সত্যজিৎ রায়ের অমর সৃষ্টি ফেলুদা। এহেন বুদ্ধিদীপ্ত চরিত্রের নাম ফেলু কেন হল, তার ব্যাখ্যা কেউ দেননি। সত্যজিৎ রায় নিজেও নামটি নিয়ে আমাদের কিছু জানাননি।
ফেলুদা বাংলা সাহিত্যের এক স্বঘোষিত প্রাইভেট ডিটেকটিভ। তাঁর ভালো নাম প্রদোষচন্দ্র মিত্র, ভিজিটিং কার্ডে লেখা থাকে ‘প্রদোষ সি মিটার’। লালমোহনবাবু ওরফে জটায়ু এই নামের এক সাংঘাতিক অর্থ খুঁজে বের করেছিলেন। প্র তে প্রফেশনাল, দোষ অর্থ ক্রাইম, আর সি হচ্ছে টু-সি, মানে ইনভেস্টিগেট করা। ফেলুদার উচ্চতা ছয় ফুট দুই ইঞ্চি। নিয়মিত ব্যায়াম ও যোগাসন করেন। রীতিমত ভাঁজা চেহারা। দেখতে যেমন সুপুরুষ, তেমনি কাজে-কর্মে আর চিন্তাভাবনায় দারুণ স্মার্ট। মুম্বাইয়ের পরিচালক পুলক ঘোষাল তো ফেলুদাকে সিনেমার হিরোও বানাতে চেয়েছিলেন। ফেলুদা রাজি হননি।
তাঁর নেশা মাত্র দুটি, চারমিনার সিগারেট এবং রহস্যভেদ। আর মাঝে মাঝে খাওয়ার পর খয়ের ছাড়া মিঠে-পান। সবসময় দুটি অস্ত্র থাকে ফেলুদার সঙ্গে — পকেটে পয়েন্ট থ্রি টু কোল্ট রিভলভার, আর মাথায় বিখ্যাত মগজাস্ত্র — যার জুড়ি মেলা ভার। ব্যোমকেশ বক্সীর কথা মাথায় রেখেও এটা বলতে হচ্ছে।
ফেলুদার আছে প্রখর মেধা। স্কুলে দু-বার রিডিং পড়েই পুরো ‘দেবতার গ্রাস’ মুখস্ত করে ফেলেছিলেন। তাসের ম্যাজিক জানেন, জানেন হিপনোটিজম, ভেন্ট্রিলোকুইজম নিয়েও পড়াশোনা আছে। ডান আর বাঁ — দুহাতেই লিখতে পারেন তিনি, সব্যসাচীও বলা যায় তাঁকে। তুখোড় ক্রিকেটার ছিলেন। আর তাঁর জ্ঞানের পরিধি তো হিংসে করার মতো। দুর্বোধ্য দর্শন বলুন, কিংবা সাম্প্রতিক বিশ্বের খবরাখবর — সবই তার নখদর্পণে। কঠিন কঠিন সব বিষয়ে আছে তার দক্ষতা — এটিমোলজি, জিওমেট্রি থেকে শুরু করে গাছ বা কুকুরের জাত শনাক্ত করার মত বায়োলজি-বোটানির জ্ঞান। ফেলুদা ভাল আঁকতে পারেন, গাইতে পারেন। যোগাসন করে বডি ফিট রাখেন। ফেলুদার প্রথম কাহিনীতে তাঁর বয়স সাতাশ। তোপসের তেরো-চোদ্দ। কুশল চক্রবর্তী, সিদ্ধার্থ চ্যাটার্জি ছিলেন সত্যজিতের তোপসে। সন্দীপের তোপসে সাহেব ভট্টাচার্য ইত্যাদি।
সত্যজিৎ রায় নিজে ছিলেন ছ-ফুট তিন। ব্যারিটোন স্বর, শালপ্রাংশু পার্সোনালিটি। পড়াশোনার বহর কল্পনাতীত। খেয়াল করে, তলিয়ে দেখতেন সবকিছু আর চিন্তা-বিশ্লেষণ করতে ভালবাসতেন তিনি। ফেলুদার চরিত্র মানিকবাবু তৈরি করেছেন নিজের আদলেই। ফেলুদার তীক্ষ্ণ মনন, সাথে তোপসের সরস, ঝরঝরে লেখনী আর লালমোহন বাবুর হিউমার — এই ত্র্যহস্পর্শে যেন সম্পূর্ণ সত্যজিৎ।
ফেলুদা নামটি সত্যজিৎবাবু কেন নিয়েছিলেন, তা তিনি কোথাও বলে যাননি। যে লোক মাত্র দু-বার রিডিং পড়েই দেবতার গ্রাস মুখস্ত করতে পারে, সে আর যাই হোক, পরীক্ষায় ফেল করার বান্দা নয়। সুতরাং ‘পরীক্ষায় অকৃতকার্য’ অর্থে ফেলু ভাবেননি সত্যজিৎ।
যখন সত্যজিৎ চিত্রপরিচালক জীবনের মধ্যগগনে, তখন চিলির কবি পাবলো নেরুদা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন (১৯৭১ সাল)। ফরাসি দার্শনিক-লেখক জ্যাক দেরিদাও তখন লাইমলাইটে চলে এসেছেন। এই নেরুদা-দেরিদা নামের চক্করে পড়ে কি সত্যজিৎ ফেলুদা নামটি বেছে নিয়েছিলেন? আন্তর্জাতিক স্তরে নামটি গ্রহণযোগ্যতা পাবে আর বাঙালিয়ানাও বজায় থাকবে ভেবে?
নাকি তাঁকে প্রভাবিত করেছিল নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের টেনিদা বা প্রেমেন্দ্র মিত্রর ঘনাদা?
যে কোনও পরীক্ষায় কোনও দিন ফেলই করেনি, তার নাম ফেলুদা রাখা হল কেন? ফেলু নামটি এল কোথা থেকে? বাংলার পাড়ায় পাড়ায় আগেকার দিনে ছেলেদের নাম ফেলারাম, ফেলু আর মেয়েদের নাম ফেলী রাখা হত। তারা হয়তো বুদ্ধিমানই, পরীক্ষাতেও লেটার মার্কস নিয়ে পাস করেছে, কিন্তু নামটি ফেলু। কেউ যে তাদের ফেলে দিয়েছিল জন্মের অব্যবহিত পরে, তারও কোনও তথ্য হাতে নেই। তারা যে ফেলেছড়িয়ে মানুষ হয়, তাও নয়। অনেকেই বেশ গোছান প্রকৃতির, অগোছালো তো নয়ই।
তাহলে, ফেলুদা তথা ফেলু এল কোথা থেকে? হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ, জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাঙ্গালা ভাষার অভিধান, সংসদ বাংলা অভিধান-এ এর উত্তর মিলবে না। মিলবে না রাজশেখর বসুর চলন্তিকাতেও। সুবলচন্দ্র মিত্রর আদর্শ বাঙ্গালা অভিধানেও ফেলু শব্দের অর্থ দেওয়া নেই।
এখানে মুশকিল আসান হতে পারে অধ্যাপক ক্ষুদিরাম দাশের লেখা ‘সাঁওতালি বাংলা সমশব্দ অভিধান’।
এখানে ‘ফেল’ শব্দের একটি অর্থ, বেশি বয়স অথচ অবিবাহিত। সাঁওতালি ভাষা থেকে শব্দটি বাংলায় এসেছে। মেয়েদের ক্ষেত্রে শব্দটি বেশি প্রযোজ্য। বেশি বয়স পর্যন্ত বিয়ে না হওয়া বা আইবুড়ো মেয়েকে ‘ফেলী’ বলা হয়। আইবুড়ো ছেলেদের ফেলারাম বা ‘ফেলু’ বলে। সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদার ক্ষেত্রে এই নামের প্রয়োগ সার্থক। কারণ ফেলুদা চিরকুমার, তাঁর বিয়ে হয়নি। ব্যোমকেশ বক্সীর মতো তাঁর কোনও সত্যবতী নেই।
সত্যজিতের ফেলুদা সিরিজ নারীচরিত্রবর্জিত। এটা নিয়ে অনেকের অভিযোগ আছে। ফেলুদা নামটি কি তাহলে তিনি জেনেশুনেই দিয়েছিলেন?