নবাব আল্লামি শেখ মহম্মদ সুলতানি গোলকুণ্ডা রাষ্ট্রের মীর জুমলার (সরকারি নাম জুমালাতুল মুলকি, পদটির মৌখিক প্রচলিত জনপ্রিয় নাম মীর জুমলা) মত গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব পালনের সঙ্গে পেশোয়া পদের দায় দায়িত্ব নির্বাহ করার কাজও চলালেন। কূটনৈতিক দায় পালনের যোগ্যতার সম্মান স্বরূপ পেশোয়া পদের জন্য তিনি নববর্ষে বিশেষ আংরাখা খেলাত উপহার পেলেন, পেলেন দুটি ইরাকি ঘোড়া আর তিনি যাতে সসম্মানে রাজ সন্নিধানে পালকিতে আসতে পারেন সেই সম্মানও তাঁকে দেওয়া হল (১৭ রজব ১০৪৫, ১৭ ডিসেম্বর, ১৬৩৫)। রাজত্বজুড়ে নির্দেশ ছড়িয়ে দিয়ে বলা হল, রাজ্যের সব ধরণের মামলা এখন থেকে তার দপ্তর সামলাবে।
সুলতান যে তাঁর ওপরে আস্থা পেশ করছেন, এই বিষয়টা দায়িত্ব পালনে তাঁকে আরও উদ্বুদ্ধ করে তুলল। নিজামুদ্দিন মহম্মদ লিখছেন, জনগনের জীবনের মান উন্নয়নে, চাষের বিকাশে এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে তিনি আরও উন্মুখ হয়ে উঠলেন।
নবাব আল্লামি ফাহামির হাতে প্রভূত সরকারি ক্ষমতা কেন্দ্রিভূত হওয়ায় তিনি নিজে রাজকাজে নিযুক্ত কর্মদক্ষ মানুষকে প্রশাসনের বিশেষ কাজে লাগাবার উদ্যোগী হলেন। অভিজ্ঞতা, দক্ষতা আর প্রজ্ঞা বিচার করে বহু শিল্লাদারকে মজলিস (পরামর্শ সভা) পদে, কাউকে মহাল পদে, কাউকে আবার আমিল বা হাকিম পদে উন্নীত করলেন। আগেই বলেছি আমাদের বীর, তখন মীর মহম্মদ, সর-ই-দফতরশাহী (সরকারী তথ্যাদার) দপ্তরে কাজ করতেন। তখনই তিনি হয়ে উঠেছেন সুলতানের অন্যতম প্রিয় শিল্লাদার। ১০৪৫/১৬৩৫-৩৬-এ তাঁকে মছলিপত্তনম হাবিলদার পদে নিয়োগ করা হল। ভারতবর্ষের ইতিহাসে প্রভাবের নিরিখে, সেই মুহূর্তে ভবিষ্যতের মীর জুমলার এটাই হয়ত গুরুত্বতম পদোন্নতি।
গোলকুণ্ডা রাজ্যের মূল বন্দর ছিল মছলিপত্তনম। পূর্ব উপকূলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্দর। বন্দরে প্রচুর কর্মী কাজ করত। দক্ষিণী চিন্টজ আর ক্যালিকো কাপড় রপ্তানিতে মছলিপত্তনম বন্দরের আন্তর্জাতিকস্তরে সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বজুড়ে। সে বহুবর্ণিল অসামান্য কাপড় হয় স্থানীয় তাঁতিরা তৈরি করত অথবা সেগুলি আসত সেন্ট টমাস অঞ্চল থেকে। ইন্ডিজের [দক্ষিণপূর্ব এশিয়া অঞ্চল] অন্যান্য অঞ্চলে পূর্বাঞ্চলে যত চিন্টজ বা ক্যালিকো তৈরি হত সেগুলির মধ্যে দক্ষিণের চিন্টজ আর ক্যালিকো ছিল সব থেকে মিহি এবং রংদার। সামগ্রিকভাবে ভারতবর্ষের পূর্ব উপকূল ছিল সূতি বস্ত্র উতপাদকেদের স্বর্গরাজ্য — সুতি পণ্য রপ্তানির মূল অঞ্চলই ছিল পূর্ব উপকূলের বঙ্গোপসাগর সন্নিহিত বন্দর। তো মছলিপত্তনম বন্দর হয়ে দক্ষিণী সূতি কাপড়ের নানান উৎপাদন ব্যান্টাম এবং মধ্য প্রাচ্য যেত; এছাড়াও এই এলাকার সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল সুরাট, বন্দর আব্বাসের (গমব্রুম) মত মধ্যপ্রাচ্যের বন্দর বা দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার নানান বন্দর, বিশেষ করে পেগুর। নিজামুদ্দিন আহমদ লিখেছেন, ‘জাহাজগুলি দক্ষিণের দেশে (জেরবাদ) এবং উত্তরের দেশে (বালাবাদ) যেত, আর যেত আরব এবং আজমের বন্দরের পানে। বছরভর এই বন্দরে বিপুল পরিমান জাহাজ আসত এবং বন্দর ছেড়ে যেত। এই বন্দরের বিশেষত্ব ছিল বছরজুড়ে আমদানি রপ্তানিতে জুড়ে থাকা’। পূর্ব বা পশ্চিম উপকূলের কোনও বন্দরই সারা বছর ক্রিয়াশীল থাকত না। থেভেনট (Thevenot) নিজামুদ্দিন আহমদের লেখা এই তথ্য সমর্থন করে বলছেন, ‘উপকূলটি অসাধারণ, প্রায় সব দিকের দেশ থেকে সহজে জাহাজ আসতেও পারে, বেরোতেও পারে। আমি সেখানে কোচিনি চিনা, সিয়াম, পেগু এবং পূর্বাঞ্চলের অনেক জাতির, অনেক দেশের মানুষ দেখেছি।’
এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণতম অন্তর্জাতিক বন্দরটির পরিচালন ব্যবস্থা খুব একটা ভাল মানের ছিল না। তবে বন্দর রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে সর্বক্ষণের হাবিলদার নিযুক্ত করেছিল কুতুব শাহী সাম্রাজ্য। দায়িত্বে থাকত সেই রাজ্যের (মুস্তাফানগর) প্রধান পদাধিকার সর সিমতো আর বন্দরের জন্য ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক শাহবন্দরও। কিন্তু বন্দর পরিচালনায় সর্বস্তরে দুর্ণীতি বন্দরের পতনের বার্তার ইঙ্গিত বয়ে নিয়ে আসছিল। বন্দর কর্মচারীরা রাজ্যের এবং তার পশ্চাদভূমির উতপাদকেদের আর্থিক উন্নতির বিষয়ে মাথা না ঘামিয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করতে বহু অনাবশ্যক, বেআইনি শুল্ক আদায় করত। ব্রিটিশ কুঠিয়ালদের তথ্য থেকে পরিষ্কার যে মছলিপত্তনমের মূল প্রশাসন পরিচালনা দুজন মূল আধিকারিক — মুল্লা মহম্মদ টাকি তাকরিশি (আলহজ্জ্ব ১০৩৭/১৬২৮) এবং তাঁর উত্তরাধিকারী মীর ফাসিউদ্দিন মহম্মদ তাকিরিশি (১৬২৮) হাবিলদারের ওপর ন্যস্ত ছিল। বণিকদের সঙ্গে কর্মকর্তাদের খারাপ ব্যবহারে বন্দর নিয়ে প্রভূত অভিযোগ জমা পড়ত গোলকুণ্ডা দরবারে। ব্রিটিশ কুঠিয়ালদের সঙ্গে বন্দর প্রশাসনের নিয়মিত খিটিমিটি লেগে ছিল। মীরপাসকে (মীর ফাসিউদ্দিন) লেখা চিঠিতে কুঠিয়ালরা জানাচ্ছে, বন্দর প্রশাসনের সঙ্গে তাদের বিবাদের কারণ হল পূর্বসূরী মামাটুকির (মহম্মদ টাকি) বেআইনি কাজকর্ম আর অহঙ্কারী, নাক উঁচু চরিত্র। আজও তাঁর পূর্বসূরী অনুসৃত বেআইনি নীতিগুলো নির্বিচারে ব্যবসায়ীদের ওপর প্রয়োগ করা হচ্ছে। ব্রিটিশেরা জানাল, এই দুরবস্থা যদি আর কেশিদিন চলতে থাকে, তাহলে তারা বাধ্য হয়ত মছলিপত্তনম থেকে কুঠি তুলে আরামগাঁওতে (চন্দ্রাগিরির নায়েকের প্রশাসনের অধীনে) কুঠি বানানোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে।
কয়েক বছর পরে (১৬৩০-৩২) এই জেলার প্রশাসক হয়ে এলেন মির্জা রোজবিহানী ইসপাহানি। ব্রিটিশ কুঠিয়ালদের নথিতে তিনি মীর্জা রসবাহান নামে তিনি পরিচিত। ব্রিটিশেরা তাকে বড় গভর্নর হিসেবে মানত; তিনিও ব্রিটিশ কোম্পানির অনাচারের বিরুদ্ধে মুখোমুখি টক্করে নামলেন। সামগ্রিকভাবে কাপড়ের রপ্তানি শুল্ক অনাদায়ে, বন্দর ব্যবহারের কর না দেওয়ায় ব্রিটিশদের পেটাপল্লি থেকে জাহাজে কাপড় তুলতে দেননি, জাহাজও ছাড়তে দেন নি। ফলে কুঠিয়াল পানারেকায় মছলিপত্তনম প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করে (২২ নভেম্বর ১৬৩০), তাকে যথাবিহিত সমঝোতায় আপোস এবং সস্তুষ্ট ক’রে মির্জা রোজবিহানকে দুটি ব্রড ক্লথ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জাহাজ ছাড়িয়ে নেন। যতদূর সম্ভব এই মানুষটি ছিলেন মছলিপত্তনম এলাকার হাবিলদার। বাটাভিয়ার ডচেদের দাগ রেজিস্টারে তাকে মছলিপত্তনমের প্রশাসক, গভর্নর হিসেবে দেখানো হয়েছে। ২৯ আগস্ট, ১৬৩২ সালে মছলিপত্তনম থেকে লেখা এক চিঠি থেকে জানতে পারি তিনি সেই এলাকার rendedare বা চাষী এবং গোলকুণ্ডার প্রশাসক (সরইখাহিল) ছিলেন।
যাইহোক, মছলিপত্তনম বন্দর হিসেবে এতই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে ব্রিটিশ কুঠিয়ালেরাও প্রতিবাদস্বরূপ কিছুদিনের জন্য (১৬২৮-৩০) বন্দর ছেড়ে চলে গেলেও ১৬৩০-এ ফিরে এসে গোলকুণ্ডার সুলতানের থেকে ১৬৩৪-এর ২৬ ফেব্রুয়ারি ব্যবসা করার ছাড়পত্রের নির্দেশপত্র স্বর্ণ-ফার্মান অধিকার করতে বাধ্য হয়। কুঠির তথ্যাবলী থেকে পরিষ্কার, ব্রিটিশ কুঠিয়ালদের পাওয়া এই ব্যবসায়িক ছাড়ে উদ্বিগ্ন বন্দর প্রশাসকদের মনে হল, রাজ্য প্রচুর অর্থ রাজস্ব হারাবে। তারা ডাচেদের সঙ্গী করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সুলতানের কাছে ফরমান অপব্যবহারের অভিযোগ আনে। ফলে সরইখাহিল (আবদুল্লা খাঁ মাজানদারানি) এবং দবির (মুল্লা ওয়ায়িস, মুন্সিউলমামালিক) গোলকুণ্ডার ব্রিটিশ কুঠিয়াল রজার্সএর থেকে বাতসরিক ছাড় দেওয়া শুল্কের পুরোটাই দাবি করে বসল।
বন্দরের স্বাভাবিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার এবং অন্যান্য কাজকর্ম তাঁর নির্দেশে চালানোর কাজে আমাদের নায়ক মীর মহম্মদ সফল হলেন। কিছু সময় পরে দেখা গেল তার প্রশাসনিক দক্ষতায় রাষ্ট্রের রোজগার বেড়েছে, বন্দনে অন্যান্য অভিচার কমছে। নিজামুদ্দিন আহমদ তাঁর চাকরির সময়ের নথি অবলম্বনে লিখছেন, হাবিলদার পদে মীর মহম্মদ প্রশাসনিক দক্ষতা এবং নিজস্বতা প্রমান করলেন। অর্জিত প্রশাসনিক দক্ষতা আর পুত চরিত্র তাকে প্রশাসনের সিঁড়িতে খুব তাড়াতাড়ি চড়তে সাহায্য করল। এক বছর হাবিলদারের পদে কাজ করার পর (১৬৩৭) তিনি তেলেঙ্গানার মুস্তাফানগরের (কোণ্ডাপল্লি)) একটি বিশাল দুর্গ মহলের হাবিলদার নিযুক্ত হলেন। সেখানেও তিনি নিজস্ব কর্মদক্ষতার ছাপ রাখলেন। দুর্গের প্রশাসন ঢেলে সাজালেন। বাড়তি সম্পদ আদায়ের ব্যবস্থা করলেন। তাঁর বক্তৃতা এবং কর্মদক্ষতা তাঁর আশেপাশে থাকা প্রত্যেক আমলার মন ছুঁয়ে যেত। তিনি সুলতানের স্বার্থের জন্য রোদেপুড়ে যে শ্রমের কাজ করতেন, যেটা তাঁর মত উচ্চপদের আমলাদের পক্ষে অস্বাভাবিক ছিল। মাঠে ঘাটে তুমুল পরিশ্রমে তাঁর উচ্চাসনে ওঠার পথ পাকা হল। মছলিপত্তনম আর মুস্তাফানগরের সফল হাবিলদারি তাঁকে পৌঁছে দিল সরইখাহিল পদে।
সরইখাহিল শব্দের আক্ষরিক অর্থ ঘোড়ার [আস্তাবলের] প্রধান। এই শব্দে অনেক সময় অশ্বারোহী দলের প্রধানও বোঝাত। কিন্তু সরইখাহিল পদের মূল দায়িত্বভার ছিল অনেকটা মীর জুমলা পদের অনুরূপ — সেনাবাহিনী অভিযানে যাওয়ার সময়কার প্রত্যেকটি খুঁটিনাটি দায় পূরণ করা ছাড়াও সরইখাহিলকে রাজ্য জোড়া রাজস্ব আদায় করতে হত, রাজ্যের বিপুল এলাকার ওপর নজরদারি চালাতে হত। পদের বর্ণনায় একটা বিষয় পরিষ্কার গোলকুণ্ডা রাজ্য প্রশাসনে সরইখাহিল দপ্তর খুবই গুরুত্বের বিভাগ ছিল, রাষ্ট্র প্রশাসনের ভাল বা খারাপ দিকে যাওয়া সরইখাহিল এবং তাঁর দপ্তরের কাজকর্মের গুণমানের ওপর অনেকটা নির্ভর করত। অদক্ষ ব্যক্তিত্বহীন মানুষ যদি সরইখাহিল আধিকারিক হত তাহলে মহলের অসামারিক আমলা আর রাজস্ব আদায়কারী ব্রাহ্মণেরা নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে সরকারি তহবিল তছরূপ আর আত্মসাত করার প্রবণতা বাড়াত, যার ফলে রাজস্ব আদায়ের ক্ষতি হত। তাই প্রধান রাজস্ব আধিকারিক হিসেবে তিনি পূর্ব উপকূলের ব্যবসায় নিজের দপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করলেন। দেওয়ান মীর জুমলা মনসুর খাঁ হাবসির মৃত্যুর পর মুল্লা মহম্মদ তাকি তাকরিশিকে বহু চাকরিপ্রার্থীদের থেকে বেছে নিয়ে সরইখাহিল (আসলে মীর জুমলা) পদে নিযুক্ত করা হয় ২৩ সফর ১০৩৮, ১২ অক্টোবর ১৬২৮এ। তিনি এই পদের দায়িত্ব এতই দক্ষ ভাবে পালন করেন যে মহালের দুর্নীতিপূর্ণ আধিকারিক এবং মাথায় চড়ে বসা ব্রাহ্মণেরা তাদের প্রশাসনিক বেআইনি কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলে; তহবিল তছরূপ এবং লুঠপাট প্রবণতা বন্ধ হয়ে যায়, রাজস্ব আদায় বাড়তে থাকে। জমিদার নারায়ণ রাওয়ের (মজমুদার) থেকে বকেয়া ১,৩০,০০০ হুন রাজস্ব আদায় করে খাজাঞ্চিখানায় জমা হয়। বেগড়বাঁই করা এবং রাজস্ব না দিয়ে বুক ফুলিয়ে ঘুরতে থাকা চৌধুরীদের হত্যা এবং তাঁদের সম্পত্তি রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয়। সুলতান, মহম্মদ টাকিকে সারিফুলমুলক উপাধিতে ভূষিত করে তাকে সোনার জলে কারুকার্য করা কলমদানি উপহার দেন। তিনি এই উপহার মির্জা মহম্মদ আমিন মীর জুমলা ছাড়া অন্য কোনও অধিকারিককে উপহার দেন নি।
এই পদের বিশদ বর্ণনা দিলাম কারন সরইখাহিল আর মীর জুমলা এই দুটি পদ এর পর থেকে একজনই (মহম্মদ টাকি) সামলাবেন এবং দেওয়ানির অন্যতম মূল কাজ, রাজস্ব আদায়, এই দুই পদাধিকারিকের ওপর ন্যস্ত হবে।
নিরবিচ্ছিন্ন দুবছর সাত মাস কাজ করে, শাওয়াল ১৯, ১০৪০, ১১ মে ১৬৩১ তে সরফ-ই-মুলক, সরইখাহিল এবং সদর মহম্মদ টাকি তাকরিশির এন্তেকাল ঘটে। পরের ছয় বছর ক্ষমতায় থাকা মানুষেরা দপ্তরটি নিয়ে নানান পরীক্ষা নিরীক্ষা করবেন। তাঁরা একের পর এক ক্ষণস্থায়ী, অস্থায়ী পদাধিকারী বসিয়ে দপ্তরটি চালানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু টাকি যে উচ্চতায় দপ্তরটিকে পৌঁছে দিয়ে যান, সেই দক্ষতার রেশ ধরে রাখা সম্ভব হয় না। দপ্তরের আমলারা ক্রমশঃ কাজে উৎসাহ হারিয়ে ফেলতে থাকে। পেশোয়া পদের অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়ে, নবাব আল্লামি ফাহিমি শেখ মহম্মদ ইবন খাতুন দেওয়ান পদ দেখাশোনা করতেন। এই পদের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর তিনি তাঁর সাবেক দেওয়ান দপ্তরের কাজকর্ম দেখাশোনা করতে দেন মীর কাশিম নাজিরউলমুলক, মীর মুইজ্জুদ্দিন মহম্মদ মুশারফ এবং নারায়ণ রাও মজমুদার এবং অন্যান্য আধিকারিককে — এদের কাজ ছিল যথাক্রমে রাজকীয় রসুইখানা, হাতিশাল, ঘোড়াশালের ব্যবস্থাপনা করা।
প্রশাসনিক অচলাবস্থা চলতে থাকার দরুন খাদ্যশস্যের দাম হঠাতই বেড়ে যায়। আগাপাছতলা দুর্নীতি রমরমার ফলে বাড়তে থাকা প্রশাসনিক খরচে নাজেহাল দেওয়ানির দৈনন্দিন কাজকর্ম ঢিলে পড়ে, বহু কাজ, প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়। বিভিন্ন মহাল থেকে অভিযোগের পর অভিযোগ আসতে থাকে সুলতানের কাছে। বাস্তবিকভাবে এই অস্থায়ী পদাধিকারিরা ঠিক মত কাজ করে নি। ২৪ জিলহিজ্বা ১০৪৯, ১৪ জুলাই ১৬৩১ মীর্জা আস্তরাবাদী, সরইখাহিল পদে নিযুক্ত হলেন। মীর্জা বিশ্বস্ত এবং সৎ হলেও, হিসেব রাখা এবং প্রশাসনিক কাজে অনভিজ্ঞতার দরুণ তাঁর পদের প্রতি সুবিচার করতে পারেন নি। এই সুযোগে ব্রাহ্মণেরা মাথায় চড়ে বসে। বাউতাতে প্রাসাদ আর মহালগুলি থেকে এতই অভিযোগ আসতে থাকে যে সুলতান বাধ্য হয়ে নিজেই কারখানার কাজকর্ম দেখতে শুরু করেন। নবাব আল্লামির পরামর্শে মীর্জা রোজবিহানী ইসপাহানিকে ৩ রাবিউসসানি ১০৪১, ১৯ অক্টোবর ১৬৩১ সালে এই পদে নিযুক্ত করেন সুলতান। সৎ সত্যবাদী কর্মঠ হওয়া সত্ত্বেও তাঁর কাজ সুলতানের পছন্দ হল না। তাকে বরখাস্ত করে সুলতানের প্রধান নৃত্য সহায়ক মীর ফাসিউদ্দিন তাকরিশি সোনার কারুকার্য করা কলমদানি উপহার দিয়ে এই পদে বহাল হন। কিন্তু তারও চাকরি বেশি দিন রইল না, শেষমেশ সুলতান নবাব আল্লামিকে মীর জুমলা পদে নিয়োগ করেন ৯ শাওয়াল ১০৪৩, ২৯ মার্চ ১৬৩৪-এ। আগেই বলেছি তাঁর সঙ্গে ভাইপো মহম্মদ তাহির সরইখাহিল হিসেবে তাঁর সহকারীর পদে নিযুক্ত হন। মীর জুমলা পদ সামলানো ছাড়াও নবাব আল্লামি পেশোয়া পদের খেলাত পেলে (১৭ রজব ১০৪৫, ১৭ ডিসেম্বর ১৬৩৫), সরইখাহিল তিন মাসের জন্য খালি পড়ে থাকে। নবাব আল্লামির পরামর্শে, কাশিমকোট এবং কলংএর সরইলস্কর আবদুল্লা খান মাজানদারানি সরইখাহিল পদে নিযুক্ত হলেন ১৯ শাওয়াল ১০৪৫, ১৭ মার্চ ১৬৩৬। আমরা দেখলাম ১৬৩১এর পর থেকে কিছু দিন অন্তর এই গুরুত্বপূর্ণ পদে আধিকারিক বদল হয়েছে এবং সেই পরীক্ষা নিরীক্ষা সফল হয় নি, একের পর এক সরইখাহিল পদে আধিকারিক পরিবর্তিত হতে থাকবে যতক্ষণনা আমাদের বীর মীর মহম্মদ এই পদের আধিকারিক হিসেবে মনোনীত হচ্ছেন।
১০৪৭ হিজরাব্দের মহরমের শুরুতে এক রাজকীয় আদেশ (ফরমান) বলে মীর মহম্মদকে দরবারে ডেকে পাঠিয়ে তাঁকে ৭ সফর ২১ জুন ১৬৩৭-এ রাজধানীর দরবারে এক উজ্জ্বল রাজকীয় অনুষ্ঠানে ভাল জাতের হাতি, ইওরোপিয় ও চিনা কাপড় উপহার দিয়ে সম্মান জানানো হয়। সুলতান তাঁকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করে ‘জ্ঞানী আর দক্ষতার সংমিশ্রণ’ রূপে অভিহিত করলেন। সফর ৯-এর রাতে ২৩ জুন ১৬৩৭ সালে সৈয়দ আবদুল্লা খাঁ মাজানদারানির উত্তরসূরীরূপে পুরোনো মহালকে উকিলদের হাতে ছেড়ে মীর মহম্মদ নতুন পদে অভিষিক্ত হলেন। (চলবে)