দ্বিতীয় অধ্যায়
কর্ণাটকে মীর জুমলা
প্রথম পর্ব
কর্ণাটক এবং কর্ণাটকে মুসলমান উপস্থিতির ইতিহাস
ক। বীজাপুর
৬। জিঞ্জি
ব্রিটিশদের সঙ্গে মাদ্রাজে সন্ধি করে ১৬৪৭-৪৮-এর শীতে মীর জুমলার নেতৃত্বে কুতুবশাহী বাহিনী শীতকালে চলল উত্তর থেকে জিঞ্জির দিকে। সেনাবাহিনী যতই এগিয়ে আসতে থাকে, বিপদের আশংকায় তাঞ্জোরের নায়ক থরথর করে কাঁপতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত মীর জুমলার সঙ্গে সন্ধি করলেন তাঞ্জোরের নায়ক। মীর জুমলার পরিকল্পনা ছিল জিঞ্জিকে উত্তর, পূর্ব এবং দক্ষিণ দিক থেকে আক্রমন করবেন। সেই পরিকল্পনায় দক্ষিণ আর্কট জেলার তাঞ্জোরের তাণ্ডিভরম আর আসিউর (আলিউর?) দখল নিলেন। মাদুরার তিরুমালার নায়ককে একদা তাঞ্জোরের নায়ক বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। তিনি এবারে শোধ নিতে বদ্ধ পরিকর হয়ে আদিল শাহকে দূত পাঠিয়ে সমস্ত সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিলেন। আদিল শাহ জিঞ্জি দখল মনস্থ করেছিলেন, কিন্তু জিঞ্জি গোলকুণ্ডার আশ্রয়ে যেতে চায়। কুতুব শাহ শাহজাহানকে জানালেন জিঞ্জি আর তাঞ্জোরের জমিদার তাঁর নিরাপদ আশ্রয়ে রয়েছে। আদিল শাহ এই জোটের পূর্বলক্ষ্মণ হয়ত অনেক আগেই দেখতে পেয়েছিলেন। তিনি বুঝলেন মীর জুমলার কূটনীতিতে এই দুই নায়ক তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। তিনি কুতুব শাহের প্রতি বিদ্বিষ্ট হয়ে উঠে মুজফফরাউদ্দিন খান মহম্মদ, খানইখানানকে দরবারে ডেকে গোলকুণ্ডা রাজ্য লুঠ আর দুর্গকে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। তাঁর এই আভিযান শুরু করতে বহু দেরি হল। শাহজাহানের দূত হামিম মহম্মদ হুসেইন আদিল শাহের দরবারে বললেন কুতুব শাহের নির্দেশে মীর জুমলা এই কাজটি করেছেন, এবং তিনি (দূত) দেখবেন যাতে আদিল শাহ যথেষ্ট ক্ষতিপূরণ পান। এই সমঝোতা সূত্রেই আদিল শাহ শাহজাহানকে অনুরোধ করলেন এক তৃতীয়াংশ দুই তৃতীয়াংশ আহদনামার ভাগাভাগির বখরার এবং বললেন পেশকাশ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাকে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক।
কিন্তু ১০ জানুয়ারি ১৬৪৮-এ ভাগাভাগির সমাধানে অখুশি আদিল শাহ গুলবর্গার মুস্তাফা খানকে নির্দেশ দিলেন তুরুমালার নায়ককে সঙ্গে নিয়ে জিঞ্জি দখল করার — ‘এটাই তাঁর শেষ এবং সব থেকে বড় সৈন্য সজ্জা’। ১৭০০০ ঘোড়া, ২০-৩০ হাজার পদাতিক সৈন্য তাঁর সঙ্গে ৩০ হাজার তিরুমালার সৈন্য (যথাযোগ্য যুদ্ধাস্ত্র ছাড়া অনিয়মিত সেনা দল) যোগ করে মুস্তাফা খান এগিয়ে চললেন। ঘটনার অগ্রগতি দেখে মীর জুমলা ১৬৪৮এর মার্চে বর্ষায় কাঞ্জিভরমের দিকে এগোলেন। দূরদৃষ্টিতে তিনি বুঝলেন বিশাল মাদুরা এবং মহিশূরের যৌথ বাহিনী নিয়ে আদিল শাহ ওয়ান্ডিওয়াশের দিকে এগোচ্ছেন। ভেলুগতির মত হিন্দু সেনানায়ক আর তাঁর গোলান্দাজ বাহিনী নিয়ে মীর জুমলা মুস্তাফার আগেই জিঞ্জি পৌঁছবার চেষ্টা করলেন, যাতে জিঞ্জি বীজাপুরের হাতে না পড়ে। বীজাপুরী ঐতিহাসিক, ঝাউরি লিখছেন মীর জুমলা স্বাভাবিকভাবে ‘কিছুটা গণ্ডগোল পাকাতে চাইছিলেন’। জিঞ্জির রাজা এগিয়ে এসে মীর জুমলাকে স্বাগত জানিয়ে আশ্বাস দিয়ে বললেন তিনি চুক্তি পালন করতে বদ্ধপরিকর। এবং তিনি বিশ্বাসঘাতকতা করবেন না। দুটি সুলতানি বাহিনী মাত্র ১০ মাইল দূরত্বে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে রাজা মীর জুমলার বাহিনীর ২ মাইল আগে শিবির ফেলেছেন। মীর জুমলা দ্রুত রাজার সঙ্গে যোগ দিলেন। দুটি বাহিনীর মধ্যে এখন তফাত মাত্র আট মাইলের। মুস্তাফা বুঝলেন রাজা আর মীর জুমলার যৌথ বাহিনীর বিরুদ্ধে তাঁর আক্রমন কার্যকারী হবে না। তিনি আদিল শাহকে খুব তাড়াতাড়ি আরও বাহিনী পাঠাতে অনুরোধ করলেন। আদিল শাহ ৭/৮০০০ সেনা বাহিনীর নায়ক সেনাপতি ইখলাস খান, রুস্তমইজামান, আফজল খাঁ এবং অন্যনান্য বিখ্যাত সেনাপতিকে মুস্তাফা খানের সাহায্যের জন্য পাঠাবেন ঠিক হল। অন্যদিকে কুতুব শাহ মনে করলেন আদিল শা রুস্তমকে পাঠিয়েছেন তাঁর হাত থেকে জিঞ্জি আর তাঞ্জোর দখল করার জন্য। তিনি শাহজাহানকে বিজাপুরের এই চুক্তি ভাঙ্গার ঘটনা বিবৃত করে পাঠালেন এবং মীর জুমলাকে কিছু দিন অপেক্ষা করতে নির্দেশ দিলেন। কেননা তাঁর বিশ্বাস পাদশাহ তাঁর পক্ষেই রায় দেবেন।
দুটি সেনা বাহিনী কোনও আক্রমণ প্রতিআক্রমন ছাড়াই মুখোমুখি বসে রইল। জিঞ্জি কার দখলে থাকবে, এই সিদ্ধান্ত কয়েক দিনের মধ্যেই দুপক্ষের বিরোধে নিষ্পন্ন হবে। কিন্তু বিজাপুর রাজ্যে বাহিনীর মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বে আদিল শাহী সেনা বাহিনী আসতে দেরি হওয়ায় এবং মীর জুমলা মুস্তাফার মত বেশ কিছু বিখ্যাত বিজাপুরী সেনানায়ককে নিজেদের দিকে টেনে নেওয়ায়। মীর জুমলা মুস্তাফার নেতৃত্বে বিক্ষুব্ধ সেনাপতিদের সঙ্গে তলে তলে যোগাযোগ করতে শুরু করলেন। আদিল শাহী বাহিনী আসতে দেরি করায় মুস্তাফাদের ইচ্ছে কুতুব শাহীর সঙ্গে শান্তি চুক্তি করা।
যত দিন যেতে থাকে জিঞ্জির ভাগ্য কি হবে তা নিয়ে কিন্তু ভেতরে ভেতরে যত দিন যায় দুই সুলতানের মধ্যে ঘনিয়ে ওঠা বিরোধ ক্রমশ বাড়তে থাকে। দুই সেনাপতির মধ্যে ‘অন্যান্য দৃষ্টিভঙ্গী বাদ দিয়ে, শুধুই পারস্পরিক বিশ্বাসের ওপর ভর করা’ চুক্তিতে ঠিক হয় জিঞ্জি জয়ের পরে মুস্তাফা খান সেখানই থাকবেন আর মীর জুমলা ফিরে যাবেন গোলকুণ্ডায়। দুজনই প্রকাশ্যে পরস্পরকে সাহায্যের কথা জানালেন। খানইখানান অর্ধেক রাস্তা পিছিয়ে রায়চূড়ে শিবির গাড়লেন। মুস্তাফা জিঞ্জির দিকে এগিয়ে এসে ত্রিণোমাল আর চঙ্গম দুর্গ দখল করলেন। মীর জুমলা জিঞ্জির ৩০ মাইল দূরে ভেলোরের আশ্রিত রাজ্য স্বারিগুন্টার শিবিরে ফিরে গেলেন। এখান থেকে তিনি কুতুব শাহের পক্ষ থেকে এওি অঞ্চলের প্রশাসন চালাচ্ছিলেন।
৩ জিকাদ ১০৫৮/৯ নভেম্বর ১৬৪৮-এ মুস্তাফা খান হঠাত মারা যাওয়ায় সীমান্ত চুক্তি নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে সমস্যা শুরু হল। বাহিনীতে যোগ দেওয়ার নির্দেশ পাওয়ার সময় সেনাপতি খান মহম্মদ নান্দিয়ালে তাদপার্তি দুর্গ দখলের লড়াই করছিলেন। ফলে সাময়িকভাবে কাজ চালানোর জন্যে ভারপ্রাপ্ত সেনাপতি মালিক রাইহানের নেতৃত্বে জিঞ্জিতে আবরোধ শুরু হল। রাইহান সেনাদের ২৫০০ হুন মাইনে দিয়ে অবরোধ আরও জোরদার করলেন। এই সুযোগে মীর জুমলা একাই জিঞ্জি দখলের পরিকল্পনা করলেন। তাঁর ধারণা ছিল মুস্তাফা এবং খারিয়ত খান মারা যাওয়ায় তাদের সেনা বাহিনী ছন্নছাড়া হয়ে রয়েছে, শাহজী নিজে মানসিকভাবে দুমড়ে মুচড়ে রয়েছেন, মালিক রাইহান জিঞ্জি দখলের আগেই তিনি জিঞ্জি দখল নেবেন। মীর জুমলার অভিযানের পরিকল্পনার খবর পেয়ে মালিক রাইহান একটা কড়া বার্তা পাঠালেন, ‘আপনি দুর্গের খুবই কাছে আছেন, তাই আপনার এই কাজ আমাদের স্বার্থ বিরোধী। দুর্গের আধিবাসীরা আপনার কাছে [আক্রমণ নয়] সাহায্য প্রার্থনা করে। আমার মনে হয় আপনি একটু দূরেই অপেক্ষা করুন। আদিল শাহী সেনার নিয়ন্ত্রণ আমার হাতে নেই। যদি কিছু ঘটে যায় তাহলে তার দায়িত্ব আমি নেব না। মুস্তাফা খান হয়ত মারা গিয়েছেন, কিন্তু আমি এখনও জীবিত রয়েছি। আমি শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করে যাব।’ মালিক রাইহানের কঠোর অবস্থানের দরুন গোলযোগ তৈরি না করে আক্রমনের পরিকল্পনা থেকে মীর জুমলা পিছিয়ে গেলেন। তিনি ভেলোরের ৪২ মাইল দূরে আরও উত্তরে কুডাপ্পা জয় করতে গেলেন। খান মহম্মদ সরকারি নির্দেশে তাদপার্তি থেকে অবরোধ জোরদার করতে এলেন।
আপাতত পিছিয়ে গেলেও মীর জুমলা কিন্তু জিঞ্জি দখলের সিদ্ধন্ত থেকে সরলেন না। শুরুর দিকে নায়কেদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে তিনি ১৬৪৬-এর সীমান্ত চুক্তি এবং ১৬৪৮-এর মুস্তাফার সঙ্গে চুক্তি সত্ত্বেও তাদের বিজাপুরের বিরুদ্ধে উস্কাতে শুরু করলেন। বিজাপুরের দরবারি ঐতিহাসিক ঝাউরিইবনঝাউরি লিখছেন, ‘বিশ্বাসঘাতক, দুর্মতি আবদাল্লা, যাকে রয়াল যুদ্ধে হারিয়ে দিয়েছিল, যে বিজাপুরের সমর্থন ছাড়া এক ইঞ্চিও কর্ণাটকের জমিও দখল করতে পারত না, সে অবিশ্বাসীর (রয়াল) সঙ্গে গোপন চুক্তি করে, তার সেনাপতি মীর জুমলার সাহায্যে হিন্দুর সহায়তায় হিন্দু রাজাকে খেপিয়ে জিঞ্জির সুরক্ষা করতে গেল।’ মীর জুমলা বাহিনী নিয়ে খুব দেরিতে এসে পৌছনোয় রাজাকে সাহায্য করতে পারলেন না। ততক্ষণে একদিনের যুদ্ধে খানইখানান জিঞ্জি দখল নিয়েছেন। মীর জুমলা আতঙ্কিত হয়ে, চুক্তি পালন না করে অসম্মানজনকভাবে গোলকুণ্ডার দিকে পালিয়ে গেলেন।
জিঞ্জির পতনের পরেই বিজাপুরী সেনার হাতে তাঞ্জোর আর মাদুরার নায়কেরও পতন হল (১৬৪৯-৫০) এবং তেগনাপত্তনমের মত সমুদ্রের আশেপাশের এলাকাগুলো লুঠ, খুন, অত্যাচারের ঝড় চলল। হিন্দু রাজারা রাজস্ব দিতে প্রতিশ্রুত হল। ডাচ নথি অবলম্বন করে ফস্টার লিখছেন, ‘ভারতের পূর্বাংশে… মুসলমান শক্তি কানাড়িদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলল। বিজাপুরী সেনা, প্রখ্যাত দুর্গ জিঞ্জিকে কেন্দ্রকরে সমগ্র জেলা দখল করল। তেগনাপত্তনমের প্রশাসক করা হল মলয়াকে’। অখুশি রয়াল, মহীশূরের নায়কের আশ্রয়ে থাকতে থাকতে বিজাপুরের সঙ্গে যুদ্ধ প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকলেন। জেসুইট ধর্মপ্রচারকেদের বক্তব্য, ‘আদিল শাহী সেনা দুটি ক্ষমতাশালী রাজাকে হারিয়ে, অভূতপূর্ব পরিমানে সম্পদ দখল করে, একটাও যুদ্ধ না করে, একটাও সৈন্য না খুইয়ে বিশাল দেশটি জয় করে বিজাপুরে ফিরে যায়’।
কুতুব শাহ আদিল শাহকে অভিবাদন জানিয়ে চিঠি লিখলেন। চিঠির সঙ্গে ৪ লাখ হুণ এবং জিঞ্জি পতনের সময় মুঘলদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য চারটি রত্ন উপহারস্বরূপ পাঠালেন। তাঁর প্রস্তাব ছিল কর্ণাট আর মুলুন্দএর জঙ্গল কারোর অধিকারে নেই, সেটি কুতুব শাহ নিজের অধিকারে নিতে চান, যাতে আগামী দিনে শত্রুর আক্রমন থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। আদিল শাহ, কুতুব শাহী প্রস্তাবে রাজি হলেন, গোন্ডিকোটা দুর্গ এবং গোটা কোক্কানুর কুতুব শাহের দখলে দিলেন। যাইহোক, সামগ্রিকভাবে দেখা গেল, চুক্তি ভঙ্গ হতে হতে শেষ পর্যন্ত সীমান্ত চুক্তি সেইটুকু সময়ের জন্য টিকে গেল।
৭। সিধোউত (siddhout বা সিদ্ধবাতম)
১৬৪৮-এ জিঞ্জি আর পরের বছরে তাঞ্জোরের পতনের পর দুই সুলতানি রাজ্য বাকি কিছু হিন্দু রাজ্য দখলের জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে। বিজাপুর দক্ষিণে লড়াই শুরু করল, গোলকুণ্ডা শক্তির সেনাপতি মীর জুমলা উত্তর দিকে নজর দিলেন নতুন করে। বিজাপুর, বিজয়নগরের পশ্চিমের তেলুগু আর পূর্বের তামিল পশ্চাদভাগের অংশটার পাশাপাশি পেনুকোণ্ডা এবং বাসবপত্তনম, বেলোর, জিঞ্জি এবং আর্নি দখলে রেখেছে। মীর জুমলা দখল করতে লাগলেন উত্তরের সিধোউত, গাণ্ডিকোটা, গুটি আর দক্ষিণের উপকূলভাগ। মীর জুমলা কার পরে কোন অঞ্চল দখল করেছেন সেই ক্রম ডাচ, পারসি, তেলুগু, তামিল, ব্রিটিশ পরস্পর বিরোধী সূত্রে বোঝা দুষ্কর। তবুও আমরা তেলুগু সূত্র, সাহিত্যিক এবং লেখমালা আর ভৌগোলিক অঞ্চলের সূত্র তুল্যমূল্য বিচার করে মীর জুমলার বিজয় পথ নির্ধারণ করার চেষ্টা করতে পারি।
মীর জুমলা এর পরে নজর দিলেন কুডাপ্পা জেলার সিধোউত বা সিদ্ধবাতমএ। ১৬৪৬-এ তিনি উদয়গিরি নতুন করে দখল করে চিট্টিভেলির একাংশ কবলে আনলেন। কিন্তু এই জেলারই, বালাঘাট কর্ণাটকের খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ শাসন করছেন কুলাপ্পা জেলার পূর্বাংশের মাতলি সমাজের নায়ক দ্বিতীয় কুমার অনন্তের পালিত পুত্র, অনন্তরাজা দেবছোড়া মহারাজা। তাঁর রাজধানী সিদ্ধবাতম। তেলুগু সূত্রে জানতে পারছি, যুদ্ধে তিনি মীর জুমলার দুই মুসলমান আধিকারিকএর (সর্দার) মাথা কেটে নেন এবং ব্রাহ্মণ বক্সী ত্রিম্বকম রাউ (ত্রিম্বক রাও) পালিয়ে বাঁচেন (শক ১৫৭১ বিকৃতি, ১৬৪৯-৫০)। তবে পরের দিকে যুদ্ধ করে টিকে থাকা যাবে না বুঝে তাঁর কাকা এলামারাজা এবং অন্যান্য আধিকারিকের সঙ্গে আলোচনা করে মহিলা, আত্মীয়স্বজন ইত্যাদি নিয়ে ইক্কেরি বাসবপুরমে পালিয়ে যান (১৬৫০)। অভিজাতশূন্য সিদ্ধবাতমকে মীর জুমলা সেনা ঘাঁটি বানিয়ে ত্রিম্বক রাও শঙ্করজী পন্তকে অঞ্চল শাসনের দায়িত্ব দিলেন।
৮। গাণ্ডিকোটা
আধুনিক মাদ্রাজের কুডাপ্পা আর অনন্তপুর জেলার গাণ্ডিকোটার রাজা ছিলেন তিম্মা নায়ার (তেলুগু সূত্রে প্রেমাসানি চিনা (চিন্না), তিম্মা নায়ডু)। তিনি বিজয়নগরের এবং জিল্লালার রেড্ডিদের করদ রাজা। পেন্নার উপত্যকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা গাণ্ডিকোটা। তাভার্নিয়ে বলেছেন, অঞ্চলটা গোলকুণ্ডার অন্যতম শক্তিশালী প্রতিরক্ষা কাঠামো। কুডাপ্পা জেলার ইয়ারামালাই সমুদ্র তল থেকে পাহাড়ের ওপর ১৬৭০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। শহরটি পাহাড়ের পাদদেশে। দুই সাম্রাজ্যবাদী সুলতানি রণনীতিতেই এই অঞ্চল্টা বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। গোলকুণ্ডা কয়েকবার চেষ্টা করেও গাণ্ডিকোটার রাজাকে দমন করতে পারে নি।
বিজাপুরের ইক্কেরি দখলের সময়ে (১০৪৭/১৬৩৮) খান মহম্মদ, মালিক রাইহান, আলি খুদাবন্দ খান এবং অন্যান্য বিজাপুরী উজির গাণ্ডিকোটা কেল্লা অবরোধ করেন। কিন্তু সাহজী ভোঁসলা আর আসদ খানের বাহিনীকে (১০৫৭/১৬৪৮ সালে) ভিলভুয়ার আর কৃষ্ণা তুপাক্কির নেতৃত্বে রয়ালের বাহিনী হারিয়ে দিলে আদিল শাহের নির্দেশ সেই অবরোধ তুলে নিয়ে মুস্তাফা খানের বাহিনীকে জোরদার করতে যোগ দিতে হয়। আন্দাজ, এই সময় বিজাপুর জিল্লালা দখল নেয় এবং রেড্ডিদের বন্দী করে। রেড্ডিরা পালিয়ে তিম্মা নায়ারের সাহায্যে তাদের রাজ্য আর নান্দিয়ালের দু/তিনটি গ্রাম দখল করে। খান মহম্মদ তিম্মা নায়ারের সঙ্গে চুক্তি করে দখলি গ্রামের জন্য ক্ষতিপূরণ জোগাড় করেন। কিন্তু সীমান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত, বিজাপুরের মনে হচ্ছিল এই এলাকাগুলি তাঁর দখলে আসা দরকার। চুক্তির পরে এর আশেপাশের এলাকাগুলি কুতুব শাহের জন্য ছেড়ে রাখে তারা। এর জন্য কুতুব শাহ বেশ ভাল রকমের ক্ষতিপূরণ দিলেন (১৬৪৯)। (চলবে)