অন্তুর বাবার ছবিটা ছিল উত্তরদিকের দেয়ালের বেশ খানিকটা ডঁচুতে টাঙানো। বলা যায়, টঙে। ঘুলঘুলির ঠিক নীচে। বাড়িটা তৈরির সময় গজালগুলো ওইভাবেই গেঁথে দেওয়া হয়েছিল। তাতে ভাড়াটাদের কোনো হাত ছিল না। উচ্কপালে হয়ে না তাকালে টঙে-তোলা এইসব ছবি সহজে নজরে পড়ার কথা নয়।
ছাপোষা মধ্যবিত্তদের ঘরে মৃত প্রিয়জনদের ছবি বড় করে ঘরে টাঙিয়ে রাখার রেওয়াজ খুব বেশিদিনের নয়।
অন্তুদের বাড়িতে সবচেয়ে পুরোনো ফটো ছিল তার ঠাকুর্দার। পোট্রেট নয়, গ্রুপফটো। ওর ঠাকুর্দা নাজির না সেরেস্তাদার কী একটা ছিলেন। ছবিটা তোলা হয়েছিল কাছারিতে। চেহারাগুলো খুব মজার। সকলেরই চাপদাড়ি। বুকের ডানপাশে বোতাম-দেওয়া আচকান। কপালজোড়া টাক থাকায় ওর ঠাকুর্দাকে তবু যাহোক চেনা যাচ্ছিল।
ঠাকুর্দার চেয়ে ঊর্ধ্বতন কোনো পুরুষের দূরের কথা, এমন কি অন্তুদের বাড়িতে তার ঠাকুরমারও কোনো ছবি ছিল না। অবশ্য ছবি না থাকলেও ঠাকুমা কেমন দেখতে ছিলেন সে সম্বন্ধে ওর মনে প্রায় স্পষ্ট একটা ধারণা গড়ে উঠেছিল। তার কারণ, ছোটতেই ওদের বলা হয়েছিল যে, ‘তোদের ঠাকুমা দেখতে ছিলেন উপরোনো তোদের সেজো পিসিমার মতো।’ অবশ্যই আরো ঢ্যাঙা, অবশ্যই আরো ফরশা। ‘অবশ্যই’গুলো অন্তুর মনে তেমন ঠাঁই পায় নি, কেননা তার কল্পনাশক্তি কোনোদিনই খুব একটা প্রখর ছিল না। ফলে, ঠাকুমা দৈর্ঘ্যে আর গায়ের রঙে সেজো পিসিমাকে কখনোই ছাড়িয়ে যেতে পারলেন না। দুঃখের বিষয়। কিন্তু সত্যি।
অন্তুর মেঘে মেঘে অনেক বেলা হয়েছে বটে, ক্যামেরাও এখন বলতে গেলে ঘরে ঘরে। তবু কিন্তু কেউ ফটো তুললেই অন্তুর কানে কানে ‘ক্লিক’ নয়-‘ফস্’ করে একটা শব্দ হয়।
এও এক অদ্ভুত বাপার। স্মৃতি জিনিশটা ভারি হেজলদাগড়া। একবার যেটা ধরে, কিছুতেই ছাড়তে চায় না। চোখ কানের মাথা খেয়ে বাস্তবকে দিব্যি অস্বীকার করে বসে।
অবশ্যই ‘ফস্’ শব্দ একটা ছিল। শ্মশানে ছবি তোলার। একটা লাঠির আগায় বসানো থাকত একটা বাটি। তাতে কী দেওয়া হত ভগবান জানে। হয়তো লোহাচুর। একটা কাঠির মুখে আগুন দিয়ে বাটিটার মুখে ছোঁয়ালেই ‘ফস্’ করে জ্বলে উঠত। সেহু আলোয় ছবি তোলা হতো।
অন্তুর ছেলেবেলায় সাধারণ মানুষের ছবি একবারই উঠত। বেঁচে থাকতে নয়, মরে গেলে। সেই সুবাদেই অন্তুর স্মৃতি ‘ফস্’ শব্দটাকে ধরে রেখেছে।
অন্তু, অন্তু, অন্তু! অন্তু কি তোমার ইয়ার?
মাপ করবেন, একজন প্রবীণ লোককে আমি এতক্ষণ বেআক্কেলের মতো স্রেফ নাম ধরে ডেকে গিয়েছি। শুধু প্রবীণ কেন, কোনো প্রমাণ সাইজের লোককেই সচরাচর এভাবে বলাটা ঠিক আদব নয়।
যাঁকে অন্তু বলছি, তিনি একজন ছোকরা হলেও কথা ছিল। কিংবা লেখক যদি তাঁর গুরুজন কিংবা সমবয়সী হতেন। তা নয়। লেখক তো এখানে নৈর্ব্যক্তিক। তিনি হলেন সাংখ্যের পুরুষ। অন্তত সাহিত্যে সেটাই প্রশস্ত। কাজেই টেকো মাথার যে ভদ্রলোক, চুলে কলপ দিয়ে বয়স ভাঁড়ানো সত্ত্বেও সরকারি চাকরি থেকে যাঁকে অবসর নিতে হয়েছে, যাঁর আর এখন শাদা চুল ঢাকবার এবং রোজ দাড়ি কামাবার আদৌ কোনো তাগিদ না থাকায় চেহারাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে অতি ক্যাডাভ্যারাস, সেই অনন্তনারায়ণ দত্ত, বেঁকে পাড়ার লোকে অনন্তবাবু, আপিসের সহকর্মীরা দত্তবাবু বা বড়বাবু বলতেন এবং যাঁকে অন্তু বলে ডাকার লোক কমতে কমতে ঘরে বাইরে মাত্র দুচারজনে এসে ঠেকেছে—অগত্যা তাঁকে আমি এখন থেকে অনন্তনারায়ণ বলবারই অভ্যেস করব। যদি একটু-আধটু ভুল করে ফেলি, আশা করি পাঠাকরা নিজগুণে লেখককে ক্ষমা করে দেবেন।
তা অনন্তনারায়ণ যখন উত্তরদিকের দেয়ালে একটা টিকটিকির পোকা শিকার দেখতে দেখতে চোখদুটো একটু টঙের দিকে তুলেছেন। হঠাৎ দেয়ালটা তাঁর কাছে কেমন যেন শাদা শাদা ঠেকল। সেইসঙ্গে মনের মধ্যে কেমন একটা কির্ কির্ করার ভাব। চুনকাম-করা দেয়াল শাদা হবে না তো কী! না, তা নয়। তবে একটা যেন কী। কী যেন নেই।
আর তারপরই যে কথাটা মনে পড়ে গিয়ে অনন্তনারায়ণের বুক ধড়াস ধড়াস করে উঠল, সেটা হল তাঁর বাবার এনলার্জ-করা একটা বড় বাঁধানো ছবি। ছবিটা নেই। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চোখ কপালে উঠে পশ্চিমদিকের দেয়ালে ঠিক এমন জায়গায় গিয়ে ঘা খেল, যেখানে আরো একটা বড় বাঁধানো ছবিতে উত্তরমুখো হয়ে আছেন স্বর্গাদপি গরীয়সী তাঁর গর্ভধারিণী মা। তাঁর মা-র চোখে কেমন যেন একটা ফ্যাল ফ্যাল করা চাহনি। সোজা পশ্চিমের দেয়ালের ফাঁকা জায়গাটার দিকে তাকিয়ে কুপুত্র অনন্তনারায়ণকে যেন তিনি ভর্ৎসনা করছেন।
অনন্তনারায়ণ এমন ফ্যাসাদে জীবনে পড়েন নি। আরো একটা কথা মনে পড়ে গিয়ে তাঁর অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। আজ অমাবস্যা। আর চারদিন পরেই তাঁর বাবার মৃত্যুতিথি। তাঁর এক বোন আর এক ভাই এই শহরেই থাকে। সারা বছর তেনাদের টিকি দেখা যাবে না বটে, কিন্তু বাবার মৃত্যুতিথিতে ঠিক এসে হাজির হবে। তাও কি, একেবারে ছানাপোনাসুদ্ধু সপরিবারে। দাদাবউদিকে বিজয়ার প্রণামটাও ওই একই দিনে তারা সেরে নেবে। সঙ্গে আনবে বাবার জন্য দুটাকা দামের একরত্তি চিম্সে-পড়া মালা। ওদের লজ্জা দেবার জন্যে অনন্তনারায়ণ করকরে পাঁচটা টাকা খরচ করে একটা মালা এনে বাবার গলায় পরিয়ে রাখেন। কিন্তু লজ্জা পাবার মতোন বুদ্ধি ওদের ঘটে থাকলে তো! পরের বারও ফের সেই দুটাকা দামের মালা। বোন হল সেজো। তার স্বামী করে লোহালক্কড়ের ব্যবসা। কিন্তু স্বামীটি হাড়কঞ্জুষ। অনন্তনারায়ণের ছোট ভাইটিও আর এক। অর্ডার সাপ্লাই করে তারও আয় নিতান্ত মন্দ নয়। ও হয়তো ভাবে, বেশি টাকা দামের মালা আনলে দাদাকে হয়তো ছোট করা হবে। আহা, দাদার তো সামর্থ্য বেশি নয়। তার ওপর এখন তো পেন্সন একমাত্র ভরসা। হুঁঃ ছাড়ো তো! তোমরা আর আমাকে ভাই চিনিও না। তাই যদি হবে, জন্মের মধ্যে কম্ম বছরে একদিন—একদিনও তো দাদাবউদির জন্যে ভালোমন্দ কিছু একটা আনতে পারে। উলটো একটা বেলা গুষ্টিসুছ এসে অনন্তনারায়ণকে ওরা খেয়ে ফতুর করে দিয়ে যায়। যাকগে যাক, যাগকে ওসব। কথায় শুধু কথা বাড়ে।
তবু ভালো যে, মালার দামটা ওরা কম রেখেছে। যদি ওরা পাল্লা দিয়ে দাদাকে টেক্কা দেবার এতটুকু চেষ্টা করত, তাহলে আর অনন্তনারায়ণকে দেখতে হত না। সেটা হত নির্ঘাৎ মড়ার ওপর খাড়ার ঘা।
এখন ওরা এসে যদি দেখে (ভাবতেও অনন্তনারায়ণের গা শিউরে উঠল!) বাবার ফটোটারই কোনো পাত্তা নেই, তাহলে আত্মীয়স্বজনদের কাছে অনন্তনারায়ণের আর মুখ দেখাবার কোনো উপায় থাকবে না। সবার কাছে তাঁর পরিচয় হবে বংশের কুলাঙ্গার বলে।
পুরোনো কিছু কথা মনে পড়ে গিয়ে অনন্তনারায়ণের যে কী আফশোস হছিল বলার নয়। দক্ষিণের শহরতলিতে পৈতৃক ভাড়াবাড়িতে থেকে যাওয়াটাই হয়েছে তাঁর কাল। ভাড়াটা কম বলে তিন মেয়ের বিয়ে দিয়ে ঝাড়া হাত-পা হয়ে সংসারের হাল আজও কোনোমতে তিনি ধরে রাখতে পেরেছেন। কিন্তু তিনি যে কোনো বিষয়-আশয় করে উঠতে পারেন নি, তারও জন্যে দায়ী এই কম ভাড়ার পৈতৃক ভাড়াটে বাড়ি। চলে তো যাচ্ছে, আর কেন—এই একটা ভাব তাঁর সমস্ত উদ্যম নষ্ট করে দিয়েছে। তাঁর বয়সী সবাই চাকরি করতে করতে ব্যবসার লাইনে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিয়েছে। এখন তারা সবাই প্রায় বাড়িগাড়ির মালিক।
তবে এটা বলতেই হবে যে, অনন্তনারায়ণের ভাইরা অন্য অনেকের ভাইদের চেয়ে শতগুণে ভালো। তারা সবাই বিয়ে-থা করার পরই যে যার আলাদা হয়ে গেছে। পৈতৃক আসবাবপত্র সুদ্ধু ভাড়াবাড়িটা অনন্তনারায়ণ যে নির্ঝঞ্ঝাটে ভোগদখল করতে পারছেন, সেও তো নেহাতই তাঁর ভাইদের কৃপায়। তারা অনায়াসে এ সবের ভাগ চেয়ে বসতে পারত। কিন্তু তারা তা করে নি।
ফলে, পৈতৃক যা কিছু উত্তরাধিকার তার মালিক হয়েছেন একা অনন্তনারায়ণ। সেটা কম নাকি!
বাবা মারা যাওয়ার পর অনন্তনারায়ণ তাঁর বাবা আর মা দুজনেরই ছবি আলাদা করে এনলার্জ করিয়েছিলেন। কিন্তু মূল ফটোটা দোকান থেকে চেয়ে নিতে তিনি ভুলে গিয়েছিলেন। ফলে, যেটা দাঁড়িয়েছে তা এই যে, ওই এনলার্জমেন্ট দুটোই দুনিয়ায় থেকে যাওয়া তাঁদের একমাত্র ছবি। অনন্তনারায়ণ এই সময় চেয়ারে সরে নড়ে বসায় বোঝা গেল যে, একথা মান করে তিনি বেশ বিচলিত বোধ করছেন।
এতক্ষণে বাঝর ছবিটা তাঁর মনের মধ্যে জ্বলজ্বল করে উঠেছে। আঁকার হাত থাকলে তিনি এমনকি এঁকেও ফেলতে পারতেন। রং ময়লা হলেও গুম্ফমণ্ডিত ভারি সৌম্য চেহারা ছিল তাঁর বাবার। অনন্তনারায়ণ তাঁর শালার ছাপাখানা থেকে বিনা পয়সায় দুটি পঙ্তি ছাপিয়ে নিয়ে ছবির তলায় জুড়ে দিয়েছিলেন—“পিতা স্বর্গঃ পিতা ধর্ম পিতা হি পরমন্তপঃ। পিতরি প্রীতিমাপন্নে প্রিয়ন্তে সর্বদেবতাঃ।।” ফাঁকা দেয়ালে পুরো ছবিটাই তিনি মনশ্চক্ষে দেখতে পাচ্ছেন।
এনলার্জ করে ছবি বাঁধানো তখন কত কম খরচে হত। এখন হলে? অনন্তনারায়ণের ঢাকের দায়ে মনসা বিকোনোর দশা। বাবা-মা-র ম্মৃতি ধরে রাখার আত্মপ্রসাদ হঠাৎ এইখানে এসে অনন্তনারায়ণের ঠোঁটের ফাঁকে মিলিয়ে গেল। তাঁর একটিই ছেলে। কলেজে পড়ে। খুব একটা মেধাবী নয়। তার ওপর রাজনীতির চক্করে পড়ে পড়াশুনো আরো ডকে উঠেছে। কেরিয়ার করার দিকে কোনো নজরই নেই। তার মানে, ভবিষ্যতে কখনো অনন্তনারায়ণের ফটো এনলার্জ করে বাঁধানো হবে বলে মনে হয় না। তাছাড়া যে ছেলে বিজয়ার পরেও বাপ-মায়ের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে না, ঠাকুরদেবতায় যার বিশ্বাস নেই—তার কাছ থেকে সেসব আশা করাই ভুল। এইখানে অনন্তনারায়ণ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ঢোঁক গিললেন।
ভাইবোনদেরও বলিহারি। বাবা-মা-র ছবি দুটো থেকে কপি করে নিয়ে অনায়াসে তারা নিজের নিজের কাছে রাখতে পারত। দাদাবউদির সঙ্গে সম্পর্কের সব পাটও তারা এইভাবে চুকিয়ে দিতে পারত। তা নয়। ওরা দত্তবংশের স্মৃতির সব বোঝা দাদার ঘাড়ে চাপিয়ে নিজেরা গায়ে ফুঁ দিয়ে বেড়াতে চায়। কেন যক্ষ হয়ে তাঁকেই সব আগলাতে হবে? পৈতৃক ভাড়াবাড়িতে থাকতে পারার এটা কি মাশুল?
কপালে একটা মশা বসেছিল। অনন্তনারায়ণ হাতের চেটো দিয়ে সেটা মারলেন। দূর থেকে দেখলে কেউ এটাকে কপাল চাপড়ানো বলে মনে করতে পারত।
বাড়ির বড়ছেলে হওয়ার ঝকমারি অনেক। ভাইবোনেরা তো জ্ঞান হয়ে ঠাকুরদাকে দেখে নি। অনন্তনারায়ণ ছিলেন ঠাকুর্দার অন্ধের নড়ি। ছোটবেলায় সব সময় তাঁকে ঠাকুর্দার ছায়া হয়ে থাকতে হত। শ্রীকৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম থেকে শুরু করে নানক, কবির, তুলসীদাসের দোঁহা—ঠাকুর্দার পাল্লায় পড়ে তাঁকে মুখস্থ করতে হয়েছিল।
তার চেয়েও বড় কথা, ঊর্ধ্বতন সাত পুরুষের নাম, শ্রেণী, গোত্র—রোজ সকালে উঠে আওড়াতে হত। এসব অত্যাচার তো আর কাউকে সইতে হয় নি। তবে?
ওরা তো ছবিতে বছরে একদিন মালা দিয়েই খালাস।
আজ তিরিশ বছর ধরে দাদা যে ভারবাহী পশুর মতো একা পূর্বপুরুষদের স্মৃতির বোঝা বইছে, সে কথা একবার কেউ ভুলেও বলবে না। উলটে দেয়ালটা ফাঁকা দেখে চোখ কপালে তুলে সবাই নাটুকে গলায় বলে উঠবে—ছবি? বাবার ছবি?
না। সত্যিই, ব্যাপারটা খুবই অস্বস্তির হবে। তাছাড়া অনন্তনারায়ণ জানেন, ওদের বউদিও তখন ওদের তালে তাল দেবেন। বলবেন আমি তখনোই বলেছিলাম, পই পই করে বলেছিলাম ইত্যাদি। তাতে অনন্তনারায়ণের প্রেস্টিজ আরো ঢিলে হয়ে যাবে।
অনন্তনারায়ণ বুঝলেন, এবার একটা কিছু না করলেই নয়। আজ যখন শনিবার, আজকেই কিছু একটা বিহিত করতে হবে। নইলে এরপর খুবই দেরি হয়ে যাবে।
যেই ভাবা সেই কাজ। অনন্তনারায়ণ আসল কালপ্রিটকে চিঠি লিখতে বসলেন। ‘আসল কালপ্রিট’ বলতে শঙ্কর। তাঁর এক বন্ধুপুত্র। লিখলেন:
শঙ্কর বাবাজীবন,
তোমার হয়তো মনে আছে, আজ বৎসরেক হইতে চলিল তুমি এক মাসের কড়ারে আমার পিতৃদেবের একটি এনলার্জড্ ফটো নিয়া গিয়াছিলে আমাকে উহা হইতে একটি অয়েল পেন্টিং তৈরি করিয়া উপহার দিবে বলিয়। তোমর আরো ইচ্ছা ছিল, ওই একই সঙ্গে আমার মাতৃদেবীর ফটোটিকেও অয়েল পেন্টিঙের রূপ দিবার। কিন্তু রোগা শরীরে তোমার নিতে কষ্ট হবে ভাবিয়া এবং আমাদেরও ঘর ফাঁকা হওয়ার ভয়ে সেদিন তোমার ইচ্ছা পূরণ করিতে পারি নাই। তারপর বেশ কয়েক মাস কাটিয়া গিয়াছে, ওখানকার কয়েকজনকে দিয়া খবরও পাঠাইয়াছি। কিন্তু বাবা, আর আমার পক্ষে তো অপেক্ষা করা চলে না। আগামী বুধবার আমার বাবার মৃত্যুবার্ষিকী। বাড়িতে লোকজন আসিবে। মঙ্গলবার রাত্রর মধ্যেই ফটোটি আমার চাই। তোমার বাবা-মা-কে আমার ভালোবাসা দিও। আর কি।
ইতি—
আশীর্বাদক
শ্রীঅনন্তনারায়ণ দত্ত
চিঠিঢা শেষ করে অনন্তনারায়ণের মেজাজটা বেশ ভালো হল। এ রকম হয়। অনেকদিন ধরে কোনো কাজ করব করব ভেবে ফেলে রাখার পর যখন সেটা করা হয়ে যায় তখন তার একটা অদ্ভুত তৃপ্তি আছে। কাজটার ফলাফল যাই হোক না কেন।
চিঠিটা লেখার পর অন্দরমহলের দিকে তাকিয়ে অনন্তনারায়ণ একটা হুঙ্কার ছাড়লেন—‘ও গো শুনছ!’
আঁচলে-বাঁধা চাবির গোছাটা কাঁধের ওপর ফেলতে ফেলতে অনন্তনারায়ণের স্ত্রী ঘরে ঢুকলেন।
গিন্নীর এই চাবির গোছাটা দেখে অনন্তনারায়ণ, প্রকাশ্যে নয়, কিন্তু মনে মনে হাসেন। চাবি বলতে একটা খিড়কির দরজার, একটা রান্নাঘরের, একটা সেলাইয়ের কলের, টেবিলের দুটো দেরাজের, একটা কাপড়চোপড়ের আলমারির আর সেই সঙ্গে বহুদিন আগে গত হওয়া কয়েকটা টেপা-তালার—ব্যস, এই হল ওঁর অস্থাবর সম্পত্তির পাহারাদার। আলমারির যে আধখানায় টুকিটাকি জিনিশপত্রের সঙ্গে ড্রয়ারে রোজকার খরচের টাকাপয়সা থাকে, সেটাতে কোনো চাবি নেই। সব সময় খোলা। গহনাটি তো নেই। সেই বিয়ের সময় যা পেয়েছিলেন। কম নয়। তিন মেয়েকে পার করতেই সে-সব খরচা হয়ে গেছে। অনন্তনারায়ণ চটাস করে আরেকটা মশা মারলেন। এবারো সেটা নিজের কপাল চাপড়ানোর মতো দেখাল।
অনন্তনারায়ণের স্ত্রী বরাবরই একটু উগ্রপন্থী। বেশ মন দিয়েই তিনি চিঠির বয়ানটা শুনলেন।
এরপর দুজনের মধ্যেই কথোপকথনটা হল এই রকমের :
‘তৈরিই বটে! তা ওর হাতুড়ি বাটালি আছে তো?’
অনন্তনারায়ণ একটু দ্বিধায় পড়লেন। শ্লেষটা ঠিক কাকে লক্ষ্য করে বুঝতে না পেরে, বললেন, ‘আর্টিস্ট তো, কাজেই ওটা কেটে ‘আঁকিয়া’ করাই ভালো। হ্যাঁ, আর্ঢিস্টদের আবার বড্ড অভিমান। একটু সরে বসতে বলার উপায় নেই।’
‘উপহার কথাটা কোথা থেকে পেলে? শঙ্কর বলেছিল তোমাকে?’
‘না মানে, কোনো ভুল বোঝাবুঝি না হয় সেইজন্যেই কায়দা করে কথাটা জুড়ে দিলাম আর কি।’ অনন্তনারায়ণ এখানে একটু মিথ্যের আশ্রয় নিলেন। আসলে শঙ্কর তাঁকে ছবিটা বিনা পয়সায় এঁকে দেবে আগাগোড়া এটাই তিনি ধরে নিয়েছিলেন। তাই এ বিষয়ে তাঁর মনে কোনো চিন্তাই ছিল না। উপহার কথাটা তাঁর কলমের ডগায় এসে গিয়েছিল নেহাৎই সৌজন্যের সূত্রে।
অনন্তনারায়ণের স্ত্রী একটু হাসলেন। মুখে না বললেও, ভাবখানা এই—‘তোমাকে আমি চিনি না? তোমার যদি সেই আক্কেলই থাকবে, তাহলে এতদিনে মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই হয়ে যেত নিজেদের। তাহলে আর এভাবে রোজ দুবেলা বাড়িওয়ালার লাথিঝাঁটা খেতে হত না। পৈতৃক ভাড়াবাড়ি বলতে লজ্জা করে না তোমার? বাড়ি হবে হয় পৈতৃক, নয় ভাড়াটে। তা নয়, পৈতৃক ভাড়াবাড়ি! এ যেন সোনার পাথরের বাটি। ছিঃ।’
আর শেষটায় মুখটা একটু তেতো করে বললেন, ‘মঙ্গলবার রাত্রের মধ্যেই চাই জব্বর লিখেছ। আমি বলি কি, চিঠিটা ডাকবাক্সে ফেলে দিয়ে এসে চোখ বুজে বসে থাকো। শ্বশুরমশাইয়ের ছবিটা আড়াল থেকে উড়ে এসে ঠিক দেয়াল জুড়ে বসে যাবে।’
মেয়েদের বাস্তব বুদ্ধি সত্যিই বেশি। নৈর্ব্যক্তিক ‘চাই’ লেখাটা মোটেই কাজে আসবে না। নিজের ভুল বুঝতে পেরে অনন্তনারায়ণ ‘আমার চাই’ কেটে ইলেক দিয়ে ওপরে লিখলেন, ‘এ বাড়িতে পৌঁছাইয়া দিবে।’ অনন্তনারায়ণের মনে হল, ‘বাড়ি’ না লিখে ‘বাসা’ লেখাটাই উচিত ছিল। যাকগে মরুকগে, ও নিয়ে অত খুঁতখুঁত করে লাভ নেই। বরং ওর পাশে আরেকটু জোর দিয়ে অনন্তনারায়ণ যোগ করলেন : ‘এর অন্যথা না হয়।’
চিঠিতে অত কাটাকুটি থাকলে লেখকের দ্বিধা বা সংশয় প্রকাশ পেতে পারে। এই আশঙ্কা করে অনন্তনারায়ণ পুরো চিঠিটা একটু না কেটে আবার গোটা গোটা করে লিখলেন।
তারপর স্ত্রীকে ডেকে বললেন, ‘দরজাটা বন্ধ করে দাও। আমি একটু বেরোচ্ছি একবার শ্যামবাজারে যাব। ফিরতে দেরি হতে পারে।’
অনন্তনারায়ণকে বাইরে রেখে দরজাটা বন্ধ করার আগে তাঁর স্ত্রী, সম্ভবত না জেনেই, হঠাৎ একটা বোমা ফাটিয়ে বসলেন।
‘শঙ্কর শুনেছিলাম নকশাল হয়ে গিয়েছিল। ছবিটবি আঁকে ঠিক আছে। কিন্তু তোমার সঙ্গে ও নকশা না করে থাকলেই ভালো।’
দরজাটা ভাগ্যিস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং অনন্তনারায়ণ আগে থেকেই সিঁড়ির রেলিংটা শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন। ফাল অনন্তনারায়ণের মুখের চেহারায় মুহূর্তে কী পরিবর্তন এসেছিল তাঁর স্ত্রীর সেটা চোখে পড়ে নি এবং অনন্তনারায়ণও মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার হাত থেকে নিজেকে সামলে নিতে পেরেছিলেন।
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতেই, তাঁর গন্তব্য সম্পর্কে অনন্তনারায়ণ মনস্থির করে ফেলেছিলেন।
কালীঘাট স্টেশন বেশি দূরে নয়। টিকিট কেটে আপ ট্রেনে উঠে জানলার ধারে বসে তাঁর প্রথম কাজই হল পকেট থেকে চিঠিটা বার করে কুটি কুটি করে ছিঁড়ে ফেলা।
মনে মনে তিনি হিশেব করে নিয়েছিলেন যে, আসা-যাওয়া নিয়ে মোট ঘণ্টাতিনেক লাগাবে। তাছাড়া দেরি হওয়ার কথা বাড়িতে তো বলাই আছে।
স্ত্রীর কথা শোনার পর থেকেই তাঁর ভয়টা এখন আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। ছবিটা নিয়ে আসার পেছনে শঙ্করের সত্যিই কি কোনো চাল ছিল? পূর্বপুরুষদের মুছে দেওয়ার একটা গূঢ় দুরভিসন্ধি? পেছনটাকে একেবারে বরবাদ করে শুধু সামনের দিকে মানুষের মুখ ঘুরিয়ে দেওয়ার? কামপুচিয়ায় পলপতের দল যা করতে চেয়েছিল? সেইজন্যে একই সঙ্গে বড় করে বাঁধানো সব ফটোই সে নিয়ে যেতে চেয়েছিল?
একটার পর একটা চিন্তা স্রোতের মতো বয়ে চলেছে। অনন্তনারায়ণ তাতে কুটোর মতো ভাসছেন। মাঝখানে সিগনাল না পেয়ে বেশ খানিকক্ষণ আটকে পড়ায় ট্রেনটা লেট রান করছিল। ফলে, মাঝপথেই সন্ধে হয়ে গেল। তার মানে, শঙ্করদের বাড়িটা রাত্তিরে খুঁজে বার করতে একটু কষ্ট হবে। তা হোক। তার চেয়েও বড় কথা, ওদের বাড়িতে পৌঁছুনো। অবশ্য কপালে যে কী নাচছে কেউ জানে না।
স্টেশনটা এসে যেতেই অনন্তনারায়ণ হুটপাট করে নেমে পড়লেন। যখন তিনি বেরিয়ে যাবার গেটের একেবারে মুখে, ঠিক সেই সময় ফস্ করে সমস্ত আলো নিভে গেল।
তীরে এসে তরী ডুবলে যা হয়, অনন্তনারায়ণের তখন সেই অবস্থা।
এখন উপায়? ঘুট ঘুট করছে অন্ধকার। তার ওপর অনন্তনারায়ণের মনে পড়ল, আজ অমাবস্যা। লোডশেডিঙের সবে শুরু। কখন শেষ হবে কেউ বলতে পারে না। এটা তো শহরতলি। কাজেই সারারাত আলো না এলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।
অনন্তনারায়ণ যে অন্ধকারেই টুকুস টুকুস করে হেঁটে যাবেন তাও সম্ভব নয়। কারণ, এখানকার রাস্তাঘাট তাঁর মোটেই সড়গড় নয়।
সুতরাং পিছু হঠা ছাড়া এখন আর কোনো উপায় নেই। এর পরের ফেরার ট্রেন এখুনি এসে যাবে। যাতায়াতী টিকিটের পয়সাটাই যা জলে গেল।
একেবারে জলে গেল না। কেননা, ফেরার পথে আবার সেই জানলার ধারে বসার ফলে হাওয়া লেগে হঠাৎ তাঁর মাথাটা খুলে গেল।
আসছে বুধবার তাঁর এক বিশেষ বন্ধু মল্লিকপুরে আরোগ্যভোজনের নেমন্তন্ন করায় বাড়িতে তালা দিয়ে সপরিবারে তাঁকে চলে যেতে হবে। শেষ ট্রেনের আগে ফেরা যাবে না। ছেলে যদি যেতে না চায় ওর দিদির বাড়িতে ও যেন খেয়ে নেয়।
মৃত্যুতিথিটা কাটিয়ে দেওয়ার পর বাবার ছবির কথা আবার ভাবা যাবে।
অনন্তনারায়ণের স্ত্রী যা ঢ্যাঁটা। উনি এখন রাজি হলে হয়।
একপ্রস্থ খরচ আর খাওয়ানো-দাওয়ানার হাঙ্গামা থেকেও বাঁচা যাবে বইকী।
তাঁর স্ত্রী এই টোপটা এখন গিললে হয়।