দ্বিতীয় অধ্যায়
কর্ণাটকে মীর জুমলা
প্রথম পর্ব
কর্ণাটক এবং কর্ণাটকে মুসলমান উপস্থিতির ইতিহাস
ক। বীজাপুর
৪। কর্ণাটকে মীর জুমলার দ্বিতীয় অভিযান
পূর্ব কর্ণাটক জয়ের গোলকুণ্ডার রাজত্বের প্রচেষ্টা এই হারের ফলে ধুলিতে মিশে গেল মাত্র এক ধাক্কায়। মীর মহম্মদের অনুপস্থিতিতে গাজি আলির অযোগ্য নেতৃত্ব গোলকুণ্ডা বাহিনীর সাময়িক পশ্চাদপসরণ নিশ্চিত করতে হল। সেই আক্রমণের প্রাবল্যে এবং আকস্মিকতায় গোলকুণ্ডার সেনাবাহিনী এতই হতচকিত হয়ে পড়ে যে ঘুরে দাঁড়িয়ে নতুন করে আক্রমন শানাবার কথা তাঁদের মনে আসে নি।
একদিকে হারের ধাক্কা সামলানোর প্রক্রিয়ায় কুতব শাহ চেষ্টা করছিলেন তাঁদের বাহিনীর পশ্চাদপসরণের সুযোগে যেন বিজাপুর, তাদের সাম্রাজ্যের হারানো জমি দখল না নিতে পারে। তাছাড়া কর্ণাটকে গোলকুণ্ডার যতটুকু দখলে রয়েছে, সে সব ধরে রাখতে নিজেদের বাহিনীর জন্য অতিরিক্ত সম্পদ, রসদ এবং বাহিনী পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন দ্রুত গতিতে। ১৬৪৪-এর শেষে এবং ১৬৪৫-এর প্রথম পাদে, গোলকুণ্ডাকে ছোট ছোট রাজা নিয়ে জোট করে বিরোধিতা করা রয়ালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ প্রচেষ্টা সাময়িকভাবে থামিয়ে দিয়ে শান্তি চুক্তিতে উপনীত হতে হয়। কুতুব শাহী কূটনীতি হল সাময়িকভাবে পিছু হঠে নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার সময় কেনা। ইতিমধ্যে নায়কেরা দুই সুলতানের সাহায্য চেয়ে বসায় বীজাপুর আর গোলকুণ্ডার পররাজ্য আক্রমনের বাসনা জেগে উঠল হুঠ করে। জয়ের আস্বাদ মিলিয়ে যেতে না যেতেই, সুলতান নতুন করে মীর মহম্মদ, বর্তমানের মীর জুমলাকে দ্বিতীয়বার কর্ণাটক রাজ্য জয়ে পাঠালেন।
সময়টা যেন মীর জুমলার নতুন অভিযানের জন্যই অপেক্ষা করছিল। কর্ণাটক যুদ্ধে যুদ্ধে আর দুর্ভাগ্যের ভারে ক্ষতবিক্ষত। রয়ালও সমস্যার ভারে প্রপীড়িত। গোলকুণ্ডার চাপে ডাচেরা তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে। ১২ আগস্ট ১৬৪৫ থেকে সুরক্ষিত পুলিকট ডাচ কুঠি রয়েলের বাহিনীর হাতে অবরুদ্ধ। অন্য দিকে রয়েলের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধে সামিল তিন নায়ক তাঞ্জোর, মাদুরা এবং সিনসিদার (জিঞ্জি) । সেখানেও লড়াই চলছে সমানতালে। ১৬৪৫-র ডিসেম্বরে নায়কদের যৌথ বাহিনী রয়ালের সেনাবাহিনীকে হারিয়ে দেয়। রয়ালের হারের ফলে সে পুলিকটের অবরোধকে জোরদার করতে চাহিদার ভগ্নাংশ মাত্র ৪,০০০ পদাতিক আর কিছু খাবারদাবার আর গোলাবারুদ পাঠাতে পেরেছে। সমান্তরালভাবে বিজাপুরের রয়াল রাজ্য আক্রমণের খবর গোলকুণ্ডার হর্ষ বৃদ্ধি করে। ১৬৪৬-এর শুরুতে আদিল শাহি সেনাপতি মুজফরউদ্দিন খান মহম্মদ খানইখানান, কুর্নুলের নান্দিয়ালসহ, সেই অঞ্চলের আটটি দুর্গ দখল করে ১৬৪৬-এর বসন্তে পশ্চিম দিক থেকে অগ্রসর হয়ে কর্ণাটক বালাঘাট দখল করেন। ব্রিটিশেরা যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি বুঝে মন্তব্য লিখল, ‘মুসলমানেরা নতুন করে ছেড়ে যাওয়া এলাকা দখল নিতে শুরু করেছে’।
এই সব একসঙ্গে ঘটে চলা চলচ্চিত্রসম ঘটনার সুযোগে সুসজ্জিত, সুব্যস্থিত এবং চরম দক্ষ ইওরোপিয় গোলান্দাজ এবং বন্দুকচি বাহিনী নিয়ে মীর জুমলা উত্তর আর পূর্ব দিক থেকে রয়ালের এলাকায় শাঁড়াশি আক্রমন শুরু করলেন। দামরালার জায়গায় মাল্লাইয়ার (চিন্নানা) হাতে সেই অঞ্চলের শাসনভার তুলে দেন রয়াল। মাল্লাইয়া তাঁর ৫০ হাজার সেনা নিয়ে চেষ্টা করছিলেন ‘আক্রমনকারী মুসলমান বাহিনীকে তাঁর রাজার রাজ্য থেকে দূরে রাখার’। গোলকুণ্ডার আক্রমন সামলানোর জন্যে পুলিকটের ডাচে অবরোধ থেকে বিপুল সংখ্যক, ৩০,০০০ থেকে ৪০,০০০ সেনা তুলে নেন রয়াল। মাত্র হাজার খানেক সেনার অবরোধ ভাঙতে ডাচেরা নতুন উদ্যমে আক্রমন শানালেও রয়ালের খুব কমই ক্ষতি হল। ছোট বাহিনী নিয়ে একইভাবে অবরোধ চলতে থাকে। রাজা ডাচেদের থেকে বিপুল অঙ্কের ৬০,০০০ রিয়াল ক্ষতিপূরণ চেয়ে বসেন; জানিয়ে দিলেন ক্ষতিপূরণ না পেলে অবরোধ তুলতে রাজি নন।
কিন্তু ডাচেদের বিরুদ্ধে রয়ালের ক্ষণস্থায়ী সাফল্য মীর জুমলার আক্রমণে ছিন্নভন্ন হয়ে গেল। পাঁচ মাসের মধ্যে কৃষ্ণা নদী পেরিয়ে কুর্নুল জেলার কাম্বামে পৌঁছে এরাগোন্দাপাল্লেমের প্রায় অজেয় দুর্গ দাদ্দানালা দখল করলেন মীর জুমলা। দাদ্দানালার নায়ককে নিহত করার পর, নতুন করে মীর জুমলা তাঁর ফলিত এবং বাস্তবজনোচিত কূটনীতি অবলম্বন করলেন। কেল্লার নিহত নায়েকের পুত্রকে নগদ ৫০ লক্ষ প্যাগোডা আর বছরে এক লক্ষ প্যাগোডার বিনিময়ে দুর্গের দখলি স্বত্ব অর্পণ করলেন। মীরের সব থেকে বড় জয় হল, রয়াল রাজত্বের পূর্বাঞ্চলের মুকুট, রাজধানী কেল্লা উদয়গিরি দখল। ব্রিটিশ সূত্রে জানতে পারছি ‘২১ জানুয়ারি আর ১০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে মুসলমান সেনানায়ক রয়াল রক্ষণের তিনটে গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ দখল করলেন’। উদয়গিরি দখল হল স্রেফ বিশ্বাসঘাতকতার সূত্রে। ডাচেদের বিরুদ্ধে লড়াই করে প্রায় জিততে বসা রয়ালের সেনানায়ক মাল্লাইয়ার দুর্গ ঘিরে রাখে মীর জুমলা। ৫০ হাজার সেনা থাকা সত্ত্বেও সে মীর জুমলার সঙ্গে কৌশলে বোঝাপড়া করে, নিজে আর তাঁর সৈন্যের বিপদমুক্তির আশ্বাস নিয়ে দুর্গটা তুলে দিল গোলকুণ্ডার দখলে। উদয়গিরি দখল করে মীর জুমলা পশ্চিমের পানে যেতে যেতে কুডাপ্পা জেলার চিট্টিভেলির ছটা দুর্গ দখল করেন। মাতলি সমাজে প্রধান, দ্বিতীয় কুমার অনন্ত শুধু যে তাঁর রাজ্য হারালেন তাই নয়, তাকে বিপুল অর্থ ক্ষতিপূরণ দিতে হল।
৫। বীজাপুর গোলকুণ্ডার কর্ণাটক ভাগাভাগি চুক্তি
কর্ণাটক দখল নিয়ে দুই দক্ষিণী সুলতানি রাজ্যের মধ্যে চলতে থাকা দ্বন্দ্বের আবহে, আহমদনগর দখলের পর প্রায় দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে মুঘল পাদসাহ শাহজাহান দক্ষিণ বিজয়ের লক্ষে দীর্ঘস্থায়ী কূটনৈটিক খেলা শুরু করলেন। তবে মুঘল সাম্রাজ্যের দক্ষিণ বিজয় কিন্তু শুধু সামরিক বলে হয় নি, বরং দুই সুলতানি রাজ্যের মধ্যে কূট লড়াইএর বৈরিতাকে এই খেলায় চতুরভাবে ব্যবহার করে মুঘলেরা চূড়ান্ত দক্ষিণ বিজয় হাসিল করে। মুঘলেরা জিততে পেরেছিল কারন ক) ইনকিয়াদনামা (আত্মসমর্পণের ইচ্ছে) বা আহদনামা বা তাহুদনামা (চুক্তি) যাকে ১৬৩৬-এর এপ্রিল-মে মাসের সীমান্ত চুক্তি হিসেবেও আধুনিক সময়ের ইতিহাস অভিহিত করে এবং খ) মুঘল সাম্রাজ্যের ভয় দেখানোর রণনীতি আর গ) দুই সুলতানি রাজ্যে মোঘল সাম্রাজ্যের ‘অপ্রতিহত ক্ষমতা’ বিষয়ে অযথা ভয়ের পরিবেশ তেরি হওয়া। বীজাপুর গোলকুণ্ডা দুই রাষ্ট্রই তাদের বৈদেশিক নীতি তৈরি করেছিল মুঘলদের সাম্রাজ্যবাদী নীতি নির্দেশে। ঠিক সেই জন্যই দুটি রাজত্বের স্বাধীনতা মুঘল পরাধীনতায় পরিণত হল। অন্য ভাষায় বলতে গেলে, ইনকিয়াদনামার ফলে দুই গুরুত্বপূর্ণ শক্তিশালী দক্ষিণী রাজ্য মুঘলদের নির্দেশ ছাড়া এবং মুঘল স্বার্থবিহীনভাবে বড় যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারত না। মুঘলদের সঙ্গে যে সীমান্ত চুক্তি হয়েছিল, তাকে মান্যতা দিতে তারা উত্তরের মুঘল হিন্দুস্তান বা তার লাগোয়া কোনও রাজত্ব জয়ের অভিযানে সম্ভব হল না, তাঁদের অভিযানগুলি দক্ষিণের দিকে নিয়ে যেতে বাধ্য হল, যার জন্য তাঁদের রয়াল আর তাঁর নায়কদের লড়াইয়ের সুযোগ নিয়ে বিজয়নগর দখল করতে হয়।
মুঘলেরা যে গোলকুণ্ডা এবং বীজাপুরকে পুর্ব এবং পশ্চিম কর্ণাটক দখলের নীতি প্রণয়ন করতে প্ররোচনা দিয়েছিল, তার হাজারো পরোক্ষ সূত্র ছড়িয়ে রয়েছে সে সময়ের মুঘল ইতিহাস আর নথিতে। যদিও সরাসরি মুঘল সূত্র এই তত্ত্ব স্বীকার করে না। কর্ণাটকীয় আগ্রাসন সংক্রান্ত বিভিন্ন তেলুগু নথিতে মুঘল সম্রাট বলতে শাহজাহানকে, না তাঁর প্রতিনিধি দক্ষিণে মুঘল সুবাদার আলমগিরকে বোঝানো হয়েছে, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে যথেষ্ট বিভ্রান্তি রয়েছে। কিন্তু ‘গাণ্ডিকোটা কৈফিয়ত’ নামক নথিতে পাচ্ছি, মুঘল সম্রাটের সরাসরি প্ররোচনায় গোলকুণ্ডা সাম্রাজ্য কর্ণাটক জয়ে উৎসাহিত হয়, ‘পাদশার উজির মীর জুমলা, আলমগীরের পক্ষে দক্ষিণে আসেন…’। মুঘল হস্তক্ষেপের একটা লেখমালা বিষয়ক প্রমানও রয়েছে। গুটি তালুকে উদ্ধার হওয়া তাম্রপ্রশস্তিতে পাওয়া যাচ্ছে, পাদশা বা মুঘল সম্রাটের (পাচ্চায়ি) হয়ে গোলকুণ্ডা কর্ণাটক এবং গুটি দখল করে।
কুতুবশাহী আক্রমন সংক্রান্ত নথিপত্রেও একই তত্ত্ব সমর্থনের তথ্য পাচ্ছি। অর্থাৎ নীতি নির্ধারণে মুঘল সাম্রাজ্যের পক্ষে পরোক্ষে উৎসাহ দেওয়ার নথিরও অস্তিত্ব রয়েছে। মুঘলদের প্ররোচনায় সুলতান তাঁর সৈন্য নিয়ে কর্ণাটক আক্রমন করেন। পাদশাহ শাহজাহানকে লেখা আবদুল্লা কুতুব শাহ এক চক্রান্ত-পত্রেও এ ধরণের ধারনার প্রমান পাওয়া যায়, ১) ‘রয়াল কর্ণাটক’ রাজ্য থেকে লুঠ করা সম্পদের দুই তৃতীয়াংশ সম্রাটকে দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়; ২) রয়াল এবং তাঁর নায়কদের মধ্যে বিভেদ ঘটিয়ে যে চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হবে, ঠিক হয় সে সময়ে পাদশাহের একজন আধিকারিক সেখানে উপস্থিত থাকবেন; এরই সঙ্গে দিল্লিতে শাহজাদা দারার কাছে কুতুব শাহ, নিজেকে তাঁর আজন্ম শিষ্য (মুরিদ) উল্লেখ করে দাক্ষিণের গণ্ডগোলে তাঁকে মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করার আর্জি পেশ করেন (আর্জদস্ত)। অন্য দিকে এই তত্ত্বের পক্ষে সরাসরি সমর্থন পাওয়া যাচ্ছে ডাচেদের পক্ষ থেকে; সে সময়ের ডাচ সূত্রে জানা যাচ্ছে, মুঘলেরা, দুই সুলতানকে কর্ণাটক ‘আক্রমন করে, নিজেদের মধ্যে ভাগবাঁটোয়ারা’ করার ‘নির্দেশ’ দিয়েছিল।
মুঘল সাম্রাজ্যবাদী নিয়ন্ত্রণে দিড়ই টানা পুতুলের মত অভিনয় করতে থাকা দুই দক্ষিণী সুলতানের মুহুর্মুহু আক্রমনে ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠা কর্ণাটকের রয়াল রাজ্য দুই সুলতানের বিদ্বেষ কাজে লাগাতে চেষ্টা করে। এক সুলতানের সেনাকে নিজের পক্ষে নিয়ে অন্য সুলতানের বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে রয়াল একজনকে অর্থ, হাতি আর অন্যান্য উপঢৌকন দিয়ে বশ করে। এই দৌত্যটা খুব কঠিন ছিল না, কেননা দুই সুলতানের পরস্পরের মধ্যে গভীর ঈর্ষা আর অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি হয়েই ছিল। রয়াল সেটাকে নিজের স্বার্থে কাজে লাগালেন। এই পদক্ষেপের ফলে মুঘল আগ্রাসনের প্রাবল্যের [জগদীশ নারায়ণ সরকারের ভাষায় ইসলামিক স্টিম রোলার] গতি কিছুটা হলেও কমে যায়।
দুই সুলতান খুব তাড়াতাড়ি পরিষ্কার পরিষ্কার বুঝে গেলেন, আলাদা আলাদা ভাবে যুদ্ধ জয় সম্ভব নয়। দুই রাষ্ট্রের মিলিত আক্রমন ছাড়া বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থায় কর্ণাটক বিজয় সম্পন্ন হবে না এবং অবিশ্বাসীর রাষ্ট্রের (ট্রি অব দ্য ইনফিদেল) শেকড় চিরতরে উপড়ে ফেলা যাবে না। আদিল শাহ বুঝলেন, ‘কুতুব শাহের সাহায্য ছাড়া রয়াল বিরুদ্ধে সফলভাবে যুদ্ধ জেতা অসম্ভব; তিনি কর্ণাটক ভাগ করার কুতুব শাহী প্রস্তাব বাধ্য হয়ে মেনে রয়াল এবং অন্যান্য জমিদারের বিরুদ্ধে ধ্বংসক্রিয়ায় প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রকে সামিল করলেন’। ১৬৪৬-এর মার্চ-এপ্রিলে দুই সুলতানের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিতে লুঠের ভাগ ঠিক হল — হিন্দু কর্ণাটকের রাজা শ্রীরঙ্গ’র রয়াল রাজ্যের যুদ্ধের সামগ্রী, পণ্য, সোনাদানা, রত্নরাজি এবং নগদ অর্থ আলোচনা সাপেক্ষে বিজাপুর আর গোলকুণ্ডার মধ্যে ভাগ হবে। এই লুঠের দুই তৃতীয়াংশ যাবে আদিল শাহি কোষাগারে আর এক তৃতীয়াংশ যাবে কুতুব শাহের খাজাঞ্চিতে।
সেই মুহূর্তের রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতায় সীমান্ত বাঁটোয়ারা এবং রাজ্যভাগ চুক্তিকে দুই সুলতানি রাজ্য সুখদায়ক প্রকল্প বলে মনে করছিল। বিজিত আদিল শাহী উজির নবাব মুস্তাফা খান কানাড়ি দেশ এবং কুতুব শাহী উজির মীর জুমলা পূর্ব কর্ণাটকের দিকে সাঁড়াশি আক্রমণের নীতিতে এগোতে থাকলেন। ১৬৬৪-এর জুন মাসে বিজাপুরী সেনাপতি মুলুন্দের দিকে এগোলেন। ব্যাঙ্গালোর জেলায় তাঁর সঙ্গে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হল মাদুরা, তাঞ্জোর আর জিঞ্জি ইত্যাদির নায়েক, দেশাই এবং আরও অন্যান্যদের। ঠিক হল সেখান থেকে তারা রয়ালের রাজধানী ভেলোরের দিকে এগোবেন। একই সঙ্গে কুর্নুলে থাকা খান মহম্মদকেও মূল বাহিনীকে অনুসরণ করতে নির্দেশ দেওয়া হল। চলতি অবস্থা শ্রীরঙ্গর অস্তিত্বের পক্ষে মাথা ব্যথার কারণ হয়ে উঠল; কারন যে মানিওয়ারেরা (নায়েক) এক সময় তাঁর অধীনে ছিল আজ তারা তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে, এবং তাঁদের উকিল আর অন্যান্য পেশাদার মুস্তাফা খানের কাছে গিয়েছে আদিল শাহী সুলতানির পক্ষে আইনি অধীনতার জন্য কাগজপত্র তেরি করতে। নতুন রাজনৈতিক পরিবেশে চিন্তিত হয়ে রয়াল ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার ঘোড়সওয়ার, এক লাখ পদাতিক এবং ১০০ হাতি পাঠালেন নায়কদের ভয় দেখাতে। জিঞ্জির রূপ নায়েক অভিযান থেকে ভয় পেয়ে সরে দাঁড়ালেন। তাঞ্জোরের নায়েক বিজয়র্গভ আর মাদুরার নায়েক তিরুমালা খালপত্তনমে (কয়ালপত্তনম) বহু রত্নখণি নিয়ন্ত্রণ করতেন; তারা রয়ালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার পরিকল্পনায় এড়ে রইলেন। রয়াল বুঝলেন তারা মুস্তাফার সঙ্গে যোগ দিয়ে তার রাজত্ব দখল করবেই। রয়াল শান্তি প্রস্তাব দিয়ে ভেলোরের কাছে কানোয়ি পাসে তাঁর ব্রাহ্মণ গুরু ভেঙ্কান্না সোমাইয়াজীকে (সোমাজী) নবাব মুস্তাফার সঙ্গে সাক্ষাত করতে পাঠালেন। নবাবের শান্তি শর্ত (নায়েকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিকল্পনা থেকে রয়ালকে সরে আসতে হবে, এবং পিছিয়ে ভেলোরে চলে যেতে হবে) শুনে ফিরে এসে রয়ালকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে পরামর্শ দিলেন গুরু। মুস্তাফা খান তখন জগদেব দেশ জয় করতে গেছেন।
একই সময়ে নবাব মীর জুমলা উদয়গিরি দখল করে গোটা পূর্ব উপকূল, নেলোরের দক্ষিণ এবং সেন্ট জর্জ দুর্গের আশেপাশের অঞ্চল দখলের যে কার্যকরী পরিকল্পনা ছকলেন। সেই পরিকল্পনা অনুসারে উত্তর আর্কোটের টোণ্ডামানাদ, তিরুপতি এবং চন্দ্রগিরি ১৬৪৬-এর এপ্রিল মাসের আগেই দখল হয়ে যায়। ১১ ডিসেম্বর পুলিকটের আশেপাশে থাকার সময় ডাচেরা অগ্রগামী গোলকুণ্ডা বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা করে তাদের বশ্যতা স্বীকার করল। সেনাপতি ডাচ দুর্গের সুরক্ষার ব্যবস্থায় প্রভাবিত হলেন। যুদ্ধের আবহে প্রচুর আলোচনার টানাপোড়েনের পর তিনি ডাচেদের এলাকায় কাসিম মাজানদারিনিকে থানাদার নিয়োগ করলেন। তিনি শুধু পুলিকটই নয়, স্যান থোমেরও প্রশাসন হাতে নিয়ে রাজ্যজুড়ে শান্তি বজায় রাখায় ব্যবস্থা করে হিন্দু শক্তি দমনের দিকে এগোলেন। মীর জুমলা পুলিকট থেকে এগোবার পথে সমস্ত রাস্তা জুড়ে বাড়ি ঘরদোর পুড়িয়ে মানুষ খুন করে, বিপুল ধ্বংসলীলা চালাতে থাকলে আতঙ্কিত স্থানীয় অভিজাতরা তাঁর অভিযানে যোগ দিতে বাধ্য হয়। এলাকার পর এলাকা জনশূন্য হল। তিনি পৌঁছবার আগেই পোন্নারি, পূনামালি, কাঞ্চি (কাঞ্চিভরম), এবং চিঙ্গিলপুটের (যেটি শক্তিতে এবং অভেদ্যতার নিরিখে সপ্তম স্বর্গের সঙ্গে তুলনীয়) পতন হল, জনশূন্য এলাকা দখল করতে করতে মীর জুমলার বাহিনী এগোতে লাগল ভেলোরের দিকে। ৪ জানুয়ারি ১৬৪৭এ জানা গেল রাজার সকাশে (ভেলোর) পৌঁছবার জন্য মাত্র দু দিন হাতে রয়েছে। দেশজুড়ে বিপুল মন্বন্তর নেমে এলে একের পর এক বসতি উজাড় হয়ে গেল জুমলার বিরোধিতা করতে কোনও শক্তিই এগিয়ে এল না।
বিজাপুরী আর কুতুব শাহী সেনার হাতে ভেলোরে হিন্দু সেনাপতি ভাইলুয়ারের চরম বিপর্যয়ের পর রয়াল আত্মসমর্পনের অঙ্গীকার করে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৫০ লক্ষ হুণ আর ১৫০টি হাতি দিতে বাধ্য হলেন (এপ্রিল, ১৬৪৭)। বিজাপুরের আত্মসমর্পণের শর্ত কুতুব শাহ মেনে নিলেন না। রয়াল আত্মসমর্পনের পর হঠাতই দেখাগেল নায়কেরা নতুন করে রয়ালের পাশে দাঁড়াবার অঙ্গীকার করছেন, দেশের স্বাধীনতার পতাকা উর্ধ্বে তুলে ধরার নিশ্চয়তা দিচ্ছেন, কিন্তু ততদিনে বহু দেরি হয়ে গিয়েছে, যে ক্ষতি হয়েছে, তা তাড়াতাড়ি পূরণ করা সম্ভব নয়। নায়কদের মধ্য কলহ পতনের কারণ হল। তাঞ্জোর আর জিঞ্জির সামরিক ক্ষমতা এতই সীমিত ছিল যে তারা আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে বিন্দুমাত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে নি। মহীশূর আর মাদুরার যৌথ সেনা দল বিজাপুরের মুস্তাফা খানের সাহায্যে ওয়ান্ডিওয়াসে মীর জুমলার বিরুদ্ধে দাঁড়ালেও, মীর জুমলা কয়েকজন হিন্দু সেনাপতি যেমন ভেলুগতির প্রধানকে সঙ্গে টেনে নিয়ে তাদের সমস্ত প্রতিরোধ উপড়ে ফেলেন।
১৬৪৭-এ মাদ্রাজে ব্রিটিশদের সঙ্গে সন্ধি করায় মীর জুমলা পিতলের বন্দুক পেলেন। তার বদলে তাদের বেশ কিছু বাণিজ্য সুবিধা দিতে হল। অক্টোবরে ব্রিটিশ কুঠিয়ালেরা সমীক্ষা পত্র পাঠিয়ে জানাল গোলকুণ্ডার রাজা মোটামুটি সমগ্র রাজত্ব জয় করে নিয়েছে, এবং আনাবব (নবাব) উপাধিতে দেশ শাসন করছে। (চলবে)