৩। গোলকুণ্ডার উজির মীর মহম্মদ
ঐতিহাসিক নিজামুদ্দিন আহমদ, মীর মহম্মদকে আসাফ জাহি (আসফের মত জ্ঞানী), আসফ মঞ্জিলাত, আসফ মরতাবাত-এর মত উদ্দেশ্যপূর্ণ গুণবাচক বিশেষনে ভূষিত করে বলছেন, ‘সুগভীর জ্ঞানে, প্রাণঢালা সেবায় সুলতানি প্রশাসনের বিভিন্ন কাজকর্ম এবং ধার্মিক দায়িত্ব যথাযোগ্যভাবে পালন করতে থাকায় সুলতান, রাজত্বের সমৃদ্ধির বিষয়টি নিজেই অনুভব করতে পারছিলেন। প্রশাসনিক নানান কাজ যথাযোগ্য দক্ষতায় সম্পাদন করায় মীর মহম্মদের ক্রমশ সুলতানের কাছাকাছি আসার সৌভাগ্য হল। ভাগ্য আর জ্ঞানের বলে তিনি শীঘ্র প্রশাসনিক সংক্রান্ত ব্যবস্থার (অম্র হুকুমত) চরমতম দক্ষ ক্ষমতাশালী পণ্ডিতে (ইস্তাকাল) পরিণত হবেন। পরিকল্পিতভাবে জোর করে মথ্যা অর্থ আদায়কারীদের (আরবাব-ই-দাখিল) রোজগারের রাস্তা বন্ধ করলেন। অধস্তন কর্মী (উম্মাল) আর ব্রাহ্মণ করণিকদের থেকে বিপুল পরিমান অনৈতিক রোজগার করা অর্থ উদ্ধার করে সুলতানের কোষাগারে জমা করলেন’। সুলতান তাঁর দক্ষ কাজে সন্তষ্ট হয়ে তাকে রত্ন খচিত কলমদানি (কলমদানি-ই-মুরাসসা) উপহার দিলেন। সঙ্গে জায়গির হিসেবে দিলেন বছরে ৩০,০০০ হুন রাজস্ব বিশিষ্ট একটি পরগণাও, যাতে তিনি বেশ কিছু আরবি সৈন্য রাখতে পারেন। সম্রাটের পৃষ্ঠপোষণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি ১০০ আরবি এবং ইসপাহানি সৈন্য নিয়োগ করলেন সুলতানের শিল্লাদার হিসেবে। সম্মানজনকভাবে মাতা-সাম্রাজ্ঞীর বেশ কিছু কাজ দক্ষ হাতে সম্পাদন করায়, রাজ-মাতাও তাঁকে প্রচুর উপহার দেন, যার মধ্যে ছিল কোমরবন্ধ, রত্নখচিত তরোয়াল (শামশির-ই-মুরাসসা), ঘোড়া আর হাতি। গোলকুণ্ডার ক্ষমতাশালীরা এখন তাঁর বশীভূত।
তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা প্রদর্শনে, তিনি আরও কিছু অতরিক্ত রাজকীয় দায়িত্ব পাবেন। এই দায়িত্ব সম্পাদনে তাঁর অতুলনীয় সাংগঠনিক ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যায়। জেনানা-মহলের জন্য সুলতানের মাতা-সাম্রাজ্ঞীর রাজধানীর একটিও প্রাসাদ পছন্দ হচ্ছিল না। তিনি কর্মদক্ষ আমলা মীর মহম্মদের ওপর দায়িত্ব দিলেন মাত্র একবছরেরও কম সময়ের মধ্যে (রবিউলআওয়াল ১০৪৮, জুলাই ১৬৩৮-এর মধ্যেই) চার তলা প্রাসাদ, হায়াত মঞ্জিল বানিয়ে দেওয়ার জন্যে। সেই দায়িত্ব পাওয়ার পর, প্রাসাদের জন্যে একটি বিশেষ জায়গা বাছাই করে প্রাসাদ পরিকল্পনার দায়িত্বপ্রাপ্ত হাবিলদার মালিক আলমাসের তত্ত্বাবধানে প্রাসাদটির স্থাপত্য পরিকল্পনা করলেন। মীরের স্থাপত্য পরিকল্পনাটি সুলতান কিছুটা সংস্কার করে দিলেন – চার তলার চারদিকে চারটি বিশাল জানালাওয়ালা উঁচু মিনার জোড়া হল। প্রাসাদের সাজসজ্জা নিখুঁত এবং বিশদে রূপায়িত করতে মীর মহম্মদ রাজ্যের এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রচুর জ্যামিতিবিদ এবং কারিগর নিযুক্ত করে নিজে সারাদিন প্রায় অভুক্ত থেকে স্থপতি এবং কারিগরদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে কাজ সম্পন্ন করে প্রাসাদটি বরাদ্দ করা সময়ের বহু আগে রাজ-মাতাকে উপহার দিলেন। ওপরের তলায় ছাদের চার মিনারের মাঝখানে চাঁদনি (পোর্টিকো), দেহলি (টেরেস), বসার যায়গার সঙ্গে একটি গরম সময়ের ঘর আর একটা গোসলখানা তৈরি করান; সুলতানের নির্দেশে দেওয়ালে বিশেষ আঙ্গিকের শিল্পকলার সাজসজ্জাকে বাস্তবে রূপায়িত করার ব্যবস্থা করেন। ঘরের দেওয়ালে ইরাণ আর হিন্দোস্তানের শিল্পীদের দিয়ে আঁকানো হয় দরবার, শিকার এবং যুদ্ধের রঙ্গিন চিত্রাবলী। প্রাসাদ তৈরি আর সজ্জার সামগ্রিক কাজটি মীর জুমলার নেতৃত্বে এমনই চরমতম সুদক্ষতায়, অসামান্য পেশাদারি উদ্যমে সম্পাদন করা হল, নিজামুদ্দিন নতুন রাজপ্রাসাদকে এরম বা ইডেনের সঙ্গে তুলনা করলেন।
বিষ্ময়করভাবে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই বরাত দেওয়া প্রাসাদ মাথা তুলে দাঁড়াল। রাজধানীর প্রখ্যাতরা বিমোহিত। প্রত্যেকেই তাঁর দক্ষতার স্ফুরণ এবং প্রাসাদের রূপে বিমুগ্ধ। রবিউলআওয়ালের শেষের দিকে (১ আগস্ট, ১৬৩৮) প্রাসাদ উদ্বোধনের দিন ঠিক হল। এই দিন তাঁর প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় তৈরি প্রাসাদ সর্বসমক্ষে উপস্থিত করানো হবে। প্রাসাদ উদ্বোধনে আসবেন উজির, আমীর, এবং অন্যান্য দরবারি অভিজাত আর সুলতানি রাজত্বের উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরা। মীর মহম্মদের অবাক করা কাজে মুগ্ধ মাতা-রাজ্ঞী। তিনি নির্দেশ জারি করলেন — নতুন বর্ণাঢ্য, সম্পদশালী প্রাসাদের উদ্বোধন অনুষ্ঠানের সমস্ত ছোট ছোট খুঁটিনাটি পরিকল্পনা প্রশাসনের কর্মচারীর সঙ্গে মিলে তৈরি এবং রূপায়িত করতে হবে মীর মহম্মদকে। মীর মহম্মদ কঠিন দায়িত্ব নিতে আগেও পিছপা হন নি, এবারেও হলেন না। তাঁর ওপরে চাপিয়ে দেওয়া গুরুদায়িত্বগুলোকে তিনি সর্বশক্তিমানের আশীর্বাদ হিসেবে গণ্য করলেন। প্রত্যেকটি সুচারুরূপে সুসম্পন্ন করায় বোঝাগেল তিনি বড় মঞ্চে, বড় প্রকল্প পরিকল্পনা এবং রূপায়নের কাজে স্বচ্ছন্দ বোধ করছেন এবং নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তুলছেন।
প্রাসাদের সামনের বিশাল মাঠটি পরিষ্কার করে আরশির মত চকচকে করে ফেলা হল। সরনৌবত (সেনা বাহিনী না নহবত?) তাঁদের ক্ষমতা দেখাতে এল। মাতা-রাজ্ঞীর বিশেষ দূতের হাতে পাঠানো সোনার শিকলি আর ঝালর দিয়ে প্রাসাদের দিকে যাওয়ার ১,০০০ গজ দীর্ঘ পথ অতুলনীয় আড়ম্বরে সাজিয়ে ফেললেন তিনি। মঞ্চে আসার রাস্তায় ভেলভেটের গালিচা পাতলেন। বড় বড় ৮টা তোরণ দিয়ে রাস্তাটা মুড়ে দেওয়া হল। গরীবদের বিতরণের জন্য বিপুল পরিমাণ খাদ্য তৈরি হল, সে খাওয়ার তিন দিনেও সে খাদ্য শেষ করা গেল না। অতিথিদের অভ্যর্থনার জন্য রাস্তায় সার দিয়ে দাঁড় করানো হল সুসজ্জিত হাতি, ঘোড়া, উট আর দাস-দাসী। হাতে রত্ন খচিত সোনার বারকোষে (ট্রে) বহুমূল্য রত্নরাজি, মিহি কাপড় ইত্যাদি নিয়ে রাস্তা জুড়ে ১২টি হারেমের আহুদাদার আর মালিকেরা দাঁড়ানোয় সমগ্র উদ্বোধন অনুষ্ঠানের জাঁকজমক আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। রত্ন খচিত এই অনুষ্ঠানে সাম্রাজ্য-প্রধান সুলতান তাঁর রাজনৈতিক বিশালত্ব অবলম্বন করে আরবি ঘোড়া থেকে নেমে এক একটি তোরণ পার হচ্ছেন, আর তাকে প্রত্যেকটি তোরণেই আলাদা আলাদাভাবে অভ্যর্থনা, সম্বর্ধনা জানানো হচ্ছে মীর মহম্মদের পরিকল্পনায়। অনুষ্ঠান এলাকায় পৌঁছে সুলতান সিঁড়ি চড়ে সব থেকে উঁচু আসনে বসলেন। উচ্চপদস্থ আমলারা তাঁকে নানান ধরণের পেশকাশ দিলেন, তিনি সেগুলো গ্রহণ করে তাঁদের স্বাগত এবং ধন্যবাদ জানালেন। মাতা-রাজ্ঞী সুলতানকে তিনি একটি সোনার ঝালর এবং সোনার শিকলিতে মোড়া একটি হাতি, দুটি ঘোড়া, ইরাকী রত্নখচিত শৃঙ্খল, ইওরোপের ভেলভেট এবং আরও নানান উপহারে ভরিয়ে দিলেন। তাঁর পক্ষ থেকে বিশেষ উপহার হিসেবে দেওয়া হল পাড়ে সোনালী রেশমের সুতোয় সেলাই করা, জমিনে সোনার সুতোর সূচিকাজ করা আর সোনায় মোড়া চৌদ্দটি মিহি কাপড়।
বিপুল সম্পদের অধিকারী মীর মহম্মদ সৈয়দ সোনা দিয়ে অসাধারণ সূক্ষ্ম কারুকাজ করা অন্যান্য আনুষঙ্গিক উপকরণে সজ্জিত ১২ মন ওজনের সোনার পালঙ্ক উপহার দিলেন। এছাড়াও তিনি তার পক্ষ থেকে দিলেন সোনার গোলক, সোনার তৈজসপত্র, সোনার পাত্র, মিহি বস্ত্র এবং সুলতানী অহং মেটানোর মত অন্যান্য উপহার। মীর মহম্মদের দক্ষতাপূর্ণ সেবায় খুশি হয়ে মাতা-সাম্রাজ্ঞী তাকে উপহার দিলেন সোনার শৃঙ্খলে মোড়া একটি ঘোড়া, একটি হাতি, একটি কোমর বন্ধনী, এবং একটি রত্নখচিত তরোয়াল।
দক্ষ হাতে রাজ্ঞী-মাতার প্রাসাদ তৈরি করে সুলতানি রাজ্যে তিনি রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন। এর পাশাপাশি আরও কিছু ঘটনা মীর মহম্মদকে ভবিষ্যতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের দিকে তাড়াতাড়ি এগিয়ে দেবে। যারা তাঁর কাজের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের বিরোধিতা চূর্ণ করে আরও গর্বিত দর্পে তিনি এগিয়ে চলবেন। স্বার্থবাহী আমলাদের স্বার্থান্ধ বিরোধিতা তাঁর জীবনে আশীর্বাদ বয়ে আনল। মীর মহম্মদের নিজের জ্ঞান, দক্ষতা, প্রজ্ঞা প্রচার হতে থাকায়, দবির এবং মুনসি-ও-উলমামালুক পদের অধিকারী মুল্লা ওয়ায়েজের তীব্র ঈর্ষায় জ্বলেপুড়ে মরলেন। সুলতানের অভয় হাত মাথায় থাকার সুযোগ নিয়ে সমস্ত শোভন এবং বাস্তব বিচারবুদ্ধি নাশ করে সর-ই-খাহিল দপ্তরের কাজকর্মে দাখিলা দেওয়া শুরু করলেন তিনি। এমন কী পেশোয়া দপ্তরে নির্বিচারে দখলদারি এবং সব কয়জন মনসবদারের সঙ্গে তাঁর দপ্তরের অধস্তন কর্মচারীদের মত ব্যবহার করতে লাগলেন এবং সেটা মাত্রা ছাড়া হয়েগেল। তাঁর এই বেয়াদপি দেখে, বুঝেও সুলতান নানা কারণে, বহু বাধ্যবাধকতায় তাকে নিবৃত্ত করতে পারলেন না। সর-ই-খাহিল দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক মীর মহম্মদও সুলতানের অতিশয় প্রিয়পাত্র ছিলেন। তাঁর ওপরে ভার দেওয়া নানা অসামরিক এবং দেওয়ানির রাজস্ব আদায় সংক্রান্ত দায়িত্ব নিজস্ব যোগ্যতায় পালন করে মহামহিমের কৃপাপাত্র হয়েছেন। তিনি দক্ষ মানুষ। তাঁর নিজের ওপর অস্বাভাবিক আস্থা। স্বাভাবিকভাবে তাঁর দপ্তরে অযাচিতভাবে মুল্লা ওয়ায়েজ মাথা গলানো পছন্দ করলেন না। তিনি মুল্লা ওয়ায়েজের অনৈতিক দখলদারির তীব্র প্রতিবাদ করলেন সম্রাটের সামনে। মুল্লা ওয়ায়েজরা তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলল, তিনি ব্যক্তিগতভাবে সুলতানের প্রতি এবং সুলতানি প্রশাসনের প্রতি দায়বদ্ধ নন। এমন অভিয়োগ দৃঢভাবে খণ্ডণ করে মীর মহম্মদ সুলতানকে কড়া চিঠি লিখলেন। এরপর থেকে মীর সুলতানের নিরাপত্তা বেষ্টনীতে প্রবেশ করবেন। বহু চেষ্টাতেও মীরের ক্ষমতার ডানা ছাঁটতে না পেরে, সুলতানের ওপর পরোক্ষে চাপ তৈরি করতে চরম ক্ষিপ্ত মুল্লা ওয়ায়েজ দীর্ঘ ছুটির আবেদন সুলতানের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। এটা চিঠি বোমা দিয়ে মুল্লা ওয়ায়েজ নিজের কফিনে শেষ পেরেক পুঁতলেন। তাঁর সুলতানি প্রশাসন থেকে বিসর্জন নিশ্চিত হয়ে গেল। প্রতিবাদ পত্র পেয়ে সুলতান তেলেবেগুণে জ্বলে উঠে রবিউল্লাওয়ালএ (জুলাই ১৬৩৮) মুল্লাকে পদচ্যুত করিয়ে তাঁর বাড়িতেই নজরবন্দী করে রাখার নির্দেশ জারি করলেন। বেশ কিছু দিন উজির দপ্তরে টালমাটাল চলল। প্রশাসনের টালমাটাল অবস্থার কিছুটা সদর্থক প্রভাব পড়ল মীর মহম্মদের কাজকর্মে। মীরের ১০০ সেনার খরচ চালাতে বলা হল মুল্লার প্রাক্তন জায়গিরের রাজস্ব ব্যবহার করে। মুল্লার, দবির দপ্তরটি ২৬ শাওয়ালে, ২০ ফেব্রুয়ারি ১৬৩৯-তে মির্জা টাকি নিশাপুরির দায়িত্বে দেওয়া হয়। ওয়াইস খানের ছেড়ে যাওয়া উজিরাত পদটিকে কাশমকোটা থেকে ডাকিয়ে এনে মির্জা রুস্তমকে দেওয়া হল। বরখাস্তের পরে মুল্লার বাহিনী মালিক অম্বরের দায়িত্বে ছিল, সেটি মীর মহম্মদের বাহিনীর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হল। মালিক অম্বর, মীর মহম্মদকে বর্ণনা করলেন ‘আধুনিক যুগের আসফ’ রূপে।
ক্রমশ মীর্জা মীরের পরিচিতি এবং ক্ষমতার বিস্তৃতি ঘটতে লাগল। দাদমহলের ময়দানে ইরাকি সেনার রণনৈপুণ্য, সুসজ্জিত শিক্ষিত হাতি এবং ঘোড়ার কুচকাওয়াজ দেখিয়ে তিনি কোমর বন্ধনী উপহার পেলেন এবং ‘সর-ই-খাহিল-এর মত উচ্চপদের সঙ্গে উজিরাতের দায়িত্ব’ও লাভ করলেন। রাজধানীতে উজির পদাধিকারীর বাধ্যতামূলক দায়িত্ব ছিল, রাজধানীতে উপস্থিত থাকলে সপ্তাহে একদিন সারা রাত এবং পরের দিন সক্কালে নদীর ওপারের (রুদ খানা) নদী মহলের মাঠে সৈন্য, হাতি, ঘোড়ার কুচকাওয়াজ দেখবেন। এই কুচকাওয়াজের পর সেই বাহিনী যাবে দাদমহলের ময়দানে সুলতানের নজরদারির উদ্দেশ্যে। সাধারণত রাজত্বে ১২ জন উজির বা মন্ত্রী থাকেন। এদের মধ্যে এক থেকে তিনজন উজিরের একসঙ্গে বসে সারারাত সৈন্যের কুচকাওয়াজ দেখা বাধ্যতামূলক।
৪। কুতুব শাহের মছলিপত্তনম যাত্রা
মীর মহম্মদের অর্জিত দক্ষতা, মানুষকে যথাযোগ্যভাবে সংগঠিত করার করার প্রজ্ঞা, বর্তমান সময়ের কোনও ঘটনা দূরের সময়ে কী প্রভাব ফেলবে, সেটা বোঝার দূরদর্শিতা সুলতানকে আনন্দ দিচ্ছিল। তিনি মীর মহম্মদকে আরও বেশি দায়িত্ব দিয়ে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা পরীক্ষা করতে চাইলেন। ইতিমধ্যে সুলতান রাজধানী থেকে মছলিপত্তনমের (বন্দর-ই-মুবারক) দিকে যাত্রার (২৯ অক্টোবর থেকে ২৭ ডিসেম্বর ১৬৩৯) পরিকল্পনা রূপায়িত করার কথা ভাবলেন এবং যাত্রা পথের সমস্ত ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি সমাধানের জন্যে আমাদের নায়ককে দায়িত্ব দিয়ে, দায়িত্বপ্রাপ্ত আস্থার অধস্তন, মীর মহম্মদের দক্ষতাগুলোকে নতুন করে নিজের চোখে লক্ষ্য করলেন।
উপকূলের দিকে যাত্রা করবেন এই সদিচ্ছায় সুলতান জনাব আসফদৌরান, মীর মহম্মদকে নির্দেশ দিলেন যাত্রার জন্য যত কিছু প্রয়োজন, সব কিছুই সুলতানি কারখানা থেকে সংগ্রহ করতে। তাঁর নির্দেশমত পথে এবং ছাউনিতে অত্যাবশ্যকীয় রসদপত্র জোগাড় করে মজুদ রাখার বিষয়েও পরিকল্পনা করা শুরু করলেন মীর মহম্মদ। তাছাড়া যাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ঝামেলাও মেটানোর কাজ করবেন মীর মহম্মদ, সে নির্দেশও জারি করা হল। সুলতানের বন্দরের দিকে যাত্রা করার জন্য রাস্তা তৈরি করা, জঙ্গল কাটা, যাত্রাপথের মধ্যবর্তী চৌদ্দটি স্থানে বিশাল বাহিনীর জন্যে শিবির ফেলার কাজ করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন তিনি। মহল আর বাউতাতের (বাড়ির) সুবিধের জন্য, তিনি সমগ্র বিষয়টি মানসিকভাবে ছকে নিয়ে ছোট বড় সব ধরণের ঝমেলা মিটিয়ে ফেললেন রাজধানীতে বসেই। সুলতান সর-ই-খাহিলকে নির্দেশ দিলেন, তিনি যেন রাজপথের মহালদের নির্দেশ দেন, যাত্রা কালে রাজধানী থেকে মছলিপত্তনম পর্যন্ত রাস্তায় পর্যাপ্ত খাবার এবং বিচালি যোগাড় ও সঞ্চয় করা থাকে। ঠিক হল সোনার সিংহাসনে আসীন হয়ে বন্দরের দিকে যাত্রা করা সুলতানের সঙ্গী হবেন তাঁর মা, রাজকীয় মহিলারা, পেশোয়া, উজির, পরামর্শদাতা এবং অভিজাত, ইরাণ এবং ভারতবর্ষের নানান এলাকার রাজদূত (হাজিব)। থাকবে সেনাবাহিনীর পদাতিক, গোলান্দাজ, ঘোড়সওয়ার, হাতিসওয়াররাও, যারা সুলতানের রাজকীয় গরিমা প্রকাশে সহায়ক হবে, আর উপকূলের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া সুলতানের নিরাপত্তা বিধানও করবে। যাত্রার আগে মীর মহম্মদকে যে কাজগুলো সমাধান করতে হয়েছে তার একটামাত্র উল্লেখ করা থাক – তাঁর হাতে ফরমান পাঠিয়ে রাজধানী ছেড়ে চলে যাওয়া ইরাণের রাজদূত ইমাম কুলি বেগকে রাস্তা থেকেই রাজধানীতে ফিরিয়ে আনতে নির্দেশ দেওয়া হল। তিনি সে কাজটা অসদামান্য যোগ্যতায় সমাধা করলেন। বিপুলাকায় বাহিনীর উপকূল উদ্দেশ্যে যাত্রার দুটি লুকোনো উদ্দেশ্য ছিল, প্রথমত বাগী হয়ে উঠতে থাকা জমিদারদের সুলতানের ক্ষমতা সম্বন্ধে সচেতন করানো, দ্বিতীয়ত বিদেশি ব্যবসায়ীদের যতটা পারা যায় সমঝে দেওয়া।
সুলতানের নির্দেশমত মীর মহম্মদের সমস্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ইরাণি জ্যোতির্বিদ জানালেন ১২ রজম মঙ্গলবার, ২৯ অক্টোবর ১৬৩৯ দিনটি যাত্রার জন্যে শুভ। এই ঘটনার সময় হায়াতাবাদে (হায়াতনগর, ১-৯ নভেম্বর) উপস্থিত থাকা ঐতিহাসিক নিজামুদ্দিন আহমদ শিরাজি, মীর মহম্মদের সংগঠনের দক্ষতা সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষণ করেছেন। তিনি বলছেন সামরিক, অসামরিক মানুষ নিয়ে কাফেলায় যাত্রা করা ৫,০০০-এর ওপরে মানুষ তাঁদের চাহিদামত খাদ্য, পণ্য এবং প্রয়োজনীয় সেবা পেয়েছেন — এবং এ সবই হয়েছে আসফজাইর সাংগঠনিক প্রতিভায়। মুনাগালা কসবায় (১৫ নভেম্বর) পৌঁছলে, সেই অঞ্চলের হাবিলদার সৈয়দ মীর রুস্তম বিপুল সুলতানি বাহিনীর খোরাক পৌছে দিয়েছেন নবাব আল্লামি, মীর মহম্মদ আর হাকিমুল মুলকের জিম্মায়। পরের দিন নবাব মুনাগালা থেকে পাহাড়ি কেল্লা অনন্তগিরিতে পৌঁছন। বাহিনীর নিরাপত্তা বিধানের জন্যে মীর মহম্মদ, হাকিমুল মুলক এবং অন্যান্য সেনানায়ক নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় উঠলেন।
মুস্তাফানগর (কোণ্ডাপল্লি, ১৯ নভেম্বর) মীরের নিজের তালুক। সেখানে তিনি সুলতানি কাফেলাকে অনির্বচনীয় সেবা এবং অন্যান্য সুখ দিয়েছেন অপরিযাপ্ত। পরের দিন পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত প্রাসাদটি সত্যিই সুলতানের পক্ষে বাসযোগ্য অবস্থায় আছে কি না, মীর সরজমিনে সমীক্ষা করতে গেলেন। যাওয়ার আগে নবাব আল্লামি আর হাকিম-উল-মুলককে নির্দেশ দিলেন সুলতান সত্যিই নিরাপদে পাহাড়ে উঠতে পারলে, পাহাড় থেকে নিরাপদে নামতে পারবেন কী না, সেটা বুঝে নেওয়ার জন্যে। মীর মহম্মদ পাহাড়ের চূড়ায় সুলতানের সম্মানে বিপুল জাঁকজমকওয়ালা জলসার ব্যবস্থা করলেন। ২১ তারিখ সন্ধ্যেয় সুলতান মহিলাদের নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় দুর্গে পৌঁছলেন। তিনি অন্তরঙ্গ সভাসদ আর ঘনিষ্ঠতম অমাত্যদের (মাকারবান-ই-আজম) নিয়ে ঘুরে ঘুরে কেল্লা দেখলেন। নিজের নিরাপত্তা বিধানের জন্য সুলতান নির্দেশ দিলেন হাজারো বন্দুকচি, নাইকওয়ার এবং কোতোয়াল তৈরি রাখার; পাহাড় প্রমান খাদ্য তৈরি রাখার; তোপখানার রসদ নতুন করে সারাই করার; সব শেষে বললেন রাতের বেলায় খাসাইখাইলের ফৌজ, ক্রীতদাস এবং নাইকরেরা বন্দুকবাজদের সঙ্গে শ্বাপদ সঙ্কুল জঙ্গলের আশেপাশে জেগে থাকুক, যাতে যে কোনও রকম অবাঞ্ছিত উতপাত ঠেকানো যায়। ঠিক হল সুলতানের সঙ্গী হয়ে আসা আমীরেরাও রাত পাহারা দেবে। মীর মহম্মদ সৈয়দকে সারা দিন রাত তৎপর থেকে সুলতানের চাহিদার দিকে নজর রাখতে হয়েছে। (চলবে)