সুড়ঙ্গ বা সুরঙ্গ আমাদের চেনা শব্দ। তবে এই রন্ধ্রপথ বা গোপনপথের সঙ্গে যেন জড়িয়ে রয়েছে মণিমুক্ত, ধনরত্নের সন্ধান বা কোনও অসমসাহসী উদ্ধারের কাহিনী। জলেডোবা চাসনালা খনি বা গভীর গর্তে পড়া প্রিন্স নামক চপল শিশুর উদ্ধারকার্যের জন্যেই যেন সুড়ঙ্গ খননের প্রয়োজন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রক্তকরবী নাটকে যক্ষপুরীর শ্রমিকরা মাটিতে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে তাল তাল সোনা তুলে আনে। নন্দিনী-রঞ্জন তথা অদৃশ্য রাজার উপাখ্যানে সুড়ঙ্গ শব্দটি বারবার এসেছে।
হালে বাংলাদেশে রায়হান রাফী পরিচালিত ছবি ‘সুড়্ঙ্গ’ বক্স অফিসে সাড়া ফেলেছে। হলিউডের ছবিকে টেক্কা দিয়ে টানা একমাস নাকি শীর্ষস্থানে আছে। সুড়ঙ্গ শব্দটির মাহাত্ম্য তাই অস্বীকার করা যায় না।
অথচ বাংলা বাগধারায় সুড়ঙ্গ শব্দটির দেখা মেলে না। সুশীল কুমার দে-র বাংলা প্রবাদ বইটিতে সুড়ঙ্গের জায়গায় সিঁধ বা সিঁদ শব্দটিই বহুলব্যবহৃত। বাগধারাগুলির উল্লেখ করলে এখানে অপ্রাসঙ্গিক হবে না।
১. দিনে কেন সিঁদ, না গরজ বড় বালাই।
২. ধন থাকলেই সিঁধের ভয়।
৩. পগারে সিঁদ
৪. যার ঘরে সিঁদ, সে কি যায় নিদ।
৫. রাজার বাড়ী চুরি হল, পুকুরপাড়ে সিঁদ।
৬. অভ্যাস না ছাড়ে চোরে, ঠুঁটা হাতেও সিঁদ করে।
তবে সুড়ঙ্গ তথা সুরঙ্গ শব্দটির আসল ব্যুৎপত্তি-কক্ষে সিঁদ কেটে ঢোকার চেষ্টা বিশেষ একটা হয়নি।
অভিধানপ্রণেতাগণ সকলেই একবাক্যে মেনে নিয়েছেন সুড়ঙ্গ তথা সুরঙ্গ শব্দটি গ্রিক ভাষা থেকে বাংলায় এসেছে।
ভাষাবিদ লেখক হুমায়ুন আজাদ লিখেছেন , “গ্রিকভাষায় একটি শব্দ ছিল ‘সুরিংকস্’। শব্দটি সংস্কৃতে ঢুকে হয়ে যায় সুরঙ্গ/সুরুঙ্গ। প্রাকৃতেও এভাবেই থাকে। বাংলায় শব্দটি হয়ে যায় ‘সুড়ঙ্গ’।”
হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ-এ পাই,
সুরঙ্গ বিণ [বহুব্রী ; স্ত্রী -ঙ্গা], শোভনবর্ণ, সুরাগ, সুলোহিত। অর্থ, ১. নারঙ্গবৃক্ষ (কমলালেবুর গাছ) ২. সুরভিতৃণভেদ ৩. [Cf, Gr. Surinks] গর্ত্তবিশেষ, সন্ধি, সিদ, সুড়ঙ্গ।
সংসদ বাংলা অভিধানে পাচ্ছি, সুড়ঙ্গ (সুরঙ্গ) বি (সচ.) মাটির নীচে গর্ত বা পথ, সুড়ঙ্গ পথ।
[<সং . সুরঙ্গ (গ্রিক Surinks?)]
জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের ‘বাঙ্গালাভাষার অভিধান’-এ পাচ্ছি,
সুড়ঙ্গ [সং=সুরঙ্গ > । সুড়ং, সুরঙ্গ, সোড়ং। সুঁড়ীপথ।
তবে সংস্কৃত সুরঙ্গ যে গ্রিক শব্দ Surinks থেকে গৃহীত, তা সব অভিধানপ্রণেতাই মেনে নিয়েছেন।
গোলাম মুর্শিদ সম্পাদিত বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধানে সংস্কৃত সুরঙ্গ বা গ্রিক Surinks থেকে সুড়ঙ্গ এসেছে বলা হচ্ছে। উদাহরণ আছেন ১৭৬০-এ লেখা ভারতচন্দ্রের রায়গুণাকরের রচনা থেকে।
“সুড়ঙ্গের মাটি কাটি উড়ে যাবে বায়”।
অশোক মুখোপাধ্যায়ের ‘সমার্থ শব্দকোষ’ জানাচ্ছে, সুড়ঙ্গের প্রতিশব্দ,- সুরঙ্গ, সুরঙ্গপথ, সুরাখ, গোপনপথ, সুঁড়িপথ।
এখন দেখা যাক, সুড়ঙ্গ তথা সুরঙ্গ শব্দটির কোনও সংস্কৃত ব্যুৎপত্তি হয় কিনা। এই ব্যুৎপত্তি নির্ণয়ে আমাদের সাহায্য করবে তুরঙ্গ শব্দটি।
তুরঙ্গ মানে ঘোড়া। ছেলেবেলায় প্রতিশব্দ মুখস্ত করতাম, তুরগ, তুরঙ্গ, তুরঙ্গম, ঘোটক, হয়, ঘোড়া, বাজী। ব্যুৎপত্তি, তুরঙ্গ- [সং. তুর (ত্বরা) + √গম্ + অ, খচ্ (মুমাগম)]।
কুরঙ্গ শব্দটির দিকেও তাকাতে হবে।
কুরঙ্গ মানে হরিণ।
এর ব্যুৎপত্তি, [কু(পৃথিবী)= রনগ্(গমন করা) + অ(র্ত্তৃ=জ্ঞ.)](জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাঙ্গালা ভাষার অভিধান)।
অর্থাৎ ‘গমন’ এইদুটি শব্দের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছে।
প্লবগ, ভুজগ, ঊরগ শব্দগুলিতেও ‘গমন’ আছে।
তা, সুরঙ্গও কি গমনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে না?
বামন শিবরাম আপ্তের The Practical Sanskrit-English Dictionary -তে ‘সুর্’ (দেবনাগরী হরফে)-এর অর্থ To shine।
সুরঃ-র অর্থ দেবতা, সূর্য, গঙ্গা, রাম ইত্যাদি।
হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষও সুর্ আর সুর, দুটো এন্ট্রিই রেখেছে।
‘সুর্’- এর অর্থ দীপ্তিমান হওয়া।
সুর যে দেবতা, তা সকলেই জানেন। সুরেন্দ্র, সুরলোক, সুরধুনী, সুরনদী-র অর্থও সকলের জানা।
আমরা সকলেই বলি অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষে আলোর রেখার কথা। সুড়ঙ্গশেষে আলোকবর্তিকা নিয়ে বাংলাভাষায় কয়েকহাজার উদ্ধৃতি পাওয়া যাবে। অর্থাৎ মাটিতে সুড়ঙ্গ যেন খোঁড়াই হয় সুড়ঙ্গের শেষে আলোর দেখা মেলার জন্যে। আপ্তের ‘To shine’ বা হরিচরণের ‘দীপ্তিমান হওয়া’-র কথাই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে যেন এখানে।
সুরঙ্গ(সুড়ঙ্গ) শব্দটির ব্যুৎপত্তি হবে,
[সং সুর্ (আলোকিত হওয়া) + √গম্ + অ, খচ্ (মুমাগম)]।
অর্থাৎ যে খননপথের শেষে আলোর রেখা দেখা যায়, তাই হল সুরঙ্গ তথা সুড়ঙ্গ।
আমার এই সর্পিল সুড়ঙ্গ-ব্যাখ্যা বিদ্বজ্জনরা মানবেন কিনা জানি না, তবে আমি নাচার।
পরিশেষে জানাই আলিপুরের ন্যাশনাল লাইব্রেরি (পূর্বতন বেলভেডিয়ার হাউস) থেকে একটি সুড়ঙ্গ নাকি অতীতে আদিগঙ্গায় পড়ত।
ফোর্ট উইলিয়াম থেকেও সুড়ঙ্গপথে গঙ্গায় যাওয়া যায়।কত সুড়ঙ্গ যে কলকাতার বুকে খোঁড়া হয়েছিল, তা দেবা ন জানন্তি, কুতঃ মনুষ্যা।
কলকাতাকে সুড়ঙ্গনগরী বললেও অত্যুক্তি হবে না।