বটতলা
একটি টিভি চ্যানেলের পয়লা বৈশাখের বিশেষ অনুষ্ঠানে সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহকে বলতে শুনেছিলাম, ‘বটতলার বই আমরা বাথরুমের দরজা বন্ধ করে পড়তাম’৷ তিনি যে অশ্লীল বা যৌনতাসর্বস্ব সাহিত্যের কথাই বলতে চেয়েছিলেন, তা বোঝার জন্যে অবশ্য বাথরুমের দরজা বন্ধ করতে হয় না৷ তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদ করেছিলেন সভায় উপস্থিত বাচিকশিল্পী জগন্নাথ বসু ও ঊর্মিমালা বসু।
আমার মনে হয় ‘বটতলা সাহিত্য’ নিয়ে বাজারচলতি ধারণার গোড়ায় গলদ আছে৷ ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধ থেকে বিংশ শতকের প্রধমার্ধ — বটতলার সাহিত্য আমাদের মননে ব্যাপকভাবে শিকড় ছড়িয়েছিল৷ উত্তর কলকাতার বটতলাকেই বটতলা সাহিত্যের সূতিকাগৃহ বলে দাবি করা হলেও বটতলার বাইরেও অনেক দূর পর্যন্ত এই সাহিত্য বিস্তার লাভ করেছিল৷ মনে হয়, বটগাছ-কেন্দ্রিক বটতলাসাহিত্যের ধারণাটাই ভুল৷ যতই সুকুমার সেনের মত গবেষকরা বটগাছের প্রকৃত অবস্থান নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করুন না কেন।
‘বট’-এর একটি আভিধানিক অর্থ হল ‘বড়া’৷ জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাঙ্গালা ভাষার অভিধানে বট মানে পিষ্টকবিশেষ, বড়া।
হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ-এ পাচ্ছি, বট মানে গোল পিষ্টকভেদ, বড়া। ব্যুৎপত্তি, [√বট্ + অ(অচ্)-ক] ।
কলকাতার বাগবাজার সন্নিহিত এই অঞ্চলগুলিতে সবসময় খোলা জায়গায় রসবড়া, ছানাবড়া, মোচা, বেসন, কলা, আলু প্রভৃতির বড়া পাইকিরিহারে ভাজা হত৷ মেলার মতো পরিবেশে মানুষজন সেই সমস্ত সুস্বাদু বড়ার স্বাদ নিতেন, পেট ভরেও খেতেন অনেকে৷ বড়া বিক্রির এই সমস্ত মোকাম সম্মিলিতভাবে ‘বটতলা’ বা ‘বড়াতলা’ হিসেবে খ্যাত ছিল৷ হ্যাঁ, বটগাছ তো থাকতেই পারে সেখানে, যেমন কলকাতার অন্যত্রও অতীতে প্রচুর সংখ্যক বটগাছ ছিল বা দু-একটি এখনও আছে৷
বটতলার সাহিত্য বলতে মেলার মতো খোলা পরিবেশে রাস্তায় বসে বিক্রির ‘সস্তা’-র সাহিত্য বোঝানো হত৷ কোনো পরিকাঠামো বা স্ট্রাকচার থাকত না বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই৷ গরম গরম চপ-তেলেভাজার সঙ্গে কমদামি সস্তা বই গছানো হতো খদ্দেরদের। কিন্তু গুণপনার দিক থেকে মোটেই নিম্নমানের ছিল না সে-সব বই৷ যদিও ‘বড়া’র বৈগুণ্যও বইয়ের ওপর ভর করে সে-সব সাহিত্যসৃষ্টিকে কমদামি সস্তার সাহিত্য হিসেবে চিহ্ণিত করেছে৷
আধুনিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে ইউরোপীয় সাহিত্য ও ইসলামি সাহিত্য বটতলার হাত ধরেই বঙ্গীয় শিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত জনগণের কাছে পৌঁছোয়৷ মার্কুইস দ্য সাদ, সিগমুণ্ড ফ্রয়েড, হ্যাভলক এলিস প্রভৃতি যৌনতা-মনস্তাত্ত্বিকদের প্রথম ধারণাসমূহ বটতলার হাত ধরেই বাংলার ঘরে ঘরে অন্তঃপুরবাসীদের হাতে পৌঁছোতে থাকে৷ মোটামটিভাবে ‘পেরেস্ত্রৈকা-আক্রান্ত’ ইউরোপীয় সাহিত্যপ্রবাহের সঙ্গে খোলা জানালা দিয়ে মশারাও ঢুকে পড়তে লাগল বাংলার ঘরে ঘরে৷ ‘পাসকরা মাগ’ ধরনের নামকরণও যৌনতার ধারণাটিকে কুলোর বাতাস দিল৷ তবে ফুটপাথে বিক্রি হওয়া কলেজস্ট্রিটীয় কালচারটি কিন্তু বটতলার কাছে ধার করা৷ সস্তার লেটার প্রেসে অযত্নে ছাপা সস্তা বই যে অভ্রান্তভাবে ‘বটতলা সাহিত্য’, এই ধারণাটি এখনও অনেক শিক্ষিত বাঙালির মনে গেড়ে বসে আছে৷ বাস্তবে কিন্তু ‘বটতলা’ অনেক ক্ষেত্রে আমাদের পথ দেখিয়েছে৷ মধ্যযুগীয় কাব্য, ইসলামীয় সাহিত্যের বঙ্গানুবাদ, কালীঘাটের পট বটতলাই সস্তায় আমাদের দিয়েছে৷ বটতলাই যে ‘কমিউন’-ধর্মী লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের প্রথম ধাত্রীগৃহ, তাও বোধহয় স্বীকার করে নেওয়ার সময় এসেছে৷
বটগাছকেন্দ্রিক সাহিত্য-সভ্যতা নয়, বড়া-চপ-তেলেভাজার মোকামকেন্দ্রিক সাহিত্যবাজারের ধারণা অধুনা বইবাজারের ধারণাটিকেও পুষ্ট করে৷ বটতলা সাহিত্য সস্তা যৌনতা ছড়িয়েছে বলে যে অভিযোগ আছে, তা চরম অসত্য৷ বাৎস্যায়নের কামসূত্র পড়া, খাজুরাহো-ঘোরা বাঙালি বোধহয় এত সহজে কাত হয় না৷ তবে ইউরোপীয় পর্নোগ্রাফির বই যে ঊনবিংশ শতকে রাস্তায় ঢেলে বিক্রি হত বটতলার চৌহদ্দির বাইরে, তাও ইতিহাস স্বীকার করে নিচ্ছে৷ বাংলার ঘরে ঘরে, অন্দরমহলে যৌনতার বীজ ঢোকানোয় ইউরোপীয় পর্নোগ্রাফির অবদানও কম নয়৷ ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালিতে ছাপা সুদৃশ্য ক্যাটালগের পাশে বটতলার সস্তা চটি বই হালে পানি পেত না৷ সব ব্যাটাকে ছেড়ে দিয়ে বেঁটে ব্যাটাকে ধরার নীতি চিরকালই চলে আসছে৷
বটতলা যেন সপ্তদশ শতকের লন্ডনের উপকণ্ঠে গ্রোভ স্ট্রিটের মতো। সস্তা চটি বইয়ের সঙ্গে কমদামি স্ট্রিটফুডের কালচারটি আমাদের বাঙালি অভ্যাস-মননে ঢুকিয়ে দিয়েছিল।