আজকের শব্দ আচাভুয়া।
শব্দটি বাঙালি পাঠকের কাছে কিঞ্চিৎ অপরিচিত ঠেকলেও, সাহিত্যে এর ব্যবহার আছে। প্রাজ্ঞ লেখকরা এখনও শব্দটি ব্যবহার করেন।
ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর লিখে গেছেন —
‘শাঁখা, শাড়ি, সিঁদুর, চন্দন, পান গুয়া৷
নাহি দেখি, আয়তি কেবল আচাভুয়া৷’
আচাভুয়া মানে কী? ‘আচাভুয়ার বোম্বাচাক’-ই বা কী জিনিস? খায় না মাথায় দেয়! বস্তুত বাংলাভাষার অভিধান প্রণেতাগণও আচাভুয়া ও বোম্বাচাক বোঝাতে নাকানিচোবানি খেয়েছেন৷ সংসদ বাংলা অভিধান-এ ও হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’-এ আচাভুয়া বলতে কিম্ভূতকিমাকার বা অদ্ভুতদর্শন ব্যক্তি বা বস্তুকে বোঝানো হয়েছে৷ সংস্কৃত ‘অত্যদ্ভুত’ থেকেই নাকি আসছে আচাভুয়া৷ আবার জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান’-এ সংস্কৃত ‘অসম্ভব’ বা হিন্দি ‘আচাম্ভ’ থেকে আচাভুয়ার উৎপত্তির কথা বলা হয়েছে৷
বস্তুত আচাভুয়া নিয়ে ভাবতে ভাবতে যখন কূলকিনারা পাচ্ছিলাম না, তখন একটি সূত্র পেলাম জ্ঞানেন্দ্রমোহনের অভিধান থেকেই৷ ‘আচাভুয়ার বোম্বাচাক’ বলে যে বাগধারাটি আছে, তার অর্থ হল — সোনার পাথরবাটি বা কাঁঠালের আমসত্ত্ব জাতীয়৷
আচাভুয়ার অনেক রকম উচ্চারণ তথা বানানভেদ আছে৷ যথা আচাবুয়া, আচাবুয়ো, আচাভুয়ো৷ ‘হতোম পেঁচার নক্সা’য় লেখা হয়েছে,‘চুঁচড়োর বারোইয়ারিতে ‘আচাভো’, ‘বোম্বাচাক’ প্রভৃতি সং প্রস্তুত হত৷’ অর্থাৎ আচাভো আরও একটি শব্দরূপ৷ অভিধানপ্রণেতাগণ যতই সংস্কৃত পূর্বনামের কথা বলুন না কেন, প্রথম থেকেই আমার মনে হত, ‘আচাভুয়া’ শব্দটি বহিরাগত৷ পর্তুগিজ ও ইংরেজি শব্দ তো আমাদের বাংলা ভাষায় গিজগিজ করছে৷
মনের মধ্যে আচাভুয়া-আচাভুয়ো-আচাভো নাম জপতে জপতে ‘ইউসেবিও’ নামটি হঠাৎই মাথায় খেলে গেল৷ আমার আদি অকৃত্রিম ফুটবলপ্রেমই হয়তো ইউসেবিও নামক পর্তুগিজ ফুটবলারের নামটি মগজে চালান করল৷ পর্তুগিজ-ফুটবলারের নাম যখন, তখন ইউসেবিও শব্দটি পর্তুগিজ হতেই পারে৷ ‘ইউসেবিও’-র মানে জানতে হিমশিম খেয়ে যেতে হল৷ ইন্টারনেটের শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া গতি নেই৷ দেখলাম ‘ইউসেবিও’ শব্দটি একটি স্প্যানিশ-পর্তুগিজ শব্দ, এর মানে ধর্মপ্রাণ সাত্ত্বিক পূজারি বা পাদ্রি৷ এই শব্দটিরও অনেকগুলি কথ্যরূপ আছে৷ তার একটি হল ‘এসেবিও’৷ মগজে ঘুরঘুর করতে থাকা বুৎপত্তি-পোকাটা বলল—
ইউসেবিও — এসেবিও — এচেবিও — আচাবুও — আচাবুয়া — আচাভুয়া, এই পথেই শব্দটি এসেছে৷ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে ব্যাবসা-বাণিজ্যের ছলে এসে জাঁকিয়ে বসার আগে থেকেই পর্তুগিজরা ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যে লিপ্ত ছিল৷ তার সঙ্গে তারা চালাত ধর্মপ্রচার, দাসব্যাবসা, দস্যুবৃত্তি৷ হুগলির ব্যান্ডেলের চার্চ পর্তুগিজদেরই তৈরি, কলকাতার মুর্গিহাটার চার্চও।
বস্তুত পর্তুগিজ পাদ্রি ও পর্তুগিজ জলদস্যুতে গিজগিজ করত চারশে বছর আগেকার বাংলা৷ জলদস্যুরা তখন বঙ্গভূমির ত্রাসবিশেষ৷ ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েকে চুরি করে চালান করত নিজের দেশে৷ সুন্দরী রমণীদেরও হরণ করে নিয়ে যেত৷ জলদস্যু তথা বোম্বেটে তথা বোম্বাটিয়া শব্দটি আসছে পর্তুগিজ ‘বোম্বার্ডিয়েরো’ শব্দ থেকে৷ বোম্বার্ডিয়েরো থেকে বোম্বাটিয়াক হয়ে বোম্বেটিয়া বা বোম্বেটে শব্দটি এসেছে৷ বোম্বাটিয়াক থেকেই এসেছে বোম্বাচাক শব্দটি৷ অর্থাৎ বোম্বাচাক মানেও জলদস্যু৷ অনেকে বোম্বাচাক মানে ভম্বচক্র বা ধোঁয়ার কুণ্ডলী বোঝেন৷ কেন তা পরিষ্কার নয়।
কথাটা হচ্ছে, পাদ্রি তথা ইউসেবিও তথা আচাভুয়াকে অদ্ভুতদর্শন বা কিম্ভূতকিমাকার বলা হচ্ছে কেন? আমার মনে হয়, পাদ্রির অদ্ভুত পোশাকআশাকই চার-পাঁচশো বছর আগেকার অনভ্যস্ত বাঙালির চোখে তাদের অদ্ভুতদর্শন বা কিম্ভূতকিমাকার করে তুলেছিল৷ সনাতন ভারতীয় পোশাকরীতির সঙ্গে পর্তুগিজ পাদ্রির পোশাক যে একেবারেই মেলে না, তা বলাই বাহুল্য৷ যদিও পাদ্রিদের সম্বন্ধে ভালো ধারণাই ছিল তৎকালীন বঙ্গজনের। ‘আচাভুয়া পানি/বানি’ বলে যে শব্দবন্ধ অভিধানে পাই, তার প্রকৃত অর্থ আচাভুয়া বাণীও হতে পারে৷ কেন-না মিশনারিদের দ্বারা খ্রিস্টধর্মের প্রচার ইংরেজের আগে পর্তুগিজরাই বঙ্গদেশে শুরু করেছিল৷ এ প্রসঙ্গে ডোম আন্তোনিওর কথা মনে পড়বেই। খ্রিন্টান ডায়ালগ বা ‘আচাভুয়া বাণী’ তখনকার বাংলার নিরক্ষর ও অল্পশিক্ষিত জনগণের কাছে কিছুটা হলেও আদৃত হয়েছিল৷
এখনও বাংলাদেশে খুলনার চালনা বন্দরের কাছে আচাভুয়া নামে একটি গ্রাম আছে৷ এখানকার অধিবাসীরা পেশায় মুচি হলেও নিজেদের ‘ঋষি’ বলে পরিচয় দেয়৷ কয়েকশো বছর আগে তাদের পূর্বপুরুষরা যে ঋষিতুল্য মানুষ ছিল, তা বংশপরম্পরায় তাদের জানা৷ যদিও ধর্মপ্রচারের কাজ ‘ফুরিয়ে’ যাওয়ায় জীবিকার তাগিদে তাদের অন্য কাজ বেছে নিতে হয়৷ এখনও এই জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে বর্তমান৷ যদিও তাদের সংখ্যা ক্রমশ কমে আসছে৷ ইউসেবিও শব্দটিকে তারা এখন চিনতে পারবে কিনা সন্দেহ৷ ধর্মপ্রাণ সাত্ত্বিক পাদ্রি তথা আচাভুয়া যে কখনও হিংস্র নরহন্তারক জলদস্যু হতে পারে না, তা দিনের আলোর মতো সত্য৷ এইজন্যই সোনার পাথরবাটি বা কাঁঠালের আমসত্ত্বর সঙ্গে সমার্থক ধরা হয় ‘আচাভুয়ার বোম্বাচাক’-কে৷ বস্তুত স্প্যানিশ-পর্তুগিজ শব্দ আচাভুয়া যে ইউসেবিও শব্দজাত তা অদ্যাবধি কেউ ধরতে পারেননি৷
অনুষ্টুপ পত্রিকায় রবীন্দ্রগবেষক সমীর সেনগুপ্তর লেখা রবীন্দ্রনাথের মদ্যপান-বিষয়ক একটি প্রবন্ধে বাঙালির আচাভুয়া বা পিউরিটান অভ্যাসের কথা লেখা হয়েছে। বস্তুত তখনই অনেকের নজরে আসে শব্দটি। চন্দ্রিল ভট্টাচার্যের লেখাতেও পিউরিটান বা বিশুদ্ধবাদীঅর্থে ‘আচাভুয়া’ শব্দটির ব্যবহার পেয়েছি।
সুতরাং হাল আমলের বাংলাতেও আচাভুয়া শব্দটি জায়গা করে নিয়েছে। ইউসেবিও ফুটবলার হিসেবে পেলের সমকক্ষ ছিলেন। একসময় পেলে-টোস্টাও-ইউসেবিও, একই বন্ধনীতে জায়গা পেতেন। ইউসেবিওর শেষজীবন সুখের হয়নি। একটি পা বাদ গিয়েছিল মৃত্যুর কয়েকমাস আগে। তবে আচাভুয়া শব্দটিকে বাংলাভাষা থেকে বাদ দেয় কার সাধ্যি!