ভারতের সংবিধানের খসড়া রচনার জন্য গঠিত কমিটির সভাপতি হয়েছিলেন বাবাসাহেব আম্বেদকর। এটা তাঁর সারা জীবনের সংগ্রামের একটা স্বীকৃতি। পাশাপাশি গান্ধি, নেহরু, প্যাটেলদের যে বিরাট আস্থা ও ভরসা ছিল বাবাসাহেবের উপর, বাধ্য কংগ্রেসি না হলেও তাঁর দেশপ্রেম যে নিখাদ ছিল, সেই মনোভাবটির প্রতিফলন ঘটেছিল আম্বেদকরকে সংবিধানের খসড়া রচনা কমিটির সভাপতি হিসেবে নিয়োগ করায়। সাত সদস্যের কমিটিতে বাবাসাহেব ছাড়াও ছিলেন মুন্সি, মহম্মদ সাদুল্লা, আল্লাদি কৃষ্ণস্বামী আইয়ার, এন গোপালাস্বামী আয়েঙ্গার, খৈতান এবং মিটার। বাবাসাহেব বাদে এই ছ’জন সদস্যের অবদান কতটা? সংবিধান-সভার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য টি টি কৃষ্ণমাচারি ওই সভায় এক বক্তৃতায় বলেছিলেন,
“মাননীয় সভাপতি মহাশয়,
এই সভার যেসব সদস্যগণ ড. আম্বেদকরের ভাষণগুলি খুব মনোযোগের সঙ্গে শুনেছেন, আমি তাঁদের একজন। আমি জানি এই সংবিধান রচনা করতে গিয়ে কী বিপুল পরিশ্রম এবং উদ্যোগ তাঁকে নিতে হয়েছিল। আমাদের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ এই সংবিধান রচনার জন্য বিশাল মনোযোগ দরকার হয়েছে; কিন্তু সংবিধান রচনার জন্য নিযুক্ত কমিটি এই খসড়া সংবিধান আমাদের হাতে তুলে দেয়নি। এই সভা নিশ্চয়ই জানে, যে সাত সদস্যকে আপনারা নিয়োগ করেছিলেন, তাঁদের একজন পদত্যাগ করেছিলেন এবং তাঁর বদলে অবশ্য অন্য একজনকে নেওয়া হয়েছিল। একজনের প্রয়াণ হয়, তাঁর জায়গায় অন্য সদস্য নেওয়া হয়নি। একজন সদস্য আমেরিকাতে থেকেছেন, তাঁর বদলেও অন্য সদস্য নেওয়া হয়নি। আরেকজন সদস্য সরকার পরিচালনার কাজে ব্যস্ত থেকেছেন, সেই কাজ করে সংবিধান রচনায় তাঁর সময় দেওয়া তেমন একটা সম্ভব হয়নি। এক বা দু’জন দিল্লি থেকে অনেকটা দূরে বসবাস করতেন এবং তাঁদের শারীরিক পরিস্থিতি কাজ করার উপযুক্ত ছিল না। সুতরাং শেষ পর্যন্ত এই সংবিধান রচনার কাজ ড. আম্বেদকরের উপরেই বর্তেছিল এবং আমরা কৃতজ্ঞ যে এই কাজটি তিনি এমন ভাবে সম্পন্ন করেছেন, যা প্রশংসার দাবি রাখে।“

টি টি কৃষ্ণমাচারির উপরের কথাগুলি পড়লেই বোঝা যায়, প্রায় একক ভাবে একটি প্রাথমিক খসড়া থেকে আম্বেদকর আজকের ভারতীয় সংবিধানকে রূপ দিয়েছিলেন। এই সংবিধান রচনা করতে পেরে যথেষ্ট সন্তুষ্ট ছিলেন আম্বেদকর। তবে লিখিত সংবিধানকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে গিয়ে যে বহু বাধাবিপত্তির সামনে পড়তে হবে, সেটা সম্পর্কেও সচেতন ছিলেন বাবাসাহেব। তিনি বলেছিলেন,— এই সংবিধানের মাধ্যমে “রাজনীতিতে আমরা সাম্য পেলেও সামাজিক ও আর্থিক ক্ষেত্রে অসাম্য থেকে যাবে। …এই দ্বন্দ্বকে যত দ্রুত সম্ভব দূর করতে হবে; অন্যথায় অসাম্যের শিকার ভারতবাসীরা রাজনৈতিক গণতন্ত্রের কাঠামোকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে, যে রাজনৈতিক গণতন্ত্রের কাঠামোকে এত পরিশ্রম করে আমরা গড়ে তুলেছি।“
আজ, ২০২২ সালের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে ভারতবাসীর প্রশ্ন, সামাজিক ও আর্থিক বৈষম্য কি কমাতে পেরেছি আমরা? দীর্ঘ কংগ্রেস শাসনের আমলে সামাজিক বৈষম্য খানিকটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বেড়ে গিয়েছিল আর্থিক বৈষম্য। আর মোদি সরকারের আমলে? হিন্দুত্ববাদের সাঁড়াশি আক্রমণে একদিকে যেমন দলিত ও নিম্নবর্ণের উপর হামলা অত্যাচার বহুগুণে বেড়ে গেছে, তেমনই আকাশচুম্বী হয়েছে অর্থনৈতিক বৈষম্য। আরও দুশ্চিন্তার ব্যাপার হলো, তীব্র সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা প্রায় দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়েছেন। ঐক্যবদ্ধ ভারতের আদর্শ বুকে নিয়ে ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি যে ভারতের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ সম্পূর্ণ অন্য পথে চলতে শুরু করেছে। এই প্রবন্ধ লেখার সময়ে দেশের নানা অংশ থেকে উদ্বেগজনক খবর পাওয়া যাচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, সাম্প্রদায়িক বারুদের উপর ক্রমশ দাঁড়াচ্ছে ভারত। বিজেপি এই সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাতেই ভোটের অঙ্ক কষছে। মানুষের চেতনা কী আজ সেই জায়গায় রয়েছে যে বিজেপির এই হিসেব চুরমার করে দেবে? হয়তো ধর্মনিরপেক্ষতার নেহরুবাদী আদর্শ এই প্রজন্মে শক্ত ভিত পাচ্ছে না এখনও। দেশ জুড়ে ধর্মের নামে নানা গোষ্ঠীগুলি যদি হিংসায় উন্মত্ত হয়ে ওঠে, ভারতের ভৌগলিক তথা আত্মিক অখণ্ডতা যে অচিরকালের মধ্যেই নষ্ট হতে থাকবে, সে বিষয়ে সন্দেহ আছে কি?

ঠিক এই জায়গাটাতেই আম্বেদকর আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। উপরের উদ্ধৃতিটি খেয়াল করুন, প্রিয় পাঠক। তিনি যা বলেছিলেন, তার সোজা অর্থ এই যে সামাজিক ও আর্থিক বৈষম্য কমাও, নইলে রাজনৈতিক সাম্য বা গণতন্ত্রও বিপদে পড়বে। আজ যখন দেখি, দেশের বড় অংশে জাত-পাতের নামে ভোট হয়, যখন দেখি, অসহায় কর্মহীন যুব বয়সিরা ধর্মের নামে উন্মত্তের মতো আচরণ করছে, একটা উগ্র নেশার মতো, তখন মনে হয়, ওই ছেলেটির যদি নিয়মিত কর্মসংস্থান হতো, তাহলে হয়তো সে এই উগ্রতায় ভিড়ত না। সংবিধান ভিত্তিক গণতান্ত্রিক ভারত সম্পর্কে আম্বেদকরের মনোভাব ছিল, হয় বৈষম্য কমাও, অথবা ধ্বংস ডেকে আনো। কংগ্রেস বৈষম্য কমাবার রাস্তা খুঁজে পায়নি, বৈষম্য, কর্মহীনতা বাড়িয়েছে, এবার সেটারই সুযোগ নিচ্ছে হিন্দুত্ববাদীরা। বিপন্ন হয়ে পড়ছে গণতন্ত্র, সংবিধানও।

নেহরু-আম্বেদকরের সংবিধান চিন্তার মূল দিকদর্শন কী? তা হলো ব্যক্তির অধিকার মেনে নেওয়া। সামন্ততান্ত্রিক ভারতে তা কখনও মানা হয়নি। ব্রিটিশ শাসনে তো নয়ই। স্বাধীন দেশে ব্যক্তি নাগরিকের বিধিবদ্ধ অধিকার থাকবে, যার মূল কথাগুলি সংবিধানে লিখিত আকারে নিরাপদ থাকবে, এটাই সামাজিক ক্ষেত্রে অন্যতম মূল দিকনির্দেশ। ব্যক্তির অধিকার মানে তার সামাজিক ও আর্থিক অধিকার। মুক্ত মানুষের স্বাধীনতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং ব্যক্তি মানুষ হিসেবে মর্যাদা ভারতের সংবিধানের হৃৎপিণ্ড। একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যাবে, এই বিষয়গুলির প্রত্যেকটিই বিপন্ন। আমরা শুধু একটি বিষয় নিয়ে একটু খুঁটিয়ে দেখতে পারি, সেটা হলো ভ্রাতৃত্ববোধ সংক্রান্ত ধারণা।
ভ্রাতৃত্ববোধের ধারণা, আম্বেদকর ও নেহেরু
মনে রাখা দরকার, স্বাধীন ভারতে প্রথম আইন ও বিচার বিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন বাবাসাহেব আম্বেদকর। ১৯৪৭ সালে ক্ষমতা হস্তান্তর হওয়ার মুহূর্তে জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বে প্রথম ভারতীয় মন্ত্রীসভা দায়িত্ব গ্রহণ করে। রাষ্ট্রপতি হন রাজেন্দ্র প্রসাদ, যদিও তখনও গভর্নর জেনারেল হিসেবে কাজ চালিয়ে যান মাউন্টব্যাটেন। নেহরু আম্বেদকরকে বেছে নেন আইন ও বিচার বিভাগের মন্ত্রী হিসেবে। স্বাধীনতা প্রাপ্তির দিনটি থেকে ১৯৫১ সালের ৬ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি মন্ত্রী ছিলেন। মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশিই বাবাসাহেব প্রায় একক চেষ্টায় সংবিধানের খসড়া রচনা করেন ১৯৪৭-৪৯ সময়পর্বে। প্রসঙ্গত, এর আগে আম্বেদকর ব্রিটিশ রাজত্বের সময়ও মন্ত্রী ছিলেন, সেটাকে বলা হতো ভাইসরয়-এর এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল। এই কাউন্সিলে তিনি শ্রমমন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছেন ১৯৪২ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত।

মন্ত্রী থাকাকালীন নেহেরুর সঙ্গে আম্বেদকরের নানা বিষয়ে মতান্তর হতো। অন্যতম একটি বিষয় ছিল সমতার প্রশ্নটি। আম্বেদকরের মতে, নেহরু বেশি গুরুত্ব দিতেন আর্থিক অসাম্য তথা দুর্দশা দূর করার দিকটিতে। আম্বেদকর মনে করতেন, সেটা যথেষ্ট নয়। সামাজিক অসাম্য তথা জাত-পাত প্রথাকে সরাসরি আক্রমণ না করলে এমনি এমনি তা চলে যাবে না। অন্য দিকে নেহরু মনে করতেন, আর্থিক দুর্দশা ঘুচলে ধীরে ধীরে জাত-পাত প্রথা দুর্বল হয়ে পড়বে। প্রসঙ্গত, কমিউনিস্টরাও এভাবেই চিন্তা করতেন বা আজও করেন। আজকে পিছু ফিরে তাকালে কী দেখি? আর্থিক অসাম্য তো কমেই-নি, ৮০-র দশক থেকে জাত-ভিত্তিক রাজনীতির উত্থানে কংগ্রেস ও কমিউনিস্টরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সবথেকে বেশি। প্রথমে এসেছে জাত-ভিত্তিক রাজনীতির জোয়ার, তার পরে, তারই হাত ধরে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বাড়বাড়ন্ত। নেহরুবাদ তথা কমিউনিস্টদের দূরদৃষ্টির অভাবের জন্যই ভারত আজকের বিপদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এখানেই আম্বেদকরের প্রাসঙ্গিকতা।
ভ্রাতৃত্ববোধ এমনই একটা বিষয়, যার সঙ্গে সমঝোতা চলে না। সারা বিশ্বের ইতিহাসে আমরা দেখেছি, মানুষের প্রতি মানুষের সহানুভূতি যদি জাত-পাত, ধর্ম-সম্প্রদায়কে অতিক্রম না করতে পারে, সমঝোতা করতে শুরু করে, তবে অচিরকালের মধ্যেই দক্ষিণপন্থা গেড়ে বসে। কিন্তু আম্বেদকরের সতর্কবাণীকে সেকালে তেমন আমল দেওয়া হয়নি। আর আজকের বিজেপি তো মনুবাদ, বর্ণপ্রথা, নারীর অধিকার হরণের মতো সমস্ত পশ্চাৎপদতার প্রতিভূ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নইলে কী আজ দেখতে হয়, দেশ জুড়ে বিশাল বিশাল হনুমানের মূর্তি স্থাপন করছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী? (চলবে)