৯ ডিসেম্বর, ১৯৪৬। ভারতের সংবিধান সভার (কন্সটিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলি) প্রথম অধিবেশন বসে। বাংলা থেকে প্রথম শপথ নিলেন শরৎচন্দ্র বসু, সুভাষ চন্দ্রের দাদা। দ্বিতীয় যিনি শপথ নেন তিনি হলেন বি আর আম্বেদকর। বাংলা থেকে অন্যান্য যে বিশিষ্ট সদস্যরা শপথ নিয়েছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন ফ্র্যাঙ্ক রেজিনাল্ড অ্যান্টনি, প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ, কমিউনিস্ট পার্টির সোমনাথ লাহিড়ী এবং নির্দল শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। আম্বেদকর ছিলেন যশোহর-খুলনা কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত সদস্য। দেশভাগের পর যশোহর-খুলনা পাকিস্তান সংবিধান সভার অন্তর্ভুক্ত হলে আম্বেদকর এর সদস্যপদ লুপ্ত হয়। এরপর নানা রাজনৈতিক ঘাতপ্রতিঘাত পেরিয়ে তিনি ১৯৪৭ এর জুলাই মাসে বোম্বে আইনসভা থেকে পুনরায় কংগ্রেস-এর সমর্থনে সংবিধান সভার সদস্য হন। সে অন্য কাহিনী।
আম্বেদকর প্রথম বাংলা থেকেই সংবিধান সভায় নির্বাচিত হয়েছিলেন কিনা সে নিয়ে বিতর্ক হয়েছে লোকসভাতেও। ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে লোকসভায় আম্বেদকরের বাংলা যোগ নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন তৃণমূল ও বিজেপি সদস্য সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় ও এস এস আলুওয়ালিয়া। এই বিতর্কে শেষ পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করতে হয় অপর সাংসদ ঐতিহাসিক সুগত বসুকে। মধ্যপ্রদেশে জন্মগ্রহণ করলেও এবং বোম্বেতে রাজনৈতিক জীবন অতিবাহিত করলেও এই দুটি প্রদেশ-এর কংগ্রেস কমিটি আম্বেদকরকে মনোনয়ন দেয়নি। ফলে তাঁর সংবিধান সভায় যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়।
এই সময় বাংলার তপশিলী নেতা যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল-এর সক্রিয় সহায়তায় আম্বেদকর বাংলা আইনসভার তপশিলি সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংবিধান সভায় যান। ইতিহাস এই ঘটনা সম্পর্কে নীরব। এই নীরবতা প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসের। আম্বেদকরের জীবনীকাররাও এ সম্পর্কে আলোকপাত করতে দ্বিধা বোধ করেন। অবিভক্ত বাংলার কয়েকজন তপশিলি বিধায়ক (এম এল এ) যদি যোগেন্দ্রনাথের উদ্যোগে তাঁকে বাংলার আইনসভা থেকে নির্বাচিত করে সবিধান সভায় না পাঠাতেন, তা হলে হয়তো আমরা ‘সংবিধানের রূপকার’ হিসেবে আম্বেদকরকে চিনতাম না।
তখনকার বোম্বাই আম্বেদকরের রাজনীতির মূল কর্মক্ষেত্র হলেও, কেন তাঁকে বাংলা থেকে সংবিধান সভায় যেতে হল? ১৯৩৫ এর ভারত শাসন আইন অনুযায়ী ১৯৪৬-এ দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচনে বোম্বাই প্রদেশ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি পরাজিত হন। সারা ভারতে তাঁর দল তপশিলি ফেডারেশন একটি মাত্র আসন পায় বাংলায়। পূর্ববাংলার বাখরগঞ্জ দক্ষিন (সংরক্ষিত) আসনে জেতেন যোগেন্দ্রনাথ। ‘বরিশালের যোগেন মন্ডল’ নামেই তিনি সমধিক পরিচিত ছিলেন।
এই নির্বাচনে স্বাধীন ভারতের সংবিধান রচনার জন্য সংবিধান সভা গঠনের কথা বলা ছিল। প্রাদেশিক আইনসভার সদস্যরাই সংবিধান সভার সদস্যদের নির্বাচিত করার অধিকার পান। কিন্তু আম্বেদকরের দল বোম্বাই আইনসভায় শোচনীয় ফল করায় এবং তিনি স্বয়ং পরাজিত হওয়ায় তাঁর সংবিধান সভায় যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়। দলিত প্রশ্নে কংগ্রেসের সঙ্গে মতপার্থক্যের কারনেই তিনি কংগ্রেসের সমর্থন পাননি।
কি করবেন তিনি? তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যত প্রশ্নের সামনে। দলিত ও পিছিয়ে পড়া শ্রেণির কথা বলার কেউ নেই সংবিধান সভায়! তিনি চাইলেন বাংলার ইউরোপীয় বিধায়কদের সাহায্যে ভোটে জিততে। তখন দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ইউরোপীয় সদস্য ছিল বাংলায়। কিন্তু ইউরোপীয় সদস্যরা ভোটদানে বিরত থাকায় তিনি আতান্তরে পড়েন। তিনি জানতেন তপশিলি কংগ্রেস বিধায়করা দলের নির্দেশ অমান্য করে তাঁকে ভোট দেবেন না। হতাশ আম্বেদকরকে যোগেন্দ্রনাথ প্রতিশ্রুতি দেন, যে ভাবেই হোক বাংলা থেকে তিনি আম্বেদকরকে সংবিধান সভায় পাঠাবেন।
১৯৪৬ সালের নির্বাচনে বাংলার আইনসভার ৩০ টি সংরক্ষিত আসনের ২৬ টি দখল করে কংগ্রেস। মাত্র তিনটি আসন পান নির্দলরা। এর মধ্যে প্রমথরঞ্জন ঠাকুর (পি আর ঠাকুর নামে সমধিক পরিচিত) কংগ্রেসের সমর্থনে সংবিধান সভার প্রার্থী হলে নির্দল এর সংখ্যা দাঁড়ায় দুই জন। এঁরা হলেন নগেন্দ্র নারায়ণ রায় ও মুকুন্দবিহারী মল্লিক। এই অবস্থায় তপশিলি ফেডারেশনের একমাত্র বিধায়ক যোগেন্দ্রনাথ-এর পক্ষে আম্বেদকরকে জিতিয়ে আনা ছিল একেবারেই অসম্ভব।
সংবিধান সভার নির্বাচনের তারিখ ছিল ১৮ জুলাই। আম্বেদকরের পক্ষে প্রস্তাবক যোগেন্দ্রনাথ থাকলেও, সমর্থক হবেন কে? শেষ পর্যন্ত রংপুরের বিধায়ক নগেন্দ্র নারায়ণ রায় অসুস্থ অবস্থায় কলকাতায় এসে মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর করলে প্রার্থী হতে আম্বেদকরের আর কোন বাধা রইলনা। তিনি যশোহর-খুলনা সংরক্ষিত আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামেন। ইতিমধ্যে মুকুন্দবিহারী মল্লিক ও টাঙ্গাইলের গয়ানাথ বিশ্বাস আম্বেদকরকে সমর্থনের কথা জানান। ১৯ জুলাই ফলাফল ঘোষিত হতে দেখা যায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভোট পেয়ে আম্বেদকর বাংলা থেকে সংবিধান সভায় নির্বাচিত হয়েছেন।
আধুনিক ভারতের ভোট যুদ্ধের ইতিহাসে যে রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা সে সময় দেশকে আলোড়িত করেছিল কজন আমরা সে খোঁজ রাখি! পরবর্তী সময়ে কংগ্রেসের মনোনয়নে সংবিধান সভায় গেলেও বাংলার মানুষ যদি তখন তাঁর পাশে না দাঁড়াতেন তাহলে সংবিধানের রূপকার বাবা সাহেব আম্বেদকরকে আমরা নাও পেতে পারতাম।
very nice