ছেলে/ছেলেবেলা
‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে’! জীবনানন্দমাতা কুসুমকুমারী দাশের এই আশা যে কিছুটা হলেও পূরণ হয়েছে, তা চন্দ্রযান ৩-এর চাঁদে সফ্ট ল্যান্ডিং ও ল্যান্ডার বিক্রম আর রোভার প্রজ্ঞানের নানাবিধ কর্মকাণ্ডে বাঙালি মেধাবী ছেলেদের সফল অংশগ্রহণেই তা পরিষ্কার।
লক্ষ্মী ছেলে, ঘরের ছেলে, পরের ছেলে, বামুনের (ব্রাহ্মণের) ছেলে, ভদ্রলোকের ছেলে, চাষার ছেলে, গরিবের ছেলে, ভিখিরির ছেলে, দস্যি ছেলে, দামাল ছেলে, কাঙালের ছেলে, বড়লোকের ছেলে, চালাক ছেলে, বোকা ছেলে, ধড়িবাজ ছেলে, — ছেলের রকমের যেন শেষ নেই!
‘ছেলে’ শব্দটির ব্যুৎপত্তি কী? ‘ছেলে’র উৎসের দিকে তাহলে একটু নজর ফেরানো যাক৷
হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’-এ পাই, ‘শাবক’ শব্দ থেকে প্রাকৃত ‘ছাব’ শব্দ হয়ে বাংলা ছাবাল তথা ছাওয়াল শব্দটি আসছে৷ ‘ছাওয়াল’ থেকেই ‘ছেলে’৷
সংসদ বাংলা অভিধান হরিচরণেরই প্রতিধ্বনি করেছে। সংস্কৃত শাবক > প্রাকৃত ছাব > ছাওয়াল > ছেলে।
জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাঙ্গালা ভাষার অভিধানে পাওয়া যাচ্ছে, — সং= শাবক > ছাবাল = ছাওয়াল = ছাআল = ছেলে। বেটাছেলে ও মেয়েছেলে, শব্দদুটি যথাক্রমে পুরুষশাবক ও স্ত্রীশাবক নির্ধারণ করে।
ছাওয়াল থেকে ছেলে কীভাবে আসতে পারে, সেটা নিয় অবশ্য একটু ধন্দ আছে। ছাওয়াল কখনও ছাইয়াল হলে তবেই স্বরসঙ্গতির নিয়মে ছেয়াল হবে। সেখান থেকে ছেয়ালে, ছ্যালে হয়ে ছেলে আসবে। তাহলে কি শাবক থেকে প্রাকৃতপথে ছেলে আসার সময়, কোনও না কোনও পর্বে ছাইয়াল শব্দটি ছিল?
প্রকৃতপ্রস্তাবে তৎসম শব্দ শাবক-এর থেকে কন্নড় ‘চিল্লে’ থেকে ছেলে শব্দটি আসা সোজা।কন্নড় ভাষায় চিল্লে মানে বালক, শিশু বা পুত্র। মালয়ালম চেওল শব্দটির মানে দুগ্ধপোষ্য শিশু। সুতরাং দ্রাবিড়ভাষাগুলি থেকে ছেলে শব্দটির আগমন হয়েছিল কিনা তা তলিয়ে দেখা দরকার। আদতে বাঙালি ভাষার দিক থেকে দ্রাবিড়-অস্ট্রিক উত্তরাধিকার বহন করছে। পরে আর্য সংমিশ্রণ ঘটেছে।
ছেলে শব্দটির সঙ্গে বেলা যোগ হলে ‘ছেলেবেলা’ আসে। বাল্যাবস্থা, বাল্যকাল, বালকবয়স ইত্যাদি অর্থে এর ব্যবহার। মেয়েবেলা কিন্তু ছেলেবেলার অপোজিট জেন্ডার নয়। সংস্কৃত মাতৃকা থেকে প্রাকৃত মাইআ হয়ে মেয়ে এসেছে। মেয়ের মধ্যেই মা শব্দটি লুকিয়ে আছে। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস বাঙ্গালাভাষার অভিধানে আর একটি ব্যুৎপত্তি দিয়েছেন।
মহিলা > মহিআ > মায়্যা > মেয়ে।
‘ছেলেবেলা’ লিখলে শুধু মেয়েবেলা বইটির লেখিকা তসলিমা নাসরিন কেন, প্রত্যেক নারীর জীবনের প্রথম খণ্ডকালকে বোঝাবে। ‘ছাওয়াল’ শব্দের দ্যোতনা ‘মেয়ে’ শব্দটিতে বিন্দুমাত্র নেই৷ মেয়েছেলে, মেয়েমানুষ কি বাচ্চা মেয়েকে বোঝায়?
সন্তানের বাল্যকাল বোঝাতে স্ত্রীপুরুষ নির্বিশেষে ‘ছেলেবেলা’ লেখাই বাঞ্ছনীয়। ‘মেয়েবেলা’ মোটেই নারীজীবনের প্রথম খণ্ডকালকে বোঝাতে পারে না৷ বস্তুত এটি একটি অনির্ধারক শব্দ, যা ‘নারীর জীবনকাল’ বা ‘মেয়েজীবন’ বোঝায়৷ ছেলেবেলার প্রতিস্পর্ধী শব্দ হিসেবে মেয়েবেলা শব্দটির অবতারণা তাই একটি ভুল সিদ্ধান্ত।
একটি প্রতিষ্ঠিত পাক্ষিক পত্রিকার সম্পাদকের দাবি — ‘মেয়েবেলা’ শব্দটি লেখিকা তসলিমা নাসরিনের সৃষ্টি৷ কী অদ্ভুত দাবি৷ ১৯৮৭ সালে সাহিত্যিক লীলা মজুমদার প্রথম ‘মেয়েবেলা’ শব্দটি ব্যবহার করেন। সংস্কৃতাপত্য বাংলা ভাষার একটা অসীম ক্ষমতা আছে নিত্যনতুন শব্দের জন্ম দেওয়ার৷ Boyhood বা Girlhood-দুটি ইংরেজি শব্দেরই বাংলা ‘ছেলেবেলা’৷ ‘মেয়েবেলা’ লিখলে হয়তো জ্ঞানীগুণীজনের পিঠ চাপড়ানি পাওয়া যায়, তবে ভাষাজ্ঞানহীনতা প্রকাশ হয়ে পড়ে৷ কেউ কেউ ছোটবেলা লিখে ভাবের ঘরে চুরি করলেও, ভবি কিন্তু ভুলবে না।
এটাও ঠিক, বাংলা সাহিত্যে কেউ কোনও ‘শব্দ’ সৃষ্টির পেটেন্ট দাবি করতে পারে না৷ নতুন শব্দের সৃষ্টি হয় ভাষার উৎকর্ষে, লেখকের কেরামতিতে নয়৷