“আম্বেদকর-জয়ন্তীতে আমি ভারতরত্ন ড. বাবাসাহেব আম্বেদকরের প্রতি শ্রদ্ধায় অবনত হচ্ছি। পশ্চাৎপদ অংশের মানুষকে সমাজের মূলস্রোতে নিয়ে আসার জন্য তাঁর সংগ্রাম প্রতিটি প্রজন্মের কাছে উদাহরণ হয়ে থাকবে।” বাবাসাহেব আম্বেদকরের জন্মজয়ন্তীতে ১৪ এপ্রিল ২০২২ এই ক’টি কথায় শ্রদ্ধা জানিয়েছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দেশজুড়ে তাঁর ভক্তরা এতেই প্রধানমন্ত্রীকে সাধু সাধু বলে ধন্যবাদ জানাতে ভোলেননি, বিশেষ করে বিজেপি-র সংগঠিত সোশ্যাল মিডিয়া বাহিনী। কত কম সময়ে দশ হাজার বা এক লক্ষ অভিনন্দন পাঠানো যায়, সে ব্যাপারে হয়তো হিন্দুত্ববাদী সোশ্যাল মিডিয়া বাহিনী বিশ্বরেকর্ডের দাবি করতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি বিজেপি, আরএসএস বা হিন্দুত্ববাদী বাহিনী আম্বেদকরকে শ্রদ্ধা করে? মাননীয় পাঠক, প্রধানমন্ত্রীর ট্যুইটটির দিকে একটু মনোযোগ দিন। ‘আম্বেদকর-জয়ন্তীতে আমি ভারতরত্ন ড. বাবাসাহেব আম্বেদকরের প্রতি শ্রদ্ধায় অবনত হচ্ছি’, প্রথমে বলা এই বাক্যটি আলংকারিক, প্রয়াত বিশিষ্ট কোনো ব্যক্তির জন্মদিনে এমনটা লেখারই রেওয়াজ। দ্বিতীয় বাক্য পশ্চাৎপদ মানুষদের সম্পর্কে, ‘পশ্চাৎপদ অংশের মানুষকে সমাজের মূলস্রোতে নিয়ে আসার জন্য তাঁর সংগ্রাম প্রতিটি প্রজন্মের কাছে উদাহরণ হয়ে থাকবে’, যেখানে তিনি একবারও জানান না, যে তাঁর সরকার আম্বেদকরের নীতি নামবে কি-না। নানা প্রজন্মের কাছে আম্বেদকরের সংগ্রাম উদাহরণ হয়ে থাকবে বললে কিছুই বলা হয় না, যেমন, সেটা ভালো না খারাপ, সেই সংগ্রাম ও তার চিন্তাধারা আমাদের গ্রহণ করা উচিত কি-না, ইত্যাদি। প্রধানমন্ত্রী মোদি, তাঁর দল বিজেপি, মূল সংগঠন আরএসএস যে আম্বেদকরের চিন্তাধারার ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে, সেটা জানতে হলে জানতে হবে খোদ আম্বেদকরকে।

১৮৯১ সালের ১৪ এপ্রিল জন্ম নেওয়া আম্বেদকরের ১৩১-তম জন্মদিবস পেরিয়ে এলাম আমরা। নানা আলোচনা হচ্ছে তাঁকে নিয়ে। এই প্রবন্ধে আমি মহান চিন্তনায়ক বাবাসহেবের কয়েকটি প্রধান চিন্তা নিয়ে কথা বলব, আর দেখাতে চাইব, কীভাবে সেগুলির শবের উপর দাঁড়িয়েই হিন্দুত্ববাদ জাগছে। প্রথমেই একটা বিষয় পরিষ্কার করা যাক। বাবাসাহেবকে কী স্বাধীনতা সংগ্রামী বলা যায়? হয়তো যায়, হয়তো যায় না। অন্তত যে অর্থে গান্ধি, নেহরু, সুভাষচন্দ্র বা ভগত সিংহ, মাস্টারদা সূর্য সেনেদের মতো মানুষেরা স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন, সে অর্থে স্বাধীনতা সংগ্রামী বাবাসাহেব ছিলেন না, এটা তো বলাই যায়। তাঁর কাছে সমগ্র দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতার থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল দেশের চার ভাগের তিন ভাগ মানুষের স্বাধীনতা। দলিত, আদিবাসী, পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের সামাজিক মুক্তিই দেশের প্রকৃত স্বাধীনতা আনতে পারবে, এটাই ছিল তাঁর মত। স্বাধীনতা সংগ্রামী কথাটির অর্থ ঠিক কী, সে বিতর্কে না গিয়ে এটা অবশ্যই বলা যায়, যে নয়-দশ জন প্রধান চিন্তানায়কের প্রদর্শিত পথে আজকের ভারত প্রাণ পেয়েছে, আম্বেদকর তাঁদের অন্যতম। তিনি জাতি গঠনের অন্যতম প্রধান কারিগর।

আধুনিক শিল্প-সভ্যতার অগ্রণী দূত ব্রিটিশদের কাছ থেকে আম্বেদকর জাত-পাতের অভিশাপ ঘোচাবার ব্যাপারে সহায়তা চাইতেন। সহায়তা চাইবার ব্যাপারে ব্রিটিশরা কতখানি বিশ্বাসযোগ্য ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে। কিন্তু সেসময়ে ব্রিটিশরাই তো ছিল শাসক। ব্রিটিশরা তখনই ভারত ছেড়ে চলে যাক, এটা বাবাসাহেব ১৯৪৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত চাননি। পরে, বিপুল দাঙ্গা আর চোখের সামনে ভারতীয় সভ্যতাকে দাউদাউ করে জ্বলতে দেখে তিনি মত বদলেছিলেন।
গান্ধি প্রমুখ মহাত্মাদের সম্পর্কে তাঁর এক ধরনের শ্রদ্ধামিশ্রিত বিরাগ ছিল। প্রথম সাক্ষাতেই তিনি মোহনদাসকে বলেন, মহাত্মাদের উপর তাঁর বিশ্বাস নেই। ‘ইতিহাস আমাদের দেখিয়েছে, মহাত্মারা ক্রমশ বিলীয়মান মায়ামূর্তির মতোই অনেক ধুলো উড়িয়ে যান, কিন্তু চেতনার উন্মেষ ঘটান না।’ কথাটা কতটা সত্যি, পাঠক বিচার করবেন, বিশেষ করে আজকের ভারতের জাত-পাত ও সাম্প্রদায়িকতার উত্থানের প্রেক্ষিতে। গান্ধির অবশ্য আম্বেদকর সম্পর্কে অবিমিশ্র শ্রদ্ধা ছিল। তিনি আম্বেদকরের জীবন ও সংগ্রাম সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছিলেন, জেনেছিলেন। গান্ধি একসময় আম্বেদকর সম্পর্কে বলেছিলেন, বর্তমান ভারতীয় সমাজ সম্পর্কে ‘তাঁর তিক্ত মনোভাব পোষণ করার সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে। তিনি যে আমাদের মাথা ভেঙে দিচ্ছেন না, এটা তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণ।’ স্বাধীনতা সংগ্রামের নানা বাঁক এবং মোড়ে গান্ধির সঙ্গে আম্বেদকরের নানা মতপার্থক্য ও সমঝোতার ইতিহাস আমরা ইতিহাসে পড়েছি।

আম্বেদকরের প্রধান চিন্তা ও আধুনিক ভারত
আম্বেদকরের চিন্তার মূল কেন্দ্রটি কী? সেটা হলো, ভারতের তথাকথিত হিন্দু সমাজে উদগ্র, নির্মম, হিংস্র, নির্দয় জাত-পাতের চলতি ব্যবস্থা। যে ব্যবস্থা যে-কোনো পর্যবেক্ষককে বেদনাবিধূর করে দেবে, সেটাই শত-শত বছর ধরে এ দেশে চলছে কীভাবে? ভারতীয় ধর্মীয় সাহিত্য গভীর ভাবে পড়াশোনার মধ্য দিয়ে আম্বেদকর বোঝেন, ধর্মীয় মূল কয়েকটি শাস্ত্রে যেভাবে জাতপ্রথাকে গৌরবান্বিত করা হয়েছে, সেটাই এই ভয়ানক পরিস্থিতির মূলে। ভারতীয় প্রাচীন সাহিত্যের পাঠকরা জানেন, সেখানে অনেক জায়গাতেই ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রের বিভাজন করা হয়েছে। তৎকালীন সমাজের ৯০ শতাংশ শ্রমজীবী মানুষকে শূদ্র আখ্যা দিয়ে সমস্ত সামাজিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। ওইসব ধর্মীয় সাহিত্যের নির্দেশ অনুসারে শূদ্রদের একমাত্র ধর্ম হলো ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যদের সেবা করা, অর্থাৎ উচ্চবর্ণের জন্য সারা জীবন খেটে যাওয়া, কোনো প্রশ্ন না তুলে আনুগত্য স্বীকার করা ও অত্যাচার মেনে নেওয়া।
যারা শূদ্র, তারা আবার অস্পৃশ্যও বটে। এমনকী ভারতীয় ইতিহাসের এক দীর্ঘ পর্যায় জুড়ে শূদ্রদের ছায়া মাড়ানোও হতো না। তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে গেলেও তারা উচ্চবর্ণের জন্য নির্ধারিত জলাশয়ে বা জলের কলে যেতে পারবেন না, জল পান করতে পারবেন না। এটাকে স্বাভাবিক ও জন্মগত বলে দেখানো হয়েছে শত-শত বছর ধরে। ঠিক এই জায়গাটাতেই প্রশ্ন তুলে আম্বেদকর বললেন, কেন সচেতন হিন্দুরা এর বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলছেন না? তিনি মনে করতেন, ধর্মীয় বিধান মেনে নেবার মধ্যেই এই নির্মম প্রথার শিকড় রয়ে গেছে, আর সেটাই এর স্থায়িত্বের মূল কারণ। ১৯৩৫ সালেই তিনি বলেছিলেন, তিনি হিন্দু হয়ে জন্মালেও হিন্দু হয়ে মরবেন না। ঘটনাও তা-ই ঘটেছিল। মৃত্যুর মাত্র কয়েক মাস আগে আম্বেদকর ও তাঁর ৪ লক্ষেরও বেশি অনুগামীরা বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। সারা জীবন তিনি এই মত পোষণ করেছেন, যে হিন্দু সমাজ তার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে অচ্ছুৎ করে রাখে, সেই সমাজকে গৌরবান্বিত করাটা আত্মহননেরই শামিল। তিনি বলতেন, ‘যদি কখনও এ দেশে হিন্দু রাজ প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তা হবে ভারতের পক্ষে সর্বাপেক্ষা বড় বিপর্যয়’। প্রকৃতপক্ষে, তা যাতে না হয়, সেই লক্ষ্য নিয়েই ভারতের সংবিধান রচনায় সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন।

ঠিক এই জায়গাটাতেই আঘাত হেনেছে হিন্দুত্ববাদ। ভারতের ভবিতব্য হিন্দু রাষ্ট্র, এটা তারা গৌরবের সঙ্গে প্রচার করে। ‘গর্ব সে কহো, হম হিন্দু হ্যায়’, বা ‘মন্দির ওহি বনায়েঙ্গে’-র মতো স্লোগানে যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ মাতোয়ারা হয়ে যায়, তখন বোঝা যায়, আম্বেদকরের চিন্তার মূল সূত্রটা যেন ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। হ্যাঁ, আম্বেদকরের চিন্তা নেহরুবাদের সঙ্গে মিশ খেতে পারে, কংগ্রেসের সঙ্গে বা তৃণমূল কংগ্রেসের মতো দলের সঙ্গে মিলতে পারে, বিজেপি-আরএসএস-এর সঙ্গে কখনই নয়। কংগ্রেস, নেহরুবাদ, আধুনিক মনস্কতা যতই পিছু হটছে, জাত-পাত, সাম্প্রদায়িকতা যতই নানা মোড়কে আরও ব্যাপক হচ্ছে, আম্বেদকর পিছু হটছেন। হিন্দু রাষ্ট্র কখনই নয়, আম্বেদকরের এই সিদ্ধান্তর মাথায় হাতুড়ির আঘাত হেনে জন্মদিনে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন হিন্দুত্ব শিরোমণি মোদিজি, এর থেকে বড় ভেলকি আর কী-ই বা হতে পারে! (চলবে)