কৃষিপ্রধান দেশ ভারতবর্ষ। কৃষিকাজই ছিল আদিবাসীদের মূল পেশা, আর গবাদি পশু ছাড়া কৃষি কাজ সম্ভব নয়। সেই গৃহপালিত গোরু-মহিষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা জানানোর পরব বাঁধনা। বন্দনা বা আহ্বান করা থেকে ‘বাঁদনা’ কথাটির উৎপত্তি। গো মাতাকে সৃজন শক্তির আধার রূপে আরাধনা করার পরব ‘বাঁদনা’।
বাংলার পশ্চিম সীমান্ত কুড়মি, মুন্ডা, লোধা, ভূমিজ মুন্ডা সাঁওতাল, কুইরি, কুমহার প্রভৃতি, আদিবাসীরা অনূর্বর পাহাড়ি রুক্ষ প্রান্তরে চড়ে বেড়ানো গরু মহিষদের দলকে অপদেবতা কিংবা নানা হিংস্র জন্তু জানোয়ারদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্যও ‘গো বন্দনা’বা ‘বাঁদনা পরব ‘ পালন করে।কালীপূজার পরের দিন অর্থাৎ প্রতিপদ তিথিতে এই অনুষ্ঠানটি হয়।তিন থেকে পাঁচদিন ব্যাপী নাচ-গান সহ অন্যান্য আদিবাসী লোকসংস্কৃতির মধ্যে দিয়ে অনুষ্ঠান চলে।
বেশ কয়েক মাস ধরে কঠোর পরিশ্রম করে চাষাবাদ করে কৃষক ফসল ঘরে তোলে। তাই মানুষের সঙ্গে গবাদি পশুদেরও বিশ্রাম নিতে হয়। তাই এই পরবের কদিন মানুষের সঙ্গে গরু মহিষদের বিশ্রামে রাখা হয়।

এই ব্রতকে নিয়ে একটি কাহিনী প্রচলিত আছে। অনেক দিন আগে রাঢ় অঞ্চলের (বাঁকুড়া, পশ্চিম বর্ধমান, পূর্ব বর্ধমান, পুরুলিয়া, মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, ছোটনাগপুর, মানভূম) প্রকৃতি যখন রুক্ষ, কঠোর, উত্তপ্ত সূর্যের কিরণে ক্লান্ত, তাপিত, ছিল না কোন ঘাসের চিহ্ন ছিল না, বৃক্ষ ছিলো শুষ্ক, অরণ্য প্রান্তর ছিল খরা পীড়িত… ঠিক সেই সময় এ অঞ্চলের গরু মহিষাদি ঠিক করল যে তারা আর কাজ করবে না। কারণ তাদের অসম্ভব খাটনি অথচ প্রয়োজনীয় খাদ্য নেই। কঠিন প্রান্তরকে বিদীর্ণ করে ফসল ফলায়, গাড়ি টানে, বোঝা বয়, দুধ দেয় অথচ সারাদিনে পরিশ্রমের পর জোটে এক গাছি শুকনো খড়। কৈলাসাধিপতি মহাদেব এ কথা জানতে পারলেন। মর্ত্যের গো-বৃন্দ মহাদেবের কাছে তাদের অন্য পশুদের বিরুদ্ধে অনুযোগ জানালো। মহাদেব তাদের অশ্বাস দিলেন যে তিনি অমাবস্যার অন্ধকারে মর্তে হাজির হবেন।
কোনভাবে মানুষেরা সে কথা জানাতে পারে। তাই মর্ত্যবাসীগন অমাবস্যার অন্ধকারে গরু গুলোকে পরিষ্কার করে তেল সিঁদুর মাখিয়ে পেট ভরে খাওয়ালো। মহাদেব এসে দেখলেন যে পৃথিবীর গো-জাতির অবস্থা খুবই ভালো। মানুষ ওদের যত্ন করে। গো জাতির অকৃতজ্ঞতা দেখে মহাদেব রেগে গিয়ে তাদের চিরকাল খাটার অভিশাপ দিলেন এবং মানুষকে আশীর্বাদ করলেন।

সেই থেকেই মানুষ বিশ্বাস করেন যে কালীপুজোর রাতে মর্তে প্রতিবাড়িতে আসবেন দেবাদিদেব মহাদেব। তাই বাড়ির মানুষেরা গোয়াল ঘর ও গরুগুলোকে পরিষ্কার করে তাদের তেল সিঁদুর মাখিয়ে পেট ভরে খাওয়ান যাতে মহাদেবের সন্তুষ্ট হয়ে মানুষকে আশীর্বাদ করেন। উল্লিখিত কাহিনীর মধ্যে অন্যান্য সবকিছুর পরিবর্তন ঘটলেও অমাবস্যার দিনে গোজাতিকে মানুষের সেবা করাটা অপরিবর্তিত থেকে গেল।
অমাবস্যার দিন গোয়ালের গরু, মোষের শিংয়ে মহুল গাছের কড়চা ফল ও তিল একসঙ্গে পিষে তেল বানিয়ে প্রদীপ জ্বালানো হয় ও ঐ তেল গরুর শিঙেও মাখানো হয়। মাঠের ভেতর চালের গুড়ি দিয়ে ঘর কেটে ছাঁদনদড়ি ও বাঁধনদড়ির পূজা করা হয়। একে বলা হয় গঠপূজা। মাঠে সুন্দর করে আলপনা এঁকে তার ভেতরে ডিম রেখে দেওয়া হয়। এরপর ধামসা, মাদল বাজিয়ে অহিরা গানের সুরে সুরে গরুগুলি ছুটোছুটি করতে দেয়া হয়। এর মধ্যে যে গরুটি ডিম ভেঙে দেয়, তার মাথায় তেল, সিঁদুর, ধানের শীষ পড়িয়ে দেওয়া হয়। এই গরুটি যে ব্যক্তির তাঁকে ভাগ্যবান মনে করা হয়। সবাই বাজনা বাজিয়ে তাঁর বাড়ি হাজির হন।
ঐদিন সন্ধ্যেবেলায় তুলসীতলা, কুয়োপাড়, জানলায় কাঁঠাল বা শাল গাছের পাতায় চালের গুঁড়ো রেখে ভিতরে সলতে দিয়ে প্রদীপ জ্বালানো হয়। এই রীতিকে ‘কাচিজিয়ারি’ বলা হয়ে থাকে।

বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, পশ্চিম বর্ধমান ও পূর্ব মেদিনীপুরে বাঁধনা পরবে জামাই বাঁদনা অনুষ্ঠান পালন করা হয়। ঐদিন শাশুড়িরা জামাইকে ধান, দূর্বা ও মিষ্টি-পিঠে দিয়ে বরণ করেন।
ছাং গরগর আইসকা পিঠা।
দেখ্ ন জামাই কেমন মিঠা।।
রাতে গেরস্থ নতুন জামা কাপড় পড়ে ধান, দূর্বা, আমের পল্লব, হলুদ জল ও ধূপ ধূনা দিয়ে সুর কেটে ছড়া পড়ে গরুকে বরণ করে নেয়। গভীর রাতে গোয়ালে গিয়ে প্রদীপ জ্বেলে আসে, গ্রামের যুবকেরা (এদের ধাঁগড়িয়া বা ধাঁগড় বলে) সারারাত
গরুকে জাগিয়ে রাখার জন্য ধামসা মাদল বাজিয়ে, অহীরা গান গায়।
অমাবস্যার পরের দিন অর্থাৎ প্রতিপদের দিন সকালে লাঙ্গল জোয়াল,মই প্রভৃতির চাষের যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করে, জমি থেকে একআঁটি ধান কেটে পুজো করা হয়। ধানের শীষের অলংকার তৈরি করে মোষের শিং এ পরিয়ে দেওয়া হয়।

দ্বিতীয়া বা তৃতীয়ায় অর্থাৎ ভাইফোঁটার দিন গরুখুঁটা বা কাড়াখুঁটা বা বুঢ়ীবাঁদনা বা খুঁটান অনুষ্ঠিত হয়। ঐদিন নির্দিষ্ট কিছু মহিষ বা গরুকে গলায় মালা ঘন্টা ও ঘুঙর বেঁধে শক্ত খুঁটিতে বাঁধা হয়। এরপর গরু গুলোর সামনে মৃত গোরুর চামড়া শুঁকিয়ে বেঁধে রেখে ঢাকঢোল নানা রকম বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে গরুগুলোকে উত্তেজিত করা হয়, যাতে গরুগুলি চামড়াতে গুঁতো দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। সেই সঙ্গে চলে অহিরা গান ও নাচ।এইভাবে গরু, মহিষের শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটে উৎসবের।
বাঁদনা’ পরব আদিবাসী সমাজের এক মিলন উৎসব। পরবের সময় মেয়ে জামাই বউ ননদ সকল আত্মীয়রা একত্রিত হয় আনন্দঘন পরিবেশে এই কটা দিন কাটায়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো পশ্চিমবঙ্গ সহ ভারতের পাঠ্যপুস্তকে সেই ভাবে এই ব্রতের উল্লেখ করা হয় না। এমনকি মিডিয়াগুলিও সেরকম ভাবে প্রচারে আনেন না। ফলে ধীরে ধীরে এই উৎসব জৌলুস হারাচ্ছে।
বাঁদনা’ লোককলার একটি জীবন্ত ও প্রাচুর্যপূর্ণ উপাদান।এর সাথে শাস্ত্রধর্মের কোন সম্পর্ক নেই, সবটাই লৌকিক ব্যাপার।আদিবাসী সমাজ প্রকৃতির পূজারী। পুরোনো ঐতিহ্য, সংষ্কৃতি ধরে রাখতে
গবাদি পশুর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পালন করা হোক বাঁদনা পরব’।।
এই অনুষ্ঠানের সাক্ষী আমি। এখনো গোরুর পরব বলে বর্ধমানের অনেক গ্রামে পালিত হয়। জামাই ফোঁটাও পালিত হয়। সকল সম্প্রদায়ের মানুষই এই অনুষ্ঠান পালন করেন।
অনেক ধন্যবাদ এত সুন্দর একটা কমেন্টের জন্য।