প্রশাসনিক ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে ত্রিপুরার বিপ্লব দেব সরকার তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইলে বোঝা গেল তিনি ভয় পেয়েছেন। ১৫ সেপ্টেম্বর ওই রাজ্যের আগরতলায় অভিষেকের পদযাত্রা করার দিনক্ষণ স্থির ছিল। তার মানে হাতে আর মাত্র দু’দিন। আর মাত্র ৪৮ ঘন্টা আগে সেই পদযাত্রার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করল বিপ্লব দেবের পুলিশ। স্বভাবতই এই খবর জানামাত্র হইচই পড়ে গিয়েছে রাজনৈতিক মহলে। তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি বিজেপি ভয় পেয়েই মিছিল করতে দিচ্ছে না।
ত্রিপুরা প্রশাসনের বক্তব্য, ওইদিন একই পথে এবং একই সময়ে অন্য একটি দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি রয়েছে। তার অনুমতি আগে থেকেই নেওয়া হয়েছে। সেই কারণেই তৃণমূলের মিছিলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। কিন্তু ওই দিন আগরতলায় যে প্রতিবাদ মিছিলের আয়োজন করেছিল ত্রিপুরা তৃণমূল কংগ্রেস, নিয়মমাফিক সেই মিছিলের রুট জানিয়ে আবেদনও করা হয়েছিল। সেই অনুযায়ী মিছিলের যাবতীয় প্রস্তুতিও সারা হয়ে গিয়েছে ত্রিপুরা তৃণমূল কংগ্রেস-এর তরফে। তাহলে মিছিলের ২৪ ঘণ্টা আগে ত্রিপুরা পুলিশ আচমকা কেন জানাল, তৃণমূল কংগ্রেসের মিছিলের অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়। পুলিশের তরফে এও জানানো হয়েছে, নির্দেশ অমান্য করলে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, বিজেপি অথবা ত্রিপুরার বিপ্লব দেব সরকার কি রাজনৈতিকভাবে পেরে উঠতে না পেরেই পুলিশ-প্রশাসনকে কাজে লাগালো? কারণ, ত্রিপুরায় তৃণমূল কংগ্রেস লাগাতারভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে ত্রিপুরায় তৃণমূল দল আকারে প্রকারে বাড়তেও শুরু করেছে। তৃণমূল ত্রিপুরায় পার্টি অফিস গড়ারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে বিপ্লব দেবের সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে। তাছাড়া ত্রিপুরায় যে তৃণমূলের শক্তি বাড়াছে তার আভাস বেশ কিছুদিন ধরেই মিলছে। ইতিমধ্যে কংগ্রেস ভেঙে সামনের সারির বেশ কয়েকজন তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। কেবল তাই নয়, বিজেপি ছেড়ে অনেকে যোগ দিয়েছেন তৃণমূলে। এমনকি সিপিএম ছেড়েও একাধিক নেতা-কর্মীরা তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন।

বিজেপির বড় নেতারা এখনও কেউ দল ছেড়ে তৃণমূলে না এলেও অনেক বিধায়ক তৃণমূলে যোগ দেওয়ার জন্য মুখিয়ে রয়েছেন। কিছুদিন আগে সুদীপ রায় বর্মনের নেতৃত্বে বিজেপির একাংশ কলকাতায় এসেছিলেন। তারা তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন বলেও খবর। ওই ঘটনার পর থেকে বিশেষ করে ১৫ সেপ্টেম্বর অভিষেকের মিছিল ঘোষণার পর থেকেই জোর জল্পনা— তবে কি এবার সুদীপ অনুগামী বিধায়করা অভিষেকের সভায় তৃণমূলের পতাকা হাতে তুলে নিচ্ছেন? সুদীপ রায় বর্মনের পাশাপাশি তাঁর অনুগামী বিজেপি বিধায়কদের মধ্যে অনেকের নামই এখন ত্রিপুরার বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। এদের মধ্যে রয়েছেন সুরমার বিধায়ক আশিস দাস, বরদোয়ালির বিধায়ক আশিস সাহা, ওম্পির বিধায়ক বুর্বুমোহন ত্রিপুরা ও ঊনোকোটি জেলার বিধায়ক দিবাচন্দ্র রাঙ্খেল।
এই পরিস্থিতিতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বা তৃণমূল কংগ্রেসের পদযাত্রাকে বিপ্লব দেব যে সহজভাবে মেনে নেবেন না এটা তো খুব সাধারণ ব্যাপার। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ত্রিপুরায় পা দেওয়ার দিন থেকেই উত্তর-পূর্বের এই রাজ্য রাজনীতির আঙিনায় আরও উত্তপ্ত হয়েছে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে ত্রিপুরায় ক্ষমতা দখলের লড়াই নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে পারদ ক্রমেই চড়ছে। সময় এখনও অনেক বাকি কিন্তু তা সত্বেও তৃণমূল ত্রিপুরায় ঘাঁটি গড়তে মরিয়া। গত দু-মাসে অভিষেকের এই নিয়ে তৃতীয় বার ত্রিপুরা যাওয়ার কথা ছিল। মূলত, বিপ্লব দেব সরকারকে ২০২৪-এর লোকসভা ভোটের আগে উত্খাতের ডাক দিয়েছেন তিনি। তাই মিছিল যাতে না করা যায় তার জন্যই বিপ্লব পুলিশ প্রশাসনকে কাজে লাগিয়েছেন।
এই ঘটনা প্রমাণ করে বিজেপি ত্রিপুরায় তৃণমূলের উত্থানকে ভয় পেয়েছে। ত্রিপুরাবাসীর মধ্যে ইতিমধ্যেই ১৫ সেপ্টেম্বরের পদযাত্রা ঘিরে একটা উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। সেই আঁচ অনুভব করেই বিজেপি পুলিশ প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে পদযাত্রার অনুমতি খারিজ করেছে। প্রসঙ্গত, ২০২৩-এর ত্রিপুরার বিধানসভা ভোটকে পাখির চোখ করে এগোচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস। ত্রিপুরা গিয়ে ত্রিপুরেশ্বরী মন্দিরে পুজো দিয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। বিজেপির নেতৃত্বে আগরতলায় তাঁর গাড়িতে হামলার অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি ইডির ডাকে সাড়া দিতে দিল্লি গিয়েছিলেন অভিষেক। সেই সময় বিজেপির বিরুদ্ধে আরও বড়সড় আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়ে আসেন তৃণমূল সাংসদ। যে রাজ্যেই বিজেপির সরকার, সেখানেই গণতন্ত্র ফেরাতে তৃণমূল যাবে- এমন হুঙ্কার ছেড়েছিলেন তিনি।তারপর কলকাতা ফিরতেই ঘোষিত হয় তাঁর ত্রিপুরা সূচি। আর সেই সূচিতেই বিপ্লব দেব সরকারের পুলিশের ঘোরতর আপত্তি। কারণ তৃণমূলকে রুখতে হবে।