বাংলা নাটকের ক্ষেত্রে আধুনিক সময়ে একটা সমস্যা বার বার দেখা গেছে। থিয়েটারের জন্য নাটক চাই। অর্থাৎ লেখা নাটক। নাট্যকার যে নাটক লেখেন, পরিচালক আরেকভাবে তার পাঠ তৈরি করেন, সেই নাটক মঞ্চস্থ হয়। দর্শক অভিনন্দন জানান বা মুখ ফিরিয়ে চলে যান। এই সমস্যা যে শুধু মাত্র বাংলার, তা নয়। স্বয়ং শেক্সপিয়রকেও মঞ্চস্থ করার জন্য দ্রুত নাটক লিখে দিতে হতো। পরিচালকরা রীতিমতো ঘাড়ে চেপে বসতেন। গিরিশযুগেও বাংলার চিত্র একই ছিল। রঙ্গমঞ্চ জমজমাট কিন্তু ভালো নাটকের অভাবের কথা বলেননি এমন নাট্য পরিচালক বা প্রযোজক খুঁজে পাওয়াই দায়। এক দিকে পেশাদার রঙ্গমঞ্চ, অন্যদিকে ১৯৪৪ সাল-পরবর্তী সময়ে নতুন ধারার নাটক বা গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন হয়ে উঠলো। তবে এই নাটক প্রধানত প্রসেনিয়ামনির্ভর। অর্থাৎ প্রথাগত মঞ্চে যা অভিনয় হয়। বাদল সরকার প্রসেনিয়ামের জন্য একের পর এক অসামান্য নাটক লিখেছেন। শম্ভু মিত্র বলতেন, নবান্ন, রক্তকরবীর পর বাংলার নাটকে বড়ো ঘটনা বাদল সরকারের ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’। সত্তরের দশকের গোড়ায় সাফল্যের শীর্ষে অবস্থান করেও বাদলবাবু তৃতীয় ধারার থিয়েটার আন্দোলন গড়ে তুলতে পা বাড়ালেন।
বাদল সরকার যে বছর জন্মগ্রহণ করেন অর্থাৎ ১৯২৫ সালের ১৫ জুলাই ওই বছরই ১৬ জুন মারা গেলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন। এর ঠিক ৪ বছর আগে ১৯২১ সালে নাট্যাচার্য শিশিরকুমার মেট্রোপলিটন কলেজের চাকরি ছেড়ে পুরো সময় থিয়েটার করবেন বলে ম্যাডন কোম্পানিতে পরিচালকের দায়িত্ব নিলেন। চিত্তরঞ্জন তাঁকে বলেছিলেন জাতীয় নাটমঞ্চ গড়ে তোলার কথা। বিষয়টা এগোচ্ছিল। হঠাৎই সি আর দাস মারা গেলেন। নাটমঞ্চের কাজ থমকে গেল। শিশিরবাবুর সারা জীবনের আক্ষেপ রয়ে গেল। শম্ভু মিত্রও এই ক্ষোভের কথা বার বার প্রকাশ করেছেন। নাট্যাচার্য শিশিরকুমার কিংবা শম্ভুবাবু চেয়েছিলেন দর্শক রুচিকে কিছুটা প্রভাবিত করতে। কীভাবে? তাঁরা নাট্যভাষার আরও ব্যাপকতর বিকাশের পথ খুঁজতে চাইছিলেন। তাঁরা এটা ভালোই জানতেন যে, সাহেবদের আদলেই এদেশেও প্রসেনিয়াম থিয়েটারের কাজ হচ্ছে। এই সব মঞ্চে প্রধানত গল্প বলা, বাস্তববাদী থিয়েটার অভিনীত হয়। নাট্যভাষার আরও বিচিত্র বিকাশ প্রয়োজন। আসলে প্রায় নিঃশব্দে কাজ করেছেন বাদল সরকার। উত্তর কলকাতার ওই ভাঙা বাড়ির তিন তলার ছাদের পাশের ঘরটাতে বসে নিঃশব্দ বিপ্লব ঘটিয়েছেন বাদলবাবু। ১৯৫৪ সালে বহুরূপী নাট্যদল যখন রক্তকরবী প্রযোজনা করছে ঠিক সেই সময়ই লন্ডনে বসে এবং ইন্দ্রজিতের খসড়া করছেন বাদলবাবু। মনে রাখার বিষয়, প্রথমে লেখা হয়েছিল এই নাটকের কবিতাগুলি। আগে নাট্যকারকে কবিই বলা হতো। গিরিশ ঘোষকে কিন্তু মহাকবি বলা হয়। রক্তকরবী তো এক অর্থে দীর্ঘ কবিতাই।
বাদল সরকারের ১৯৬৩ সাল থেকে ৬৮ সালের মধ্যে লেখা নাটকগুলি বিস্ফোরক ক্ষমতা বহন করে। এবং ইন্দ্রজিৎ প্রযোজনা করেছিল শৌভনিক দল। নির্দেশনা ছিল গোবিন্দচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়ের। এই নিয়ে শম্ভুবাবু ক্ষোভের অন্ত ছিল না। এবং ইন্দ্রজিৎ প্রকাশিত হয়েছিল বহুরূপী পত্রিকাতে। একেবারে নতুন ভাষা। এরকম নাটক বংলায় কিন্তু এর আগে লেখা হয়নি। এর পরে বাদল সরকার লিখেছেন বাকি ইতিহাস, পাগলা ঘোড়া, সারা রাত্তির, পরে কোনো দিন, যদি আরেকবার, বল্লভপুরের রূপকথার মতো আশ্চর্য সব নাটক। কোথায় গেল বাস্তববাদী নাটকের কার্যকারণের প্রতিফলন? আদি, মধ্য, অন্তের সেই আদলটাও তো হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়লো। ৬৭-৬৮ সালের পর বাদলবাবু কিন্তু ফের নতুন নাট্যভাষার সন্ধানে মাঠে-ময়দানে ছুটে বেড়াতে শুরু করলেন। ইতিমধ্যে পেয়েছেন সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার, সরস্বতী সম্মান, পদ্মশ্রীর খেতাব আরও কত। ভারত সরকার তাঁকে পূর্ব ইউরোপে সাংস্কৃতিক দূত হিসেবে পাঠিয়েছে। পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, চেক রিপাবলিক ঘুরে এসে চলে যাচ্ছেন হাড়োয়া, দেগঙ্গা কিংবা বাসন্তী-ক্যানিংয়ে। মাতলা কিংবা বিদ্যাধরী পার হয়ে রাঙাবেলিয়া গ্রামে। স্পার্টাকুস, ভোমা, মিছিল, হট্টমালার ওপারে, বাসি খবর, গণ্ডি এগুলির প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে একেবারে নতুন ভাষা নিয়ে এলেন বাদল সরকার। তাঁর প্রথম পর্বে ভাষাও কিন্তু ষাট দশকের শেষেই ফেলে এসেছেন। তখন তিনি নাটক লিখছেন হাভাতে, হাঘরে মানুষের ভাষায়। সৃষ্টি হলো নতুন দিগন্ত।