অনেক দিন করোনা সংক্রমণের গ্রাফ নিম্নগামী হবার পর সপ্তাহখানেক ধরে তা আবার ঊর্ধ্বমুখী। রাজ্যের মন্ত্রী তথা মেয়র ফিরহাদ হাকিম এই সম্বন্ধে জানান, ‘পুরসভা সবরকম চেষ্টা করবে। তবে আমজনতা একটু সচেতন হলে পরিস্থিতির মোকাবিলা করা সহজ হবে।’ বিশেষজ্ঞদের মতে করোনা সংক্রমণ বাড়ছে উত্তরের তুলনায় দক্ষিণ কলকাতায় এবং এঁদের অধিকাংশই উপসর্গহীন। ১৪ জুন মঙ্গলবারের স্বাস্থ্য বিভাগের হিসেব অনুসারে আক্রান্তদের মধ্যে দক্ষিণ কলকাতার বাসিন্দা ৫৫ শতাংশ। সমগ্র কলকাতায় উপসর্গহীন করোনা রোগী ৮৭ শতাংশ। পজিটিভিটি রেট ৫.৮৭ শতাংশ। এর মধ্যে ২০ থেকে ৫৫ বছর বয়সীদের সংখ্যা ৬০ শতাংশ। রাজ্যের সংক্রমণ বেশি কলকাতাতেই। তবে পাইকপাড়া, টালা, মানিকতলা ও উল্টোডাঙায় আক্রান্তের সংখ্যা কম। যেহেতু আক্রন্তদের মধ্যে বড় অংশ উপসর্গহীন, তাই টেস্ট বাড়িয়ে তাঁদের চিহ্নিত করতে চাইছে কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগ। জোর দেওয়া হচ্ছে মাস্ক ব্যবহারের ওপর।

কলকাতা পুরসভা কলকাতা শহরে রাজ্যের জনস্বাস্থ্য বিষয়ক পরিষেবার মূল কেন্দ্র। ২০২০ সালে কোভিড সংক্রমণের বিশ্বব্যাপী অতিমারির সময় থেকেই পৌর স্বাস্থ্য বিভাগ পুরসভার স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে কোভিড-কেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনায় সমৃদ্ধ করে তুলেছে। প্রয়োজনীয় রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা, রোগীকে অনুসন্ধান করা এবং তাঁর অসুখের গতিপ্রকৃতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নাগরিকদের স্বাস্থ্যের সুরক্ষা দেওয়াই পুরসভার স্বাস্থ্য বিভাগের মূল লক্ষ্য ছিল এবং এখনও আছে। কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় বেশি সংখ্যক কোভিড রোগী পেলে ‘কনটেনমেন্ট’ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় সংক্রমণকে প্রতিরোধ করতে কলকাতা পুরসভা সতত সজাগ ও সচেষ্ট আছে। মাইকো-কনটেনমেন্ট অঞ্চল চিহ্নিত করে কোভিড আক্রান্তদের সুস্থ লোকদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখারও ব্যবস্থা অতীতে করা হয়েছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে আবারও তা করা হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জনস্থাস্থ্যের মূল কথা নলেজ, অ্যাটিটিউড ও প্র্যাকটিসের পরিবর্তন। অর্থাৎ আরও ভালোভাবে কোভিডকে জানা, কোভিড নিয়ন্ত্রণে পজিটিভ দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা ও নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে কোভিডকে প্রতিহত করা। একসময় কলকাতায় আক্রান্তের সংখ্যা দৈনিক চার হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আবার একসময় তা শূন্যতেও নেমে আসে। যখন করোনা বেড়েছিল সেইসময় কোভিড বিমুক্ত আচরণের গুরুত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। যথাযথ ভাবে মাস্ক পরা ও টিকাকরণের কথা বলা হয়েছিল। এখনও তা বলা হচ্ছে।
কলকাতা পুরসভার স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান উপদেষ্টা তপনকুমার মুখোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, “দুটি ডোজ নেবার পরেও কেউ সংক্রমিত হলে সেক্ষেত্রে চিকিৎসাশাস্ত্রের পরিভাষায় বলা হয় ‘ব্রেক থ্রু’ ইনফেকশন। এর মানে ভ্যাকসিনেশন হওয়া ব্যক্তির সংক্রমণ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তৈরি হয়েছে। এই কারণেই তিনি আবার আক্রান্ত হচ্ছেন। এই ধরনের সংক্রমণ উপসর্গবিহীন বা অল্প উপসর্গ যুক্ত হয়ে থাকে। শুধু কোভিড নয়, যে কোন ভ্যাকসিন থেকেই ‘ব্রেক থ্রু’ ইনফেকশন হতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞ মহলের মত, কোনো ভ্যাকসিন ১০০ শতাংশ সুরক্ষা দিতে পারে না। এক্ষেত্রে আর একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, ‘ইমিউনো জেনিসিটি’ বা সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক ক্ষমতার বিষয়টি আর ‘প্রোটেকটিভ ইমিউনিটি’ অর্থাৎ সংক্রমণ থেকে কতটা সুরক্ষা পাওয়া যাবে — এই দুটি বিষয় কিন্তু এক নয়। ‘ইমিউনো জেনিসিটি’ মানে ব্যক্তির শরীরে সংক্রমণ প্রতিরোধের ব্যবস্থা। একে ‘রেসপন্স’ ও বলা হয়। তবে এটি উক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রোটেকটিভ না-ও হতে পারে। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি ভ্যাকসিন নিলেও সম্পূর্ণ সুরক্ষিত না-ও থাকতে পারেন। এইসব বিষয়কে মনে রেখেই আমরা (চিকিৎসক) বলে থাকি ভ্যাকসিন মানুষকে সুরক্ষা দিতে পারে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয়তো আংশিক সুরক্ষা দিতে পারে, কিন্তু করোনার বিধি-নিষেধ মানা সব সময় জরুরি।’

কোভিড নিয়ন্ত্রণে কলকাতা পুরসভা সবসময়ই নাগরিকদের পাশে ও নাগরিকদের সঙ্গে আছে — মত ফিরহাদ হাকিমের। তিনি আরও জানান, হঠাৎ সাইক্লোনের মতো ২০২০ সালের একেবারে প্রথমদিকে করোনার হানা শুরু হয়। সমস্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপরে অভূতপূর্ব চাপ সৃষ্টি হয় করোনাকে কেন্দ্র করে। কোভিড সংক্রমণের আর একটি বৈশিষ্ট্য হলো এটি একেবারে নতুন সংক্রমণ। যার ফলে এটি সম্পর্কে আমাদের কিছুই জানা ছিল না। ধীরে ধীরে অসুখটি চিহ্নিত করবার মতো পরীক্ষা বা ল্যাবরেটরি টেস্ট, নানা ওষুদের প্রয়োগ করতে করতে দু-একটি ওষুধে কিছুটা সুফল এবং সর্বশেষে টিকা বা ভ্যাকসিন আমাদের হাতে এসেছে। ২০২০-২১ সালে করোনাকে কেন্দ্র করে এই যে কঠিন ও অবিশ্বাস্য লড়াই, সেই সংগ্রামের কোনো পর্যায়েই কলকাতা পুরসভা পিছিয়ে থাকেনি। সংক্রমণের ভয় থাকা সত্ত্বেও কলকাতা পুরসভার কর্মীরা রোগীদের ল্যাবরেটরি টেস্ট করা, জ্বর ইত্যাদি উপসর্গ নিয়ে এলে তাঁদের চিকিৎসার বন্দোবস্ত করা, ভ্যাকসিন হাতে আসার পরে অসংখ্য মানুষকে টিকা দেওয়া ইত্যাদি কাজ চালিয়েছেন নিরলস ভাবে।’ অতীতে কোভিড শূন্য কলকাতা গড়ে তুলতে ফিরহাদ হাকিম বারবার ডাক দিয়েছেন, এবং তা করেও দেখিয়েছেন। তাই এই পুরবোর্ডের ওপর আস্থা রাখাই যায়। তবে এ কথা ভুললে চলবে না মানুষের সচেতনতার ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল করোনার গ্রাফ।