আজকের শব্দ টেরাকোটা।
যে কোনও ভাষাবিদ গড়গড় করে এর ল্যাটিন ব্যুৎপত্তির কথা বলে যাবেন। ল্যাটিন থেকে নাকি বাংলায় এসেছে। শব্দটি যে ল্যাটিন থেকে ১৭১৫ সালে ইটালিয়ান ভাষায় ব্যবহৃত হয় প্রথম ও ১৮৬৫তে ইংরেজিতে গৃহীত হয়, তাও তাঁরা মুখস্ত বলবেন। যদিও বাংলায় আর কোনও শব্দ ল্যাটিন থেকে আসেনি!
তাঁদের জ্ঞাতার্থে জানাই, টেরাকোটা একটি নিখাদ বাংলা শব্দ। ল্যাটিন ব্যুৎপত্তি খাটে না। ল্যাটিন Terra Cocta থেকে ‘Terracotta’ এসেছে বলা হয়। তবে বাংলা ব্যুৎপত্তির কথা শুনে চমকে উঠবেন না। বাংলা থেকে আসা আরও সোজাপথে।
তৎসম ‘তির্যক’ থেকে আসা টেরা-র অনেকগুলি অর্থ। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’-এ বাংলায় ‘টেরা’ বা ‘টেড়া’র একটি মানে উষ্ণ বা গরম। কটা মানে লালচে, তামাটে বা পিঙ্গল। গরমে যা লালচে হয়ে যায়, তাই টেরাকটা তথা টেরাকোটা। এইভাবে ভাবলে ক্ষতি কী? বিশেষত, বাংলার টেরাকোটার বৈশিষ্ট্য মাথায় রাখলে, এই ব্যুৎপত্তিটিই যুক্তিযুক্ত মনে হয়। অন্যত্র মাটিকে বেক করা হয়, Burn করা বা পোড়ানো হয় না। বাংলায় টেরাকোটা মানেই ‘পোড়ামাটির কাজ’।
বাংলা তথা ভারতীয় ভাষা থেকে অনেক শব্দ ইংরেজিতে গৃহীত হয়েছে। জেমিন্দার, লুট, ঘেরাও ইত্যাদি। হয়তো ‘টেরাকোটা’ও সাহেবদের হাত ধরে ইংরেজি ভাষায় ঢুকেছিল। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার কর্তাব্যক্তি আলেকজান্ডার কানিংহাম ১৬০ বছর আগেই গৌড়-পাণ্ডুয়ার আদিনা মসজিদ, রাজশাহীর পাহাড়পুরের বৌদ্ধমহাবিহারে খননকার্য চালিয়েছিলেন। সেখানে অসংখ্য টেরাকোটার কাজ ছিল। তিনিই সম্ভবত বাংলা ‘টেরাকোটা’ শব্দটিকে ইংরেজিতে গ্রহণ করেন।
তিনি ১৮৩৩এ ভারতে এসে জেমস প্রিনসেপের সঙ্গে যোগ দেন ১৮৩৭-৩৮এ। প্রিনসেপ ছিলেন পুরাতত্ত্ববিদ ও ঐতিহাসিক। তাঁর নামে গঙ্গায় প্রিনসেপ ঘাট আছে। তাঁর সমস্ত জ্ঞান উজাড় করে তিনি দেন কানিংহ্যামকে। কানিংহামই ১৮৬৫তে বাংলা টেরাকোটা শব্দটির ইঙ্গকরণ করে ইংরেজিতে Terracotta লেখেন।
মন্দিরবিশেষজ্ঞ ডেভিড ম্যাককাচচান, এম আর্চার, অনেকেই তো বাংলার টেরাকোটা নিয়ে লিখেছেন। তাঁদের মাধ্যমেই হয়তো টেরাকোটা শব্দটি ইংরেজিতে বহুলপ্রচারিত হয়েছিল। পরে ল্যাটিন ‘Terra Cocta’কে আনা হয়েছে জোর করে।
মন্দিরবিশেষজ্ঞ ও লোকশিল্পবেত্তা ইন্দ্রজিৎ চৌধুরী বিভিন্ন লেখায় লিখেছেন, বাংলার টেরাকোটা শিল্প সম্পূর্ণ নিজস্ব ঘরানার। এর সঙ্গে পৃথিবীর আর কোনও শিল্পের সাযুজ্য নেই। শুধু উপহাস আর পরিহাস করে আমার এই ব্যুৎপত্তি খণ্ডন করা যাবে না, যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করতে হবে। Cocta থেকে cotta আসা সোজা, না ‘কটা’ থেকে cotta আসা সহজ? Terra নিয়ে অনেক কথা বলে, Cocta নিয়ে নীরব থাকলে হবে না। ভাবের ঘরে চুরি করলে ধর্মে সইবে?
প্রসঙ্গত চীনে আবিষ্কৃত ‘Terracotta Warriors’ খৃস্টপূর্ব ২০০০ সালের। সেখানে কিন্তু টেরাকোটা বলা হয় না, চীনা ভাষায় বলা হয়, হং থাও। ল্যাটিনের লেজ ধরে এগোতে গেলে মুশকিল।
বাংলায় পোড়ামাটির কাজের চল ষোড়শ শতক থেকেই চলছে। বিষ্ণুপুরের মল্লরাজাদের প্রতিষ্ঠিত মন্দিরগুলিই তার প্রমাণ। ১৭১৫ সালে ইটালিয়ান ভাষায় নাকি ‘টেরা ককটা’ আসে। তারপর ইংরেজিতে আসে ‘টেরাকোটা’ হয়ে ১৮৬৬তে। বাংলায় টেরাকোটার ঐতিহ্য দুটি সময়কালকেই পিছনে ফেলে দেয়। বাংলা থেকেই যে টেরাকোটা শব্দটি ইংরেজিতে গেছে, তা হলফ করে বলা যায়।