিনীর হয়ে লড়ায়ের দায়িত্ব পেলেন। সেনাপতিদের পালিয়ে যাওয়া রুখতে হাতির বদলে তিনি ঘোড়া চড়তে নির্দেশ দিলেন। কেউ তার নির্দেশ অমান্য করলে হাতি দিয়ে মাড়িয়ে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে রাখলেন তিনি। মীর জুমলার বিশাল বাহিনীর অগ্রগমনের সংবাদে সুজার বাহিনীতে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।

নালার দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুই বাহিনীর মধ্যে প্রথমে গোলার লড়াই শুরু হল ৬ ডিসেম্বর দিনের দেড় পহর (প্রহর? তিন ঘন্টায় এক প্রহর আর যাম হিসেবে ছটায় সকাল ধরলে দুপুর এগারোটা নাগাদ শুরু হল লড়াই — অনুবাদক) থেকে। কয়েকদিন ধরে গোলা বিনিময় এবং খণ্ডযুদ্ধের পর মীর জুমলার বাহিনীকে টেনে আনতে, সুজার বাহিনী রাজমহলের দিকে কিছুটা পিছু হঠার ভান করে বেশ কিছুটা জায়গা ছেড়ে পিছিয়ে যায়। সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে মীর জুমলার বাহিনী সুজার ছেড়ে যাওয়া যায়গা দখল করে সুজা বাহিনীকে ঘিরে নেওয়ার চেষ্টা করলে সুজার মূল সেনাপতি মহম্মদ সুলতান মাত্র ৪০০ বাহিনী নিয়ে সামনের দিক পাহারা দেওয়া একতাজ খানের বাহিনী ঘিরে নেয় (১৫ ডিসেম্বর)। মুখ্য পাহারাদার একতাজ, তার বাহিনীর সাহায্যের জন্য মীর জুমলাকে নতুন বাহিনী পাঠাবার অনুরোধ করলেন। মীর জুমলা জুলফিকারকে বললেন আঘার (উইঘুর) এবং রোজবিহানীদের মোট ৭,০০০ মেলানো মেশানো বাহিনী পাঠাতে। যদি তারা জয় নিশ্চিত করতে পারে তাহলে যেন তারা শাহজাদার পিছন ধাওয়া করে। কিন্তু এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হল না। বিপক্ষের গোলায় আহত একতাজকে নিয়ে নালার সেতু পেরিয়ে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয় জুলফিকার।

মীর জুমলা হতোদ্যম না হয়ে নতুন করে যুদ্ধ জিততে দাবার ঘুঁটি সাজাতে বসলেন। সুজার তিনজন সেনানায়কের মধ্যে, শাহী বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করার অভিজ্ঞতা হয়েছে একমাত্র সামনে লড়াই দেওয়া শাহজাদার; তিনি বাঁদিকের সেতু দখলের দিকে এগোচ্ছিলেন। মীর জুমলা এক পাশ এবং পিছন দিয়ে সুজার বাহিনীকে ঘেরার পরিকল্পনা করলেন স্বভাবসিদ্ধ রণনীতিতে। সামগ্রিক সেনা চালনার দায় জুলফিকার খানকে দিয়ে মীর জুমলা বাঁদিকের সেতু ধরে নালা পেরিয়ে ধীর গতিতে জঙ্গল, কাদা পেরিয়ে গিরিয়ার কাছে ভাগীরথীর তীরে সুজার সেনার পিছনে মীর ইসফানদিয়ার মামুরির বাহিনীর ওপর গোলান্দাজ বাহিনী, হাতি এবং উট হাউই (সুইভেল?) বাহিনী নিয়ে তীব্র আক্রমন শানালেন। মীর জুমলার আক্রমন এতই তীব্র হয়েছিল যে, শাহজাদাকে, আক্রান্ত সেনাদল উদ্ধারে যুদ্ধের এই ক্ষেত্র সামলাতে চলে আসতে হল। তিনি পৌঁছে ঘোষণা করলেন এই যুদ্ধ যার নেতৃত্বে জিতবে তাকে হিন্দুস্তানের সাম্রাজ্যের অর্ধেকটা উপহার দেওয়া হবে।। জুলফিকারের বিপক্ষে গোলাবারুদের দারোগা ইবন হুসেইনকে রেখে, সুজা ছোট কিন্তু দক্ষ সেনাবাহিনী নিয়ে সর্বশক্তিমানের ওপর ভরসা রেখে তাকে বার বার বিপদে ফেলা বৃদ্ধ যোদ্ধা, মীর জুমলাকে শিক্ষা দিতে এগোলেন।

দিনের তিন পহর পার হয়ে গেলেও সুজা যুদ্ধে টিকে রইলেন; তাকে সরানো সোজা হল না। সুজার বাহিনীর পিছনে গ্রাম এবং সামনে সারি দিয়ে কামান সজ্জা। মির্জা জান বেগ মীর জুমলার আক্রমণের সামনে পাহাড়ের মত দাঁড়িয়ে থেকে কামান থেকে ১০ থেকে ১৫ সেরের গোলা ছুঁড়ছিলেন। মীর জুমলার রণনীতি বিফলে যাওয়ার অবস্থা হল। তিনি এগোতেও পারছিলেন না, পিছোতেও পারছিলেন না। আলমগিরনামায় বলা হয়েছে মীর জুমলার বাহিনীর সেনাপতিরা পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন না। তারা নিজেদের মত করে বিচ্ছিন্নভাবে আক্রমন সাজাচ্ছিলেন। শাহী বাহিনীকে ছন্নছাড়ার মত দেখতে লাগছিল।

দুই পক্ষই রণক্লান্ত। মীর জুমলার ভাঁড়ারে গোলা শেষ। বিশাল বাহিনী নিয়ে খাঁড়ির মধ্যে আটকে পড়লেও অবাক হয়ে দেখলেন সুজা তার বাহিনীর ওপরে গোলা ছুঁড়ল না। সুজার ঐতিহাসিক মাসুম বলছেন, সুজা যদি মীর জুমলার বিরুদ্ধে আক্রমনটা জোরদার করতে পারতেন, তাহলে হয়ত মীর জুমলার বাহিনীকে হারিয়েও দিতে পারতেন। তবে মাসুমের যুক্তিটা সাজানো মনে হল — গলার জোর বেশি কনভিকশন কম। শেষ দুটি লড়ায়ে সুজা, একটিতে বাঁদিকের বাহিনীর ওপর ভর করে এবং গিরিয়ায় নিজের বাহিনীর পিছনের অংশ ব্যবহার করে সাফল্য পেয়েছিলেন। তার গোলান্দাজ বাহিনী খুব শক্তিশালী হলেও, এই যুদ্ধে মূল গোলান্দাজ মীর্জা জানের বিপুল কামান বাহিনীর তীব্র গোলান্দাজির ফলে সুজার গোলার ভাণ্ডার শুন্য হয়ে যায়। এই তথ্য মীর জুমলা জানতেন না। শাহী সেনাপতি শুধু জানতেন তাঁরও ভারার শূন্য। অন্য দিকে ভাণ্ডারে গোলার সুরক্ষা না নিয়ে সুজাও মীর জুমলার বিপুল বাহিনীর বিরুদ্ধে মুখোমুখি যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে চান নি। তাছাড়া গোলা শেষ হয়ে যাওয়ার পর, সম্মুখ যুদ্ধে না গিয়ে মীর জুমলা পরিকল্পিত ভাবে তাঁর আটকে পড়া বাহিনীকে উদ্ধারের কাজ করছিলেন ব্যক্তিগত তদারকিতে। বিপক্ষের গোলান্দাজি বন্ধ হলেও প্রতিআক্রমণের ঝুঁকি নেন নি। হয়ত তিনি বুঝতে পারেন নি সুজার বাহিনীর ভাঁড়ারে গোলা ফুরিয়েছে। মীর জুমলা জানতেন যুদ্ধের প্রথম দিকে সুজার গোলার প্রাবল্যে তাঁর বাহিনীর সেনাপতিরা হতোদ্যম। এই হতোদ্যম সেনাপতিদের নিয়ে মীর জুমলা রাতে বিপক্ষের দিকে এগোনোর সিদ্ধান্ত নিলেন না।

মাথায় রাখতে হবে মীর জুমলা পূর্ব পরিকল্পিত রণনীতি অনুযায়ী এগোতে পারছিলেন না, সময়ের পিছনে চলছিলেন তিনি। বর্ষার শেষে তিনি দাউদ খানকে নির্দেশ দিয়েছেন (দাউদ তখন মুঙ্গেরে) কোশি পেরিয়ে তাণ্ডার দিকে এগোতে। মীর জুমলা প্রত্যেকদিন আশা করছেন, দাউদ খানের বাহিনীর আসার খবর পেয়ে সুজা যুদ্ধ ছেড়ে শিবির বাঁচাতে কখন দৌড় লাগাবেন। তাছাড়া তিনি অধি আগ্রহে সম্রাটের পাঠানো দিলির খানের নেতৃত্বে গোলান্দাজ বাহিনীর আসার জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। তাই খালি হাতে লড়ে বাহিনীকে আর নষ্ট করতে চাইছিলেন না। তিনি সেনাদেরর সেই খাড়ি থেকে উদ্ধার করে তাড়াতাড়ি নালা পেরিয়ে মুর্শিদাবাদের দিকে চললেন।

মীর জুমলার বিশাল বাহিনী নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পিছিয়ে যাওয়ার আনন্দে আর নিজের বাহিনীর পিছনে দাউদ খানের আক্রমণের কথা বেমালুম ভুলে সুজা মীর জুমলাকে মুর্শিদাবাদ থেকে বিচ্ছিন্ন করার উদ্যম নিলেন। তিনি মুর্শিদাবাদের উত্তরে নসিপুর (নাসিরপুর) পেরিয়ে নদীর ওপর পারে মীর জুমলার রসদের রাস্তা বন্ধ করতে গোলা ছুঁড়তে শুরু করলেন। বেশ কিছু দিন দুপক্ষের গোলান্দাজির প্রতিযোগিতা চলল। ডিসেম্বরের ২৬ তারিখের রাতে সুজা ফেরি পার হওয়ার সময় খবর পেলেন কোশি পেরিয়ে তার সেনানায়ককে হারিয়ে বড় বাহিনী নিয়ে দাউদ খান দ্রুত তাণ্ডার দিকে এগোচ্ছেন। এবার স্থায়ীভাবে সুজার ভাগ্য বিপর্যয়ের সময় শুরু হল। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev