আজকের আলোচ্য শব্দ বাউল।
বাউল শব্দটি খুব প্রাচীন। চৈতন্য চরিতামৃত-এ আছে ‘বাউলকে কহিয় — কাজে নাহিক আউল।’
সুধীর চক্রবর্তী তাঁর ‘বাউল ফকির কথা’ বইটিতে বাউল শব্দের উৎপত্তি নিয়ে সুন্দর আলোচনা করেছেন৷ যদিও এগুলি তাঁর নিজস্ব মত নয়, বহুদিন ধরে চলে আসা বিভিন্ন লেখকের মতগুলিকেই তিনি বিবৃত করেছেন।
‘বাউল’ নাকি আসছে সংস্কৃত ‘বাতুল’ শব্দ থেকে৷ বস্তুত জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাঙ্গালা ভাষার অভিধান, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ, সংসদ বাংলা অভিধান, রাজশেখর বসুর চলন্তিকা, সুবলচন্দ্র মিত্রর আদর্শ বাঙ্গালা অভিধান, নগেন্দ্রনাথ বসুর বিশ্বকোষ, জামিল চৌধুরী সম্পাদিত বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান, — সর্বত্রই বাতুল থেকে বাউল আসার কথা বলা হয়েছে। তবে ব্যাকুল, বায়ুর, বাউর থেকে বাউল আসার দ্বিতীয় তত্ত্বও কেউ কেউ ব্যক্ত করেছেন।
আমার ধারণা, বাতুল থেকে বাউল আসেনি৷ মনে একটি জিজ্ঞাসা জাগবেই, বাতুল মানে তো পাগল, বাউল হতে হলে পাগল হওয়া কি আবশ্যিক শর্ত?
নাকি মনের মানুষকে পেয়ে পাগলপারা(?) ভাবের উদয় হয় বলে, এই তত্ত্ব খাড়া করা হয়েছে?
অনেকদিন ধরে ভাবতে ভাবতে মনে হল, ‘বাউণ্ডুলে’ শব্দটি থেকে বাউল আসছে না তো? ব্যাকরণগত ভাবে তা কি সম্ভব? অনেক ভেবেচিন্তে মনে হল, সম্ভব হলেও হতে পারে৷ ভাষার বিবর্তনে মানুষের জিভের, লোক-উচ্চারণের, বিশেষ ভূমিকা আছে৷ বহুভাষাবিদকে তাই Polyglot-ও বলে৷
বাউণ্ডুলে-বাঁউড়ুলে-বাউল্লে-বাউল-এইভাবে আসতে পারে ‘বাউল’৷ বাউল যেমন গায়ক হয়, বাউল তেমনি কৃষকদেরও পদবি হয়৷ এই পদবিধারী কৃষকেরা অনেকে হয়তো কোনওদিন গান গাননি, গান গাননি তাঁর পূর্বপুরুষের কেউ৷ তবু তিনি বাউল৷ আসলে তিনি যাযাবর শ্রেণির, বোহেমিয়ান চাষি৷ এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে তাঁর অনির্বার পথ চলা৷ কোনো জায়গায় কয়েক বছর থিতু হয়ে ঘরবাড়ি বাঁধা, তারপর আবার অনির্দিষ্টভাবে পথ চলা, এ চলার বিরাম নেই৷ চরৈবেতি, চরৈবেতি৷
বাউল গায়করা কিন্তু তাঁদের পূর্বশব্দ নিয়ে মোটেই ভাবিত নন৷ তাঁরা আজ প্যারি, কাল লন্ডন, পরশু নিউইয়র্ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন৷ তাঁদের জেট ল্যাগ হয় না, তাঁরা বিশ্ববাউল৷ পয়সা কামানোই তাঁদের ধ্যানজ্ঞান, তাঁদের মোক্ষ৷ সঙ্গে বিদেশিনী সেবাদাসী যদি জুটে যায়, তবে তো সোনায় সোহাগা৷
বাউল-বিশেষজ্ঞরাও অতিশয় আজব মানুষ৷ তাঁরা ‘বাতুল’ ঘোড়াকে দাঁড় করাতে পারছেন না৷ আবার বাউন্ডুলেকে বসতেও বলছেন না৷ তাঁদের বাউণ্ডুলের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার সময় নেই৷
বাউল ও বাউণ্ডুলে, দুজনকেই সংসার প্রতিপালন করতে হয় ‘মাধুকরী’ থেকে৷ ভিক্ষুকের বেশে গেরস্তবাড়ি থেকে পাওয়া চাল-ডালকে বলে মাধুকরী বা মাদগিরি৷ বাউণ্ডুলে শব্দ থেকে বাউল আসার সম্ভাবনাকে মাধুকরী তথা ‘মাদগিরি’ আরও বাড়িয়ে তুলেছে৷
শ্রদ্ধেয় সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ মহাশয় সুধীর চক্রবর্তী প্রণীত ‘বাউল ফকির কথা’ গ্রন্থের সমালোচনা করতে গিয়ে এক জায়গায় লিখেছেন, ‘‘আমার ধারণা, লোকভাষায় ভোকাবুলারি থেকে অর্থ হারিয়ে যাওয়া বহু শব্দের মধ্যে একটা শব্দ হল ‘বাউল’৷ প্রচলিত মতে ‘বাউল’ শব্দটি নাকি এসেছে ‘বাতুল’ শব্দ থেকে৷’’ সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ মহাশয় ঠিক প্রশ্নই তুলেছেন, তাহলে ‘মাতুল’ থেকে ‘মাউল’ হল না কেন? এবং বাউল অর্থে ‘বাতুল’ প্রয়োগের কোনও লিখিত নিদর্শন পাওয়া গেল না কেন?
আমারও ডাক্তারি এই যে, ‘বাতুল’ থেকে ‘বাউল’ আসেনি৷ তাহলে বাতুলের থেকে বেশি ব্যবহৃত ‘বাতুলতা’ থেকে ‘বাউলতা’ বলে একটা শব্দের অস্তিত্ব থাকত অভিধানে৷ উলটোদিক দিয়ে আরবি-ফারসি থেকেই যে ‘বাউল’ আসছে, তাও বলা যাচ্ছে না৷ যেহেতু ‘আউলওয়ালী’ শব্দটিও সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ আরবি অভিধানে খুঁজে পাননি৷ তাহলে ‘বাউল’ এল কোথা থেকে? সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ নিজে কোনও সমাধান দেননি। প্রশ্নটি শুধু তুলেছিলেন।
আমার মতে ‘বাউণ্ডুলে’ থেকে ‘বাউল’ আসছে।
বাউণ্ডুলে থেকে বাউল শব্দে পৌঁছতে যে মধ্যবর্তী শব্দগুলি পার হতে হয়, সেগুলো হল, বাঁউড়ুলে, বাউল্লে (বাউল্ল্যা) ও বাউলে। বাউল্ল্যা পদবিটির দেখা পাওয়া যায়। বাউল্লে, বাউলে-ও মেলে। সুতরাং বাউণ্ডুলে থেকে বাউল আসার পথে কোনও বাধা নেই।
বাংলা গানে সেই কতযুগ আগে ‘ঝড় উঠেছে, বাউল বাতাস’ লেখা হয়েছে। বাতাসের গতিময়তা, তার বাউণ্ডুলেপনা গীতিকারকে প্রণোদিত করেছে বাতাসকে বাউলের সঙ্গে তুলনা করতে।