মাত্র দেড় মাস আগের কথা। ফেসবুকে রাজনীতি ছাড়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন তিনি। এমনকি সাংসদ পদও ছাড়তে চেয়েছিলেন। শেষমেশ সাংসদ পদে থেকেই তিনি রাজনীতিকে বিদায় জানিয়েছিলেন। অনেকেই তখন তাঁর আচরণকে নাটক বলে অভিহিত করেছিলেন। এমনকি তৃণমূলেরও কেউ কেউ। কিন্তু বাবুল সুপ্রিয় সব আলোচনা সমালোচনা উল্টে দিলেন। তৃণমূলে যোগ দিয়ে বললেন, বাংলার কাজের জন্য বড় সুযোগ এসেছে, তা হাতছাড়া করতে চাইনি। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে উত্তরীয় গলায় পরে তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন বাবুল সুপ্রিয়। তারপর তৃণমূলের রাজ্যসভার দলনেতা ডেরেক ও’ব্রায়েনকে পাশে নিয়ে সাংবাদিক বৈঠক করে তিনি জানিয়ে দিলেন, বিজেপিতে কাজ করার মতো কোনও সুযোগই পাচ্ছিলেন না তিনি। হঠাৎ করেই তৃণমূলের কাছ থেকে কাজের বড় সুযোগ পেয়ে গেলেন। তাই সিদ্ধান্ত বদলে ফেললেন।
কি সেই সুযোগ— তিনি কি মমতার মন্ত্রিসভায় জায়গা পাচ্ছেন? তাই কি রাজনীতি ছাড়ার সিদ্ধান্ত বদল করে বাবুলের তৃণমূলে যোগ দিলেন, আর তাকেই কি তিনি ‘বড় সুযোগ’ বলে জানাচ্ছেন? তৃণমূলও কি বাবুল সুপ্রিয়কে সেই সুযোগ দিচ্ছে? তবে আচমকাই অর্পিতা ঘোষকে সাংসদ পদ থেকে সরিয়ে সংগঠনে আনা হয়েছে। বাবুল সুপ্রিয়কে কি তবে অর্পিতা ঘোষের জায়গায় রাজ্যসভায় পাঠানো হবে? এরকম বেশ কিছু প্রশ্ন এখন রাজনীতির উঠোনে এসে হাজির হয়েছে। তা নিয়ে শুরু হয়ে গিয়েছে জোর চর্চা। বাবুলের জায়গায় যদি অন্য কাউকে রাজ্যসভায় পাঠানো হয়, তাহলে বাংলায় কাজের জন্য ‘বিরাট সুযোগ’ কথাটা বাবুল কেনই বা বলবেন।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মত, বাবুলকে যদি রাজ্যসভায় পাঠানো হয়, সেটা তো নতুন কিছু ঘটার নয়। বাবুল নিজে জানিয়েছেন, সোমবার দুপুর তিনটেয় যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর মিলে যাবে। বাবুলের পাশাপাশি ডেরেক ও’ব্রায়েনও সোমবার পর্যন্ত অপেক্ষা করার কথা বলেছেন। দেড় মাস আগে যিনি রাজনীতি থেকে সন্ন্যাস নেওয়ার কথা বললেন তিনি কেন হঠাৎ তৃণমলে যোগ দিলেন এবং সেটাকে বড় সুযোগ বললেন, তার উত্তর পেতে যেমন আটচল্লিশ ঘন্টা অপেক্ষা করতে হবে অথাবা বাবুলকে তৃণমূল সত্যি কতটা বড় সুযোগ দিয়েছে যা তিনি হাতছাড়া না করে দেড় মাসের মধ্যে মত বদল করে ফের রাজনীতিতে ফিরে এলেন তার উত্তর দেবে ভবিষ্যৎ।

প্রসঙ্গত, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে বাবুল সুপ্রিয় ও দেবশ্রী চৌধুরীকে বাদ দেওয়ার পরেই তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, ওরা আবার কি দোষ করলো? আপাতদৃষ্টিতে তাঁর করা এই মন্তব্যটি ছিল ছোট্ট, কিন্তু তার মধ্যে একটু বড় ইঙ্গিত যে আছে সে কথাও কিন্তু কোনও কোনও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছিলেন। তাঁদের ব্যাখ্যা ছিল, মুকুল রায়ের তৃণমূলে প্রত্যাবর্তনের আগে নির্বাচনের প্রচারের সময়েও তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঠিক এমন একটি ছোট্ট মন্তব্য করেছিলেন— ‘শুভেন্দুর থেকে মুকুল ভালো’। সেই মন্তব্য যে কতখানি ইঙ্গিতবাহী তা পরবর্তীতে বোঝা যায়। ভোট শেষ হতে না হতেই মুকুল রায় যোগ দেন তৃণমূলে। বাবুল সুপ্রিয় মন্ত্রীত্ব হারানোর পরও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছোট্ট মন্তব্য করায় জল্পনা শুরু হয়েছিল তাহলে কি বাবুল সুপ্রিয়র সঙ্গে তৃণমূলের সেতু বন্ধনের প্রক্রিয়া শুরু হল?
এই জল্পনাকে কেউ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন, কেউ ভিত্তিহীন না বলে বাবুলের তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পথ প্রশস্ত বলেই মত দিয়েছিলেন। তাদের ব্যাখ্যা ছিল, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বাবুল সুপ্রিয়র ব্যক্তিগত সম্পর্ক বরাবরই ভালো। মন্ত্রিত্ব চলে যাওয়ার দিনই বাংলার মুখ্যমন্ত্রী যেভাবে ‘…আবার কী দোষ করল যে ওঁর মন্ত্রী পদ কেড়ে নিল। এখন বাবুল খারাপ হয়ে গেল নাকি মোদিজীর কাছে’। এই মন্তব্যের আড়ালে মমতা ব্যানার্জি এবং বাবুল সুপ্রিয়র মধ্যেও একটা যোগাযোগ তৈরি হল বলেই মনে করছিলেন ওয়াকিবহল মহল। রাজনীতিতে যে কোনও কিছুই ঘটা সম্ভব। তাই বাবুলের পদ্মফুল ছেড়ে জোড়াফুলে যাওয়ার সম্ভাবনাকে তারা উড়িয়ে দিতে পারেন নি। মন্ত্রীত্ব খোয়ানোর পর বাবুল সামাজিক মাধ্যমে সরব হয়েছিলেন এমনকি কিছুটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন। তবে এখন না হলেও বাবুল চাইলে যখন খুশি তৃণমূলে যোগ দিতে পারেন, এই ছাড়পত্র নাকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে দিয়েছিলেন।
উল্লেখ্য, দু’দশক আগে মুক্তি পাওয়া সুপারহিট বলিউড ছবি ‘কহো না প্যার হ্যায়’-তে একই সঙ্গে আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল হৃত্বিক রোশনের আর বাবুল সুপ্রিয়-র। হৃত্বিকের লিপে বাবুলের গাওয়া ‘দিল নে দিল কো পুকারা’ সেই সময় ঝড় তুলেছিল। ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে গায়ক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে যে তরুণ পা বাড়িয়েছিলেন তারপর থেকে বলিউডে প্লে-ব্যাক সিঙ্গার হিসাবে বাবুল সুপ্রিয়কে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। কিন্তু ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি আসানসোলে কয়েক হাজার মানুষের সামনে আবেদন করলেন- তাঁর বাবুলকে দরকার (মুঝে বাবুল চাহিয়ে)। ওই বছর লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের আসানসোল কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তৃণমূলের প্রার্থী দোলা সেনকে হারিয়ে জয়ী হলেন বাবুল। সে বছর বাংলায় গেরুয়া শিবিরে দুটি পদ্ম ফুটেছিল। তার একটি আসানসোলে বাবুলের জেতা আসন। সাংসদ হয়েই সোজা নরেন্দ্র মোদির কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় নগরোন্নয়ন, আবাসন ও দারিদ্র দূরীকরণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হন বাবুল। পরে দফতর পরিবর্তন করে তাঁকে ভারী শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী করা হয়। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনেও বাবুল আসানসোলে তৃণমূল প্রার্থী মুনমুন সেনকে পরাজিত করে দ্বিতীয়বার সাংসদ নির্বাচিত হন এবং ফের মোদি-২ মন্ত্রিসভায় বন, পরিবেশ ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হন। কিন্তু গত ৭ জুলাই থেকেই আচমকা বদলে যায় ছবিটা।
মোদি মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণে বাংলা থেকে চার জন নতুন মুখের জায়গা হলেও, বাবুল মন্ত্রিত্ব হারান। এখন দেখার বাবুল বড় সুযোগ কি পেলেন।