ইতিহাসের সাল তারিখের হিসেবের আগের দিনগুলো বড়ই ধোঁওয়া ধোঁওয়া। বিচ্ছিন্ন। তার তল পাওয়া ভার। কেমন ছিল সেই সময়ের মানুষগুলো? তারাও বুঝি গান গাইত! আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে ছবি আঁকত কি তারা পাথরের গায়ে? বাদামির গুহায় নাকি ছিল সেসব ছবি এককালে। তাদের শিকার করার উল্লাস। যূথবদ্ধ জীবনের খুশি। নাচের ভঙ্গিমা। চারপাশে ঘিরে থাকা পশুপাখির দল। কিন্তু সেসব দেখবার আর উপায় নেই। আজকের কাল সেই সময়কে হরণ করে নিয়েছে।

প্রকৃতি অবশ্য অদ্ভুত সব রঙে রাঙিয়েছে পাহাড়কে। তাকে আকার দিয়েছে আপন খেয়ালে। শিল্পীরা সেই পাহাড় ছেনে মূর্তি গড়েছেন। মন্দির গড়েছেন। কবির কবিতা, রাজাদের কীর্তি, শিল্পীদের নাম রয়ে গেছে শিলালেখতে। আগামীতে সেসব উপাদানেই গড়ে উঠেছে ইতিহাস।

সকালের সূর্যের সোনালি আলোয় সে অতীত যেন কথা বলে ওঠে। কিছু ছবি বড্ড যেন চেনা। ইতিহাসের বইতে দেখা। সে ছবির গল্প চেনাতে মাস্টারমশাই আর দিদিমণিরা পালে পালে ইস্কুলের ছাত্রছাত্রী নিয়ে এসেছেন বাদামিতে। তাদের কারোর কারোর পায়ের জুতো জোড়াটুকুও জোটেনি। মেয়েদের কালো বেণীতে কনকম্বর ফুলের মালা। এই এক্সকার্সান নাকি কর্ণাটক সরকারী শিক্ষানীতির আওতায় পড়ে। এসব দেখেশুনে বড় স্বস্তি হয়।

মাস্টারমশাই ছাত্রছাত্রীদের শান্ত করিয়ে বলতে লাগলেন, “বাদামিতে চালুক্য রাজবংশ ৫৪০ থেকে ৭৫৭ খ্রীস্টাব্দ অবধি রাজত্ব করেছেন। বাদামির আগে বাগালকোট জেলার আইহোল ছিল তাঁদের রাজধানী। সেটি বাদামি থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে। কাছাকাছিই আরেকটি শহর পাদাক্কাল। এখানে তাঁদের প্রতিষ্ঠিত স্থাপত্যকীর্তি, শিলালেখ দেখতে গোটা পৃথিবীর লোক ছুটে আসে।
আইহোলের পর মালপ্রভা নদীর তীরে বাদামি শহর ছিল তাঁদের দ্বিতীয় রাজধানী। শহরটি পাহাড় দিয়ে ঘেরা। প্রাকৃতিক উপায়ে সুরক্ষিত, সুন্দর এবং উর্বর।

পাহাড়ের ওপরে তাঁরা দুর্গ তৈরি করলেন। মন্দির বানালেন। মন্দিরের স্থাপত্যে রয়ে গেল উত্তর ভারতের নাগর শৈলী আর দক্ষিণ ভারতের বিমান শৈলীর ছাপ। কঠিন পাথর খুদে শিব, দুর্গা, কার্তিক, গণেশ, বিষ্ণু, কিন্নর, কুবের, যক্ষের মূর্তি গড়ে উঠল শিল্পীদের হাতের ছোঁয়ায়। সেইসব দেবদেবীরা এখনো রয়েছেন পাহাড়ের গুহায়। মহাবীর, জৈন তীর্থংকর আর বুদ্ধদেব স্ব-মহিমায় বিরাজিত সেখানে।
ইতিহাসের এইসব শুকনো গল্প শুনে শ্রীনিবাস, সুরেশ, সীতালক্ষ্মী, কুট্টিআম্মা, কমলারা একটু উসখুস করতে লাগল। মাস্টারমশাই তখন শুরু করলেন চালুক্যদের শৌর্যবীর্যের কাহিনী।

“চালুক্যরাজ প্রথম পুলকেশী ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী সম্রাট। তিনিই ৫৪০ খ্রীস্টাব্দে বাদামিতে দুর্গ তৈরি করলেন। অশ্বমেধ যজ্ঞ করে নিজে রাজচক্রবর্তী রাজা হয়ে বসলেন সে দুর্গের সিংহাসনে।

প্রথম পুলকেশীর নাতি দ্বিতীয় পুলকেশী প্রচুর যুদ্ধবিগ্রহ করলেন। তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তৃত হল নর্মদা থেকে কাবেরী। অর্থাৎ সুদূর গুজরাট থেকে দক্ষিণের পান্ড্য পর্যন্ত ছিল তাঁর আধিপত্য। তিনি উত্তর ভারতের সার্বভৌম রাজা হর্ষবর্ধন তাঁর পরাক্রমে দক্ষিণে পরাস্ত হলেন। এই ঘটনার জেরে হিউয়েন সাং দ্বিতীয় পুলকেশীকে সম্মান দিলেন, দক্ষিণাপথনাথ নামে। তিনিই ছিলেন চালুক্য বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট।”

বাহুবলী সিনেমা দেখা বালখিল্যেরা চঞ্চল হয়ে উঠল এই গল্প শুনে। তারা আরো পরাক্রম, বিজয়গাথা শুনতে চায়। কিন্তু ছ’শ বছরের চালুক্য সাম্রাজ্যের গৌরবও একদিন অস্তমিত হল। যেমন করে সকালের সূর্য ওঠার মতই বিকেলের আলো ধীরে ধীরে অগস্ত্য লেকের পেছনে অদৃশ্য হয়ে যায়। অন্ধকার ঘনিয়ে আসে ভূতনাথ মন্দিরে, দুর্গের চূড়ায়, পাহাড়ের গুহায়।

দক্ষিণ ভারতে অষ্টম শতকের মাঝামাঝি সময়ে রাষ্ট্রকূটরা শক্তিশালী হয়ে উঠছিল। তারাই একসময় ছিনিয়ে নিল চালুক্যদের যশ, কীর্তি, সম্পদ, সাম্রাজ্য।
একদিন রাজধানী বাদামিতে জলের অভাব দূর করতে দুর্গের সামনে বানানো হয়েছিল বিশাল জলাশয়। ঋষি অগস্ত্যের নামে সেই জলাধারে এখনো পানকৌড়ি ডুব দেয়। মাছেরা নির্ভয়ে খেলা করে। দু-একটা বক উড়ে আসে মাছের লোভে লোভে।

বর্ধমানের গুসকড়া গ্রাম থেকে বাদামির সোনার দোকানে কাজ করতে এসেছে আনোয়ার। ছোট্ট অন্ধকার ঘরে তার সারাদিনের কাজকারবার। তাদের বস্তির ঘরেও তেমন রোদহাওয়া নেই। বেগম নূরকে নিয়ে সে প্রতিদিন বিকেলে অগস্ত্য জলাধারের পাশে ভূতনাথ মন্দিরের চাতালে বসে। বিকেলের এই নরম আলো, ঠান্ডা হাওয়াতেই তাদের দিনগত পাপক্ষয় থেকে মুক্তিস্নান হয়।