দু-দশক আগে মুক্তি পেয়েছিল বলিউড সুপারহিট ছবি ‘কহো না প্যার হ্যায়’। ছবিটিতে একই সঙ্গে আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল হৃত্বিক রোশনের আর সেই সঙ্গে আরও একজনের ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরে যায়। তিনি হলেন বাবুল সুপ্রিয়। হৃত্বিকের লিপে বাবুলের গাওয়া ‘দিল নে দিল কো পুকারা’ সেই সময় ঝড় তুলেছিল। ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে গায়ক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে যে তরুণ পা বাড়িয়েছিলেন তারপর থেকে বলিউডে প্লে-ব্যাক সিঙ্গার হিসাবে বাবুল সুপ্রিয়কে আর ফিরে তাকাতে হয়নি।
খুব মসৃন চলছিল বলিউডি জীবন ঠিকই কিন্তু ২০১৪ সালে বাবুলের জীবন কিছুটা ওলটপালট হয়ে গেল। নরেন্দ্র মোদি আসানসোলে কয়েক হাজার মানুষের সামনে আবেদন করলেন- তাঁর বাবুলকে দরকার। অনেকটাই যেন এলেন, দেখলেন আর জয় করলেন। ওই বছর লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের আসানসোল কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তৃণমূলের প্রার্থী দোলা সেনকে হারিয়ে জয়ী হলেন বাবুল। শোনা যায় সেসময় যোগগুরু রামদেব নাকি বাবুলকে বিজেপির হয়ে ভোটে দাঁড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তাতে রাজি হয়ে যান বাবুলও। বাকিটা ইতিহাস।
সে বছর বাংলায় গেরুয়া শিবিরে দুটি পদ্ম ফুটেছিল। তার একটি আসানসোলে বাবুলের জেতা আসন। সাংসদ হয়েই সোজা নরেন্দ্র মোদির কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় নগরোন্নয়ন, আবাসন ও দারিদ্র দূরীকরণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হন বাবুল। পরে দফতর পরিবর্তন করে তাঁকে ভারী শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী করা হয়। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনেও বাবুল আসানসোলে তৃণমূল প্রার্থী মুনমুন সেনকে পরাজিত করে দ্বিতীয়বার সাংসদ নির্বাচিত হন এবং ফের মোদি-২ মন্ত্রিসভায় বন, পরিবেশ ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হন। কিন্তু গত ৭ জুলাই আচমকা আবার পরিবর্তন বদলে যায় সম্পূর্ন ছবিটা।
মোদি মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণে বাংলা থেকে চার জন নতুন মুখের জায়গা হলেও, বাবুল মন্ত্রিত্ব হারায়। এ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের ক্ষোভ, হতাশা প্রকাশ কর ফেলেন বাবুল। বাবুলের ওপর মোদির অনাস্থা কেন? তার থেকেও বড় প্রশ্ন এখন কি করবেন বাবুল সুপ্রিয়। তাঁর ভবিষ্যতের চাকা কোন রাস্তায় গড়াতে চলেছে? বৃহস্পতিবার ফেসবুকে একটি দীর্ঘ পোস্ট করেছেন বাবুল। সেখানে আসানসোলের সাংসদ লিখেছেন, “বেশ কিছুদিন ধরেই আমি অত্যন্ত আনন্দের সাথে লক্ষ্য করছি যে আমার গান নিয়ে কোনো পোস্ট করলেই আপনারা অকুন্ঠ ভালোবাসা প্রকাশ করছেন। প্রশ্ন বাবুল কি রাজনীতি থেকে দূরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করছেন? প্রসঙ্গত, একুশের বিধানসভা নির্বাচনে টালিগঞ্জ কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের অরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন বাবুল। হেরে যান বড় ব্যবধানে। এই পোস্টে সেই বিষয়েরও উল্লেখ করেছেন তিনি। লিখেছেন, ‘আজ মন্ত্রী নেই বলে ছেড়ে চলে যাওয়াটা কি ঠিক হবে? জীবনে অনেক হার দেখেছি কিন্তু মনটাকে কখনও হারতে দিইনি, হার মানতে শেখায়নি। কঠিন সময়েও মুখে হাসি দেখেছি- হাল ছাড়িনি কখনও’।
তবে কি মন্ত্রিত্ব চলে যাওয়াতে বাবুল কার্যত ‘হতাশ’। রাজনৈতিক মহলে বাবুলকে নিয়ে জো্র চর্চা চলছে। কারও প্রশ্ন, তবে কি এবার দল ছেড়ে অন্য দলে যোগ দিতে চান বাবুল? নাকি রাজনীতি থেকে সন্ন্যাস নিয়ে গান, অভিনয় বা সঙ্গীত জগতে মন দিতে চান? পরের লোকসভা ভোটের এখনও তিন বছর বাকি, ততদিন বাবুল কি করবে? তখন যে বাবুল টিকিট পাবেন তাতেও কোনও নিশ্চয়তা নেই। বাবুলের গায়ক থেকে রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিন্তু এখন স্রেফ আসানসোলের সাংসদ, বোধহয় এই জন্যই তার নিজের মনে হচ্ছে মানুষের হৃয়জুড়ে রয়েছে গায়ক সত্বাই।
সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর একের পর এক পোস্ট ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। প্রশ্ন উঠতে থাকে, তাহলে কি তৃণমূল কংগ্রেসে যাচ্ছেন বাবুল? সেই সময় অবশ্য জল্পনা নস্যাৎ করেছিলেন স্বয়ং বাবুলই। তিনি ফেসবুকে লিখেছিলেন যে, ‘দয়া করে আমাকে এসবের মধ্যে জড়াবেন না। আমাকে আমার কাজ দিয়ে বিচার করুন। এই সমস্ত জল্পনা দিয়ে নয়।’ কিন্তু এসব কথা বলার পর ফের নিজেই ফেসবুকে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী লিখেছেন, “জীবনে অনেক হার দেখেছি কিন্তু মনটাকে কখনো হারতে দিইনি – হার মানতে শেখায়নি! কঠিন সময়েও মুখে হাসি রেখেছি– হাল ছাড়িনি এতে গুঞ্জন থামার বদলে জল্পনা উস্কে উঠলো। তার মানে মন্ত্রিত্ব যাওয়ার যন্ত্রণা বাবুল ভুলতে পারছেন না। তাই বাবুল ভাবছেন গায়ক, নাকি রাজনীতিবিদ, কোনটা মামুষের কাছে তাঁকে বেশি গ্রণযোগ্য করে তুলেছে।
প্রসঙ্গত বাবুল ২০১৫ সালে তৃণমূল নেত্রী মমতার সঙ্গে ঝালমুড়ি থেকে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন। সেই সময় এই গায়ক-রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব একাধিকবার খবরের শিরোনামে উঠে এসেছিলেন। যদিও বাবুল বলেছিলেন ‘রাজনৈতিক সৌজন্যতা।’ তবে মোদির মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণ ও তাতে বাবুলের বাদ পড়া নিয়ে মুখ খুলতে দেখা গিয়েছিল সেই মমতাকেই। ইতিমধ্যে ট্যুইটারে বাবুল সুপ্রিয় মুকুল রায়কে ফলো করা শুরু করেন বলে জল্পনা ছড়িয়েছে। বিজেপি ক্ষমতায় এলে তিনি মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেন- এমনটাও শোনা গিয়েছিল। ফলে আসানসোলের সাংসদকে নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে। বিধানসভার নির্বাচনের আগে যেভাবে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগদানের হিড়িক পরে যায়, তা নিয়েও বিরোধিতা করেছিলেন বাবুল। যা নিয়ে দলের সাথে তার মতবিরোধ তৈরি হয়।
এর মাঝেই সম্প্রতি নিজের লোকসভা কেন্দ্রে বাবুলের বিরুদ্ধে পোস্টারও পড়েছে। ভোটের ফলাফলের পর থেকেই না কি বাবুলকে দেখা যায় নি এমন দাবি তুলে তার নামে নিখোঁজ হওয়ার পোস্টার দেখা যায়। শোনা যাচ্ছে সম্প্রতি রাজনীতির থেকে গানের দিকেই বেশি মন দিয়েছেন বাবুল সুপ্রিয়। আর এই আবহেই বাবুলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।