আজকের শব্দ ‘দ্রুম’।
‘দ্রুম’ শব্দটি আগে যেমন ব্যবহৃত হত, আজকাল তার বিন্দুমাত্র হয় না। দ্রুম কি তাহলে দুয়োরানির দলে চলে গেল?
সংসদ বাংলা অভিধানে দ্রুম শব্দের ব্যুৎপত্তি আছে, [সং.√দ্রু(ঊর্ধ্বগতি) + ম]।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বন্দে মাতরম্’-এ যে ‘ফুল্লকুসুমিত দ্রুমদলশোভিনীম্’ অংশটি আছে, সেকথা বেশিরভাগ অভিধানকারই মনে করিয়ে দিয়েছেন।
জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান’ খুললে দ্রুম-এর ব্যুৎপত্তি দেখা যায়, [দ্রু(গত্যর্থে)+ ম ]।
এবার আসা যাক হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’-এ। তিনি লিখেছেন, [দ্রু +ম অস্ত্যর্থে, দ্রুমৎ> দ্রুম(?) — দারুযুক্ত]
চিত্রপথদ্রুমাম্, বদ্ধপল্লবপুটাঞ্জলিদ্রুম, শব্দগুলি তিনি সংস্কৃতসাহিত্য থেকে তুলে এনেছেন।
দ্রুমাশ্রম, দ্রুমব্যাধি, দ্রুমরাজ, দ্রুমময়, দ্রুমারি, দ্রুমবান, শব্দগুলি তো আছেই অভিধানে।
সুবলচন্দ্র মিত্র সংকলিত ‘আদর্শ বাঙ্গালা অভিধান’-এ দ্রুম শব্দটির অনেকগুলি অর্থ দেওয়া হয়েছে। যথা, বৃক্ষ, পারিজাত বৃক্ষ, কুবের আর রুক্মিণীগর্ভজাত কৃষ্ণের পুত্র।
তা, দ্রুম শব্দটি আমরা আর ব্যবহার করি না কেন? গাছ এসে তো দ্রুম, বৃক্ষ, পাদপ, মহীরুহ, শব্দগুলির ভাত মেরে দিয়েছে। বৃক্ষের অপভ্রংশের তবু দেখা মেলে, যথা বিরিখ, বিরিখি। দ্রুম শব্দের তদ্ভব রূপগুলি গেল কোথায়?
তন্নতন্ন করে অভিধান ঘেঁটেও আপনি দ্রুম-এর তদ্ভব রূপের দেখা পাবেন না। তবে আভাসে-ইঙ্গিতে আপনাকে ধরে নিতে হবে কোন কোন শব্দ দ্রুম থেকে আসা সম্ভব।
‘দরমা’ শব্দটির কথা কাউকে মনে করিয়ে দিতে হয় না। এর অর্থ বাঁশের চাঁচারি থেকে তৈরি ঘরের দেওয়ালের বিকল্প, টাটি ইত্যাদি। ব্যুৎপত্তি দেওয়া আছে হিন্দি ‘দরমা’ থেকে। তা হিন্দি দরমা কোথা থেকে এল, বলা নেই কোথাও। এই দরমা তো দ্রুম থেকে আসতেই পারে। গাছের আঁশ থেকে যখন তৈরি, তখন তৎসম দ্রুম থেকে তো আসতেই পারে হিন্দি আর বাংলা দু’ভাষাতেই। আসার রাস্তাটি হচ্ছে, দ্রুম > দুরমো > দরমো > দরমা। দরমা বা ছেঁচাবেড়া দিয়ে তৈরি বাড়ি তো পূর্ববঙ্গ থেকে আগত উদ্বাস্তু মানুষজনের কলকাতাবিজয়ের দিকচিহ্নবিশেষ।
এরপর দুরমুশ শব্দটির কথা না বললেই নয়। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস লিখেছেন, হিন্দি দুরমট্ থেকে দুরমুশ। তা হিন্দিতে দুর্মট বা দুরমট্ এল কোথা থেকে? দুরমুশ জিনিসটিতে গাছের ডাল বা বাঁশের আগায় লোহার পেষাইকারী বা ‘পিটনে’ লাগানো থাকে। বিশেষত আগেকার দিনে ঘরের ভিত পেটার জন্যে দুরমুশের প্রয়োগ করা হত। গাছের ডাল বা বাঁশের খণ্ড থাকায় দ্রুমশ বা দ্রুমজ থেকে দুরমুশ আসতেই পারে। রোমশ হাতে দ্রুমশ ব্যবহার করে কেউ কেউ তো তিনতলাবাড়ির ভিতও দিতেন!
দুরমো বা দুরমা বলে একজাতীয় নারকেল পাওয়া যায়। সংসদ বাংলা অভিধানে শব্দটি আছে। মোটামুটিভাবে ডাব আর ঝুনো নারকেলের মাঝামাঝি এই নারকেল। ‘নারকেল দোমালা হয়েছে’, নারকেল-পাড়া ছোকরাদের মুখে এই লব্জ আমরা অনেকেই শুনেছি। এই দোমালা, দুরমা বা দুরমো, — শব্দগুলি দ্রুম-এর অপভ্রংশ বলে মনে হয়। তালগাছ যখন দ্রুমরাজ বা দ্রুমশ্রেষ্ঠ বলে পরিচিত, দোসর নারকেল গাছের ফলকে দুরমো, দুরমা, দোমালা বলে ডাকা হতেই পারে।
দুরমুশকে গ্রাম্যভাষায় নাকি ধুরমুশ বলে। স্মৃতি যদি বিশ্বাসঘাতকতা না করে, আমিও সুদূর গ্রামীণ অতীতে ধুরমুশ কথাটি শুনেছি।
ছেলেবেলায় ধুরমোতলা বলে একটি জায়গার নামও শুনতাম লোকমুখে। পরে জেনেছিলাম জায়গাটির আসল নাম ধর্মতলা। আমি কিন্তু কলকাতার বিখ্যাত ধর্মতলার (Esplanade) কথা বলছি না, গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য ধর্মতলা-নামের কথা বলছি। পরবর্তীকালে শ্রীরামপুরে ডাক্তারি করতে গিয়ে সেখানেও দেখেছি বহাল তবিয়তে আছে একটি ধর্মতলা। তাহলে কি দ্রুমতল থেকে দুরমোতলা হয়ে ধুরমোতলা তথা ধর্মতলা? আসলে কি ধর্মের পীঠস্থান নয়, নেহাতই গাছতলা ছিল জায়গাগুলি? গাছতলাতেই আস্তে আস্তে গড়ে উঠেছিল ধর্মের আলাপআলোচনার ঠেকগুলি? কলকাতার ধর্মতলা নাকি ধর্মঠাকুরের পুজোর জায়গা ছিল। গ্রাম্য দেবতা ধর্মঠাকুর নিজেও তো বৃক্ষকেন্দ্রিক। দ্রুমঠাকুর খেকেই কি ধর্মঠাকুর?
কেউ যদি ভেবে নেন, দ্রুমঠাকুর-ই কালের প্রবাহে দুরমোঠাকুর বা ধুরমোঠাকুর হয়ে ধর্মঠাকুর বনে গেছেন, তাহলে তাঁকে দোষ দেওয়া যাবে না! কেননা ধর্মঠাকুর মূলত গ্রামীণ বৃক্ষকেন্দ্রিক দেবতা। ধর্মঠাকুরের পুজোয় একটি গাছের কাণ্ডকে আলতাসিঁদুর-চালের গুঁড়িগোলা দিয়ে সাজানো হয়। গাছের নীচে পোড়ামাটির তৈরি ঘোড়ার মূর্তি, মাটির সরা, কলসি ইত্যাদি রাখা হয়।
গৌতমবুদ্ধের বোধিবৃক্ষের নীচেই যে সিদ্ধিলাভ, মহানির্বাণ ইত্যাদি ঘটেছিল, তা তো আমরা জানিই। বৌদ্ধদের ধম্ম-ও কি আসলে দ্রুম-শব্দজাত? প্রশ্নটি তোলা কিন্তু অমূলক নয়। অন্তত বৌদ্ধধর্মের উদারতা এই ধরনের প্রশ্নকে বরাবর প্রশ্রয় দেয়। গাছের নীচে সুজাতার পায়েসের কথা তো আমজনতার কাছে অজানা নয়।
সুকুমার রায় আবোলতাবোল-এর শব্দকল্পদ্রুম ছড়াটিতে লিখেছেন, —
‘ঠাস্ ঠাস্ দ্রুম দ্রাম, শুনে লাগে খটকা—
ফুল ফোটে? তাই বল! আমি ভাবি পটকা!’
বস্তুত তৎসম শব্দ দ্রুমকে এত মুন্সিয়ানার সঙ্গে তিনি ছড়াটিতে ব্যবহার করেছেন যে চমকে উঠতে হয়। দ্রুমের সঙ্গে দ্রামের অনুপ্রাস দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন প্রতিভা থাকলে বহু তৎসম শব্দকেই অনায়াসে ছড়ায় ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, শব্দটিকে নিয়ে কিঞ্চিৎ খেলাও করা যায়।
তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কস্মিনকালে দ্রুম শব্দটি ব্যবহার করেননি বলে জানাচ্ছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৈরি বিচিত্রা অনলাইন টেগোর ভেরিওরাম। জানি না এটা সর্বাংশে সত্যি কিনা।
একটি কথা মাথায় রাখা দরকার উচ্চারণগত ভাবে শব্দটি দ্রুম-অ (হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় )। এক্ষেত্রে দ্রুমদলশোভিনীম্ স্মর্তব্য। তবে বাংলায় দ্রুম্ উচ্চারণ করা হয় হরবখত।
রাজা রাধাকান্ত দেবের শব্দকল্পদ্রুম সংস্কৃত অভিধানের জগতে একটি ব্যতিক্রমী অভিধান। ১৮০৩ সাল থেকে রাধাকান্ত এই বিপুলকায় অভিধানটির সংকলন শুরু করেন, প্রথম খণ্ডটি বেরোয় ১৮১৯-এ। শেষ তথা অষ্টম খণ্ড বেরোয় ১৮৫৮-য়। তাঁর চল্লিশ বছরের সাধনায় এটি সম্ভবপর হয়েছিল।
‘দ্রুমারি’ শব্দটি নিয়ে আলাদা করে একটু বলতেই হয়। দ্রুমারি মানে হাতি। দ্রুম + অরি > দ্রুমারি। হাতির পাল জঙ্গলের ভিতর দিয়ে গাছের ডালপালা ভাঙতে ভাঙতে যায়। কচি ডাল খেতে খেতে চলে গজেন্দ্রগমনে। দ্রুম বা গাছের শত্রু হাতি, তাই নাম দ্রুমারি। দ্রুমারি শব্দটির অপভ্রংশের খোঁজে আছি। প্রতিমা বড়ুয়ার হস্তীর গান শুনেছি বারবার, হস্তিবিশারদ ধৃতিকান্ত লাহিড়ীচৌধুরীর শিকারের গল্পও পড়েছি অনেকবার, তারই কোথাও দ্রুমারি শব্দটির তদ্ভবরূপ লুকিয়ে থাকতে পারে, খেয়াল করিনি। আর বুদ্ধদেব গুহ তাঁর অজস্র শিকার ও অরণ্য অ্যাডভেঞ্চারের গল্পে দ্রুমারিহাতির কথা লিখে গেছেন কিনা খুঁজে দেখা দরকার সেটাও।