ভারতের গণতন্ত্র কতটা মজবুত হতে পারে? সদ্য স্বাধীন দেশে এই প্রশ্ন নিয়ে ভেবেছিলেন চিন্তানায়ক দেশনেতারা। নেহরু ও তাঁর সমধর্মী চিন্তকরা মনে করতেন, দ্রুত দেশের আর্থিক পরিকাঠামো উন্নত করতে হবে, কর্মসংস্থান করতে হবে কোটি কোটি মানুষের, গরিব মানুষের রোজগার বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সংবিধান স্বীকৃত নাগরিক অধিকার তথা রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা গেলে জোরদার ভিত্তি পাবে ভারতীয় গণতন্ত্র। স্বাধীন ভারতে গোড়ার দিকে কমিউনিস্টরা অবশ্য এই স্বাধীনতাকে মেকি স্বাধীনতা বলেই মনে করতেন। তারা অনেকেই ভাবছিলেন, আসলে ব্রিটিশদের শাসনই চলছে, বকলমে। একটা কারণ হলো, ১৯৪৭ সালে আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা এলেও ভারত রয়ে গেল ব্রিটিশ রাজের ডোমিনিয়ন হিসেবে। মাউন্টব্যাটেন থেকে গেলেন গভর্নর জেনারেল। এটা ছাড়া দাঙ্গা দীর্ণ সেই সময়ে অন্য কোনো পথ ছিল না, এটা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলেন তৎকালীন কমিউনিস্ট দলের সাধারণ সম্পাদক বি টি রণদিভে ও তাঁর সমর্থকরা। তাই তাঁরা আওয়াজ তুলেছিলেন, ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়’। কিন্তু আমজনতা স্বাধীনতাকে বিশ্বাস করছিলেন, এমনকী ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি গান্ধি হত্যার পরেও। তাই কমিউনিস্টদের কথা জনতা মানেনি। অবশ্য কমিউনিস্ট দলের অনেক বড় নেতাই ওসব মানেননি, যেমন জ্যোতি বসু। যাই হোক, কংগ্রেস ও কমিউনিস্টদের এসব ভাবনার পাশাপাশি ছিল অন্য ধরনের ভাবনাও।

হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ছিল, কিন্তু তেমন জমি পায়নি তখন। আর ছিল আম্বেদকরের ভাবনা। নেহরুর প্রথম মন্ত্রীসভায় কয়েক বছর কাজ করলেও ১৯৫১ সালে ইস্তফা দেন। ওই বছরের ১০ অক্টোবর সংসদে দীর্ঘ বক্তৃতায় আম্বেদকর তাঁর পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করেছিলেন। তিনি অন্যান্য প্রসঙ্গে যা যা বলেছিলেন, তার পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি তর্ক থাকতে পারে, কিন্তু তপশিলি জাতিভুক্ত মানুষদের জন্য সরকার যে কিছুই করেনি, এই অভিযোগ উড়িয়ে দেবার যো ছিল না। তিনি তথ্য দিয়ে দেখিয়েছিলেন, যতটুকু করবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার প্রায় কিছুই করা হয়নি। নেহরু অবশ্য খুবই চটেছিলেন আম্বেদকরের এহেন ব্যবহারে, এমনই মনে করা হয়। পরে আর কখনও কংগ্রেসের সমর্থন আম্বেদকর পাননি, লোকসভায় দু’বার দাঁড়িয়েও নির্বাচিত হতে পারেননি। ১৯৫২ সালে কংগ্রেস প্রার্থীর কাছে হেরে যাবার পর তাঁকে রাজ্যসভায় মনোনীত সদস্য করা হয়েছিল। পরে ১৯৫৪ সালে একটি লোকসভা উপনির্বাচনে আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন কিন্তু কংগ্রেসের প্রবল বিরোধিতায় হেরে যান। ১৯৫৭ সালে যখন দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচন হয়, ততদিনে আম্বেদকরের প্রয়াণ হয়েছে। প্রসঙ্গত, ১৯৪৬ সালে সংবিধান সভার ভোটে তাঁর দল শিডিউলড কাস্ট ফেডারেশন খুব খারাপ ফল করে, পরে বাংলা প্রদেশ থেকে আম্বেদকরকে সংবিধান সভায় নির্বাচিত করা হয়েছিল। সে সময়ে বাংলায় মুসলিম লিগের সরকার চলছিল। এই সমগ্র পর্যায়টা বিবেচনা করলে সংবিধানের খসড়া রচনা কমিটির সভাপতি পদে আম্বেদকরের বৃত হওয়াটা কেমন যেন অদ্ভুত লাগে। তবে অদ্ভুত ঘটনা তো ঘটে।

এই পর্যায় জুড়ে আম্বেদকর তাঁর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবাণী উচ্চারণ করে গিয়েছেন। তিনি মনে করতেন, ‘রাজনীতিতে ভক্তিবাদ ভীষণ ক্ষতিকর। তাঁর স্পষ্ট কথা ছিল, আত্মার মুক্তির পথ হিসেবে ধর্মে ভক্তির গুরুত্ব থাকতে পারে। কিন্তু রাজনীতিতে ভক্তি বা বীর-বন্দনা নিশ্চিত ভাবেই অধঃপতন এবং একনায়কতন্ত্রের দিকে নিয়ে যাবে’। তিনি বারবার বলেছিলেন, ‘এটা খুবই সম্ভব যে সদ্যোজাত এই গণতন্ত্র হয়তো কাঠামোর দিক থেকে এরকম থেকে যাবে, কিন্তু মর্মবস্তুর দিক থেকে একনায়কতন্ত্রের জন্ম দেবে। যদি কারও সপক্ষে বিপুল জনসমর্থন দেখা যায়, তবে একনায়কতন্ত্রের বিপদটি আরও বাস্তব হবে বলেই মনে হয়।’ পাঠক, একবার বিবেচনা করে দেখুন, গত শতকের চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকে দাঁড়িয়ে কী গভীর প্রজ্ঞা তাঁকে এসব ভবিষ্যদ্বাণী করতে চালিত করেছিল।

আমাদের দেশে প্রায় একনায়কবাদ একবার আমরা প্রথম দেখেছি ১৯৭৫-৭৭ সালে। আজকের নবীন প্রজন্মের কাছে সেসব ঘটনা দূরবর্তী সময়ের ফিকে হয়ে যাওয়া অভিজ্ঞতা। সে কারণেই ওই সব প্রসঙ্গ বারবার মনে করিয়ে দেওয়া দরকার। ১৯৭১ সালে ‘গরিবি হঠাও’ স্লোগান দিয়ে ব্যাপক জনসমর্থন পেয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধি, বড় গরিষ্ঠতা নিয়ে লোকসভায় জিতে এসে সরকার গড়েছিলেন। ওই বছরই শুরু হয়েছিল বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রাম। ভারত এই সংগ্রামে প্রথমে পরোক্ষ ও পরে প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িয়ে পড়ে। ভারতের সেনা ও বিশেষ করে মুক্তিবাহিনীর যোদ্ধাদের বীরত্বের সামনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কাবু হয়ে পড়ে, অবশেষে ওই ১৯৭১ সালেরই ১৬ ডিসেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে প্রায় এক লক্ষ পাকিস্তানি সেনা। এই বিজয়ের সব কৃতিত্ব ইন্দিরা গান্ধিকে দিয়ে লাগাতার প্রচার চলতে থাকে, যার ফলে ইন্দিরার জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বি হয়ে পড়ে। তিনি ধরাকে সরা জ্ঞান করতে শুরু করেন। সরকারি কোনো পদে না থাকা সত্ত্বেও পুত্র সঞ্জয় গান্ধির হাতে ধীরে ধীরে সরকারের বিরাট দায়িত্ব ছেড়ে দেন। এসবের ফলে ও নানা আর্থিক এবং রাজনৈতিক কারণে ইন্দিরার জনপ্রিয়তায় ভাটার টান আসে। ১৯৭৫ সালে এলাহাবাদ হাই কোর্ট যখন এক রায়ে নির্বাচনি নিয়ম ভঙ্গের অপরাধে ইন্দিরার নির্বাচন বাতিল করে দেয়, ক্ষমতা হারাবার ভয়ে অভ্যন্তরীণ জরুরি অবস্থা জারি করেন ইন্দিরা। জরুরি অবস্থায় ইন্দিরা-পুত্র সঞ্জয়ের দাপট আরও বেড়ে যায়। মনে হতে থাকে, সঞ্জয়ই যেন প্রধানমন্ত্রী। অথচ তিনি সরকারি কোনো পদে ছিলেন না। একে বলা হচ্ছিল সংবিধান বহির্ভুত ক্ষমতার আস্ফালন। সঞ্জয়ের মনোভাব যা-ই থাক না কেন, জোর করে জন্মনিয়ন্ত্রণ বা দিল্লি থেকে ঝুপড়ি উচ্ছেদের মতো কাজকর্মে সাধারণ মানুষ খুবই চটছিলেন। কিন্তু ইন্দিরা লাগাতার প্রশ্রয় দিয়ে যান। অভ্যন্তরীণ জরুরি অবস্থায় প্রায় সব গণতান্ত্রিক অধিকার বাতিল করা হয়েছিল। অবশেষে ১৯৭৭ সালের ভোটে বিপুল ভাবে হেরে যান ইন্দিরা ও তাঁর কংগ্রেস দল, আর এ ভাবেই সে যাত্রা ভারত একনায়কতন্ত্র থেকে রক্ষা পেয়েছিল।

তারপরে প্রায় সাড়ে চার দশক সেই পথে আর কেউ হাঁটার সাহস পাননি। কিন্তু ২০১৯ সালে বড় গরিষ্ঠতা নিয়ে আবার নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতাসীন হবার পরে ছবিটা একেবারে পাল্টে গিয়েছে। সংসদের সব গণতান্ত্রিক রীতিনীতি উপেক্ষা করে, রাজ্যগুলিকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করছেন নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর সেনাপতিরা। আজ ভারত চালাচ্ছে কারা? এ দেশ আজ চালাচ্ছে একটা ছোটো চক্র, যার মধ্যে আছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী ও কয়েকজন ঘনিষ্ট রাজনীতিক, আদানি, আম্বানি, টাটাদের মতো কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠী এবং দেশের সশস্ত্র বাহিনীর কয়েকজন শীর্ষ কর্তা। এঁরা যা ঠিক করছেন, তা-ই হচ্ছে। রাজনীতির পরিভাষায় একে বলা হচ্ছে ডিপ স্টেট বা রাষ্ট্রের গভীরে আসল ক্ষমতাধর রাষ্ট্র। মোদির জনপ্রিয়তার সাজানো ঘোড়ায় চেপে ভারত এগিয়ে চলেছে একনায়তন্ত্রের দিকে। মোদি-ভক্তির হাতে আজ দেশের গণতন্ত্র, সংবিধান বিপন্ন। আজ আম্বেদকরের কথাগুলি আগের থেকেও অনেক বেশি তাৎপর্য বহন করে সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে। আম্বেদকর বারবার বলেছিলেন, রাজনীতিতে ভক্তির স্থান নেই। নেতাকে নির্মম সমালোচনা সহ্য করতে হবে, সংসদে, সংসদের বাইরে। কিন্তু সমালোচনা, এমনকী সংসদে আলোচনারও আজ কোনো মূল্য নেই। প্রধানমন্ত্রী কখনও সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন না। আজ একদল ক্ষমতালোভী মানুষ হিন্দুত্বের মুখোশ পড়ে মানুষের বাঁচার ধরন, খ্যদ্যাভ্যাস, উপাসনা পদ্ধতি, সব নিয়ন্ত্রণ করতে লেগেছে। স্বাধীন চিন্তা করতে পারে এমন সাংবাদিক কুলকে ধরে ধরে নিকেশ করা হচ্ছে। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে দখল করছে সাম্প্রদায়িকতাবাদীরা। দেশ বড় বিপদের সামনে। এই নষ্ট সময়ে আম্বেদকর আমাদের আলো দেখাতে পারেন। (চলবে)