এবারের শব্দ ‘কোটি’ তথা তেত্রিশ ‘কোটি’ দেবদেবী
দেবদেবীর সংখ্যা নিয়ে একটা মারাত্মক রকমের বিভ্রান্তি আছে৷ অনেক হিন্দুই বিশ্বাস করেন, দেবদেবীর সংখ্যা ৩৩ কোটি৷ প্রচলিত বয়ানে যা ৩৩ কোটি দেবতা, তা আসলে হচ্ছে ৩৩ ‘কোটিদেবতা’৷ ঋগ্বেদে ৩৩ প্রধান দেবতার নাম পাওয়া যায়৷ এঁরা হলেন দ্বাদশ আদিত্য, একাদশ রুদ্র, অষ্ট বসু, ইন্দ্র ও প্রজাপতি (মতান্তরে অশ্বিনীকুমারদ্বয়)৷ ‘কোটি’ শব্দটি যখন বিশেষ্য, তখন এর অর্থ অগ্র বা শীর্ষ৷ ধনুকের অগ্রদেশ বা প্রান্তবিন্দুও হয়। ভাগ, প্রান্তও বোঝানো যায় ‘কোটি’ শব্দটি দিয়ে। কোটি-র অর্থ উৎকর্ষও হয়। কোটি-র মানে কোনওদিন প্রকার বা রকম নয়, অভিধানে ছিলও না। যদিও ইদানীং মিডিয়ায় ‘প্রকার’ অর্থটি জোর করে চালানো হচ্ছে। বামন শিবরাম আপ্তের Practical Sanskrit-English Dictionaryতে কোটির মানে Zenith বা শীর্ষবিন্দু বলা হয়েছে। অগ্রগণ্য বা শীর্ষস্থানীয় দেবতা তথা বৈদিক দেবতাকে তাই ‘কোটিদেবতা’ বলা যাবে৷
ঊনকোটি চৌষট্টি দেবতার যে উল্লেখ হিন্দুশাস্ত্রে তথা লোকপ্রবচনে পাই, তার মানে বুঝতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়৷ শীর্ষস্থানের ঠিক নীচেই যে সমস্ত দেবতার অবস্থান, তাঁদের ‘ঊনকোটিদেবতা’ বলা যাবে৷ সমস্ত পৌরাণিক এবং লৌকিক দেবতার মিলিত সংখ্যা ৬৪৷ দুর্গা, সরস্বতী, লক্ষ্মী, কালী, কার্তিক, মনসা প্রমুখ সমস্ত দেবদেবী এই গোত্রের অন্তর্ভুক্ত৷ ত্রিলোকের তিন প্রধান, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর৷
অর্থাৎ হিসেবটা এইরকম : —
কোটিদেবতা ৩৩
উনকোটিদেবতা ৬৪
ত্রিলোকের প্রধান ৩
মোট ১০০
হিন্দুদের মোট দেবদেবীর সংখ্যা তাই মাত্র একশত৷ এই জন্যেই হিন্দুশাস্ত্রে শত কোটি প্রণামের উল্লেখ আছে, যা আসলে শত ‘কোটিপ্রণাম’৷ সুতরাং ‘কোটি’ শব্দকে বিশেষ্য না ধরে বিশেষণ (সংখ্যাবাচক) ধরে আমাদের শাস্ত্রকারগণ বিরাট ভুল করে এসেছেন৷ অভিধানে ‘কোটিদেবতা
শব্দটির জায়গায় আছে ‘কোটীশ্বর’৷ যেখানে এর অর্থ দেবতা বা ঈশ্বর হওয়ার কথা, সেখানে এর অর্থ করা হয়েছে নৃপতি। এটা কোন পণ্ডিতের কাজ, তা জানার আগ্রহ জাগে মনে। আমার স্থিরপ্রত্যয় এই যে, ঈশ্বর এখানে দেবতা-অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে৷
এবার তেত্রিশ কোটি দেবতার রহস্য ফাঁস করা যাক।
তেত্রিশ ‘কোটিদেবতা’: —
দ্বাদশ আদিত্য : —
(১) ধাতা (২) অর্য্যমা
(৩) মিত্র (৪) বরুণ
(৫) অংশ (৬) ভগ
(৭) বিবস্বান (৮) ইন্দ্র
(৯) পূষা (১০) পর্জ্জন্য
(১১) ত্বষ্টা (১২) বিষ্ণু
একাদশ রুদ্র :
(১) অজ (২) একপাৎ
(৩) অহিব্রধ্ন (৪) বিরূপাক্ষ
(৫) রৈবত (৬) হর
(৭) বহুরূপ (৮) ত্র্যম্বক
(৯) সাবিত্র (১০) জয়ন্ত
(১১) পিনাকী
অষ্টবসু : —
(১) ধর (২) ধ্রুব
(৩) সোম (৪) অহ
(৫) অনিল (৬) অনল
(৭) প্রত্যূষ (৮) প্রভাস
ইন্দ্র ও প্রজাপতি বা, অশ্বিনীকুমারদ্বয়=২
মোট= ১২+১১+৮+২=৩৩
ঊনকোটি চৌষট্টি দেবতা : —
কোটিদেবতা বা বৈদিক দেবতাদের (সংখ্যা ৩৩) ঠিক নীচে ঊনকোটি দেবতা বা পৌরাণিক দেবতাদের স্থান৷ লৌকিক দেবদেবীও এই গোত্রে পড়েন৷ দ্বিতীয় পর্যায়ের এই দেবতার সংখ্যা চৌষট্টি৷ চৌষট্টিজন ঊনকোটিদেবতা খুঁজে পাওয়া সত্যিই দুঃসাধ্য৷ তবুও চেষ্টা-চরিত্র করে একটা লিস্ট বানানো গেল :
১) দুর্গা, ২) কালী, ৩) লক্ষ্মী, ৪) সরস্বতী, ৫) ইন্দ্র, ৬) শ্রীকৃষ্ণ, ৭) কার্তিক, ৮) গণেশ, ৯) মদন, ১০) যম, ১১) শনি, ১২) বরুণ, ১৩) অগ্নিদেব, ১৪) পবনদেব, ১৫) বলরাম, ১৬) রাধা, ১৭) জগন্নাথ, ১৮) কুবের, ১৯) বিশ্বকর্মা, ২০) মনসা, ২১) শীতলা, ২২) ষষ্ঠীদেবী, ২৩) গন্ধেশ্বরী, ২৪) দক্ষিণরায়, ২৫) ধর্মঠাকুর, ২৬) বিশালাক্ষী, ২৭) সিদ্ধেশ্বরী, ২৮) সুবচনা বা শুভচণ্ডী, ২৯) ওলাদেবী, ৩০) বনদেবী বা বনবিবি, ৩১) ঘন্টকর্ণ বা ঘেঁটু, ৩২) ইতুলক্ষ্মী, ৩৩) অদিতি, ৩৪) পদ্মা,৩৫) শচী, ৩৬) মেধা, ৩৭) সাবিত্রী, ৩৮) বিজয়া, ৩৯) জয়া, ৪০) দেবসেনা, ৪১) স্বধা, ৪২)স্বাহা, ৪৩) শান্তি, ৪৪) পুষ্টি, ৪৫) ধৃতি, ৪৬) তুষ্টি, ৪৭) কুলদেবতা, ৪৮) আত্মদেবতা, ৪৯) রাম, ৫০) লক্ষ্মণ, ৫১) সুগ্রীব, ৫২) হারীথ, ৫৩) গরুড়, ৫৪) চণ্ডক বা চণ্ডার্ক, ৫৫) চন্দ্রদেব, ৫৬) ধন্তন্তরী, ৫৭) ক্ষেত্রপাল, ৫৮) বৃহস্পতি, ৫৯) গঙ্গা, ৬০) জগদ্ধাত্রী, ৬১) বাসন্তী, ৬২) অঙ্গদ, ৬৩) সন্তোষী, ৬৪) তুলসী।
হিন্দুদের দেবদেবীর ‘গ্রেকোরোমান’ স্টাইলটির কথা অনেক তাত্ত্বিকই বলে গেছেন৷ চিন্তাহরণ চক্রবর্তী তাঁর বই ‘হিন্দুর আচার-অনুষ্ঠান’-এ, পল্লব সেনগুপ্ত তাঁর বই ‘পূজাপার্বণের উৎসকথা’-য় একথা জানিয়েছেন। কমলকুমার মজুমদার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, আরও অনেকে এ নিয়ে ভেবেছেন৷ গ্রিক, রোমান দেবতার মুখের আদল আমাদের দেবদেবীর মধ্যে চলে এসেছে। আর্যদের ভারতে আগমনের সঙ্গে এর সম্পর্ক আছে নিশ্চিতভাবেই। রোমান ও গ্রিক দেবতা কিন্তু সবসময় এক নয়, ক্ষেত্রবিশেষে অনেক আলাদা। গুণে দেখা গেল, গ্রেকোরামান দেবদেবীর সংখ্যা ও হিন্দুদের বৈদিক দেবতার সংখ্যা প্রায় গায়ে গায়ে৷
লিস্টটা বেশি লম্বা নয়—
১. অলিম্পিয়াস ২. জুপিটার
৩. জিউস ৪. জোভ
৫. হেলিওস ৬. অ্যাপোলো
৭. ফেবিয়াস ৮. মার্স
৯. মার্কারি ১০. নেপচুন
১১. ভালকান ১২. ডায়োনিসাস
১৩. প্লুটো ১৪. হেডিস
১৫. স্যাটার্ন ১৬. কিউপিড
১৭. ইরস ১৮. স্ফিংকস
১৯. জুনো ২০. হেরা
২১. ডেমিটার ২২. প্রসারপাইন
২৩. ডায়না ২৪. আর্টেমিস
২৫. মিনার্ভা ২৬. ভেনাস
২৭. আফ্রোদিতি ২৮. রিয়া
২৯. টেলাস ৩০. গাইয়া
৩১. ভেস্তা ৩২. এথেনা
৩৩. পসাডাইন
তাহলে ওরা ও আমরা সমান৷ হিসেবটা মোটের ওপর মিলে গেল। আসলে গ্রেকোরোমান দেবতার প্রভাবে গঠিত হিন্দু দেবদেবী অনার্য দ্রাবিড় ও অস্ট্রিক টোটেমগুলিকে গ্রাস করে নেয়। সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ বা Hegemony-র শিকার হয় অনার্য দেবদেবী বা টোটেমগুলি। অনেক সময়ই দেখা যায় অনার্য দেবতা আর্য তথা বৈদিক দেবতার বাহন হয়ে গেছে।
এর সর্বোৎকৃষ্ট নমুনা গরুড়ের বিষ্ণুর বাহন হওয়া। গরুড় দাক্ষিণাত্যে নিজেই আলাদাভাবে পূজিত হত।
বিষ্ণুর আগমনের পর সে বিষ্ণুর বাহনে পরিণত হল।