অহংকার করবার মত কিছু না থাকা সত্ত্বেও এই ধরাধামে এমন অনেক মনুষ্যের বসবাস, যারা নিজেকে অন্যের চেয়েও অধিকতর উচ্চ, শিক্ষিত, কিংবা জ্ঞানী বলে মনে করতে এতোটুকু দ্বিধা বোধ করেননা। যার হয়তো নেই কোন ভিত্তি, হয়তো অন্তঃসারশূন্য কিংবা হতেপারে বায়বীয়। তারপরও তারা আছন্ন হয়ে থাকে তাঁদের মিছে অহংবোধে। নবাব হাবিবুল্লা বালক উচ্চবিদ্যালয়ের গণিতের শিক্ষক জনাব মোহাম্মোদ বাবর আলী ও তেমনি একজন মানুষ। ক্লাসে এসে যতনা ছাত্রদের উদ্দেশ্যে পাঠদান তার চেয়েও বেশী সময় তিনি ব্যয় করেন আত্মগুন কীর্তনে ও আকণ্ঠ নিমগ্ন থাকেন নিজের প্রশংসায়।
বিদ্যার্থিদের যে কারো তুচ্ছ ভ্রম আবিষ্কারে বাবর আলী সিদ্ধহস্ত। বিশেষ বিশেষ শাস্তি প্রদান ও এর মধ্যে দিয়ে উদ্ভূত আনন্দের অবগাহনে নিজেকে নিমজ্জিত করাটিই যেন তার অন্যতম ব্রত।
শিক্ষক বাবর আলী সম্পর্কে এই সব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে ঈষৎ উদাস মনে ওমরের দৃষ্টি শ্রেনিকক্ষের জানালা ভেদ করে বাইরে নিক্ষিপ্ত হল। মধ্য গগনের তপ্ত রৌদ্রের প্রখর আলো মাঠের সবুজ ঘাসের ওপর পড়ে চিকচিক করছিল।
গনিত শিক্ষক বাবর আলী, অমসৃণ ও কর্কশ কন্ঠে খেঁকিয়ে উঠলেন, এই ওমর তোর মন কোথায়? ক্লাসে নাকি বাইরে? জানালা দিয়ে দেখছিস টা কী? বাবর আলীর বিটকেল বেসুরো চিৎকারে স্বম্বিৎ ফিরে পায় ওমর। সাথে সাথে নিজেকে সামলে নিয়ে, নিজ খাতায় অঙ্ক কষার কপট ভান করে সে।
ছাত্রদের উপর অত্যাচার নিপীড়ন বৃদ্ধির সাথে সাথে তার শরীরটিও যেন দৈর্ঘ্যে না বেড়ে ক্রমাগত শুধুমাত্র প্রস্থে বেড়ে চলেছে। বাবর আলীর শরীরিক অবয়বটি এখন দেখতে অনেকটা মদ কিংবা দ্রাক্ষারস সংরক্ষনের জন্যে তৈরি কাঠের পিপের মত দেখায় — দুপাশ সরু কিন্তু মধ্যদেশ স্ফিত। শুধুমাত্র পিপের উপরিভাগে যদি বাবর আলীর ছোট্ট মাথাটি জুড়ে দেয়া যেত তবে ষোলকলা পূর্ণ করে মদের পিপেটিতেই তাঁর সম্পূর্ণ দেহ অবয়বটি ফুটে উঠত।
চার পাঁচ বছর পূর্বে বাবর আলী যেদিন এই স্কুলটিতে প্রথম পদার্পন করেছিলেন সেইদিনটির কথা ওমরের এখনো স্পষ্ট মনে আছে। ওমরের মনে পড়ে গেল ঐদিন বাবর আলীর পরণে ছিল অতিশয় ঢোলা একটি হাফ হাতা শার্ট ও ফুল প্যান্ট। ওমরের ঐদিনের কথা তার মানস পটে জীবন্ত হয়ে আছে যে কারণে, সেটি হচ্ছে বাবর আলী ফুল প্যান্টের সাথে পায়ে পড়েছিলেন সবুজ রঙের এক জোড়া রূপসা চপ্পল। ফুল প্যান্টের সাথে স্পঞ্জের সবুজ চপ্পল জোড়া কিছুতেই মানানসই লাগছিল না। ক্লাসের অনেকেই মুখ টিপে হেসেছিল নিশ্চয়ই। পাঁচ বছর পূর্বের কথা। অনেক কিছুই আজ আর মনে নেই।
এসব সাত পাঁচ ভাবছিল আর অঙ্কগুলো ব্লাক বোর্ড থেকে দেখে দেখে বিধবাদের ধবধবে সাদা থান কাপড়ের মত খাতায় তুলছিল ওমর। হঠাত পেছনের দিকের একটি বেঞ্চে শোরগোল পড়ে গেল।
বাবর আলী মৃদুল নামের একটি ছেলেকে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, — এই তুই অঙ্ক না কষে এত মনোযোগ দিয়ে ক্লাসে কী পড়ছিস? মৃদুল তাড়াহুড়ো করে কিছু একটা আড়াল করার চেষ্টা করতেই বাবর আলী তাকে হাতে নাতে ধরে ফেললেন। বাবর আলী হুংকার ছেড়ে বললেন, -ওগুলো এক্ষুনি আমার হাতে তুলে দে। নইলে চাবকে গায়ের চামড়া তুলে নেব। বাধ্য হয়ে মৃদুল তার হাতের বইটি বাবর আলীর হাতে তুলে দিল।
বাবর আলী বইটির উপর কিছু সময় চোখ বুলিয়ে সবিস্ময়ে চোখ দুটো বিস্ফোরিত করে মৃদুলের দিকে তাকিয়ে বললেন, — সবে মাত্র তোরা দশম শ্রেনির ছাত্র। এই বয়সেই তোদের এত অধপতন। ছি! ছি! ছি! আমি ঘেন্নায় মরে যাচ্ছি। এই কী তোদের রুচি! লেখাপড়া বাদ দিয়ে শেষ পর্যন্ত রসময় গুপ্তের সাহিত্য হাতে তুলে নিয়েছিস? আমি স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারি না যে তোদের মনে এতটা পচন ধরেছে। তোদের আর দোষ কী — তোদের এই যুগটাকেই ঘূণপোকায় ধরেছে। ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তোদের এই সমাজ। ভেবেছিলাম তোরা লেখাপড়া শিখে আমার মত কিংবা আমাদের মত বিদ্ব্যান হবি। কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি। ভুল বললাম — আসলে গুড়ে বালি নয়, গুড়ে বিষ। অথচ আমরা যখন তোদের বয়সি ছিলাম কী সাত্ত্বিক জীবনই না পার করেছি আমরা। রোজ নিয়ম করে ক্লাসে উপস্থিত হতাম। ক্লাসের পড়া সব ঠিক ঠাক মত তৈরি করে নিতাম। স্কুলের শিক্ষকগণও আমাদের খুব পছন্দ করতেন। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে হাত মুখ ধুয়ে পড়ার টেবিলে বসে যেতাম বই নিয়ে। লেখাপড়া চলত অনেক রাত অবধি। তোদের মত হতচ্ছাড়া নচ্ছাড় কিংবা বদের হাড্ডি ছিলাম না কোনোকালেই। ক্লাসে সবসময় খুব ভাল রেজাল্ট করতাম।
বাবর আলী এবার ছাত্রদের উদ্দেশ্য করে বললেন, — এই গুরুতর অপরাধের বিচার হতে হবে। ওমরের দিকে তাকিয়ে বললেন, -অফিস থেক দুটো জালি বেত নিয়ে আয় জলদি।
স্কুলের অফিস থেকে মোটামোটা দুটো জালি বেত নিয়ে আসা হল। সেগুলোকে ওমর সযত্নে রাখল টেবিলটির ওপর। মৃদুল নামের ছাত্রটিকে ডাকা হল বাবর আলী যেখানটায় বসে আছেন সেই টেবিলটির সামনে। বাবর আলী তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, — হাত দুটো আমার সামনে সোজা করে মেলে ধর। মৃদুল রোবটের মত, নাহ রোবটের মত কথাটি ঠিক হল না, সে অনেকটা হিপ্নোটাইজড হওয়া মানুষের মত হাত দুটো সম্প্রসারিত করে পেতে রাখলো বাবর আলীর হাতের নাগালের মধ্যে।
মৃদুলের চোখ দুটি মুদিত, সে সম্ভবত ভয়ে চোখ বুজে আছে। সপাং….সপাং……সপাং বেত্রাঘাতের শব্দ হল সম্ভবত মিনিট দুয়েক। মৃদুল তখনো ক্ষোভে অভিমানে ও অপমানে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল সেখানটায়। বাবর আলী ছাত্রদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা করলেন –যদি এ ধরণের কোনো কুরুচুপূর্ণ সাহিত্য কারো কাছ থেকে পাওয়া যায় তবে তাকে লাল কালির টিসি ও সাথে শুধুমাত্র অর্ধচন্দ্র নয়, বরং পূর্ণচন্দ্র দিয়ে এই স্কুল থেকে বের করে দেয়া হবে।
বাবর আলীর বয়ানকৃত এই কুরুচিপূর্ণ সাহিত্য কার কাছে নেই? ক্লাসের সবচেয়ে ভোলাভালা জাফর, অতি ধূর্ত প্রকৃতির রঞ্জু, ক্লাসের চৌকস ছাত্র ওমর, সবচেয়ে খর্বকায় ছেলে গেদু যার আসল নাম মনি কিন্তু মনি নামটা হাজার লক্ষ টন মাটির নিচে কোন এক অজানা কারণে চাপা পড়ে গেছে, গেদু নামের আড়ালে। সবচেয়ে লম্বা ও রোগা পটকা সাজিদ। সবার কাছেই আছে রসময় গুপ্তের রগরগে বর্ণণায় ভরপুর সেই নিষিদ্ধ সাহিত্য। এরা সকলেই হঠাৎ ঈষৎ বিড়বিড় করে বলল, — এখন কী উপায়?
ক্লাস শেষে পড়ন্ত বিকেলে সূর্য অনেকটাই হেলে পড়েছে পশ্চিমে। অস্তমিত সূর্য, নিকষ কালো অন্ধকারের আগমনী বার্তা বয়ে আনে। সেই কুচকুচে কালো অন্ধকার সংক্রামিত হয় ওমর, গেদু, রঞ্জু কিংবা সাজিদদের মনেও।
রঞ্জু কিছুটা হতাশ মিশেল কণ্ঠে বলে — সব বইগুলো একত্রে বিক্রির ব্যবস্থা করলে কেমন হয়?
গেদুর গলায় কিছুটা আশ্চর্যের ভাব — এইসব আবর্জনা নিষিদ্ধ সাহিত্য কে কিনতে যাবে?
মৃদুল বলে, -আমি কিন্তু ওসব কেনাবেচার মধ্যে আর নেই বাপু যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে।
অনেক বাহাস ও বিতণ্ডার পর সিদ্ধান্ত হল, ওগুলো সব পুড়িয়ে ফেলাই ভালো।
পরদিন। স্কুল বন্ধ। সাপ্তাহিক ছুটি। সবাই মিলে সমস্ত বইগুলোকে বগলদাবা করে নিয়ে হাজির হল স্কুল থেকে অনেক দূরে গড়ের মাঠের এক প্রান্তে একটি প্রকাণ্ড অশ্বত্থ গাছের নিচে। সমস্ত বই গুলোকে স্তূপ করে আগুন ধরিয়ে দেয়া হল। চোখের সামনে পুড়ে ভস্মীভূত হল সমস্ত নিষিদ্ধ সাহিত্য। বইগুলো পুড়ে ভস্মীভূত হল ঠিকই কিন্তু সকলের মনের আগুন প্রশমিত হওয়ার পরিবর্তে উল্টো সে আগুন আরো দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। বেশ কিছুদিন আগুনের উর্ধমুখী শিখা হয়ত চাপা দিয়ে রাখা গেল ঠিকই কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই এদের সবার মনে নানারকম হাপিত্যেশ ও উসখুস শুরু হল। কিন্তু কোথায় পাবে ওরা ওসব বই। সব তো পুড়ে ছাই হয়ে মিশে গেছে মাটিতে।
ক্লাসের সবচেয়ে চৌকস ছাত্র ওমর ওদের সবার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে মনে মনে একটি বুদ্ধি আঁটে। ওমর, রঞ্জুকে উদ্দেশ্য করে একটি প্রস্তাব রাখল –বন্ধু দুঃখ করিস না। আমি নিজে ওরকম সাহিত্য রচনা করে তোদের দেখাব।
রঞ্জু আশ্চর্যান্বিত হয়ে বলল, — সত্যি তুই পারবি লিখতে ওরকম সাহিত্য?
— আলবৎ পারবো। তবে তোকে প্রতিজ্ঞা করতে হবে ওগুলো তুই ক্লাসে আনতে পারবি না।
— নিয়ে আসার তো প্রশ্নই ওঠে না। বরং বাড়িতেও ওগুলো লুকিয়ে রাখবো কোনো দূর্ভেদ্য প্রকোষ্ঠে, যাতে কেউ এর টিকিটি পর্যন্ত খুঁজে না পায়।
কিছুদিনের মধ্যে রঞ্জু হাতে পেল রুল করা সুন্দর একটি খাতায় খুশখত বর্ণাক্ষরে একখণ্ড নিষিদ্ধ সাহিত্যের পাণ্ডুলিপি। ওমরের সুন্দর হস্তলিপিতে সত্যি সত্যিই বেশ নয়নসুখ হয়। বক পক্ষীর পালকের মত সাদা খাতায় কালো কালি দিয়ে রচিত নিষিদ্ধ সাহিত্যখানা যেন কোনো শিল্পীর পটে আঁকা ছবির মত মনে হয়।
রঞ্জু খাতাটি হাতে পেয়ে দ্রুত পৃষ্ঠা উল্টোতে থাকে। দু চার পৃষ্ঠা পড়ার পর ওমর কে উদ্দেশ্য করে রঞ্জু বলে — লিখাটা কিন্তু বেশ চমৎকার হয়েছে রে দোস্ত। কিন্তু ভাষাটি বেশ একটু খটমটে লাগছে। রসময় গুপ্তের ভাষাটি আরো প্রাঞ্জল ও বোধগম্য।
ওমর কিছুটা আত্মদাম্ভিকতার সাথে বলে, — বুঝেছিস আহাম্মক, আমার সাহিত্য বলে কথা। ভাষাটিকে তো কিছুটা গুরুপাকে সমৃদ্ধ করতেই হয়। তা না হলে আমার পাণ্ডিত্যটুকু আর থাকে কোথায় বল?
তুলোর মত পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘ উড়িয়ে, প্রকৃতিতে শরতের সাদা রঙ মেখে, হেমন্তের নবান্নের ঘ্রাণে চারপাশ আমোদিত করে কিংবা ঋতুরাজ বসন্তের পাতা ঝরা নগ্ন বৃক্ষরাজির উচ্ছ্বাসে সবকিছু চলছিল সুন্দর ও সাবলীল ভাবে।
যেকোনো সাধারণ দিনের মতই একদিন বাবর আলি যথারীতি শ্রেণীকক্ষে ছাত্রদের অঙ্ক কষা শেখাচ্ছিলেন। হঠাৎ তাঁর নজরে এল রাজা নামের ছাত্রটি অঙ্ক কষা ফেলে রেখে মনোযোগ দিয়ে কী যেন পড়ছে। সুচতুর বাবর আলি দ্রুত বেগে ধাবিত হলেন সেই ছাত্রটির দিকে — দেখি বাচাধন অঙ্ক কষা ফেলে রেখে কী পড়া হচ্ছে ক্লাসে?
— না, মানে ইয়ে..স্যার আমি কিছুই পড়ছি না।
— ভালোয় ভালোয় বলছি খাতাটি আমার হাতে তুলে দে। নইলে ….
অগত্যা সীমাহীন অনিচ্ছা স্বত্তেও কম্পমান হাতে রাজা তাঁর খাতাটি তুলে দিল বাবর আলির হাতে।
কিছুদুর পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে রাগে ক্ষোভে বাবর আলি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। তাঁর বিশাল আকৃতির হাত দিয়ে কষে থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন রাজার গালে। তারপর পটাপট আরো বেশ কয়েকটি।
রাজার কাছ থেকে জানা গেল আসলে খাতাটি তাঁর নিজের নয়। সে এটি ধার করেছে রঞ্জুর কাছ থেকে। রঞ্জুকে দু ঘা উত্তম মধ্যম বসিয়ে দিতেই সে অকপটে স্বীকার করে নিল যে, ওগুলো আসলে তাঁর নিজেরও নয়। এগুলো লিখে দিয়েছে আর কেউ নয় ভালো ছাত্রের পোশাকধারী স্বয়ং ওমর।
ক্রোধে উন্মত্ত বাবর আলির পাঁচ আঙ্গুলে কপালের দুপাশের শিরা গুলো যেন দপদপ করে কাঁপছে। তিনি ক্লাসে ওমরকে কিছু না বলে শুধুমাত্র ক্লাস শেষে তাঁর সঙ্গে শিক্ষকদের কক্ষে দেখা করতে বললেন।
ক্লাস শেষ হতে হতে বেলা গড়াল পাঁচটায়। মনের মধ্যে সমুদ্রের ঢেউয়ের মত অবিরাম দুরু দুরু কাঁপুনি নিয়ে ভীত সন্ত্রস্ত ওমর হাজির হল বাবর আলির সামনে। ততক্ষণে ওমরের স্নায়ুপুঞ্জে শুরু হয়েছে টর্নেডো কিংবা তাইফুন। এক লহমায় ওমরের মনে হল সে যেন মূর্ছা যাচ্ছে।
ক্রোধান্ধ বাবর আলি ওমরকে প্রশ্ন করলেন — এগুলো কী তুই লিখেছিস?
ওমরের নিলাজ স্বীকারোক্তি — হাঁ। ওগুলো আমিই লিখেছি।
বাবর আলি ঈষৎ আক্ষেপের সুরে বললেন, — তোদের সবার কী হয়েছে বল তো? তোরা কী সবাই সদ্য যৌবনের রঙ্গিন নেশায় মাতাল কিংবা মনের বিরামহীন লিপ্সায় পাগল হয়ে গেলি? আমি ভেবেছিলাম তুই অন্তত একটি আশাতীত রেজাল্ট করে এই স্কুলের মুখ রাখবি। কিন্তু আমি এটা জেনে আশ্চর্যান্বিত হয়েছি যে, তোর এই লজ্জাতুর মনোভাবের আড়ালে লুকিয়ে আছে লালসাময় নারীর উপস্থিতি।
— স্যার, আমাকে এবারের মত ক্ষমা করে দিন। কথাগুলো বলার সময় ওমরের কণ্ঠটি বারংবার কেপে কেপে উঠছিল।
— তুই ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করেছিস ওমর। আমি কাল তোদের বাসায় এসে এই বিষয়টি নিয়ে তোর বাবার সাথে কথা বলব। তারপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি নেবে স্কুল কতৃপক্ষ।
— স্যার, যা শাস্তি হয় আমাকে দিন। প্রয়োজনে স্কুল থেকে টিসি দিয়ে বিদেয় করে দিন। দয়া করে এর মধ্যে আমার বাবা মা কে জড়াবেন না।
— বাছাধন, অন্যায় করার সময় বাবা মার কথা মনে পড়েনি?
পরদিন রাতে বাবর আলি এসে হাজির হলেন ওমরের বাসায়। ওমরের বাবা একজন প্রাক্তন শিক্ষা বিভাগের কর্মকতা —নিপাট সহজ সরল ভাল মানুষ। বাবর আলির মুখ থেক নিজের ছেলের সম্পর্কে সবকিছুই মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। বিষয়গুলো বর্ণনা করে বাবর আলি যেন সীমাহীন পরিতৃপ্তি ও সুখ লাভ করলেন। ওমরের বাবা কী বলেন সেই আশায় তিনি কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন ওমরের বাবার দিকে। কিছু সময়ের জন্যে আশ্চর্য এক নীরবতা, তারপর সেই নীরবতা ভেঙ্গে ওমরের বাবা বদিউজ্জামানই মুখ খুললেন — দেখুন মাস্টার সাহেব, ছেলেকে স্কুলে পাঠানো হয়েছে শিক্ষা গ্রহণ করতে কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে সে পথভ্রষ্ট হয়েছে। আপনার মুখ থেকে বিষয়গুলো জেনে খুব কষ্ট পেলাম। আমি আর কী বলব — আপনাদের বিচারে যা হয় সেটিই করুন। আমি আমার এই নষ্ট ছেলের জন্যে হেড মাস্টার সাহেবের কাছে ক্ষমা চাইতে পারবো না।
বাবর আলীর জন্য পর্যাপ্ত নাস্তা পানির ব্যবস্তা করা সত্ত্বেও তিনি শুধু মাত্র চা মুখে তুলেই ওমরদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন।
বাবর আলীর চলে যাবার কিছুক্ষণ পর ওমর হঠাৎ লক্ষ করল তার অপ্রিয় গণিত শিক্ষকটি তার কাঁধের উত্তরীয় ব্যাগটি ভূলবশত টেবিলের উপর ফেলে রেখে গেছেন। ওমর মনে মনে ভাবে কাল সকালে সে নিজে গিয়ে পৌছে দেবে এই উত্তরীয়টি।
মেঘলা সকাল। আকাশে পুঞ্জ পুঞ্জ সাদাকালো অজস্র মেঘমালার কারণে বুঝা যাচ্ছে না যে, বেলা আসলে গড়িয়েছে বেশ খানিকটাই । আসন্ন ঝড় জলের সম্ভবনায় একটি ছাতা সঙ্গে নিয়ে ওমর পা বাড়াল রাস্তা ধরে। হেঁটে গেলে বাবর আলীর বাড়ি পৌঁছাতে সময় নেয় বিশ থেকে পঁচিশ মিনিটের মত। সে জন্য রিকশা নেয়ার কোন মানে হয় না। আর্দ্রতা সমেত দমকা বাতাসে হাঁটতে বেশ ভালোই লাগছিল ওমরের। বেশকিছুক্ষণ হাটার পর একটি অনতিবৃহৎ মাঠ পেরিয়ে একটী সাধারণ দ্বিতল বাড়ির সমনে এসে দাড়ল ওমর দেখেই বুঝা যাচ্ছে বাড়িটি পুরাতন। বাঘের গায়ের ছাপের মত ছোপ ছোপ সবুজ শ্যাওলা গজিয়ে সম্পূর্ণ বাড়িটি চিরহরিৎ বর্ণ ধারন করেছে। সাধারণত বাড়ির সিঁড়ি ঘরটি বাড়ির অভ্যন্তরে থাকার নিয়ম হলেও এই বড়ির সিঁড়িটি বাইরের দেয়াল ঘেসে উঠে গেছে উপরে। ওমর সিঁড়ি ভেঙ্গে দোতলায় উঠে এল। সম্ভবত চলমান পরিস্থিতির কারণে দুরু দুরু কাঁপছে তার হৃদয়।
অল্প ইতস্তত করার পর বুকের ভিতর বেশ খানিকটা সাহস তুলে এনে কড়া নাড়ল ওমর একবার, দুবার, বেশ কয়েকবার দরজাটি সম্ভবত ভেজানো ছিল। অল্প একটু ধাক্কা দিতেই দুয়ারটি খুলে গেল, কচ্চপের মত মুন্ডটি ভিতরে ঢুকিয়ে ওমর দেখা চেষ্টা করল কক্ষটিতে কারো আস্তিত্ব আছে কিনা? না কেউ নেই। ঠিক সেই মূহূর্তে স্নান ঘর থেকে বাবর আলী চেচীয়ে উঠলেন । কে? মাজেদা এলি নাকি রে?
মাজেদা নামের মেয়েটি সম্ভবত বাবর আলীর বাসায় ঝিয়ের কাজ করে মনে মনে ভাবে ওমর । না — স্যার আমি ওমর। গতকাল আপনি আপনার ব্যাগটি আমদের বাড়িতে ফেলে এসেছিলেন। আমি ওটি ফেরত দিতে চলে এলাম।
ভালোই করেছিস বেশ খানিকটা প্রসন্ন গলায় কথাগুলো স্নানঘর থেকেই বলে বাবর আলী। তুই খানিকক্ষণ অপেক্ষা কর আমি গোসল সেরে এক্ষনি আসছি।
বাবর আলী অকৃতদার আর তাই ঘরে আসবাবের তেমন একটা বালাই নাই। কৌনিক এই ঘরটির এক পাশে তক্তপোশ। তক্তপোশ ঘেষে একটি টেবিল ও চেয়ার অনতি দূরে একটি আলনা। সেখানে ঝুলছে দু’একটি শার্ট প্যান্ট কিছু লুঙ্গি ও ফতুয়া । টেবিলের উপর শোভা পাচ্ছে একটি খোয়াবনামা, একটি এ.টি. দেবের ইংরাজি অভিধান এবং দু-চারটি ভিন্ন জাতীয় বই। ঘরটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ক্লাশের সদ্য সমাপ্ত পরীক্ষার খাতা ও কাগজ পত্রের অবিন্যাস্ত স্তুপ। উপকরণ হীন সেই ঘরে বিমূঢ় হয়ে ওমর বসে রইল বেশ কিছুক্ষণ। তক্তোপোশের উপর দুটি বালিশের নিচে একটি বইয়ের কিছু অংশ বাইরে বেরিয়ে আছে। ওমরের দৃষ্টি গিয়ে পড়ল সেই বইয়ের দিকে। ওমর কৌতূহলের আতিশয্যে বালিশের নিচে হাত ঢুকিয়ে একটানে বের করে আনল বইগুলো। একটা নয় তিন চারটির মত বই। বইগুলোর উপড় চোখ বুলাতেই বিদ্যুৎপৃষ্টের মত অবস্থা হল ওমরের। মনে হল বাহিরের জল ঝড়ের চমকানো বিদ্যুৎ ঘরের ছাদ গলে তার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গেল এক মূহূর্তের জন্য। তার নিজের চোখ দুটোকেই সে বিশ্বাস করতে পারছে না। তিনটি বইয়ের একটি কামদেব রচিত- মধ্যরাতের সুখ, দ্বিতীয়টি রতি দেব রচিত- আমার কাছে এস নিশিতে এবং তৃতীয়টি — সুখদেবের বৌদির অন্তর জ্বালা। কাঁচাপাঁকা কেশভর্তি সিক্ত মাথাটিতে তোয়ালে ঘষতে ঘষতে স্নান ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন বাবর আলী। বাবর আলীর চোখ পড়ল ওমরের হাতে রক্ষিত বই গুলোর উপড়। ওমর ও বাবর আলী একজন আর একজনের দিকে চেয়ে রইলেন বেশ কিছুক্ষণ। এক অসীম নিস্তবদ্ধার ঘোমটায় ঢাকলো চার পাশ।