৪। কুতুব শাহের মছলিপত্তনম যাত্রা
বেজোয়াদার (২২ নভেম্বর) তিনটি ইওরোপিয় কোম্পানি — ব্রিটিশ, ডাচ এবং ডেন দেশের কুঠিয়ালেরা তাঁদের অনুচর নিয়ে মছলিপত্তনম থেকে উপস্থিত হলেন। তারা সুলতানের অনুমতিতে ব্যবসা করছেন। তারা সুলতানের সঙ্গে কথা বললেন।
ওয়েয়ুরে (২৪ নভেম্বর) পৌঁছে সুলতান মীর মহম্মদকে নির্দেশ দিলেন, ফারাকসানার ওহুদেদার চতুর খান এবং অন্যান্যদের সঙ্গে নিয়ে বন্দর শহর ইনগণ্ডুরে (এনগোডুর) শিবির ফেলতে। বন্দরটি মীরের প্রশাসনের অধিকারে ছিল বলে তিনি বন্দরের দরজা থেকে ব্যাঙ্কশাল পর্যন্ত রাস্তার সমস্ত ব্যবস্থাপনা এবং মিছিলের নীতি নির্ধারণ করলেন (কেন? যাতে মিছিলটা ভাল হয়?)। বন্দরে ঢুকে দেখাগেল বণিকদের বাড়িঘর রঙচঙে কাপড় এবং অন্যান্য নানান দ্রব্য দিয়ে সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। মীরকে পাশে নিয়ে হাতিতে চড়ে সুলতান ব্যাঙ্কশালের [সমুদ্রের/নদীর পাশে গুদাম, সংস্কৃততে বন্ধশালা উর্দুতে তিজারতি মাল গুদাম; মাদ্রাজে সমুদ্রের তীরে আর কলকাতায় গঙ্গার তীরেও ব্রিটিশেরা বিশাল বিশাল ব্যাঙ্কশাল তৈরি করেছে; ব্যাঙ্কশাল নামে ঘাট আছে, আদালত আছে, রাস্তা আছে; গোলকুণ্ডার এনগোডু বা পরে ব্রিটিশ মাদ্রাজ বা কলকাতায় ব্যাঙ্কশাল মানে আর প্রয়োগ একই; এটা যে সুলতানি অর্থাৎ মুঘল আমলের লব্জ সেটা পরিষ্কার হল] দিকে এগোতে থাকলেন এবং মীর মহম্মদ, সুলতানের ছুঁড়ে দেওয়া প্রতিটা প্রশ্ন মর্যাদা সহকারে উত্তর দিলেন। ব্যাঙ্কশাল বাড়িতে বিশেষ একটি মজলিস (ব্যক্তিগত বন্ধুদের নিয়ে সভা) শেষ করে সুলতান বন্দরটি ঘুরে দেখার পরে, তিনি সমুদ্রে ধোবিঘাটের দিকে এগোতে শুরু করলেন।
২৭ নভেম্বর সুলতান আবার বন্দরের দিকে গেলেন এবং ইওরোপিয় কুঠিগুলি পরের দিন ঘুরে দেখার ইচ্ছে প্রকাশ করলেন। তাঁর ইচ্ছে ছিল হয়ত বন্দরের বণিকেরা তাঁর সঙ্গে থাকা মহিলাদের নানান ধরণের কাপড় চোপড় এবং দেশ বিদেশের নানান পণ্য দেখাতে, উপহার দিতে উৎসাহী হবে। উপস্থিত কুঠিওয়ালাদের সুলতান বেশ কিছু সুযোগ-সুবিধে দিলেন। ২৯ তারিখ সুলতান মহিলা, বিদেশি ব্যবসায়ীদের বাড়িঘরদোর দেখতে গেলেন। তিনি সেখানে আন্তরিকভাবে কাজ করা আমলাদের অনেক প্রশ্রয় এবং সুযোগ দিলেন এবং সরইসিমতকেও বেশ কিছু সুবিধে দেওয়ার কথা বললেন। ৩ ডিসেম্বর ধোবিঘাটে মীর মহম্মদ সুলতান আর তাঁর সঙ্গীদের আমোদ দিলেন সমুদ্রে মাছ ধরা দেখিয়ে। দেখা গেল একজোট হওয়া ধীবরেরা তাঁদের জালে প্রচুর ছোট বড় মাছ ধরেছেন ।
পরের দিন পেশকাশ অনুষ্ঠান আয়োজনের সময় মীর মহম্মদ সৈয়দ সুযোগ পেলেন সুলতানকে বন্দর এবং এই অঞ্চলের আধিবাসীদের অবস্থা অবগত করানোর। মীর মহম্মদ ব্যবসায়ীদের নানান সমস্যা সুলতানকে জানালে, তিনি বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়িকে সুযোগ দেওয়ার কথা ঘোষণা করলেন — ১) বন্দরের ঢোকার দরজায় প্রত্যেক পণ্যের জন্য জাকাত দেওয়া থেকে দেশি বিদেশি সব ধরণের ব্যবসায়ীকে মুক্তি দিলেন, ২) গয়নাগাটি আমদানি রপ্তানির জন্য ব্যবসায়ীদের থেকে যে বিপুল পরিমানে রাজস্ব নেওয়া হত, তাতেও তিনি শুল্কে বড় ছাড় দিলেন। সুলতানের জাকাত সংক্রান্ত নির্দেশ (ফরমান) একটা শিলালিপিতে খোদাই করে বন্দরের জামা মসজিদে টাঙ্গিয়ে দেওয়া হল, যাতে আগামী দিনের হাকিম আর আমিলেরা অনৈতিকভাবে এ ধরণের কর আদায় এবং তাঁর জন্য সর্বশক্তিমানের অভিশাপ পাওয়া থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারে। এছাড়া যে সব ব্যবসায়ী পেগু থেকে রুবি আমদানি করে, তাদেরও শুল্ক ছাড় দেওয়া হল। সুলতানের এই সুবিধে দানের খবর দ্রুতগতিতে বালাবাদ আর জেরবাদে ছড়িয়ে গেল। স্থানীয় রত্ন ব্যবসায়ী আর মণিকারেরা খুশি হলেন।
সাধারণ মানুষের অবস্থার উন্নতির জন্য বহু নতুন পুরোনো বাসিন্দা নির্বিশেষে অভাবি মানুষ, সৈয়দ, আলিম, ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি, জীবিত কবিদের মাসোহারা এবং দান দেওয়ার, জমি অথবা আর্থিক ভর্তুকি দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। এছাড়াও সুলতান ওয়াজিফা থেকে শুরু করে সৈয়দদের, বিশেষ করে মীর মৈনুদ্দিন মহম্মদ শিরাজি এবং মীর মহম্মদ হুসেইনকে যে দান দেওয়া হচ্ছে, সেই প্রক্রিয়া চালিয়ে যাবার প্রতিশ্রুতি দিলেন। শেষে মীর মহম্মদ, মহামহিম সুলতানের প্রশস্তি গাইলেন এবং সুলতানের মহত্ত্বের জন্য তাকে ধন্যবাদ জানালেন। সুলতান পেশকাশ গ্রহণ করে স্থানীয় একটি লবন কারখানা ঘুরতে গেলেন।
বন্দর ছাড়ার দিন (৭ ডিসেম্বর) সুলতান নিজের গলা থেকে চাদর খুলে এবং চার-কোব (এক ধরণের জামা) পরিয়ে তাঁর আমলা মীর মহম্মদের কর্মদক্ষতাকে সম্মান জানালেন। দক্ষিণের সুলতানি রাজ্যগুলোয় চার-কোব পরানোর সম্মান জানানো হয় এমন এক পদাধিকারীকে, যিনি সরইখাহিল দপ্তর থেকে বিদায় নিচ্ছেন এবং পদোন্নতি হওয়ার মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। বোঝাগেল গোলকুণ্ডা প্রশাসনে মীর মহম্মদের পদন্নোতি সময়ের অপেক্ষামাত্র। চার-কোব ছাড়াও সুলতান তাঁকে রত্ন খচিত খাপওয়ালা তরোয়াল, রূপোর জালে মোড়া যুদ্ধ হাতি, রূপোর জালে মোড়া ইরাকি ঘোড়া, রত্নখচিত জিন, লাগাম আর জাল দিয়ে মোড়া অন্য একটি ইরাকি ঘোড়া দিয়ে সম্মান জানালেন। এছাড়াও রাজ্যকে সেবা কাজে যে সব ইওরোপিয় ব্যক্তি সাহায্য করেছেন, তাদেরও সুলতান এই অনুষ্ঠানে বিধিবদ্ধভাবে সম্মান জানালেন।
৫। গোলকুণ্ডা রাজ্যে মীর মহম্মদের প্রভাব
এইভাবে মীর মহম্মদের বিভিন্ন সম্ভ্রান্ত দপ্তরে কাজ করে তিনি বিখ্যাত হলেন। মানুচি বলছেন, ‘প্রায় সব ক’টা দপ্তরে তাঁর নিজের কাজের দক্ষতার ছাপ ছেড়ে গিয়েছেন।’ দিনের পর দিন নানান কাজকর্মের প্রতিভা বিচ্ছুরণে, রাজত্বেজুড়ে তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব বাড়তে থাকে দ্রুত গতিতে। প্রথম জীবনে পাওয়া ‘নবাব’ উপাধির সূত্র একটা ব্রিটিশ কুঠির তথ্যে পাচ্ছি ২৮ মে, ১৬৩৮-এ। তার দশ দিন আগেও তিনি সরইখাহিল পদে নিযুক্ত ছিলেন। নিজামুদ্দিন আহমেদ বলছেন, প্রত্যেকটি পদক্ষেপে মীর মহম্মদ, মহামহিম সুলতানের মঙ্গল চাইতেন। ফলে সুলতানের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠতে তাঁর দেরি হয় নি। মুঘল ঐতিহাসিকেরা সক্কলে প্রায় তাঁর দক্ষিণের সুলতানি রাজ্যের ক্ষমতা কেন্দ্রে থাকা মানুষদের তীব্রভাবে প্রভাবিত করা এবং সেবা করার দক্ষতা আর ক্ষমতার কথা উচ্চকণ্ঠে বলে গেছেন। ওয়ারিস বলছেন, মীর জুমলা ‘রাটক ও ফাটক’এর (আক্ষরিক অর্থ খোলা ও বন্ধ) যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন, অর্থাৎ তিনি কুতুব শাহের প্রশাসনের সমস্ত বিষয় নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা পেয়েছিলেন। আকিল শাহ বলছেন, ‘গোলকুণ্ডা রাজ্যের সর্বেসর্বা’ ছিলেন মীর জুমলা। সে রাজ্যে কোনও কিছুই তাঁর অনুমতি ছাড়া হাসিল করা যেত না। তিনি সুলতান আর ইওরোপিয় কুঠিয়ালদের মধ্যে সংযোগসূত্র ছিলেন। তাভার্নিয়ে গোলকুণ্ডার সুলতান আবদুল্লা কুতুবশাহকে কিছু মুক্তো আর গয়না বিক্রি করতে চাইলে তাকে মছলিপত্তনম থেকে মীর জুমলার সঙ্গে দেখা করতে গোলকুণ্ডায় যেতে হয়েছিল। কেননা, ‘কোনও ব্যতিক্রমী বা দামি কিছু কিনতে চাইলে, সুলতান মীর জুমলার সম্মতি ব্যতীত কোনও পদক্ষেপ নিতেন না’ (জুলাই ১৬৫২)। গোলকুণ্ডার আভ্যন্তরীণ প্রশাসনে তাঁর অবিসংবাদী প্রভাব এবং ছড়িয়ে থাকা বিশাল ব্যবসার জাল দেখে বিদেশিদের মনে হত তাঁর হাতেই রাজ্যের চূড়ান্ত ক্ষমতা ন্যস্ত আছে। ঠিক এই জন্য মছলিপত্তনমে এক ব্রিটিশ কুঠিয়াল পারস্যের এক কুঠিয়াল সতীর্থকে লিখেছিলেন, ‘সম্রাটের বকলমে সরইখাহিল সারা রাজ্য শাসন করেন’। গোলকুণ্ডায় আসা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দূত এন্ড্রু কোগু (১৬৩৯) জানাচ্ছেন, ‘(এই তথ্যটা চরম) সত্য যে সরইখাহিলই রাজ্য শাসন করেন’।
শেখ মহম্মদ ইবনইখাতুন মীর জুমলা পদ ছাড়ার পর মীর মহম্মদ মীর জুমলা পদে আসীন হন। কিন্তু সেটা কোন তারিখে আজ আর জানার উপায় নেই। ফলে আমলা-ব্যবসায়ী মীর মহম্মদের, আগামী দিনে প্রখ্যাত মীর জুমলায় রূপান্তরের তারিখটি আমাদের অজানা থেকে গিয়েছে। অধ্যাপক শেরওয়ানির ধারণা বিজয়নগরের অন্যতম প্রধান কেল্লা, উদয়গিরি জয় করার খবর ১৮ জুন, ১৬৪৩-তে যখন সুলতানের কাছে আসে, তখনই তিনি তাঁকে মীর জুমলা উপাধি অর্পণের সিদ্ধান্ত নেন। এই ধরণের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা দক্ষ মানুষকে নতুন পদে উত্তীর্ণ হতে সাহায্য করে। ১৬৪৩-৪৪এ সোয়ালি কুঠিয়ালেরা তাঁর সম্বন্ধে মন্তব্য করেছে ‘সব ক্ষমতায় থাকা সরইখাহিল বা উজির, সরকারকে চালায় এবং দেশটাকে নিয়ন্ত্রণ করে, এই তথ্য আমাদের মাথায় রাখা দরকার’। প্রশাসন চালনায় তিনি কুশলী ছিলেন, সরকারে ছিলেন প্রভাবশালী। কিন্তু মীর জুমলা যুদ্ধেও সমপরিমান, হয়ত আরও বেশি দক্ষ ছিলেন, সেটা প্রমান হয় পূর্ব কর্ণাটক দখল করায় উদ্যমে। যেখানে তিনি ১৬৪২-এ সুলতানেরও বিরোধিতা করবেন। সেই ঘটনাটা পরবর্তী অধ্যায়ে বিস্তৃতাকারে বলব। তাঁর সম্মান এতই ছিল যে সুলতান তাঁর দুই মন্ত্রী সুজাউলমুলক এবং উলচি বেগকে তাঁর সঙ্গী হতে নির্দেশ দেয়েছিলেন।
দ্বিতীয় অধ্যায়
কর্ণাটকে মীর জুমলা
প্রথম পর্ব
কর্ণাটক এবং কর্ণাটকে মুসলমান উপস্থিতির ইতিহাস
কর্ণাটক বা কর্ণাট শব্দটা অতীতে ব্যবহার হত সাধারণভাবে তেলুগু আর কানাড়ি জনগণ এবং তাঁদের ভাষা ইত্যাদি বোঝাতে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই শব্দের বহুধা বিস্তৃতি সংকুচিত হয়ে শুধুই কানাড়ি জনগণ আর তাদের ভাষা বোঝাত। ‘কর্ণাটক দেশ’ বলতে শুধু বোঝাল উত্তরভূমি বা বালাঘাট। মুসলমান শক্তি দক্ষিণভারতে প্রথমে পৌঁছায় ঘাট, মহীশূর, তেলিঙ্গানার অংশে, যার নাম কর্ণাট অঞ্চল। কিন্তু বিজয়নগর যখন পূর্বের তামিল আর তেলুগু এলাকার দিকে সরে যেতে বাধ্য হল, সে সময় কর্ণাট শব্দটা পূর্বের সমতল দেশ বা পণঘাট নামে চিহ্নিত ছিল। পূর্বতন বিজয়নগর রাজ্য, দক্ষিণের সুলতানি সাম্রাজ্যে দুই অংশে বিভক্ত হল — উত্তরে তুঙ্গভদ্রা নদীকে সীমারেখা করে বালাঘাট আর পণঘাট নিয়ে বীজাপুরি কর্ণাটক আর হায়দ্রাবাদী কর্ণাটকে। ব্রিটিশেরা কর্ণাট শব্দটা ব্যবহার করল ঘাটের নিচের অংশ বোঝাতে, যার মধ্যে রয়েছে মাদ্রাজ, তামিলনাড়ুর নেল্লোর, এবং কর্ণাটকের নবাবের প্রশাসনিক এলাকা। ফলে মহীশূর দেশ যদিও সত্যিকারের কর্ণাটক, যাকে আজ আর কর্ণাটক বলা হয় না, বরং আধুনিক ভূগোলে যে কর্ণাটক দেখানো হয় সেটা হল মাদ্রাজের নিচু জমি বা করমণ্ডল উপকূল। এই নব্য চিহ্নিতকরণের প্রক্রিয়া বিন্দুমাত্র ইতিহাস সিদ্ধ নয়।
কানাড়ি দেশ অতীত থেকেই উর্বর জমি, ধাতু, হাতি এবং ধনসম্পদের জন্য প্রখ্যাত ছিল। কিন্তু মাদ্রাজের সমুদ্র উপকূল আর পূর্ব ঘাটের মধ্যে যে পূর্ব কর্ণাটক বা পণঘাট, সেটি পশ্চিম কর্ণাটিক বা বিজাপুরী কর্ণাটকের থেকে হাজার গুণে জনবলী, সম্পদশালী এবং উর্বর অঞ্চল। কর্ণাটকের হিরের খনি, উর্বর চাষ জমি, ধ্বংস হয়ে যাওয়া হিন্দু সাম্রাজ্যের সঞ্চিত লুকোনো সম্পদ আওরঙ্গজেবকে আকর্ষণ করেছিল তীব্রভাবে। তিনি কর্ণাটক দখল করতে চেয়েছিলেন। শাহজাহানকে তিনি লিখছেন, ‘এটি গোলকুণ্ডার মত বড় এবং ধনশালী রাজ্য’। দক্ষিণের দুটি বিভাগ মুলুন্দ আর কর্ণাটক ছিল ধনী এবং উর্বর দেশ। মুহম্মদনামা’র লেখক ঝাউরইবনঝাউরি লিখছেন, ‘এই অঞ্চলের জলবায়ূ মনোরম, বাতাস সুখকর। বর্ষা যথেষ্ট হয়। সপ্তদশ শতে চাষে সে সিরিয়া আর মিশরের থেকেও এগিয়েছিল। তার ‘শস্যাগার আকাশ চুম্বন করত’। ছোট ছোট কসবা জনবসতিতে ভর্তি থাকত। সাধারণ জনগণ ছিল সমৃদ্ধশালী। প্রত্যেকটি পরিবার ইরাণের ফরিদুন এলাকার মত সমৃদ্ধশালী। এমন কোনও দিন যায় নি, যে দিন কোনও চাষী তাঁর জমির উদ্বৃত্ত ভিক্ষা দিতে পারত না। আকাশ ছোঁয়া গোলাপজাম, ডালিম, এবং আঙ্গুরের মত সোনালী সুস্বাদু ফলদায়ী গাছে পরিপূর্ণ ছিল এই ভূখণ্ড। অঞ্চলের আমের মিষ্টত্ব আপনাকে অবাক করবে। এই দেশের বাসিন্দাদের প্রকৃতি তাঁর অযুত সম্পদ ঢেলে সাজিয়ে রেখেছে। ভ্রমনকারীরা এই অঞ্চলের ফুলের উজ্জ্বলতায়, পাখির ডাকে, সাজানো বাগানের সম্পদ দেখে হতবাক হয়ে যেত। থেভনট আরও বলছেন, এই অঞ্চলে নানান ধরণের সস্তা কিন্তু গুণমানে সমৃদ্ধ পণ্য, ছাগল, ভেড়া, মোরগ সহজলভ্য। উপকূলের বিকশিত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য শহরগুলির মধ্যে নেগাপত্তনম, ত্রিবাঙ্কুর, মায়লাপুর এবং সান থোম প্রখ্যাত।
এই ধরণের সম্পদশলী দেশ, স্বাভাবিকভাবে তার প্রতিবেশী বিজাপুর বা গোলকুণ্ডা বা পরের দিকে মুঘল সাম্রাজ্যের ঈর্ষা জাগিয়েছে। কর্ণাটক ক্রমশ ভিতর থেকে এতই ক্ষয়ে গিয়েছিল যে, বৈদেশিক আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারল না। ১৬৩৬-এর মে-জুন মাসে শাহজাহান, আদিল শাহ আর কুতুব শাহের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির সুযোগে নিয়ে দুই দক্ষিণী ক্ষমতাশালী রাজ্য গোলকুণ্ডা আর বিজাপুর, কৃষ্ণা, তুঙ্গভদ্রা নদীর তীর ছাড়িয়ে মহীশূর, মাদ্রাজ-কর্ণাটক আর পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধ করা ছোট ছোট রাজ্যর দিকে লক্ষ রেখে কাবেরী নদী ছাড়িয়ে কৃষ্ণা নদী থেকে তাঞ্জোর পর্যন্ত হতোদ্যম বিজয়নগর সাম্রাজ্যের দিকে হাত বাড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছকে নেয়। বিজাপুরের আদিল শাহ দারুলহাব কর্ণাটক গড়ে তুলতে মুলুন্দ অর্থাৎ বেন্দুর, আর মহীশূর এবং তার পরে কানাড়ি দেশ অর্থাৎ পূর্ব কর্ণাটকের মাদ্রাজের সমতল থেকে ভেল্লোর, জিঞ্জি এবং তাঞ্জোরের কাছের ভালিকাণ্ডাপুরম পর্যন্ত এলাকা দখল করেন। অন্যদিকে গোলকুণ্ডার কুতুব শাহ, দক্ষিণ আর দক্ষিণপূর্বের হিন্দু রাজ্য অর্থাৎ বিজাপুরী দখলিকৃত এলাকার কৃষ্ণার উত্তরপূর্বের অঞ্চল অধিগ্রহণ করেন। দুই দক্ষিণী রাজ্যের জোড়া ফলার শাঁড়াশি আক্রমণে বিধ্বস্ত হয়ে বিজয়নগর সাম্রাজ্যের শেষ বাতিটি শুধু টিকে রইল পূর্বে নেল্লোর থেকে পুদিচ্চেরি পর্যন্ত এলাকায় আর পশ্চিমে মহীশূর সীমান্তে একলা চন্দ্রগিরি রাজ্য হিসেবে। হতবিধ্বস্ত রাজ্যগুলোর ভূখণ্ডে ক্ষমতাসীনদের মধ্যে সিংহাসন নিয়ে কামড়াকামড়ি, ক্ষমতার লড়াই-এর সুযোগ নিয়ে মাদুরা, জিঞ্জি এবং তাঞ্জোরের নায়কেরা স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং বহুদিনের শত্রুর মত তামিল আর কর্ণাটকিরা এমন লড়াই শুরু করে যে বহিঃশত্রুর আক্রমনের বিরুদ্ধে চন্দ্রগিরি এক মন এক প্রাণ হয়ে দাঁড়াতেই পারল না। রয়াল প্রত্যাঘাত করেও হতাশ হয়ে দেখলেন, একের পর এক এলাকা তাঁর নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। এই সব কটি ঐতিহাসিক বিষয়, বিশেষ করে রয়াল আর নায়েকদের মধ্যে সম্পর্ক এমন জটিলভাবে পেকে আর বিষিয়ে উঠল যে বড় শক্তিগুলোর কাছে দাক্ষিণ কর্ণাটক দখল এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা হয়ে ওঠে। (চলবে)