বাবরি মসজিদ ধ্বংস করার পর তিন দশক পার হয়ে গেল। ‘কর সেবক’রা ৩০ বছর আগে ৬ ডিসেম্বর ১৬ শতকের তৈরি বাবরি মসজিদ ধ্বংস করেছিল। ধ্বংসকারীদের দাবি ছিল, এটা অযোধ্যা, রামজন্মভূমি, এখানে রামমন্দির ছিল, তাহলে এখানে মসজিদ কেন? বস্তুত, সেদিন থেকেই বিজেপি তথা আরএসএস-রা অত্যন্ত সচেতনভাবেই ধর্মনিরপেক্ষ এই দেশটাকে হিন্দুয়ানিতে মুড়ে হিন্দু ধ্বজাধারী মৌলবাদীদের হাতে তুলে দেওয়ার শপথ নিয়েছিল। ক্রমেই তাদের হিন্দুয়ানি এবং ধর্মীয় সন্ত্রাস বাড়তে শুরু করে। হোক না আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর সময় বিজেপির হিন্দুত্বের তাস নিয়ে খেলা চলছে। আর সেই খেলা যত দিন যাচ্ছে, ততই বাড়ছে, চড়ছে আরএসএসের হিন্দুত্বের আস্ফালন।
সেই সময় কংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিমা রাও কড়া মনোভাব দেখালে হয়ত বাবরি ভাঙা এড়ানো যেত — এমন কথা বেশ কিছু কাল কতিপয় সিপিএম নেতার মুখে শোনা গিয়েছিল। তাঁদেরই কথা অনুযায়ী, ১৯৯২ সালের ২৩ নভেম্বর জাতীয় সংহতি পরিষদের বৈঠকে প্রয়াত সিপিএম নেতা জ্যোতি বসু এবং হরকিষেণ সিং সুরজিত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে ৩৫৬ ধারা প্রয়োগ করে কল্যাণ সিংয়ের নেতৃত্বাধীন উত্তরপ্রদেশ সরকারকে বরখাস্ত করার দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিমা রাও ওই দুই সিপিএম নেতাকে জানান, কোনও হাঙ্গামা হবে না বলেই হিন্দুত্ববাদীরা দেশের সর্বোচ্চ আদালতকে আশ্বস্ত করেছে। কিন্তু গোটা বিশ্ববাসী সেদিন টেলিভিশনের পর্দায় শান্তির নমুনা দেখেছিলেন। শান্তিপ্রিয় করসেবকরা কতটা শান্তি বজায় রেখেছিল তাও দিনের শেষে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল।
একদিকে বাবরি মসজিদ ধ্বংস আর তার অব্যবহিত পরেই দেশজোড়া দাঙ্গায় খুন হয় ২ হাজারেরও বেশি মানুষ। তাতেও শান্তির বাতাবরণ থেমে যায়নি। পরিকল্পিত ও সংগঠিতভাবে দাঙ্গা লাগানো হল গুজরাটে। তৎকালীন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সরকারের হিসাব অনুযায়ী সেই দাঙ্গায় ৭৯০ জন মুসলমান খুন হয়েছিল। গুরুতর আহত হয়েছিল ২,৫০০ জন, ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল ২০ হাজার মুসলমানের ঘরবাড়ী। দেড় লক্ষাধিক মানুষ নিজের বাড়ী-ঘর-পাড়া ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। যদিও দাঙ্গা নিয়ে গঠিত ট্রাইব্যুনাল জানায়, ১,৯২৬ জনকে খুন করা হয়েছিল। তার মানে কি সেটি দাঙ্গা ছিল না, পরিকল্পিত ও সংগঠিত গণহত্যা ছিল? মনে হয় এসব কথা বহু আলোচনায় আজ ক্লিশ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু বিজেপি-আরএসএস-এর লক্ষ্য হিন্দু মৌলবাদী ও সন্ত্রাসবাদীদের নিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতবর্ষকে দাঙ্গা-সন্ত্রাস বিধ্বস্ত দেশে পরিণত করা। সেই লক্ষ্য পূরণ করতে, শান্তি ও গণতন্ত্র ধ্বংস করতে তারা সেদিন থেকেই সক্রিয় হয়ে ওঠে। অথচ ২০২০-র ৩০ সেপ্টেম্বর লখনউ-এ সিবিআই-এর বিশেষ আদালত, ২৮ বছরের পুরনো মামলার রায়ে বাবরি মসজিদ ধ্বংস মামলায় মূল অভিযুক্ত ৪৯ জনকে বেকসুর মুক্তি দেয়। আদালতের বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার ২,৩০০ পাতার রায়ে জানান, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সঙ্গে লালকৃষ্ণ আদবানি, মুরলী মনোহর যোশী, কল্যান সিং, উমা ভারতী-সহ ৪৯ জনের কেউ যুক্ত ছিলেন না। এর মধ্যে ১৭ জন অবশ্য মামলা চলাকালীন অবস্থায় প্রয়াত হন। এমনকি এই ধ্বংস করার কাজ পূর্ব পরিকল্পিত বা ষড়যন্ত্রও নয়। বিচারপতি এও জানান, ওটা হঠাৎ ঘটে যাওয়া স্বতঃস্ফূর্ততার ফল। উন্মত্ত জনতাই এই ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছে। যার পিছনে সমাজবিরোধীদের হাত ছিল। অভিযুক্তরা বরং মসজিদ ভাঙায় বাধা দেওয়ারই চেষ্টা করেছিলেন। তার মানে আরএসএস বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কেউই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মসজিদ ধ্বংসে অংশগ্রহণ করেনি।
কিন্তু আদালত বা বিচারপতির কাছে এই প্রশ্ন রয়েই যায়, তাহলে সেদিন আচমকাই দেড় লক্ষাধিক লোক নিজেরাই বাবরি মসজিদে শাবল, গাঁইতি, কোদাল, বিশাল বিশাল দড়ি নিয়ে জড়ো হয়ে গিয়েছিল? ওই বিশাল সংখ্যক লোকজনকে কেউ বা কোনও রাজনৈতিক দল সংগঠিত করেনি, কোনও মৌলবাদী সংগঠন মসজিদ ভেঙে দেওয়ার জন্য তাদের প্ররোচনা দেয়নি বা প্রভাবিত করেনি? তারা সংগঠিত হল এবং ওই বিশাল কর্মকান্ড সম্পন্ন করতে সফলও হল। অথচ ওই দিনের জন্য অর্থাৎ ৬ই ডিসেম্বর বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী শক্তি বা দল আগেই দেশের সর্বোচ্চ আদালতে হলফনামা দিয়ে তাদের ডাকা সমাবেশ শান্তিপূর্ণই থাকবে, এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে সমাবেশ করার অনুমতি চেয়েছিল কেন? দেশের সর্বোচ্চ আদালত এখানে রামমন্দির তৈরির অনুমতি দিয়েছে। শুরুও হয়েছে সেই নির্মাণ। এখন নাকি সেই এলাকায় শান্তি বিরাজ করছে, কেবল আজকের দিনটির জন্য বিশেষ নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাম মন্দির কমপ্লেক্সের আশেপাশে পুলিশদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
হিন্দু বা মুসলিম কোনো সম্প্রদায়ের মানুষই আজ আর এ নিয়ে বেশি উৎসাহী নয়।