এবারের শব্দ ধাপা।
ধাপা শব্দটি বেশ জটিল। সব জায়গাতেই বলা হয়েছে সংস্কৃত ‘স্তূপ’ থেকে এসেছে ধাপা শব্দটি৷ কেউ আবার ইংরেজি ‘Depot’ শব্দটিকে টেনে এনেছেন৷ অর্থাৎ ধরেই নেওয়া হয়েছে, ধাপা আর জঞ্জালের স্তূপ সমার্থক৷ ধাপে ধাপে জঞ্জাল জমে শহর কলকাতার উপকণ্ঠে লবণহ্রদের গায়ে যে নধর ও হৃষ্টপুষ্ট পাহাড়টি গড়ে উঠেছে, সেটাই যেন ধাপা৷
ধাপা এবং ধাপার মাঠ আমাদের চিত্ত-মননে সদাজাগ্রত৷ মলে-মার্কেটে জমজমাট কলকাতার একমাত্র মলভূমি এই ধাপার মাঠ৷ ‘ছি ছি এত্তা জঞ্জাল’ বলে ধাপাকে দুয়ো দেওয়ার দিন শেষ৷ ধাপার মাঠে শুধু কপি চাষই হচ্ছে না, অন্যান্য অর্থকরী ফসলও ফলছে আজকাল।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ সম্পাদিত ‘বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান’-এ পাচ্ছি, ধাপা মানে নিম্ন জলাভূমি বা জলাশয়-সংলগ্ন নীচু জমি। কোথায় স্তূপ বা ডিপো (Depot), আর কোথায় নীচু জলাভূমি! মনে হয় এই অর্থটিই মূলের কাছাকাছি।
কলকাতার পুরোনো ম্যাপে দেখা যাচ্ছে, সুতানুটি-কলিকাতা-গোবিন্দপুর জোট বেঁধে জোব চার্নকের কলকাতা হওয়ার সময় থেকেই ধাপা ও ‘সল্টওয়াটার লেক’ মানচিত্রমান৷ অর্থাৎ কলকাতার বর্জ্য জঞ্জাল ধাপে ধাপে জমেই ‘ধাপা’ হয়ে উঠেছে — ধারণাটি মোটেই ঠিক নয়৷ কেন-না, কলকাতার পুরনো মানচিত্রে ও কলকাতার প্রাচীন ইতিহাসে ‘ধাপার মাঠ’ বা ‘ধাপা’ যে সময়ে প্রথম উল্লিখিত হয়েছে, তখনও সেখানে জঞ্জাল ফেলার কোনো পরিকল্পনা ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি তথা ব্রিটিশ শাসকদের তরফে নেওয়া হয়নি৷ জঞ্জাল ফেলার স্থান হিসেবে ধাপার নির্বাচন অনেক পরে, কলকাতার পুরোনো মিউনিসিপ্যালিটির প্রাথমিক দশায়৷
‘সল্টওয়াটার লেক’-এর পাশ্ববর্তী অঞ্চলই ধাপাক্ষেত্র হিসেবে চিহ্ণিত৷ লেক শব্দের বাংলা ‘হ্রদ’ বা ‘দহ’৷ হ্রদের পাশ্ববর্তী হওয়ায় অঞ্চলটি তখন ‘দহপার’ হিসেবে কথিত হত৷ ‘দহপার’ই কালে কালে লোকমুখে দ্রুত উচ্চারণে ‘ধাপার’ শব্দে পর্যবাসিত হয়৷ ‘ধাপাড়’ বলে একটি শব্দ পেয়েছি সুশীলকুমার দের ‘বাংলা প্রবাদ’ বইয়ে, ধাপার মাঠকে বোঝাতে ধাপাড়। এটি নিশ্চয় ধাপার শব্দের একটি রূপ। অর্থাৎ লবণহ্রদের পারে যে মাঠ অবস্থিত, সেটাই আসলে ‘ধাপার মাঠ’ বা ‘দহপার মাঠ’৷ ‘ধাপার’ থেকেই সংক্ষিপ্ত হয়ে ধাপা শব্দটি এসেছে৷ ধাপার মাঠ ও গড়ের মাঠ শব্দবন্ধদুটি প্রাচীন কলকাতায় খুবই প্রচলিত ছিল৷ ময়লা আবর্জনা ফেলার আস্তাকুঁড় হিসেবে ধাপার যে বদনাম তা খণ্ডন হওয়া দরকার৷
হরিসাধন মুখোপাধ্যায় লিখিত ‘কলিকাতা সেকালের ও একালের’ বইটিতে পুরোনো কলকাতার যে বিবরণ পাচ্ছি তার একাংশ হুবহু তুলে দিলাম — ‘‘বর্তমান কয়লাঘাট ও চাঁদপাল ঘাটের মধ্যবর্তী স্থানে একটি খাল ছিল৷ এই খালে বড়ো বড়ো নৌকা যাইতে পারিত৷ আজকাল যাহা হেস্টিংস স্ট্রিট (Hastings Street) বলিয়া প্রখ্যাত, যাহার আশেপাশে প্রাসাদতুল্য বাড়ি, সরকারি অফিস, সেই রাস্তা খালের গর্ভে ছিল৷ এই খাল বরাবর মাঠের ও জঙ্গলের মধ্য দিয়ে ক্রীক রো (Creek Row) ও ওয়েলিংটন স্কোয়ার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল৷ ইহার পর বেলিয়াঘাটার মধ্য দিয়া আরও কিছুদুর গিয়া ইহা ধাপা বা Salt Water Lake-এর সহিত মিশিয়াছিল৷ এই খালের দুই দিকেই পঙ্কিল নালা-নর্দমা, দুই ধারে জঙ্গল ও বড়ো বড়ো গাছ ছিল৷ এই স্থান হইতে একটি অপ্রশস্ত পথ বাহির হইয়া আজকাল যেখানে গড়ের মাঠের কেল্লা আছে ও পূর্বে যে স্থানকে গোবিন্দপুর বলিত, সেই পর্যন্ত ব্যাপৃত ছিল৷ আজকাল যাহা এসপ্ল্যানেড বা ধর্মতলা বলিয়া কথিত, তাহার অধিকাংশই জঙ্গলপূর্ণ ছিল৷ তবে এই জঙ্গলের মধ্যে কোথাও বা গোচারণভূমি, কোথাও বা বিশৃঙ্খলভাবে নির্মিত দুই-চারটি গ্রাম্য কুটির৷’’
এই খালটির কোনো নাম হরিসাধন মুখোপাধ্যায়ের বইয়ে পাওয়া যায় ন৷ রাধারমণ মিত্রের ‘কলিকাতা-দর্পণ’-এও খালটির নামোল্লেখ নেই৷ ভাগীরথীর যে জলধারা খালটির মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে ধাপা পর্যন্ত কলকাতাকে মাতৃস্নেহে লালিত-পালিত করত; অন্তঃসলিলা ফল্গুধারার মতো যার ব্যাপ্তি, সেই খালটির কোনো নাম অবশ্যই ছিল, কালের প্রবাহে সেটা জনমানস থেকে মুছে গেছে৷ এইখানে খালের পার্শ্ববর্তী গোবিন্দপুর আমাদের কিঞ্চিৎ আলো দেখাতে পারে৷ বনবাদাড়, নালা-ডোবা, জলা-জংলা জায়গায় পূর্ণ গোবিন্দপুরের গা-ঘেঁষে বয়ে যেত এই খালটি৷ পরে এই গোবিন্দপুরেই ধর্মতলা, গড়ের মাঠের কেল্লা প্রভৃতি গড়ে ওঠে৷ ধাপার উদ্দেশে ধাবিত যে জলধারা, তাকে অক্লেশে ‘ধাপাধারা’ নামে ডাকা যায়৷ ফল্গুধারার মতো এই ‘ধাপাধারা’ খাল বা নদীটি লোকের মুখে মুখে অপভ্রংশ হয়ে ‘ধাপধাড়া’ বলে পরিচিত হয়৷ ‘ধাপধাড়া’ খালটির পাশেই জলা-জংলা, বনবাদাড়ে পূর্ণ নালা-ডোবায় ডুবুডুবু গ্রাম ‘গোবিন্দপুর’৷
ধাপা যে স্তূপ থেকে আসেনি, তা একপ্রকার নিশ্চিত।
জলাশয় তথা দহ-র পার্শ্ববর্তী নাবাল জমিই (দহপার) বঙ্গে ধাপা নামে চিহ্নিত হত। স্তূপ, Depot, dump এগুলি পরবর্তীকালের অভিধানপ্রণেতাদের সংযোজন।