আজকের আলোচ্য শব্দ বুজরুক।
বুজরুক বিষয়ে আর বুজরুকি নিয়ে দু-চার কথা না বললেই নয়। ফারসি বুজু্র্গ থেকে বাংলায় বুজরুক এসেছে বলে আভিধানিক মত। বলাবাহুল্য, শব্দটির অর্থ পাল্টে গেছে সম্পূর্ণভাবে। পণ্ডিত বা প্রাজ্ঞজন হয়ে গেছে চালবাজ, ঠগবাজ। এটি ছাড়া অর্থের অপকর্ষের উদাহরণ হিসেবে পেশ করা হয় ফাজিল ও ক্যাবলার। আরবিতে ফাজিল মানে বিদ্বান, পণ্ডিত। বাংলায় বাচাল, বখাটে। আরবিতে ক্কাবিল মানে সমর্থ, নিপুণ বা পণ্ডিত। বাংলায় ক্যাবলা হল বোকারাম, হাবাগোবা। প্রশ্ন হল, সত্যিই কি বুজরুক ফারসি থেকে এসেছে?
বাংলাতেও যে বুঝরোক বা বুঝরুখ বলে একটি শব্দের অস্তিত্ব থাকতে পারে, সেটার তত্ত্বতালাশই করা হয়নি। তা থেকেও যে বুজরুক আসা সম্ভব তা কেউ ভেবেই দেখেননি।
হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ-এ পাচ্ছি, [ফা ‘বুজ.রগ্ — সাধুপুরুষ; হিন্দি, মারাঠি বুজুর্গ]।
অর্থ সাধু।
হুতোম প্যাঁচার নকশা থেকে উদ্ধৃতি আছে, “আমাদের সিম্লে পাড়ায় এক মহাপুরুষ সন্ন্যাসী এসেছেন, তিনি সোণা তইরি কত্তে পারেন…তিনি ভারি বুজরুক।”
বুজরুকি, বুজরুগির অর্থ দিয়েছেন, ১. ধূর্ত্ততা, প্রতারণা ২. সাধুতা।
সংসদ বাংলা অভিধান-এ পাই,
বুজ.রুক বিণ ১. পাণ্ডিত্যের বা অলৌকিক শক্তির ভানকারী ২. প্রতারক
(ফারসি. বুজুর্গ)
বুজরুকি — পাণ্ডিত্য বা অলৌকিক শক্তির ভাণ, প্রতারণা।
সংসদ অভিধান-এর সংকলক ফারসিতে বুজুর্গ-এর আসল অর্থ না দিয়ে ভুল করেছেন। বাংলায় প্রচলিত অর্থগুলিই শুধু দিয়েছেন। ফারসিতে বুজুর্গ-শব্দটির পণ্ডিত-অর্থ যে একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে গেছে বাংলায়, সেটা পাঠক বুঝবে কী করে?
গোলাম মুরশিদ সম্পাদিত বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধানে পাই, বুজরুকি, বুজরুগি [ফারসি বুজুর্গ] ১. বি প্রাজ্ঞতা (অনেক লক্ষ্নৌএ পাতি ও ইরাণী চাঁপদাড়ি বাবুর বুজরকি ও কেরামতের অনিয়ত ইনসাফ করে থাকেন। — হুতোম, ১৮৬১)। ২. অলৌকিক শক্তির ভান, (বিবিধ প্রকার বুজরুকি হতে আরম্ভ হয়েছে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৮৯২)। ৩. ছলনা, ভান, (কতকগুলি শিক্ষিত পুতুলনাচওলার বুজরুকিমাত্র। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৯০৮)।
জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান’-এ পাই, — বুজরুক [ফা বুজুর্গ (সম্মানিত বৃদ্ধ, বয়োবৃদ্ধ ও বিজ্ঞ] বাঙ্গালায় কদর্থেই ব্যবহৃত, বিণ কুটিল, যার পেটে কথা পাওয়া যায় না, যে সরল ও স্পষ্ট কথা বলে না, নানা ভাণকারী। বিশেষ্য বুজরুকি।
সুশীল কুমার দের ‘বাংলা প্রবাদ’ বইটিতে বুজরুক ও বুজরুকি নিয়ে কোনও প্রবাদ নেই। ‘বুজরুক’ শব্দটি অন্যত্র যতই বুজরুকি করে বেড়াক, বাংলা বাগধারায় ঘাঁটি গাড়তে পারেনি।
সুবলচন্দ্র মিত্র প্রণীত আদর্শ বাঙ্গালা অভিধান-এ বুজরুকের অর্থ দেওয়া হয়েছে, কুহকী, মায়াবী, কূটকৌশলজ্ঞ, বিদ্যার ভাণকারী, কপট, শঠ।(ফারসি বুজুর্গ)।
বুজরুকির অর্থ, বুজরুকের ভাব বা কাজ, কুহক, মায়া, কূটকৌশল, চালবাজি, কপটতা, শঠতা। এখানেও সেই নিন্দার্থে ব্যবহারই প্রাধান্য পেয়েছে, প্রশংসাবাচক অর্থ গৌণ হয়ে গেছে।
ফারসিতে বুজুর্গ মানে পণ্ডিত ব্যক্তি। তাহলে বাংলায় এসে শব্দটির মানে পুরো বদলে গেল কেন? এ নিয়ে অনেকেই অনেক তত্ত্ব দিয়েছেন। তবে প্রতারক বা ঠগ অর্থে বুজরুকের বাংলা ব্যুৎপত্তি হয় কিনা কেউ ভেবে দেখলেন না। আমার মনে হয় বাংলা ব্যুৎপত্তিও সম্ভব।
‘বুঝ’ শব্দটির অর্থ বুদ্ধিশুদ্ধি বা কাণ্ডজ্ঞান। বুদ্ধিশুদ্ধি লোপ পেয়ে গেলে বা কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেললে মানুষ প্রতারিত হয়। ‘রোক’ শব্দটি বাংলায় এসেছে ‘রোধক’ থেকে। মানে বাধা, নিষেধ। একজন মানুষের বুঝ-কে বাধা দিয়ে তাকে ঠকায় যে, সেই ‘বুঝরোক’। বহুব্রীহি সমাস । বুঝরোক থেকে তো অল্পতেই বুজরুক এসে যায়। বুঝদার, বুঝ-শুঝ(বুদ্ধিশুদ্ধি), বুঝ-সমুঝ (সমঝদারের ভাব), বুঝ-ব্যবস্থা, বুঝাবুঝি, শব্দগুলি তো অভিধানেই আছে।
বুঝরোক বা বুঝরুখ(বুজরুক) অভিধানে না থাকলেও, অর্থহীন নয়, নিষ্পন্ন শব্দ, ব্যাকরণগতভাবে ঠিক। যার সংস্পর্শে এলে মানুষের বুদ্ধিশুদ্ধি লোপ পেয়ে যায়, মানুষ প্রতারিত হয়, তাকেই বুঝরোক তথা বুজরুক বলা যাবে। আমার এই তত্ত্ব কাউকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও মেনে নিতে বলছি না, সম্ভাব্যতা নিয়ে মতামত দিতে বলছি। বিপরীত মত থাকবেই। ওটা থাকাই স্বাস্থ্যকর।