বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষের জন্ম ১৮৭২ সালের ১৫ আগস্ট। তাঁর বাবা ডঃ কৃষ্ণধন ঘোষ এবং মা স্বর্ণলতা দেবী। খুব অল্পবয়সে অরবিন্দ পড়তে যান ভারতবিখ্যাত লোরেটো হাউস দার্জিলিঙে। সে সময় এই স্কুলে প্রধানত পড়াতেন ইওরোপীয় শিক্ষকরা। স্কুলজীবনে অরবিন্দ মূলত ইংরিজি ভাষায় সব শিখেছেন। খুব অল্পবয়স থেকেই ইংল্যান্ডের ইতিহাস পড়তেন। ১৮৮১ সালে ম্যানচেস্টর গ্রামার স্কুলে তাঁর দুই বড়ো ভাই ভর্তি হন। আরবিন্দের বয়স তখন খুবই কম। তিনি গৃহশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে ল্যাটিন, ফরাসি ভাষা শিক্ষা করেন। ইতিহাসও পড়তে শুরু করেন। ১৮৯৯ সালে অরবিন্দ ভর্তি হন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি লন্ডনের কিংস কলেজে পড়াশোনা শুরু করেন। এখান থেকে তিনি আইসিএস পরীক্ষা দেন। তিনি দ্বাদশ স্থান পেয়েছিলেন। কিন্তু ল্যাটিন, গ্রিক ও ইংরিজি ভাষার এই তরুণ পণ্ডিত ঘোড়ায় চড়ার প্রবল অনিচ্ছুক। ফলে ইংরেজ বুরোক্র্যাট হওয়া হলো না। এর কিছু পরে তিনি দেশে ফেরেন এবং বরোদার গায়েকোয়াড় বিশ্ববিদ্যালয়য়ের প্রিন্সিপ্যালের দায়িত্ব নেন।
অরবিন্দের পরবর্তী জীবনে নতুন অধ্যায় সূচিত হলো কলকাতায়। লর্ড কার্জন ১৮৯৯ সালে বড় লাটের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বুয়র যুদ্ধে ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের একটা ছবি তখন শিক্ষিত বাঙালির কাছে স্পষ্ট হচ্ছে। তা ছাড়া ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে সরকারী আওতায় নিয়ে আসার জন্য লর্ড কার্জন অত্যন্ত উদ্ধত বক্তব্য পেশ করলেন। ইংরেজি শিখিয়ে গোলামের দেশকে তাঁরা কৃপাধন্য করছেন, অনেকটা এভাবেই কার্জন বলতে চেয়েছিলেন। ১৯০১-এ কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে এই নিয়ে আলোচনা হয়। ১৯০২ সালে স্বামী বিবেকানন্দের প্রয়াণ। এর পাশাপাশি বাংলায় তখন অনুশীলন সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাল গঙ্গাধর তিলক মহারাষ্ট্রে শিবাজি উৎসব শুরু করলেন। আর কলকাতায় শখারাম গণেশ দেউস্কর এই উৎসব শুরু করে দেন। ১৯০৩ সালে প্রতাপাদিত্য উৎসব শুরু হলো। বাংলায় তখন বীরপূজার যুগ। মল্লযুদ্ধ লাঠিখেলা আয়ত্ত করার যুগ। ১৯০৫ সালে কার্জনের বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলন শুরু হয়ে গেলো। বিপিনচন্দ্র পাল বাংলা ও ইংরেজিতে শুরু করলেন ‘বন্দে মাতরম’ পত্রিকা প্রকাশ। তাঁর আহ্বানে অরবিন্দ ঘোষ ইংরেজি ও বাংলা দুই পত্রিকারই সম্পাদক হলেন। এই সময় বাংলা আয়ত্ত করে তিনি একের পর এক বাংলা লেখা লেখেন, যার মধ্যে একটি ‘ভবানী মন্দির’। ১৯০৭ সালে কংগ্রেসের সেই বিখ্যাত সুরট অধিবেশন, যেখানে নরমপন্থি ও চরমপন্থিদের মধ্যে প্রায় সংঘাত বেধে গেলো। রাসবিহারী ঘোষ, গোখলে, মদন মোহন মালব্য, এঁরা নরমপন্থী, এবং বাল গঙ্গাধর তিলক, লালা লাজপত রায় এঁরা ছিলেন চরমপন্থী। অরবিন্দের নেতৃত্বে বাংলার একদল তরুণ সুরাট কংগ্রেসে যোগ দেন। দেশনেতাদের এই কাণ্ড দেখে এই তরুণরা খুবই হতাশ হলেন। ফিরে এসে আশ্রয় নিলেন আরবিন্দ ঘোষের পৈতৃক মানিকতলার বাগানবাড়িতে।

এই সময় পুলিশের খাতায় অরবিন্দ হয়ে ওঠেন দেশের ভয়ংকরতম ব্যক্তি। তাঁর নাম স্বরাষ্ট্র দফতর সূত্রে জেনে গেলেন বাংলার ছোট লাট এবং ভারতের বড়লাট। তাঁরা অবাক হয়ে ভাবছেন, ল্যাটিন, ফরাসি, ইংরেজি— এইসব ভাষায় পণ্ডিত এক যুবক কিনা লিখছেন, যদি দেখো তোমার মায়ের বুকের উপর চেপে বসে এক দৈত্য বুক চিরে রক্তপান করছে, তুমি কি তখন অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়বে? বন্দে মাতরম পত্রিকার সম্পাদনার সূত্রে, ভবানী মন্দির আন্দোলন সুবাদে অরবিন্দ ঘোষকে তখন পুলিশ প্রায়ই ঘণ্টার পর ঘণ্টা জেরা করে। জেরা শেষ হলে দিনের শেষে বাড়ি ফিরে অরবিন্দ ঘোষ তাঁর প্রিয় খাবার লুচি ও আলু-চচ্চড়ি খান। ফের বন্দে মাতরম পত্রিকার জন্যে ভয়ংকর একটি লেখা লেখেন।
অন্য দিকে মানিকতলার বাগানবাড়িতে তাঁর ভাই বারীন্দ্র ঘোষের নেতৃত্বে চলছে সশস্ত্র যুদ্ধের মহড়া। হেমচন্দ্র কাননগো শিখে এসেছেন বোমা বাঁধার অত্যাধুনিক কৌশল। ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল, ক্ষুদিরাম বসু এবং প্রফুল্ল চাকীর সেই বোমা নিক্ষেপের কথা আজ কিংবদন্তি হয়ে উঠেছে। এর পর সেই বিখ্যাত আলিপুর কোর্টের মামলা, যেখানে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ লড়াই করলেন অরবিন্দ ঘোষের হয়ে। হেমেন, বারীন, উল্লাসকর এবং অন্যান্য বিপ্লবীদের দ্বীপান্তর বা ফাঁসির সাজা হলো। মুক্তি পেয়ে অরবিন্দ ঘোষ চন্দননগরে আত্মগোপন করে ফরাসি যোগাযোগে চলে গেলেন পণ্ডিচেরি। সেখানে শুরু হলো তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনা এবং ভারতীয় দর্শন নিয়ে বিপুল সংখ্যক লেখা। তবে সেটা স্বতন্ত্র আলোচনার বিষয়। তাঁর প্রয়াণ ১৯৫০ সালের ৫ ডিসেম্বর।