অবাক হয়ে ছোকরার ব্যাটিঙ দেখছিল মোহিত। মোহিত সেন। ‘বয়েজ ক্লাব’-এর কোচ। গাঁট্টাগোট্টা চেহারা। গায়ের রং মিশমিশে কালো। গলায় রুপোর হার। মাথায় কাউন্টি ক্যাপ। নেটের পিছন থেকে দেখতে দেখতে কেমন ঘোর লেগে যাচছিল মোহিতের। পুরনো ওয়েষ্ট ইনডিজ টিমের কেউ নাকি! ভাবনাটা মাথায় আসতে হেসে ফেলল। যাহ্ সেসব আবার কীভাবে হবে! পৃথিবীতে সুন্দর জিনিস বেশি আসে না। ছোকরার ব্যাটিং ক্রিজ ব্যবহার দেখবার মতো। ক্রিজ ছেড়ে একপা এগিয়ে এসে জেলার নামী স্পিনার রথীনকে উড়িয়ে দিল মাঠের বাইরে। আরো কয়েকটা বল খেলার পর রথীন সরে গেল মোহিতের ইশারায়। বল উঠে গেল সনত-এর হাতে। সনত পাড়ুই। মিডিয়াম ফাষ্ট বোলার। বেঙ্গল ট্রায়ালে আছে সাতাশ জনের মধ্যে। মাঠের শেষ প্রান্ত থেকে বল শুরু করতে যেতেই নেটের পাশ থেকে হেলমেট তুলে মাথায় গলিয়ে নিল ছোকরা।
এরপর যা শুরু হল এতদিন কোচিং জীবনে খুব বেশি দেখেনি মোহিত। পাড়ুই-এর বুকের ওপর আসা বল সামান্য পিছিয়ে গিয়ে ফ্লিক করল। পরের বাউন্সার সোজা উড়ে গেল মাঠের বাইরে। সবই ব্যাকফুটে। ছ’টা বল খেলল প্রবল কনফিডেন্স নিয়ে। গুটি গুটি পায়ে টেন্টে
ফিরে গেল কোচ। ওখান থেকেও চমৎকার মাঠ দেখা যায়।
—কী হল মোহিত — চলে এলে যে! বললেন ক্রিকেট সেক্রেটারি শিশির বাবু।
—আপনিও গেলে ভালো করতেন। যা দেখলাম খুব বেশি দেখিনি।
—বল কী?
—হ্যাঁ। এখনও ব্যাট করছে। দেখে নিন।
কাগজ পত্র রেডি করুন। সই করাতে হবে।
তড়িঘড়ি টেবিল ছেড়ে জানলার সামনে যেয়ে দাঁড়ালেন শিশিরদা। মিনিট কুড়ি মুগ্ধ মুহূর্ত। কোচ একটু জিরিয়ে নিয়ে এককাপ চা নিয়ে বসেছে সবে, জানলা থেকে মুখ ফেরালেন সেক্রেটারি, এ তো ব্যাটিং কার্নিভাল হে!
—প্রতিভা একেই বলে!
সেক্রেটারি আর কোচ দু-মাথা এক করে বসল টেবিলে এবার।
দুই
—তোমার নাম কী ভাই ?
—শিশু হেমব্রম।
কলম চলতে লাগল সেক্রেটারির।প্রশ্ন কোচের।
—বাবার নাম?
—কালাচাঁদ।
—কী করেন?
—জন খাটে আজ্ঞে।
—তুমি ক্রিকেট খেল বাড়িতে জানে?
—জানে আজ্ঞে। এই হার তো মায়েরই দেওয়া!
পাথর-কোঁদা চেহারার মুখের কথা মুখে মিলিয়ে যায়। দেখে বোঝার উপায় নেই ব্যাট হাতে এমন তান্ডব করতে পারে এই ছোকরা।
—আমাদের কথা কার কাছে শুনলে?
—ইস্কুলের গেম টিচার সতীশবাবুর কাছে। বললেন অনেক দিনের পুরনো ক্লাব। আমি ও খেলতাম। উনি ফোন নম্বর দিলেন।
—ওহ্! তোমার বাড়ি তো কলাছড়া?
—আজ্ঞে!
—ওখান থেকে ফি হপ্তায় প্র্যাকটিস করতে আসবে কী করে?
—সে আমি ঠিক আসব। গাঁ থেকে সাইকেলে বাসরাস্তা। একুশ নম্বর বাসে হরিপাল। সেখান থেকে হাওড়া। তারপর আবার বাস—!
আরও কিছু হয়ত বলত শিশু। তার আগেই ওকে থামিয়ে দিলেন শিশিরদা। কোচের চোখে চোখ রেখে সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়লেন শুধু। এর ব্যাকফুটে এত স্ট্রং হবার রহস্য জলের মতো পরিষ্কার এখন দু-জনারই কাছে।
নব বন্দ্যোপাধ্যায়, কেওটা, শিবতলা, সাহাগঞ্জ, হুগলি, পিন : ৭১২ ১০৪